Rabindranath’s Vision of Humanity Against Political Hatred। Robbar
Robbar
  • ৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২৫ আগস্ট ২০২৬

মারের সাগর পাড়ি দেব

মারের বদলা কি মার হয় রবীন্দ্রনাথে? না। শুরু হয় প্রতিহিংসাহীন ত্যাগ আর আত্মদানের মধ্য দিয়ে এক গভীর চলা। কখনও কখনও একলা চলা। আপন বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে একলা চলা। ‘রক্তকরবী’র নন্দিনী যখন রাজার বিরুদ্ধে লড়াইতে নামে, সে নিহত রঞ্জনের দেহ থেকে অপরাজয়ের স্বর শুনতে পায়। সরদারের বর্শার আগায় দুলতে থাকা কুন্দফুলের মালাটিকে সে তার বুকের রক্তে লাল করে দিতে ছুটে যায়।

Published by: Robbar Digital

Posted:May 8, 2026 8:59 pm | Updated:May 8, 2026 9:04 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

হনন তাঁকে ব্যথা দিত। ২০ বছর বয়সে লেখা ‘বাল্মীকিপ্রতিভা’য় হননজীবী দস্যুদলের নেতাকে তিনি একটি হত্যাভয়ে ভীত বালিকার (প্রতি) সানুকম্প (সহমর্মী) করে তোলেন। কেমন সেই দস্যুদল? ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে যাদের মধ্যে নিরন্তর অভিযোগ লেগেই থাকে। যেমন এক দস্যুর বিষয়ে আরেকজনের উক্তি:

‘কাজের বেলায় উনি কোথা যে ভাগেন
ভাগের বেলায় আগে আসেন ওরে দাদা!’

এমন একটি হননজীবী এবং অপহরণজীবী দস্যুদলের অধিনায়ক বাল্মীকির এক হিংস্র ব্যাধের হাতে নিরীহ পাখির হত্যা দেখে গভীর শোক হয়। আর সেই শোক থেকেই জন্ম নেয় শ্লোক। বেদনার উৎসার আদেশের রূপ নেয়। বিশ্বলোকের সকল হন্তারকের উদ্দেশে উচ্চারিত হয় সেই আদেশ:

‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠারং ত্বমগমঃ শাশ্বতী সমাঃ’

zoom
১৬ বছরের রবীন্দ্রনাথ

নিহত প্রাণের জন্য এক সকরুণ শোক থেকেই জন্ম নেয় এই শ্লোক। বাল্মীকির রামায়ণের উৎসবাণী।

সারা জীবনের কর্মে ও কথায় মানুষের সঙ্গে তাঁর সত্য আত্মীয়তার যে-আলোটি দেখতে পাই, তাতে হননের রাজনীতি এবং রাজনৈতিক হত্যার বিরুদ্ধে দেখি ওঁর অকুণ্ঠিত অবিচল অবস্থান। শেক্সপিয়র পড়ছেন কিশোর রবি, মাস্টারমশাইের আদেশে তরজমা করছেন রাজনৈতিক হিংসার নাটক ‘ম্যাকবেথ’-এর।

ম্যাকবেথ নাটকের রাষ্ট্রের মঙ্গল-অমঙ্গল গুলিয়ে দেওয়ার ডাইনির সেই অপদৈবিক সংলাপ কিশোর রবীন্দ্রনাথের অনুবাদে আসে এইভাবে:

‘মোদের কাছে ভালোই মন্দ
মন্দ যাহা ভালো যে তাই
অন্ধকারে কোয়াশাতে
ঘুরে ঘুরে ঘুরে বেড়াই’

ম্যাকবেথ-এ যেভাবে ক্ষমতার রাজনৈতিক হত্যাকে বৈধ করে দেওয়ার চেষ্টা হয়, ঠিক তেমনই প্ররোচনামূলক ভাষা দেখি রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ নাটকে, রঘুপতির মুখে–

‘কে বলিল হত্যাকাণ্ড পাপ?
এ জগৎ মহা হত্যাশালা!
….
হত্যা অকারণে, হত্যা অনিচ্ছার বশে…’

zoom
‘বিসর্জন’ নাটকে জয়সিংহর চরিত্রে রবীন্দ্রনাথ। ১৯২৩। অ্যাম্পায়ার রঙ্গমঞ্চ

জানি না কেন, এই ‘হত্যা অনিচ্ছার বশে’ শব্দবন্ধটি পড়লেই আমার ‘চার অধ্যায়’ মনে পড়ে যায়। মনে পড়ে, উপন্যাসের শেষে কেবলমাত্র দলীয় স্বার্থে অতীনের এলাকে খুন করা, রবীন্দ্রনাথের চোখ দিয়েই দেখতে পাই মানুষের সম্পর্কের চেয়েও বড় হয়ে ওঠা দলীয় রাজনীতির নিষ্ঠুর অনুজ্ঞার ভয়াবহ চেহারাটা।

ঈর্ষা থেকে আসে হিংসা। হিংসা থেকে আসে হিংস্রতা। ‘ঈর্ষা বৃহতের ধর্ম’, দুর্যোধন একথা উচ্চারণ করে পিতা ধৃতরাষ্ট্রের সামনে, ‘অন্ধ’ হয়ে থাকা ছাড়া যে রাজার আর কোনও পথ নেই। ফিরে তাকানো যাক সেই ‘গান্ধারীর আবেদন’ কাব্যনাটকের দিকে:

‘ধৃতরাষ্ট্র:

জিনিয়া কপটদ্যূতে তারে কোস জয়! লজ্জাহীন অহংকারী!

দুর্যোধন:

যার যাহা বল তাই তার অস্ত্র
পিত:,যুদ্ধের সম্বল।
আজ আমি জয়ী পিত:, তাই অহংকার।’

চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ– সবলের আস্ফালন, হিংস্রতাকে, এবং প্রতিহিংস্রতাকে বৈধ করার ভাষা। যে-রবীন্দ্রনাথ ভগবান বুদ্ধকে ‘সর্বশ্রেষ্ঠ মানব’ বলে মনে করেন, তিনি বুদ্ধ প্রসঙ্গে আলোচনায় লেখেন:

‘বাহুবলের সাহায্যে ক্রোধকে প্রতিহিংসাকে জয়ী করার দ্বারা শান্তি মেলে না, ক্ষমাই আনে শান্তি, এ কথা মানুষ আপন রাষ্ট্রনীতিতে সমাজনীতিতে যতদিন স্বীকার করতে না পারবে,ততদিন অপরাধীর অপরাধ বেড়ে চলবে,রাষ্ট্রগত বিরোধের আগুন কিছুতে নিভবে না…’।

zoom
অলংকরণ: প্রণবেশ মাইতি

ক্ষমতার দাবিতে নিরীহ নাগরিককে রাষ্ট্রের বলির পাঁঠা করার যে রীতি, সেটি একটি বাক্যে প্রকাশ করেছেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘শ্যামা’ নাটকে প্রহরীর উচ্চারণে:

‘চুরি হয়ে গেছে রাজকোষে
চোর চাই, যে করেই হোক চোর চাই,হোক সে যে কোনো লোক চোর চাই।’

নিরীহ অবধ্য প্রাণ ক্ষমতার হাতে নিহত হলে, বিবেকবান সাক্ষীরাও যে গ্রিক নাট্যের অসহায় কোরাসের মতো নিষ্ক্রিয় থাকে, সেটি দেখিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ‘শ্যামা’ নাটকের নগর-অঙ্গনাদের একত্র আচরণে, বালক কিশোর উত্তীয় বলি হতে যাচ্ছে জেনেও তাদের, ওই গ্রিক ট্রাজেডির কোরাসের মতোই, অসহায় নিষ্ক্রিয় বিলাপ এঁকে রাখেন নাট্যকার রবীন্দ্রনাথ তাঁর টেক্সটে।

বালক কিশোর উত্তীয়ের এই বলিদান আমাদের মনে করিয়ে দেয় ‘রক্তকরবী’র কিশোরের কথা, ‘ঘরে বাইরে’র অমূল্যের কথা। মনে পড়ে, ‘বিসর্জন’ নাটকে বালক ধ্রুবকে গুপ্ত হত্যার ষড়যন্ত্রের কথাও। নাটকের শেষে ‘রক্তকরবী’র রাজা যেন আর্তনাদের মতো স্বীকার করে–

‘আমি যৌবনকে মেরেছি, সমস্ত জীবন ধরে আমি যৌবনকে মেরেছি।’

এই মারের বদলা কি মার হয় রবীন্দ্রনাথে? না। শুরু হয় প্রতিহিংসাহীন ত্যাগ আর আত্মদানের মধ্য দিয়ে এক গভীর চলা। কখনও কখনও একলা চলা। আপন বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে একলা চলা। ‘রক্তকরবী’র নন্দিনী যখন রাজার বিরুদ্ধে লড়াইতে নামে, সে নিহত রঞ্জনের দেহ থেকে অপরাজয়ের স্বর শুনতে পায়। সর্দারের বর্শার আগায় দুলতে থাকা কুন্দফুলের মালাটিকে সে তার বুকের রক্তে লাল করে দিতে ছুটে যায়। ঠিক যেভাবে শাসকের অস্ত্রের মুখে দায়বদ্ধ শিল্পী হিসেবে নিজের পারফরম্যান্সটি সম্পূর্ণ করে ভয়হারা শ্রীমতী, আজ থেকে ঠিক ১০০ বছর আগে লেখা ‘নটির পূজা’র শ্রীমতী।

মার তো শুধু অস্ত্রের নয়। মানুষের জোটে অপমানের মার, অপ্রেমের, উপেক্ষার, বিদ্রুপের প্রহার।

“এই যে আমরা প্রত্যেকে পাশের লোককে আঘাত করছি ও আঘাত পাচ্ছি,– সেই প্রত্যেক আমির ক্রন্দনধ্বনি একটা ভয়ানক বিশ্বযজ্ঞের মধ্যে সকল মানুষের প্রার্থনারূপে রক্তস্রোতে গর্জিত হয়ে উঠছে: মা মা হিংসী।… ‘আমাকে মেরো না। আমাকে বিনাশ থেকে রক্ষা কর।…’ ”(শান্তিনিকেতন )

…………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন শৈবাল বসু-র অন্যান্য লেখা

…………………….

Bisarjan Macbeth Rabindranath Tagore Raktakarabi Ramayana Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar The Buddha Valmiki William Shakespeare গান্ধারীর আবেদন ঘরে-বাইরে চার অধ্যায় নটির পূজা বাল্মীকিপ্রতিভা শান্তিনিকেতন শ্যামা

Share this article on