


কিছুদিন আগেই ‘২০১৬ এস্থেটিকস্’ নাম দিয়ে ইনস্টাগ্রামে চলেছিল স্মৃতিচারণার ঢেউ– ঝাপসা ছবি, পুরনো ফিল্টার ইত্যাদি। ক্রেয়ন ট্রেন্ড-ও বহন করছে সেই একই উত্তরাধিকার। অ্যালগরিদম-শাসিত ক্লান্ত ডিজিটাল যুগে মানুষ যেন খুঁজে নিতে চাইছে শৈশবের ‘সব পেয়েছি-র দেশ’।
প্রচ্ছদের আর্টওয়ার্ক: সত্যজিৎ রায়
‘হাতের মুঠোয় রং পেন্সিল/ লাল-সাদা বল পাটকিলে ঢিল…’ বছর ২০ আগে খুব শোনা যেত এই গানটি। হঠাৎই সে গান স্মৃতি-সজীব। অকারণে? একেবারেই নয়। শৈশবের সেই রঙিন মোমখড়ি বা ক্রেয়ন যে আবারও শিরোনামে! গত কয়েক সপ্তাহে ইনস্টাগ্রামে আচমকাই দেখা দিয়েছে এক নবজোয়ার, ‘ক্রেয়ন ট্রেন্ড’।
সাধারণ ছবি এআই-এর সাহায্যে রূপান্তরিত হচ্ছে খানিক রঙিন, খানিক অসমান হাতে আঁকা অবয়বে। ছবিগুলি যেন কোনও বিশ্বজনীন শিশু ভোলানাথের আপন খেয়ালে ক্রেয়নে আঁকা ইলাস্ট্রেশন। অ্যালগরিদম বা প্রম্পট এমনভাবেই বানানো হয়েছে যাতে করে প্রতিটি জেনারেটেড ইমেজেই থাকে শিশুসুলভ অসম্পূর্ণতার ছাপ। সারল্য (তা সে যতই কোডিং হোক), খসখসে টেক্সচার, মোটা আউটলাইন, ঝলমলে রং– সবই যেন নিমেষে মনে করিয়ে দিচ্ছে স্কুলব্যাগের ভিতরে থাকা আঁকার-খাতা, প্লাস্টিকের বাক্স, নতুন ক্লাস, নতুন মোম-রঙা গন্ধ মেশানো উত্তেজনা। বহু মানুষের কাছে তাঁদের শৈশব-স্মৃতির রোমন্থন।

এআইয়ের নিখুঁত, পরিপাটি ডিজিটাল ছবির ভিড়ে এই খানিক এলোমেলো চেহারা যেন অনলাইন দুনিয়ায় সতেজ হাওয়া বইয়ে দিয়েছে। শাহরুখ খানের ফ্যানপেজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রযোজনা সংস্থা, কর্পোরেট ব্র্যান্ড থেকে শুরু করে বিভিন্ন ইনফ্লুয়েন্সার– সকলেই এই চলতি হাওয়ার পন্থী। অথচ আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ক্রেয়ন কিন্তু আদৌ নতুন কিছু নয়। বরং মোমরঙের নিজস্ব ইতিহাস চমকে দেওয়ার মতো।


আদ্যিকালে কাঠকয়লা বা চারকোল এবং তেল দিয়ে তৈরি মণ্ড পাকিয়ে তৈরি হত নলাকার রং। প্যাস্টেলের গড়ন এবং শিল্প-ঐতিহ্যের সঙ্গে ক্রেয়নের বহুদিনের যোগাযোগ। আধুনিক ক্রেয়নের উৎস ইউরোপে। পঞ্চদশ শতকে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি যে প্যাস্টেলকে কৌলিন্য এনে দিয়েছিলেন, তাই-ই আঠারো শতকের শেষভাগে প্যারিসে এসে বিপুল পরিচিতি পেল ‘কন্টি-ক্রেয়ন’ নামে। যা প্যাস্টেল এবং আধুনিক ক্রেয়নের একটি মধ্যবর্তী মাধ্যম। উনিশ শতক থেকেই শিল্পীদের একচেটিয়া ব্যবহার্যের তালিকা ছেড়ে ‘ক্রেয়ন’ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে শুরু করে। ১৮১৩ সালে প্রকাশিত ‘প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’ উপন্যাসেও ক্রেয়নের উল্লেখ মেলে। ফরাসি লিথোগ্রাফার জোসেফ লেমার্সিয়ে এবং আমেরিকায় চার্লস বাউলির মতো উদ্ভাবক রঙিন মোমকে পেনসিলের মতো আকার দিতে শুরু করেন। শিক্ষাক্ষেত্র এবং গৃহস্থালিতে এর বিপুল সম্ভাবনা বুঝতে পারে বিভিন্ন সংস্থা। এরপরই আসর মাত করে দেয় ‘ক্রেয়োলা’– ১৯০৩ সালে এডউইন বিনি ও সি.হ্যারল্ড স্মিথ বাজারে আনেন তাঁদের এই বিখ্যাত ক্রেয়নের হলুদ-রঙা বাক্স। কিংবদন্তি হয়ে ওঠা ক্রেয়োলা অচিরেই হয়ে ওঠে বেশ কয়েক প্রজন্মব্যাপী শৈশব-কৈশোরের প্রতীক।

সম্ভবত সেই কারণেই ক্রেয়ন এতখানি আবেগ, এতখানি নস্টালজিয়ার জায়গা জুড়ে রয়েছে। ভারতীয় এবং বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের স্মৃতিতে ক্রেয়নের প্রতি পক্ষপাতিত্বের কমতি নেই। নতুন ক্লাসে ওঠার আগে স্টেশনারি দোকানে গিয়ে প্যাকেটে মোড়ানো মোম-রং কেনার আহ্লাদ, নতুন খাতার গন্ধ শুঁকে ছবি আঁকা, আবার আঁকতে বসে হাতের বেকায়দা চাপে মট্ করে ক্রেয়নের ডগা ভেঙে যাওয়ার দুঃখ– সবই জড়িয়ে রয়েছে বাঙালির ছোটবেলা জুড়ে। হবে না-ই বা কেন? অমন যে জাতিস্মর ‘মুকুল’, সেও তো তার গতজন্মে-দেখা ‘সোনার কেল্লা’-র ছবি আঁকতে গিয়ে বেছে নিয়েছিল মোমরঙেরই বাক্স! এই নস্টালজিয়াই আজকের সোশ্যাল মিডিয়ায় বড় চালিকাশক্তিগুলির একটি। কিছুদিন আগেই ‘২০১৬ এস্থেটিকস্’ নাম দিয়ে ইনস্টাগ্রামে চলেছিল স্মৃতিচারণার ঢেউ– ঝাপসা ছবি, পুরনো ফিল্টার ইত্যাদি। ক্রেয়ন ট্রেন্ড-ও বহন করছে সেই একই উত্তরাধিকার। অ্যালগরিদম-শাসিত ক্লান্ত ডিজিটাল যুগে মানুষ যেন খুঁজে নিতে চাইছে শৈশবের ‘সব পেয়েছি-র দেশ’।

স্কুলজীবনে সব ক্লাসেই এমন কিছু ছাত্রছাত্রী থাকত, যারা ‘ভালো আঁকে’। বাকিরা দূর থেকে মুগ্ধ হয়ে দেখত। অনেকেই বড় হয়ে ভবিতব্যকে মেনে নিয়েছেন এই ভেবে যে, ‘আমি আঁকতে পারি না।’ কিন্তু এআই-নির্ভর ক্রেয়ন ফিল্টার সেই সংকোচকে দূর করে দিয়েছে। এখন যে কেউ নিজের ছবি, প্রোফাইলের ছবি, বা ভ্রমণের দৃশ্যকে ‘হাতে-আঁকা’ ছবি করে তুলতে পারছেন। নিমেষেই। ফলে যাঁরা কখনও আঁকতে পারেননি বলেই মানতেন, তাঁরাও সোৎসাহে গা ভাসাচ্ছেন এই ট্রেন্ডে।

এর মধ্যে হয়তো প্রচ্ছন্নভাবে কাজ করছে এক ধরনের গণতান্ত্রিক মনস্তত্ত্বও। এই ট্রেন্ডে অংশ নিতে তালিমের, বা শিল্প-দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজন নেই, অথচ সৃজনশীলতার আনন্দ আছে পুরোমাত্রায়। তার সঙ্গে বাড়তি ইন্ধন সোশ্যাল মিডিয়ার পিয়ার প্রেশার। সকলে করছে, অতএব আমাকেও করতে হবে, নইলে পিছিয়ে পড়তে হয়। তাই সেলিব্রিটি, ব্র্যান্ড, ইনফ্লুয়েন্সারদের সঙ্গে সাধারণ মানুষেরাও অদৃশ্যভাবে একই মোহের হাতছানিতে ভেসে যান সামাজিক মাধ্যমে দৃশ্যমান থাকার তাগিদে।

সম্প্রতি ফেসবুকে এক জনৈক ভদ্রলোক একটি ক্রেয়নের বাক্সের ছবি দেওয়া পোস্টের নিচে কমেন্টে লেখেন, ‘আমি যেন ছবিটার গন্ধ পাচ্ছি!’ এই একটি মন্তব্য যেন গোটা ঘটনাটির চুম্বক-সার। এলোমেলো খাপছাড়া নান্দনিকতার যে ম্যানুয়াল মোহে আজ ইন্টারনেট উত্তাল, তাও যে আদতে প্রযুক্তিরই সুচিন্তিত নির্মাণ, তা আমরা বিস্মৃত! ডিজিটাল যুগের ক্লান্ত মানুষের কাছে এই খামতিটুকুই হয়ে উঠছে পরম আদরণীয়। কারণ এত নিছক ছবির হুজুগ নয়, বর্ণে-গন্ধে-ছন্দে-গীতিতে কয়েকটি প্রজন্মের মানুষের হৃদয়ে যা দোলা দিয়েছে তার সবটুকুই কি মিথ্যে? বলবে ভবিষ্যৎ।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved