


প্রতিষ্ঠা দিবসের এই পুণ্যলগ্নে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের এই দ্বিচারিতাকে স্মরণ করা প্রয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে রবীন্দ্রনাথের নামে যে মিথ্যা অপপ্রচার ছড়ানো হয়েছিল, তা ছিল সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অন্যদিকে, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় সৌম্যেন্দ্রনাথ, ইন্দিরা দেবী বা নন্দলাল বসুরা যে বিরোধিতা করেছিলেন, তার মূলে ছিল রবীন্দ্র-আদর্শকে রক্ষা করার এক নিখাদ ভালোবাসা।
বিশেষ কৃতজ্ঞতা: রমাপ্রসাদ ভাস্কর
৮ মে ২০২৬, জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির ঐতিহাসিক আঙিনায় জন্ম নিয়েছিল রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। ৬২ বছর পেরিয়ে গেল আমাদের সবার প্রিয় এই কলাবিদ্যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। উত্তর কলকাতার ঘিঞ্জি রবীন্দ্র সরণি থেকে দ্বারকানাথ ঠাকুর লেনের সরু গলি পেরিয়ে যে লাল রঙের সুবিশাল ইমারতটি আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, তা শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বাঙালি সংস্কৃতির এক তীর্থস্থান। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, প্রিন্স দ্বারকানাথ থেকে শুরু করে খোদ বিশ্বকবির স্মৃতিবিজড়িত এই প্রাঙ্গণ আজ রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়ে সারা বিশ্বে সমাদৃত। কিন্তু ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, কালচক্রের কী অদ্ভুত পরিহাস! যে বিশ্ববিদ্যালয়টি আজ ঠাকুরবাড়ির ঐতিহ্যকে পরম মমতায় বুকে আগলে রেখেছে, তার প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে ছিল এক তীব্র বিরোধিতা, মান-অভিমান এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সংঘাতের এক অচেনা অধ্যায়। আর সেই বিরোধিতার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন খোদ ঠাকুরবাড়িরই এক কৃতী সন্তান– সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

ইতিহাস বড়ই অদ্ভুত। গত কয়েক দশক ধরে একটি ভিত্তিহীন অপপ্রচার অত্যন্ত সুকৌশলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবিগুরুকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর এক নির্লজ্জ চেষ্টা হয়েছিল। অথচ, ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ, প্রশান্তকুমার পালের ‘রবিজীবনী’ বা ঠাকুরবাড়ির নথিপত্র অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, গড়ের মাঠের যে সভায় রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্ব করার কথা বলা হয়, সেদিন তিনি কলকাতাতেই ছিলেন না। বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাত্র পাঁচ বছরের মাথায়, ১৯২৬ সালে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়েরই আমন্ত্রণে তিনি ঢাকায় যান এবং বিপুল সংবর্ধনা লাভ করেন। অর্থাৎ, যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতার মিথ রবীন্দ্রনাথের ঘাড়ে চাপানো হয়, তা সর্বৈব মিথ্যা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের পর তাঁরই নামাঙ্কিত, তাঁরই জন্মভিটায় প্রতিষ্ঠিত হতে যাওয়া ‘রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়’-এর ধারণাকে কেন্দ্র করে যে সত্যিকারের এক প্রবল বিরোধিতা দানা বেঁধেছিল, সেই ইতিহাস আজ বিস্মৃতির অতলে।

এই বিস্মৃত ইতিহাসের পরত খুলতে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯৬১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর। দিনটি ছিল বুধবার। চারদিকে তখন রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদ্যাপনের উন্মাদনা। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের সরকার ‘টেগোর ইউনিভার্সিটি বিল’ (Tagore University Bill) পেশ করেছে। ঠিক সেই সময় ৪ নম্বর এলগিন রোড থেকে শ্রীযুক্ত দ্বিজেন্দ্রলাল সেনগুপ্তকে একটি চিঠি লিখছেন সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেই ঐতিহাসিক চিঠির সম্পূর্ণ অবিকল বয়ানটি ছিল ঠিক এরকম:
…………………………………………
শ্রীযুক্ত দ্বিজেন্দ্রলাল সেনগুপ্ত প্রীতিভাজনেষু
প্রীতিভাজনেষু,
Tagore University Bill টি পশ্চিমবঙ্গ গভর্ণমেণ্ট এবারে পেশ করেছেন এ্যাসেমব্লীতে। এর প্রতিবাদ হওয়া উচিত। কংগ্রেস দলভুক্ত সদস্যদেরও এই বিলের প্রতিবাদ করা উচিত ছিলো। আমাদের জীবনের মূল জিনিষগুলি দলগত নীতির দ্বারা বিচার্য নয়। এতদিন অর্থনীতির ক্ষেত্রে, রাজনীতির ক্ষেত্রে বাংলার সর্বনাশ সাধন করা হচ্ছিল, এখন সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও হাত পড়েছে। সঙ্গীত একাডেমি নিয়ে কয়েক বৎসর আগে আমি ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের সঙ্গে কথাবার্তা বলি। প্রথমে স্থির হয়েছিলো যে তিনি এই একাডেমির সভাপতি হবেন। আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করে বলি যে তিনি যেন নিজে সভাপতি না হয়ে ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীকে একাডেমির সভাপতি করেন। তিনি রাজী হন ও নিজে ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীর সঙ্গে দেখা করে তাঁকে একাডেমির সভাপতি হতে অনুরোধ করেন। তারপরে স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ, শ্রীযুক্ত সুরেশ চক্রবর্তী, শ্রীযুক্ত অমিয় সান্যাল, শ্রীযুক্ত মন্মথ ঘোষ, লেডি প্রতিমা মিত্র, ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী ও আমি এই আকাদেমির পরিকল্পনা ও কর্মসূচী প্রস্তুত করতে ছ’মাসেরও বেশী সময় ব্যয় করি ও আকাদেমির পরিকল্পনা ও কর্মসূচী নিয়ে ডাঃ রায়ের সঙ্গে আলোচনা করি। ডাঃ রায় আমাদের একটি বাজেটের পরিকল্পনা দিতে বলেন। সেটাও তাঁকে দেওয়া হয়। তারপরে সব পরিকল্পনা তাঁর হাতে দেওয়ার পর একদিন সংবাদ পত্রে ঘোষিত হলো যে ডাঃ রায়ই সঙ্গীত-রূপক আকাদেমির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন।

এখন টেগোর ইউনিভার্সিটির পালা সুরু হলো। যেই ডাঃ রায়ের বিবৃতি কাগজে বের হলো এ সম্বন্ধে, আমি তখনি তাঁকে চিঠি লিখে কলকাতায় ‘টেগোর ইউনিভার্সিটি’ স্থাপনের পরিকল্পনা ত্যাগ করতে অনুরোধ করি। ‘বিশ্বভারতী’ই টেগোর ইউনিভার্সিটি। বিশ্বভারতী থাকতে কলকাতায় ‘টেগোর ইউনিভার্সিটি’ স্থাপন করবার কোনো প্রয়োজন নেই, আর এটা সঙ্গতও নয়। ‘বিশ্বভারতী’ কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্বাধীন থাকায় ওখানে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃত্ব করতে পারছেন না, এই যদি ‘টেগোর ইউনিভার্সিটি’ স্থাপন করবার কারণ হয় তো সেটা অতীব দুঃখের। তা ছাড়া নাচ, গান ও অভিনয়ের জন্যে ইউনিভার্সিটির প্রয়োজন নেই, একাডেমিই তার পক্ষে যথেষ্ট। আমি ডাঃ রায়কে International Tagore Centre কলকাতায় স্থাপন করতে বলি ও তার একটি পরিকল্পনাও পাঠিয়ে দিই। আমার সেই পরিকল্পনাটি ডাঃ রায় নিশ্চয়ই তাঁর বাতিল কাগজের ঝুড়িতে তৎক্ষণাৎ ফেলে দিয়েছেন। এর পর ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় ‘টেগোর ইউনিভার্সিটি’-র পরিকল্পনা সম্বন্ধে একটি বিবৃতি দিই। যুগান্তর পত্রিকার প্রতিনিধি শ্রীযুক্ত বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায় শান্তিনিকেতনে গিয়ে স্বর্গীয়া ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী, বিশ্বভারতীর উপাচার্য শ্রীযুক্ত সুধীরঞ্জন দাস, শ্রীযুক্ত নন্দলাল বসু ও শ্রীযুক্ত অন্নদাশঙ্কর রায়– এই চারজনের সঙ্গে দেখা করেন ও প্রস্তাবিত ‘টেগোর ইউনিভার্সিটি’ সম্বন্ধে তাঁদের মতামত জিজ্ঞাসা করেন। তাঁরা প্রত্যেকেই টেগোর ইউনিভার্সিটির এই পরিকল্পনাকে অসঙ্গত বলে মত প্রকাশ করেন। তাঁদের মতামত ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিলো।

টেগোর ইউনিভার্সিটি বিলটি দেখলাম। বিলটি চাতুরীতে ভরা। ভাষা শিক্ষা দেওয়ার জন্যে ও ভারতবর্ষের সাহিত্যিকদের জড়ো করবার জন্যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন নেই। এ কাজের জন্যে ভাষা শিক্ষাদানের স্কুল যথেষ্ট ও সাহিত্যিকদের সম্মেলন করবার জন্য সাহিত্য পরিষদ প্রভৃতি বহু প্রতিষ্ঠান আছে। ইতি
আপনাদের
সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর
৪ নং এলগিন রোড
১৩ই সেপ্টেম্বর, ১৯৬১
…………………………………………

চিঠিতে উঠে আসা ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীর অপমানিত হওয়ার ঘটনা বা ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের একতরফা সিদ্ধান্তের কথা থেকে বোঝা যায়, তৎকালীন বুদ্ধিজীবীরা এই উদ্যোগকে একটি সরকারি খবরদারি হিসেবেই দেখেছিলেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, একটি সরকারি কাঠামোর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় গড়লে তা হয়তো কেবল আমলাতান্ত্রিক জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে একটি সাধারণ ‘ভাষা শিক্ষার স্কুল’ বা দলীয় রাজনীতির আখড়ায় পরিণত হবে। বিশ্বভারতী থাকতে আরেকটি সমান্তরাল প্রতিষ্ঠান গড়া তাঁদের কাছে ছিল রবীন্দ্র-আদর্শের পরিপন্থী।

কিন্তু ইতিহাস নিজস্ব গতিতে চলে। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্র রায় তাঁর সিদ্ধান্তে ছিলেন অনড়। অন্যদিকে, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির অবস্থাও তখন ক্রমশ রুগ্ন হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর ঠাকুর পরিবারের সদস্যরা একে একে জোড়াসাঁকো ছেড়েছেন। পঞ্চাশের দশকে রবীন্দ্রভারতী সোসাইটির তরফে সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার বাড়িটি কিনে নিলেও, অর্থাভাবে তার রক্ষণাবেক্ষণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। সরকার এগিয়ে আসে। আকাদেমি গড়ার শর্তে অনুদান দেওয়া হয়। অবশেষে, সব বিতর্ক আর বিরোধিতার অবসান ঘটিয়ে ১৯৬২ সালের ১০ জানুয়ারি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় আইন রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে এবং ৮ মে, পঁচিশে বৈশাখ আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে আজকের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন আমরা রবীন্দ্রভারতীর দিকে তাকাই, তখন সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই চিঠি এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া তৈরি করে। সেদিনের সেই আবেগতাড়িত বিরোধিতা হয়তো ভুল ছিল না। তাঁদের ভয় ছিল, সরকারি হস্তক্ষেপ হয়তো ঠাকুরবাড়ির স্বকীয়তা নষ্ট করবে। কিন্তু বাস্তবে রবীন্দ্রভারতী কেবল একটি প্রথাগত বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে থাকেনি। অঙ্ক বাদে এখানে পড়ানো হয় কলা বিভাগের প্রায় সব বিষয়। আর্টস, ফাইন আর্টস এবং ভিস্যুয়াল আর্টস– এই তিনটি অনুষদকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রসংগীত, ধ্রুপদী সংগীত, নৃত্য, নাটক, চিত্রনির্মাণ বা ভাস্কর্যের যে চর্চা আজ জোড়াসাঁকো ও বিটি রোডের মরকত কুঞ্জ প্রাঙ্গণে হয়, তা হয়তো সৌম্যেন্দ্রনাথের কল্পিত সেই ‘আকাদেমি’রই এক বৃহত্তর ও পূর্ণাঙ্গ রূপ।

মহর্ষি ভবনের দোতলায় যে ঘরটিতে জীবনের শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন কবিগুরু, সেই ‘রবীন্দ্র-প্রয়াণকক্ষ’ আজ অগণিত মানুষের তীর্থস্থান। দক্ষিণের বারান্দা, বিচিত্রা ভবন, মৃণালিনী দেবীর ঘর কিংবা কবির আঁতুড়ঘর– সব কিছুই আজ পরম যত্নে সংরক্ষিত রবীন্দ্রভারতী প্রদর্শনশালায়। ১৯৬১ সালে জওহরলাল নেহেরু যে প্রদর্শনশালার উদ্বোধন করেছিলেন, তা আজ বঙ্গ-নবজাগরণের এক জীবন্ত দলিল।
প্রতিষ্ঠা দিবসের এই পুণ্যলগ্নে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের এই দ্বিচারিতাকে স্মরণ করা প্রয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে রবীন্দ্রনাথের নামে যে মিথ্যা অপপ্রচার ছড়ানো হয়েছিল, তা ছিল সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অন্যদিকে, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় সৌম্যেন্দ্রনাথ, ইন্দিরা দেবী বা নন্দলাল বসুরা যে বিরোধিতা করেছিলেন, তার মূলে ছিল রবীন্দ্র-আদর্শকে রক্ষা করার এক নিখাদ ভালোবাসা। আজ জোড়াসাঁকোর লাল ইটের দেওয়ালে কান পাতলে হয়তো সেই পুরনো বিতর্কের রেশ আর শোনা যায় না, শোনা যায় হাজারো তরুণ-তরুণীর গলায় রবীন্দ্রসংগীতের মূর্ছনা আর নুপূরের ধ্বনি। বিরোধিতার ছাইভস্ম থেকেই যে এমন এক সাংস্কৃতিক মহীরুহের জন্ম হতে পারে, রবীন্দ্রভারতী তারই শ্রেষ্ঠ প্রমাণ।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved