


‘মেছোবিড়াল’ নামটা ঠিক থাকলেও, ‘বাঘরোল’ আর অন্য নামগুলিতে বাঘের নাম জুড়ে দেওয়ার কারণে মানুষের মনে ভয়ের সঞ্চার হয়েছে। বাঘ দেখতে যতই সুন্দর হোক না কেন, মানুষ ‘বাঘ’ শব্দটি শোনামাত্র আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। আর তাই এই নামদু’টি এই প্রাণীটির প্রতি আমাদের মনে অহেতুক ভীতির সঞ্চার করেছে। এই ভয়ের বশবর্তী হয়ে অনেকেই সুযোগ পেলে পিটিয়ে মারেন। তবে শুধু ভয় নয়, এক শ্রেণির মানুষ নিছক পৈশাচিক আনন্দ উপভোগ করার জন্য এদের উপর নির্মম অত্যাচার চালিয়ে হত্যা করেন।
প্রচ্ছদের আলোকচিত্র: সৌম্যব্রত রায়
জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ। এক শীতের সন্ধ্যায় গঙ্গার এক অনামী পাড়ে আমরা জনাচারেক বন্যপ্রাণ-অনুসন্ধিৎসু মানুষ। সঙ্গে একজন গাইড আর নৌকাচালক। চুপ করে বসে আছি অন্ধকারের মধ্যে চোখ জ্বেলে। উদ্দেশ্য পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপ্রাণী মেছোবিড়াল বা বাঘরোলের ছবি তোলা। গঙ্গার চরে গড়ে ওঠা ছোট্ট একটি জনপদ নয়াচর। এখানে সন্ধে নামলে নদীর কয়েকটি ঘাটে আনাগোনা শুরু করে দেয় মেছোবিড়াল। তাই নদীর পাড়ের হিমেল বাতাসকে উপেক্ষা করে নিজেদের স্নায়ুর উপর নিয়ন্ত্রণ রেখে বসেছিলাম দুর্লভ এই প্রাণীটিকে চাক্ষুষ করব বলে। প্রায় আধঘণ্টা অপেক্ষার পর, বেশ রাজকীয় ভঙ্গিমায় তিনি পাড়ে তার ডেরা থেকে নেমে এলেন নদীর ঘাটে মাছ শিকারের উদ্দেশ্যে। অন্ধকারের মধ্যেও যে নরম আলো থাকে, সেই আলোয় তার আসা দেখে সবাই সজাগ। টর্চের আলো ফেলে ক্যামেরা তাক করে কয়েকটি ছবি তুলে ফেললাম। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে যখন সে ঝোপের মধ্যে দিয়ে অন্য দিকে চলে গেল তখন সম্বিৎ ফিরল। সকলের মুখে আনন্দের ছাপ। নৌকা ঘুরিয়ে আমরাও ফিরে এলাম আমাদের ডেরায়। সঙ্গে নিয়ে এলাম এক দারুণ রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা, যা আজীবন স্মৃতির মণিকোঠায় সযত্নে তোলা থাকবে।

ফেলিডি পরিবারের অন্তর্গত সদস্য ফিশিং-ক্যাটের বিজ্ঞানসম্মত নাম প্রাওনাইলুরাস ভাইভেরিনাস। ইংরাজি নাম ফিশিং-ক্যাটের আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ মেছোবিড়াল হলেও, এরা বাঘরোল, মেছোবাঘ এবং গোবাঘা নামে বহুল পরিচিত। পৃথিবীতে পাওয়া যায় এমন ৪০টি প্রজাতির বিড়ালের মধ্যে মাত্র দু’টি প্রজাতি জলজ বাস্তুতন্ত্রে বসবাসের জন্য অভিযোজিত হয়েছে, যার একটি এই ফিশিং-ক্যাট। এরা সাঁতার কাটতে পটু। এদের মূলত জলাভূমি, নদীর পাড়, হ্রদ, নলখাগড়ার বন, বাদাবন, জল-সংলগ্ন গভীর জঙ্গল ইত্যাদি অঞ্চলে বসবাস করতে দেখা যায়। এদের ব্যাপ্তি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আটটি দেশে। ভারতের তরাই অঞ্চল, রাজস্থানের ভরতপুর, উড়িষ্যার চিলিকা হ্রদ অঞ্চল, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র নদীর প্লাবনভূমি ও বদ্বীপ অঞ্চল, দক্ষিণ ভারতের মহানদী, গোদাবরী এবং কৃষ্ণা নদীর প্লাবনভূমি ও বদ্বীপ অঞ্চল, সুন্দরবন এবং পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু জলাভূমি। এরা মনুষ্য বসতির আশপাশে– হাওড়া, হুগলি, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমান, পূর্ব মেদিনীপুর, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার বেশ কিছু জনবসতি সংলগ্ন এলাকায় নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।

ফিশিং ক্যাট, বাড়ির বিড়ালের থেকে আকারে সামান্য বড়। এদের মাথা থেকে দেহের দৈর্ঘ্য ৫৭-১১৫ সেমি এবং লেজের দৈর্ঘ্য ২৪-৪০ সেমি। ওজন ৫-১৬ কেজি। সবুজাভ ধূসর গায়ের রং। পিঠের রং গাঢ় এবং পিঠের উপর লম্বাটে অসমান ছোপ থাকে। পেটের রং ফ্যাকাশে এবং কালচে বাদামি ছোপযুক্ত। কপালের উপর থেকে ঘাড় অবধি ৬-৮টি কালো লম্বাটে দাগ থাকে। ঘাড়ের কাছে ছিট-ছিট দাগ থাকে। গলার রং ধূসর সাদা। গলায় দুটো কালো রঙের সমান রেখা থাকে। থাই ও পায়ের কাছে ছোপ ছোপ দাগ থাকে। লেজের উপর কালো রঙের গোল গোল ছোপ থাকে। লেজের ডগার রং কালো। দেহের রোম খসখসে, চকচকে নয়। চোখের মণি ছোট এবং গোল। এরা একাকী বিচরণ করে। স্বভাবে নিশাচর এই বন্যপ্রাণীটি মূলত মাছ শিকার করেই খায়। তবে জলজ পাখিও শিকার করে। মাছ ছাড়া শামুক খাওয়ার তথ্য আছে। স্থলে থাকার সময় ছোট স্তন্যপায়ী, পাখি ইত্যাদি শিকার করে। ক্ষিপ্র স্বভাবের এই শিকারী প্রাণীটি জলের মধ্যে নিশ্চলভাবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে শিকারের জন্য। শিকার নাগালের মধ্যে এলেই এক নিমেষে শিকার করে।

জলাভূমিতে বেঁচে থাকার জন্য এদের শরীর বিশেষভাবে অভিযোজিত হয়েছে। এদের শরীরে লোমের দু’টি স্তর আছে। তাই জলে নেমে শিকার ধরার সময় গায়ের চামড়া ভেজে না। এর ফলে শরীর তাপ কম হারায়। এদের কান এমনভাবে গঠিত হয়েছে যে, জলের মধ্যে শিকারের চলাফেরা ও তার অবস্থান বুঝতে পারার মতো তীক্ষ্ণ শ্রবণ ক্ষমতা পেয়েছে। এরা জলে সাঁতার কাটার সময় ছোট ও মোটা লেজটিকে দাঁড় হিসাবে ব্যবহার করে। জল ও কাদার মধ্যে চলাফেরা করার জন্য পায়ের আঙুলগুলি কিছুটা অংশ পর্যন্ত পর্দা দিয়ে জোড়া। এছাড়াও এদের পায়ের আঙুলে থাকা নখ বাইরে বেরিয়ে থাকে, যা এদের জলকাদার মধ্যে চলতে আর শিকারকে বঁড়শির মতো গেঁথে ধরতে সাহায্য করে। এরা জলে মাথা ডোবালে, কানের ফুটো বন্ধ করে রাখতে পারে।

একসময় গ্রামাঞ্চল বা মফস্সলের কাছাকাছি জলাভূমিতে, জলমগ্ন চাষজমি, নলখাগড়ার বনে এদের বেশ ভালো সংখ্যায় দেখা পাওয়া গেলেও, এখন অতি দ্রুত এদের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। গবেষণায় উঠে এসেছে গত ২০১০-২০১৫ সালের মধ্যে এদের সংখ্যার প্রায় ৩০% হ্রাস পেয়েছে। এদের এই সংখ্যার দ্রুত হ্রাস এবং হারিয়ে যাওয়ার জন্য যেসব কারণগুলি তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলি হল– দ্রুত জলাভূমি ও পরিত্যক্ত ভূমি হ্রাস পাওয়া, কৃত্রিম উপায়ে করা নিবিড় কৃষিজমি ও নিবিড় মাছচাষ, ভয়ের কারণে মেরে ফেলা, শিকার। তাছাড়া যানবাহনের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যু। এইসব কারণগুলি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বর্তমানে জলাভূমি এবং পরিত্যক্ত জমিগুলি দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে। একসময় জনসংখ্যা কম ছিল, কিন্তু দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে জায়গার অভাব পূরণ করতে জলাভূমিগুলির নিধন ক্রমাগত চলছে। একমাত্র সংরক্ষিত জলাভূমিগুলি ছাড়া বাকি সব জলাভূমিই আজ বিপন্ন, আর সেইসঙ্গে জলজ বাস্তুতন্ত্রে বাস করা এই প্রাণীটির অস্তিত্বও বিপন্ন হয়ে পড়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে কৃষিজ উৎপাদন বৃদ্ধির চাপ বেড়েছে। তাই চাষের পদ্ধতিও পালটেছে। শুধু তাই নয়, আগে মাছ-চাষিরা চাষের কিছুটা অংশ বন্যপ্রাণীদের জন্য ছেড়ে দিত। এখন চাহিদা পূরণের চাপে এইসব দিন ফুরিয়েছে। মাছচাষে মুনাফা বাড়াতে, এখন যেসব প্রাণী মাছের উপর নির্ভরশীল– তাদের আটকে রাখার বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করছে; এমনকী প্রয়োজনে হত্যা করতেও দ্বিধা করছে না। ‘মেছোবিড়াল’ নামটা ঠিক থাকলেও, ‘বাঘরোল’ আর অন্য নামগুলিতে বাঘের নাম জুড়ে দেওয়ার কারণে মানুষের মনে ভয়ের সঞ্চার হয়েছে। বাঘ দেখতে যতই সুন্দর হোক না কেন, মানুষ ‘বাঘ’ শব্দটি শোনামাত্র আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। আর তাই এই নামদু’টি এই প্রাণীটির প্রতি আমাদের মনে অহেতুক ভীতির সঞ্চার করেছে। এই ভয়ের বশবর্তী হয়ে অনেকেই সুযোগ পেলে পিটিয়ে মারেন। তবে শুধু ভয় নয়, এক শ্রেণির মানুষ নিছক পৈশাচিক আনন্দ উপভোগ করার জন্য এদের উপর নির্মম অত্যাচার চালিয়ে হত্যা করেন। জলাভূমির পাশ দিয়ে যেসব হাইওয়ে বা সড়কগুলি চলে গেছে, সেগুলি এদের জন্য মৃত্যুর ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফাঁকা রাস্তায় গতির মোহে আচ্ছন্ন মানুষ ভুলে যায় রাস্তা পারাপারের অধিকার এইসব নিরীহ প্রাণীদেরও আছে। গাড়ি চাপা পড়ে মারা যাওয়ার ঘটনা খুব কম নয়। প্রায়ই বিভিন্ন মাধ্যমে এমন ছবি আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ভেবে কষ্ট হয় যে, কোনও মা বেড়াল হয়তো তার বাচ্চাদের জন্য মাছ-শিকার করতে গিয়েছিল, তার বাচ্চারা অপেক্ষা করে থাকলেও সেই মা আর কোনওদিনও ফিরবে না। কিন্তু এসব ভেবেও কি আমরা আমাদের গতি নিয়ন্ত্রণে রাখব? কিছুটা মাছ কি ছেড়ে দেব ওদের জন্য? না জেনে অহেতুক কোনও বন্যপ্রাণীকে হত্যা করব না? এমনটা ভেবে দেখার সময় এসেছে।

স্বভাবে নিরীহ এবং সুন্দর দেখতে এই প্রাণীটি আমাদের রাজ্যের গর্ব। ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বনবিভাগের অনুমোদন অনুযায়ী ভারত সরকার নিয়ন্ত্রিত জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া মেছোবিড়ালকে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপ্রাণীর স্বীকৃতি দিয়েছে। ভারতীয় বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইন ১৯৭২ অনুসারে এদের তফশিল-১-এ সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। এতকিছু সত্ত্বেও নানা জায়গা থেকে প্রায়ই এদের হত্যার খবর আসে। কোথাও সৌভাগ্য থাকলে মেরে ফেলার আগে বন্যপ্রাণ সংরক্ষণে নিবেদিতপ্রাণ কিছু স্বেচ্ছাসেবী মানুষ বাঁচিয়ে আনেন। তাই প্রয়োজন এই প্রাণীটি সম্পর্কে বিভিন্ন মাধ্যমে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার। শুধুমাত্র জলজ বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী হিসাবে নয় বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে এদের স্থান প্রোজ্জ্বল। ১৬৮৬ সালে লিখিত কৃষ্ণরাম দাসের ‘রায়মঙ্গল’ কাব্যে এই প্রাণীটির প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায়। সুতরাং এই প্রাণীটির গুরুত্ব আমাদের সামাজিক জীবনেও যে যথেষ্ট, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। মেছোবিড়ালের উপর গবেষণা ও এদের সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ২০১০ সাল থেকে চালু হওয়া ‘দি ফিশিং ক্যাট প্রজেক্ট’ পশ্চিমবঙ্গে ও উড়িষ্যায় এখনও কাজ করে চলেছে। এই প্রজেক্টের আওতায় রয়েছে মেছোবিড়াল সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, এদের সংখ্যা গণনা এবং এদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবগত করে এদের বাঁচানো। বন্যপ্রাণ গবেষণা ও সংরক্ষণ বিষয়ক অন্যতম আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন-এর লাল তালিকায় এরা সংকটাপন্ন (ভালনারেবল) ক্যাটাগরি-ভুক্ত। কিন্তু যদি এখনই এদের আবাস্থলগুলি বাঁচিয়ে বসবাসের এবং খাদ্যের জোগান দিতে পারি, তাহলে হয়তো বিপন্ন (এনডেনজার্ড) তালিকাভুক্ত হবে না। শুধু তাই নয়, স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করে এদের সম্পর্কে তথ্যপ্রদান করতে হবে। মানুষের মনে এদের সম্পর্কে জমে থাকা ভয় দূর করতে হবে। তাহলে হয়তো অহেতুক এদের মরতে হবে না। ভারত যেমন জীববৈচিত্রে সমৃদ্ধ, তেমনই পশ্চিম বাংলার ভূপ্রাকৃতিক পরিবেশ একে জীববৈচিত্রে উর্বর করেছে। ২২ মে দিনটি বিশ্বজুড়ে পালিত হয়েছে জীববৈচিত্র দিবস হিসাবে। আসুন, আমরা শপথ করি জীববৈচিত্রে আমাদের হারানো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করব, আর সেই সঙ্গে পশ্চিমবাংলার জীববৈচিত্রের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে মেছোবিড়াল সংরক্ষণ করব– যাতে পরবর্তী প্রজন্ম এদের দেখবে এদের প্রাকৃতিক আবাসেই।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved