Robbar

প্রাচ্যের ভক্তি আর পাশ্চাত্য মানবতার সেতু?

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 28, 2026 12:01 pm
  • Updated:April 28, 2026 12:01 pm  

আমি ইচ্ছে করে গিনসবার্গের ভারত-ভ্রমণ, বিশেষ করে কলকাতায় অর্জিত তাঁর অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বিশদভাবে লিখছি না। এ বিষয়ে এ শহরে অনেক কিছু লেখা হয়েছে। তবে এ প্রসঙ্গে যা বিশেষ উল্লেখের দাবি করে, তা হল বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের প্রতি তাঁর অকুণ্ঠ সমর্থন। একই সংহতি তিনি দেখিয়েছিলেন ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি। তিনি, চমস্কি, রবার্ট লাওয়েল, নর্মান মেয়লার এবং অন‌্যান‌্য স্বনামধন‌্যরা সেই পর্বে যে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, তার নাম ছিল ‘RESIST– A Call to Resist Illegitimate Authority’। তিনি কি সেক্ষেত্রে কমিউনিজমের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন?

শুভরঞ্জন দাশগুপ্ত

I saw the best minds of
My generation destroyed by
Madness

[Howl, Allen Ginsberg]

টি এস এলিয়ট বা বুদ্ধদেব বসুর কবিতা ও জীবন বিষয়ে নিবন্ধ লেখা অতীব সহজ কাজ। তুলনায় অ্যালেন গিনসবার্গ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে ভাবতে হয়– কীভাবে শুরু করব? বিচিত্র, বহুস্তরী, নানাবিধ অভিজ্ঞতা তাঁকে বর্ণময় এবং বিতর্কিত করে তুলেছে। তিনি শ্রেণিহীন সমাজের স্বপ্নে বিভোর হয়ে থেকেছেন। আবার পরবর্তী জীবনে শ্রীকৃষ্ণের মগ্ন পূজারীতে পরিণত হয়েছিলেন। পশ্চিম বিশ্ব, বিশেষ করে মার্কিন মুলুকের পণ‌্যাকীর্ণ সমাজকে তিনি সমূলে প্রত‌্যাখান করেছিলেন। আবার, অন‌্যদিকে কঠোর নিয়ন্ত্রণাধীন চিনও তাঁকে একবিন্দু স্বস্তি দেয়নি। তিনি বিশ্বের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত ছুটে বেরিয়েছেন অমৃতের সন্ধানে, উত্তরণের প্রত্যাশায়।

অ্যালেন গিনসবার্গ

তাঁর অশান্ত-অদম‌্য জীবনচর্চা নিয়ে যখন বিভ্রান্ত বোধ করি, তখন আমাদের একমাত্র আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায় তাঁর অম্লান-অটুট কবিতা। সব বিতর্ক-বিরোধ দ্বন্দ্বের যেন নিষ্পত্তি ঘটে তাঁর বেপরোয়া, মুক্তিকামী, প্রতিবাদী কবিতায়– যেখানে তিনি স্বরাট, বন্ধনহীন। সৌভাগ‌্যের বিষয়, পশ্চিম বিশ্বের কাব‌্যরসিকেরা তাঁকে প্রভূত সম্মান জ্ঞাপন করেছেন। উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস, কেনেথ রেক্সরথ, ডেনিস লেবেরটভের মতো স্বনামধন‌্য কবিরা তাঁকে সেলাম জানিয়েছেন অকাতরে। আধুনিক মার্কিনি কবিতার প্রতিটি সংকলনে তাঁর সুযোগ‌্য স্থান সুনিশ্চিত। বিশেষ করে, ‘Howl’ এবং ‘Kaddish’-এর মতো দীর্ঘ কবিতাকে অনেক সমালোচক ‘অত‌্যাশ্চর্য’ বলে অভিহিত করেছেন। এমনকী তাঁর ক্ষুদ্র কবিতাগুলিও আমাদের মোহিত করে। ইংরেজ-মরমী কবি উইলিয়াম ব্লেকের প্রগাঢ় ভক্ত, গিনসবার্গ সেই অদ্বিতীয় পঙ্‌ক্তিটি লিখেছিলেন, ‘I rushed up enchanted– it was my first sunflower, memories of Blake– my visions.’।

উইলিয়াম ব্লেক

এই বেপরোয়া কবিকে যথার্থ সম্মানজ্ঞাপন করা হয়েছে বহুবার। ১৯৭৪ সালে তাঁকে প্রদান করা হয় US National Book Award for Poetry; ১৯৭৯ সালে National Arts Club-এর স্বর্ণপদক এবং ১৯৯৩ সালে তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করে ফ্রান্সের সংস্কৃতি মন্ত্রক। তাঁকে অলংকৃত করা হয় ‘Chevalier des Arts et des Lettres’ উপাধি দিয়ে। অবশ‌্য, এই আদ‌্যোপান্ত বোহেমিয়ান কবিকে সুশৃঙ্খল অ্যাকাডেমিক জগতও স্বাগত জানায় সাগ্রহে। ১৯৮৬ সালে প্রখ্যাত ব্রুকলিন কলেজে তিনি সাহিত‌্যের প্রফেসর হয়ে ছাত্রছাত্রীদের কবিতা পড়াতে শুরু করেন। মৃত‌্যু পর্যন্ত তিনি এই গুরুদায়িত্ব সম্পাদন করে যান। ছাত্রছাত্রীরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাঁর লেকচার শুনত, বিষয়– উইলিয়াম ব্লেক, ওয়াল্ট উইটমান, জ‌্যাক কেরুয়াকের কবিতা। অন্তরঙ্গতম বন্ধু, পরে বিচ্ছিন্ন কেরুয়াকের নিম্নোক্ত কয়েকটি পঙ্‌ক্তি তিনি ক্লাসকক্ষে বারবার উচ্চারণ করতেন:

Everything
Is ignorant of its own emptiness
Anger
Doesn’t like to be reminded of fits.
                                                          [Fragment from 113th Chorus]

আর তাঁর নিজের প্রখ‌্যাততম প্রবাদপ্রতিম কবিতা ‘Howl’ নিয়ে কী বলব? এই কবিতায় তিনি একাধারে ধনতন্ত্র আর ক্ষমতার প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত‌্যকে চাবুক মেরেছেন, অবাধ যৌনতাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, এবং এমন দর্পিত ভাষায় যে, ১৯৫৭ সালে মার্কিন সরকারের শুল্কবিভাগ সংশ্লিষ্ট কাব‌্যগ্রন্থটিকে বাজেয়াপ্ত করে। আসলে, ‘Howl’-এ-ই গিনসবার্গ তাঁর পুরুষসঙ্গী পিটার অরলভস্কির সঙ্গে সম্পর্ককে সঙ্গত ও নৈতিক দাবি করেছিলেন, অন‌বদ‌্য কাব‌্যভাষায়। অতঃপর ‘হাউল’-এর বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ আনা হয়। কবিতাটি খুঁটিয়ে পড়ে বিচারক ক্লেইন হর্ন বলেন আশ্চর্য‌্যক ভাষায়, ‘Would there be any freedom of press or speech if one must reduce his vocabulary to vapid innocuous euphemism?’ অর্থাৎ, বিচারক কবিকে মুক্ত করে অভিবাদন জ্ঞাপন করেন।

গিনসবার্গ চিত্রিত ও স্বাক্ষরিত ‘হাউল’

আমি ইচ্ছে করে গিনসবার্গের ভারত-ভ্রমণ, বিশেষ করে কলকাতায় অর্জিত তাঁর অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বিশদভাবে লিখছি না। এ বিষয়ে এ শহরে অনেক কিছু লেখা হয়েছে। তবে এ প্রসঙ্গে যা বিশেষ উল্লেখের দাবি করে, তা হল বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের প্রতি তাঁর অকুণ্ঠ সমর্থন। একই সংহতি তিনি দেখিয়েছিলেন ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি। তিনি, চমস্কি, রবার্ট লাওয়েল, নর্মান মেয়লার এবং অন‌্যান‌্য স্বনামধন‌্যরা সেই পর্বে যে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, তার নাম ছিল ‘RESIST– A Call to Resist Illegitimate Authority’। তিনি কি সেক্ষেত্রে কমিউনিজমের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন? তাঁর মা ছিলেন ঘোরতর কমিউনিস্ট, পার্টির সদস‌্যা। এ প্রসঙ্গে গিনসবার্গ নিজে বলেছিলেন, ‘I Stick to my our idiosyncratic version of Communism’। পরে একনায়কি কমিউনিস্ট শাসন ব‌্যবস্থা কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করে তিনি বলেছিলেন, ‘I must say that I see little difference between the armed and violent governments both Communist and Capitalist that I have observed.”।

গিনসবার্গ ও অরলভস্কি, ভিয়েতনাম যুদ্ধ-বিরোধী মিছিলে, ১৯৬৬

আসলে, আরও অনেক বিবেকবান চিন্তাবিদ ও লেখকদের মতো, গিনসবার্গও পরিণাম খুঁজে পাননি এই দু’টি পরস্পরবিরোধী সমাজ-ব‌্যবস্থায়। এই তীব্র অন্তর্সংঘাত স্মরণীয় কয়েকটি বাক‌্যে বর্ণনা করছেন গত শতাব্দীর অন‌্যতম শ্রেষ্ঠ নন্দনতত্ত্ববিদ থিগেডর অ্যাডর্নো। তিনি বলেছিলেন, ‘I cannot accept the verified West, a slave to commodification. I cannot accept the totalitarian East, a slave to one-party dictatorship.’। মাঝেমধ‌্যে নিজেকে প্রশ্ন করি, আজ যদি কবি বেঁচে থাকতেন, তিনি উন্মত্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনীতির বিরুদ্ধে কী বলতেন? সম্ভবত, আর একটি কবিতা লিখতেন, যার শিরোনাম হত ‘Scream’!

‘কাদিস’, গিনসবার্গ চিত্রিত ও স্বাক্ষরিত শিরোনাম পৃষ্ঠা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক-আয়তনিক (One-dimensional) সমাজের বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছিল– তথাকথিত Beat Generation বা বিট প্রজন্ম। বলাবাহুল‌্য, গিনসবার্গ এই বিরোধী বিশ্বের অন‌্যতম মুখ‌্য স্তম্ভ ছিলেন। তাঁর সহযোদ্ধারা ছিলেন জীবনসঙ্গী পিটার অরলভস্কি, কবি গ্রেগরি কর্সো, কথাশিল্পী উইলিয়াম বারোস, কবি জ‌্যাক কেরুয়াক। পাঁচের দশকের এই আন্দোলন ছয়ের দশকে হিপিদের উদ‌্যোগের সঙ্গে সম্পর্কস্থাপন করে। তখনই বব ডিলানের ঘনিষ্ঠ মিত্রতে পরিণত হন গিনসবার্গ। অতঃপর এই অধ‌্যায় থেকেই একদা স্বেচ্ছাচারী বামপন্থী গিনসবার্গ যাত্রা করেন ধর্মের দিকে, প্রাচ‌্যের ধর্মের দিকে। প্রথমে বৌদ্ধদর্শনের মরমিয়াবাদ তাঁকে আচ্ছন্ন করে (‘প্রজ্ঞাপারমিতা’ পাঠ করে তিনি বলেছিলেন, ‘it blew my mind.’।) অবশেষে তিনি কৃষ্ণকেই পরম আরাধ‌্য বলে গ্রহণ করেন এবং ‘হরেকৃষ্ণ’ মন্ত্রধ্বনি তাঁর সম্পদ ও সম্বল হয়ে ওঠে। এই পর্বেই তিনি ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের অনুগত হয়ে ওঠেন, যদিও তাঁর আরোপিত কয়েকটি আচরণবিধি তিনি অবজ্ঞা করেছিলেন। কৃষ্ণমন্ত্র, যাকে বলে, তাঁর জীবনের অপরিহার্য অঙ্গে পরিণত হয়। ১৯৬৮ সালে ডেমোক্র‌্যাটদের জাতীয় কনভেনশনে এবং দু’ বছর পরে ব্ল‌্যাক প‌্যান্থারদের বিদ্রোহী সমাবেশে উপস্থিত থেকে তিনি অবিরাম কৃষ্ণনাম উচ্চারণ করেছিলেন। এই সময় প্রাচ‌্যপ্রীতির অর্থ কি পাশ্চাত‌্যকে পুরোপুরি বর্জন? আমার তো মনে হয়, তিনি প্রাচ‌্য ও পাশ্চাত‌্যের ভক্তিরস এবং মানবতার ভিতর সেতুস্থাপন করতে উন্মুখ ছিলেন। সেই কারণেই তিনি উইলিয়াম ব্লেকের মতো দিব‌্যোন্মাদ মরমিয়া কবি এবং একাগ্র মানবতাবাদী ওয়াল্ট উইটমানের অবদানকে হৃদয়গ্রাহী শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন। এঁদের কবিতাই তাঁকে পুষ্ট করেছিল। সমালোচক জেন ক্রেমারের মতে, “He adhered to whitman’s brand of American humanism and the visionary romanticism of William Blake. Ultimately, he saught the ideal of harmony among men and condemned all forms of exploitation.” তিনি বারবার ফিরে যেতেন ব্লেকের চিরন্তন লিরিকের জগতে– ‘Ah! Sunflower’, ‘The Sick Rose’, ‘The Little Girl Lost’।

বিট কবিদের মধ্যমণি গিনসবার্গ, সান ফ্রান্সিসকো, ১৯৬৫

তাঁর ভাবনা, চিন্তা, পর্যটন, দর্শনের সমৃদ্ধ জগৎ সত‌্যি বিচিত্র, বহুমুখী, ইংরেজিতে যাকে বলা যায় Encyclopedic। তাঁর রাজনৈতিক-সামাজিক অঙ্গীকারও বিশুদ্ধ প্রশস্তি দাবি করে। কিন্তু এই সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় তাঁর কবিতা– ‘Howl and other poems’ (১৯৫৬), ‘Kaddish and other Poems’ (১৯৬১), ‘The Gates of Wrath’ (১৯৫১), ‘Illuminated Poems’ (১৯৯৬) এবং আরও অন‌্যান‌্য কাব‌্যগ্রন্থের সমাহার। Yale Review-এর নামী সমালোকচ জে ডি ম্যাকক্লাচকি-কে এই কাব‌্য উদ্বুদ্ধ করেছে বলতে যে, ‘He is the best known American poet of his generation, as much a social force as a literary phenomenon.’। এখানেই শেষ নয়, সময়ের স্পন্দনের সঙ্গে যুক্ত করে বলা হয়েছে ‘তাঁর কাজ, শেষ বিচারে, আমাদের কালেরই প্রতিচ্ছবি, আমাদের প্রত‌্যেকটি দ্বন্দ্ব-স্ববিরোধিতা তাঁর কবিতায় ভাস্বর।’

সুতরাং এই নিবন্ধ শেষ করা উচিত তাঁর কবিতার উপর নির্ভর করে। অবশ‌্যই ‘হাউল’-এর সেই অবিস্মরণীয় শেষ পঙ্‌ক্তিগুলি স্মরণ করে। আসুন, আসুন, তাঁর কবিতার সাম্রাজ‌্যে প্রবেশ করি, যেখানে তাঁর প্রতিভা এবং অন্বেষণ সন্নিহিত:

Holy! Holy! Holy! Holy! Holy! Holy! Holy! Holy! Holy! Holy! Holy! Holy! Holy! Holy! Holy!
The world is holy! The soul is holy! The skin is holy!
The nose is holy! The tongue and cock and hand and asshole holy!
Everything is holy! everybody’s holy! everywhere is holy! everyday is in eternity! Everyman’s an angel!
The bum’s as holy as the seraphim! the madman is holy as you my soul are holy!
The typewriter is holy the poem is holy the voice is holy the hearers are holy the ecstasy is holy!
Holy Peter holy Allen holy Solomon holy Lucien holy Kerouac holy Huncke holy Burroughs holy Cas-sady holy the unknown buggered and suffering beggars holy the hideous human angels!
Holy my mother in the insane asylum! Holy the cocks of the grandfathers of Kansas!
Holy the groaning saxophone! Holy the bop apocalypse! Holy the jazzbands marijuana hipsters peace & junk & drums!
Holy the solitudes of skyscrapers and pavements! Holy the cafeterias filled with the millions! Holy the mysterious rivers of tears under the streets!