


দেবদাস আচার্য সেই গোত্রের কবিজীবন যাপন করেননি, যেখানে সমাজবিচ্যুত কোনও বিশুদ্ধ শৈল্পিক নন্দনতত্ত্বে বিশ্বাস রাখবেন। বরং তিনি লিখনসূত্রে আজীবন মানুষের সঙ্গে সংযোগ রাখতে চেয়েছেন। অথচ নিজেকে রাখতে চেয়েছেন ভিড় থেকে দূরে, একদা নির্জন প্রান্তরের ভদ্রাসনে। কিন্তু সেখানে গণ-রাজনীতির পরিসর আছড়ে পড়বে না, এমনটা নয়। পপুলারিটি তেমনই জন্তু, যা অজগরের মতো আমাদের একান্ত মৌলিক ও লৌকিক নৈঃশব্দ্যগুলোকে গিলে খেয়ে নেয়। বরং নির্জন ও নিভৃত পরিসরকে বিধ্বস্ত করে ফেলাই তার অন্যতম পলিটিক্যাল এথিক্স। তবু দেবদাসের ভোরকালীন মৃত্যুকে নির্বাচনী জয়-পরাজয়ের উল্লাস ঢেকে ফেলতে তো পারলই না। এমনকী কলঙ্কিত করতেও পারল না অহেতুক লোক-দেখানো শোকপ্রস্তাবের মেকি অশ্রু দিয়ে। এভাবেই তিনি নিঃশব্দে চলে গেলেন।
৪ মে ২০২৬, খুব ভোরে চলে গেলেন দেবদাস আচার্য। প্রায় নিঃশব্দে। ৮৫ বছর বয়সে। ‘নিঃশব্দ’ এইজন্য যে, এই দিনটি পশ্চিমবঙ্গবাসীর কাছে ছিল অনিবার্য উৎকণ্ঠার। বিধানসভা ভোটের গণনা। তার কয়েক ঘণ্টা আগেই চলে গেলেন দেবদাস আচার্য। তাঁর চলে-যাওয়া যদি একদিন আগে-পরে হত, তাহলে বিষয়টা অন্যরকম হতেই পারত। সত্যিই তো, একজন কবি, যিনি জীবনচর্চায় নীতিগতভাবে সমস্ত প্রকার যশোপ্রার্থী হওয়ার প্রলোভন থেকে সরিয়ে রেখেছেন, জীবন ও কবিতার মধ্যে লৌকিক সেতু নির্মাণ করে গিয়েছেন আজীবন নিষ্ঠার সঙ্গে– সেরকম একজন কবিকে নিয়ে কবিজগতের সীমায়িত পরিসরে আলোচনা করা যেতেই পারে। কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনের মতো তুমুল জনপ্রিয়, সারাদেশব্যাপী ‘হট অ্যান্ড হ্যাপেনিং’ বিষয়ের সঙ্গে তো দেবদাস আদর্শগতভাবেই যান না, তাহলে তাঁর এই চলে যাওয়ার মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করে বারবার মনে হচ্ছে কেন– এই নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের আগেই দেবদাস চলে গেলেন? যদিও এই দু’টি আপাতবিচ্ছিন্ন বিষয়ের কোনও কার্যকারণ সম্পর্ক নেই। তবু, একটি বিপুল জনাদেশ ও তার ঠিক প্রাক্মুহূর্তে মহাকালের একজন কবির প্রস্থানভূমির মাহেন্দ্রক্ষণ স্থির করে ফেলা– আদৌ কি কোনও যোগসূত্র নেই?

দেবদাস আচার্য সেই গোত্রের কবিজীবন যাপন করেননি, যেখানে সমাজবিচ্যুত কোনও বিশুদ্ধ শৈল্পিক নন্দনতত্ত্বে বিশ্বাস রাখবেন। বরং তিনি লিখনসূত্রে আজীবন মানুষের সঙ্গে সংযোগ রাখতে চেয়েছেন। অথচ নিজেকে রাখতে চেয়েছেন ভিড় থেকে দূরে, একদা নির্জন প্রান্তরের ভদ্রাসনে। কিন্তু সেখানে গণ-রাজনীতির পরিসর আছড়ে পড়বে না, এমনটা নয়। পপুলারিটি তেমনই জন্তু, যা অজগরের মতো আমাদের একান্ত মৌলিক ও লৌকিক নৈঃশব্দ্যগুলোকে গিলে খেয়ে নেয়। বরং নির্জন ও নিভৃত পরিসরকে বিধ্বস্ত করে ফেলাই তার অন্যতম পলিটিক্যাল এথিক্স। তবু দেবদাসের ভোরকালীন মৃত্যুকে নির্বাচনী জয়-পরাজয়ের উল্লাস ঢেকে ফেলতে তো পারলই না। এমনকী, কলঙ্কিত করতেও পারল না অহেতুক লোক-দেখানো শোকপ্রস্তাবের মেকি অশ্রু দিয়ে। এভাবেই তিনি নিঃশব্দে চলে গেলেন। রেখে গেলেন জীবন-নিঃসৃত করে লেখা কবিতা, রেখে গেলেন ব্যক্তি ও সমাজচেতনার সুবিস্তৃত শুঁড়িপথ। যেন তাঁর মৃত্যুতে ফেসবুকব্যাপী গণপ্লাবন মানায় না। তাই বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের জগঝম্প আমাদের সরিয়ে দিল অন্যদিকে, কোনও তুমুল জনপ্রিয়তার ঘূর্ণিপাকে ডুবে মরার অনিবার্য সততায়। মঞ্চপ্রস্তুতির জনাদেশের আগেই, ‘একটু আসছি–’ বলে কোথায় চলে গেলেন দেবদাস আচার্য।
এই নির্বাচনী ফলাফলের পিছনে পূর্বসূরির মতো পড়ে রইল গণতন্ত্রের মরিয়া রুগ্ন অসহায় বিবর্ণ চেহারা। আর উত্তরসূরির মতো তৈরি হল সেই নিঃসাড় চেহারাকেই বাঁচিয়ে তোলার প্রকল্প। তবু মানুষ এতেই সংস্থিত, উনমন, এতেই খুশি, কেননা তার কাছে আর বিকল্প নেই। সংসদীয় রাজনীতির এই বিস্তৃত ক্রমপ্রসারণকে দেখতে পেলেন না দেবদাস। বরং রেখে গেলেন ‘কালক্রম ও প্রতিধ্বনি’, ‘মৃৎশকট’, ‘উৎসবীজ’, ‘মানুষের মূর্তি’, ‘আচার্যের ভদ্রাসন’ ও আরও অনেক ছোট-বড় কবিতার বই। এবং সেইসব বইয়ের ছোট-বড় লেখা বিস্তীর্ণ এক সেতু তৈরি করে ফেলেছিল নির্জনে, লোকচক্ষুর আড়ালেই– মানুষের নিজস্ব অবস্থান ও অস্তিত্বের পরিসরে।
কতিপয় সহৃদয় পাঠক এক ভাববীজ ও গোপন সমাজতন্ত্রের আকর পেয়ে গেল এমন সময়ে, যখন সমাজের ব্যবহারিক ক্ষেত্রে তারা এই অভিজ্ঞান সামলে রাখতে পারেনি, কিংবা তুমুল ঘৃণাভরে রাখতে চায়নি। তাদের মনে হয়েছে, এইসব প্রান্তিকতার মধ্যে আর কোনও সারস্বত ঐশ্বর্য নেই। বরং প্রান্তিকতা ও নিম্নবর্গের স্বাধিকারের মধ্যেই যে জাতীয়তাবোধের প্রগাঢ় স্থিতি নির্মাণ হতে পারে– এ প্রসঙ্গ এখন জনতার কাছে না-পসন্দ। ফলে উপনিবেশকালে উচ্চবর্গীয় সংস্কৃতি যেমন ঘাড়ে চেপে বসে তার ইতিহাস-ভূগোলের পরিধি মেপে দিচ্ছিল, তৈরি করে দিচ্ছিল নির্দিষ্ট কোনও ছাঁচ, যার বাইরে দাঁড়িয়ে ভিড়ের হৃদয় কিছুই ভাবতে পারবে না। অন্যকে নিয়ে তো নয়ই। এমনকী নিজেকে নিয়েও না। ইতিহাস সত্যি কথা বলে, কিন্তু কতটা সত্যি বলতে পারে– তা নির্ভর করে ইতিহাস কারা লিখছেন, তাদের ওপর। রণজিৎ গুহ জানিয়েছেন:
‘ইতিহাসবিদ্যার জন্ম এদেশে ইংরেজ রাজশক্তির ঔরসে এবং ভূমিষ্ট হবার পর থেকেই তা ঔপনিবেশিক মানদণ্ডকে আশ্রয় করে বেড়ে ওঠে। যাঁরা এই ধারায় প্রথম ইতিহাস লেখেন, তাঁরা সকলেই হয় সরকারি কর্মচারী কিংবা সরকারের প্রসাদপুষ্ট ও ইংরেজ শাসনের সমর্থক বেসরকারি সাহেব মেমসাহেব। তাঁরা যে ইতিহাস লেখেন তার উদ্দেশ্য হয় একেবারে সরাসরি শাসনব্যবস্থার প্রয়োজন সিদ্ধ করা কিংবা বেসরকারি রচনা হলেও কার্যত তার সাহায্যে ব্রিটিশ প্রভুভক্তি ও প্রভুসংস্কৃতিকে আরও জোরদার করা।’

এই ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে, ভারতের পাওয়ার পলিটিক্সের নিরিখে, দেশ হোক বা রাজ্য– এই নিয়মের খুব একটা ফেরফের হয়েছে কি? বরং সুকৌশলে ঔপনিবেশিক এই নিয়মতন্ত্র বিশ্বায়ন-পরবর্তী দুনিয়ায় আরও সফলকাম হয়ে উঠেছে ক্ষমতার কাছে। তাহলে এর উল্টোদিকে পড়ে রইলেন যারা, যারা পড়ে থাকেন চিরকাল, তাদের কী হল? তারাও একপ্রকার বাধ্য হয়েই ওই ঔপনিবেশিক সুবিধাবাদের নির্মিত সুকৌশলী সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রস্তাবনাকেই গিলে নিলেন। ফলে পাওয়ার স্ট্রাকচারের মধ্যেই অন্তঃসলিলা নদীর মতো বিরোধের ভূমিও তৈরি হল।
সংস্কৃতি যে শহর তথা বাজারমুখী হয়ে পড়বেই একথা স্বাভাবিক। ফলে আধুনিক অভিজাত সমাজের মাধ্যমে ওই উপনিবেশ লালিত সংস্কৃতিই ফুলে-ফেঁপে উঠল, সেখানে এমনকী সর্বহারার জন্য বেদনা নিঃসৃত হল সেই আধুনিকতার মুখোশের আড়াল থেকে। পার্থ চট্টোপাধ্যায় অবশ্য স্পষ্টতই জানিয়েছিলেন:
‘ব্রিটিশ শাসন কায়েম হওয়ার পরেও এমন অনেক নতুন সামাজিক প্রক্রিয়া শুরু হল, যা আধুনিক। কিন্তু তা উনিশ শতকের মধ্যভাগের পরিচিত ঔপনিবেশিক আধুনিকতা নয়। এই পর্বের আধুনিকতাকে আমি আদি-আধুনিক নামে অভিহিত করার পক্ষপাতী।’

এখন বিষয়টি যেভাবেই হোক, এই দুই শ্রেণিই যে উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত প্রিভিলেজ্ড তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এঁদের ভাবাতুর চোখ দিয়ে দূর থেকে করুণায়, সমব্যথিত্বে গড়ে তোলা নিম্নবিত্তের আখ্যানই হয়ে উঠেছে আলোচনার পরিসর। যাদের নিয়ে কথা, তাদের বলার প্ল্যাটফর্ম গড়েই তোলা হয়নি যে। তাদের নিয়ে কথা বলার, তত্ত্ব নির্মাণের এলাকাটি মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত নিজের দখলেই রাখতে চেয়েছে। দেবদাস, অনেকটা সেই প্রান্তবাসীর স্বরক্ষেপণ থেকেই যেন লিখে গিয়েছেন যাবতীয় মেকি তত্ত্বকথা, শহুরে বাবুগিরি ও আরবান ডমিনেশনের বিরুদ্ধে: ‘আমাদের ঠিকানায় কোনও নান্দনিক চিত্রকল্প নেই’। অতএব, হে সুধীজন, আপনারা যেন সুখী-সুখী বিষাদভাবক্লিষ্ট কবিতা পড়তে চাইবেন না এখানে। এখানে অন্য কোনও স্থান-কাল-পাত্রের বলয় গড়ে তুলতে চেয়েছেন দেবদাস, যা আমাদের সুপরিচিত, ভানহীন; যাকে আমরা তত্ত্বের আবডালে সুবিধামতো ব্যবহার করতে চেয়েছি। আর তাই, ব্যবহৃত ঘুঁটির মতো রয়ে গিয়েছে তাদের অবস্থান। দেবদাস, শৈশবে চরম দরিদ্র, মধ্যবয়সে নিম্ন-মধ্যবিত্ত চাকুরিজীবী হয়েও, ভারতের চিরায়ত আদিবৃত্তি কৃষিকে মেনে, একজন কৃষকসন্তান হিসেবেই, অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে লিখে ফেলতে পারেন এমন পঙ্ক্তি:
‘আমার প্রিয় মাটির ওপর আমি শুয়ে আছি, সনাতন মূল্যবোধ
পাপ ও পুণ্যের উপলব্ধি নিয়ে, পাপ ও পুণ্যের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে
আমার শরীর সমকালীন বাষ্পে গলে যাক, শরীরে থাক শতাব্দীর উলকি
আমার কালো চামড়া আমি দান করে যেতে চাই অনাগত সভ্যতার জন্য’

এ-কবিতায় ভারতীয়ত্ব রয়েছে এই কারণে, কৃষিজীবীর অন্তঃস্বর ধারণ করা এই কবিতায় বক্তা প্রিয় মাটির ওপর শুয়ে থাকতে চেয়েছে। এখানে সে ফসলরূপ সন্তান। মা– মাটি। সেকথা বলার অপেক্ষা রাখে না। নিজেকে পৃথিবীর সন্তান হিসেবে দেখার নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণে দেবদাস এখানে নিজের অর্থনৈতিক অবস্থানকে অস্বীকার করে চাকুরিজীবী থেকে হয়ে যাচ্ছেন কৃষিজীবী। খসে পড়ছে তার প্রিভিলেজ সত্তার দিনানুদিনের জীবন। অথচ এই কণ্ঠস্বরকে যে ভান মনে হচ্ছে না, তার কারণ, যে ভাষাবোধের মাধ্যমে দেবদাস তার বক্তব্য পেশ করেছেন, তা একান্তভাবেই আদি-আধুনিকতার মেকি পরিসর থেকে সর্বৈব মুক্ত। বরং ঔপনিবেশিক হ্যাংওভার যে চোরাগোপ্তা লুকিয়ে আছে আমাদের রাজনৈতিক পছন্দের নির্মাণে, সেকথাও দেবদাসের এই অবস্থান বুঝিয়ে দিতে চায়। এই কবিতা যাদের কথা বলে, তাদের কোনও কথা মেইনস্ট্রিমের অংশীদার নয়। বড়জোর তাকে মধ্য ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত নিয়ন্ত্রিত মেইনস্ট্রিম ফিল-গুড কনটেন্টে পরিণত করেছে, তাকে নিয়ে আসর জমিয়ে নিজের বিদ্যা জহির করেছে, কিন্তু তাদের নিয়ে কথা বলার যে অধিকার– তা প্রকৃতপক্ষে অর্জন করতে পারেনি।
কী কারণে আজ ভারতের শ্রমজীবীর কথা ব্রাত্য? উপেক্ষিত? একারণেই। শ্রমজীবীর কথাকে শ্রমজীবীর জীবনচর্যা দিয়ে স্থাপন করতে দেওয়া হয়নি। সেই তত্ত্বনির্মাণকে সোনার চামচ হিসেবে ব্যবহার করে সাংস্কৃতিক চরিত্র প্রতিপন্ন করে নিয়েছেন কত স্ববিরোধী বাবু ও বিবিগণ। সুবিধাবাদীর তত্ত্বকথার সবচেয়ে বড় প্রস্থানভূমির বিষয় এই জনতা; এবং এ-বিষয়কে প্রগতিশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল– উভয়েই তাদের বীজমন্ত্র হিসেবে বানিয়ে রাখতে চেয়েছে, অতি সন্তর্পণে, সংসদীয় রাজনীতির ভানসর্বস্ব ভালোমানুষির জন্য। সেইসমস্ত মানুষদের নিয়ে আজীবন কথা বলে যাওয়া দেবদাস কিন্তু শুধু শ্রমজীবীর কষ্টের কথা তুলে ধরেননি। তাঁর কবিতায় শ্রমজীবীর ইতিবৃত্ত বরং উদ্যাপন, জীবনভঙ্গি, অনিবার্যতা, যাকে ছাড়া ভারতের প্রকৃত সনাতন ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ভারতের সনাতন মূল্যবোধ এই– আমার প্রিয় মাটির ওপর আমি শুয়ে আছি। এর চেয়ে তুমুল, চিরকালীন রাজনৈতিক পঙ্ক্তি কি আর ভাবা যায়?

‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো কি আজও প্রাসঙ্গিক?’ প্রবন্ধে পার্থ চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন: ‘কৃষক যে তার সামান্য ভূসম্পত্তিকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়, বাজারের নিয়মে তা লাভজনক না হলেও সেটা হাতছাড়া করতে চায় না, এই মনোভাব আমরা বুঝতে পারি, হয়তো তা নিয়ে সহানুভূতি দেখাই। কিন্তু কৃষকের সেইসমস্ত দাবিকে ভিত্তি করে যে আন্দোলন, মার্কস-এঙ্গেলস তাকে পেটি বুর্জোয়া সোশ্যালিজম, অর্থাৎ খুদে মালিকদের সমাজতন্ত্র বলে ব্যঙ্গ করেছেন।’ ‘Sympathy’ ও ‘Empathy’-র মধ্যে যে-পার্থক্য, তা সূক্ষ্ম হলেও মারাত্মক। সহানুভূতিপরায়ণ হয়ে দূরে থেকে কষ্ট পাওয়া আর সহানুভূতিপরায়ণ হয়ে তা থেকে দূরত্ব ঘুচিয়ে রক্তমাংস-মননে মিশে গিয়ে অন্য শ্রেণিচরিত্রের মর্মে পৌঁছনো– সহজ কথা নয়। সেখানে থাকবে না কোনও নির্বাচনী স্বার্থ। যদি রাজনৈতিক স্বার্থ থেকে থাকে, তবে তা একমাত্র আর্থ-সামাজিকতার অনিবার্যতায় ওই শ্রেণির হৃত গৌরবকে উদ্ধার করবার স্পেস তৈরি করতে সাহায্য করা। কথাগুলি না-হয় তারাই বলুন, যাঁদের সমস্যা। এই ‘Empathy’ দেবদাসের সমগ্র কবিসত্তায় ছিল বলেই তিনি লিখতে পেরেছেন:
‘গান করো সব এই মাটি আর এই আকাশের
গান করো ঐ সূর্যের
গান করো সব সমুদ্রের আর পাহাড়ের আর
গাঢ় নিতম্ব শস্যমুখর খামারের
গান করো সব ইঞ্জিন আর জাহাজের
গান করো সব শিল্পের’

এখানে ‘শিল্প’ শব্দের অর্থ ‘art’ না-থেকে ‘industry’ হয়ে যায়, আর বিশ্বকর্মাদের রচিত এই সংগীত সমাজবিচ্যুত কোনও কলা (art)-র কথা না-বলে ‘industry’-র কথা বলে, ভারতীয় সভ্যতার সৃষ্টির এক নিরবচ্ছিন্ন কর্মপ্রণালীর ইতিহাসকে সাক্ষী রেখে। ফলে সমাজ-সংলগ্ন কোনও সাধনার পথেই দেবদাস আমাদের এগিয়ে দেন তাঁর কবিতার মাধ্যমে। সেকারণেই তাঁর কবিতার বইয়ের নাম হয় ‘মানুষের মূর্তি’। সেখানে কবিতা শুধুমাত্র বক্তব্যপ্রধান না থেকে, ছোট-ছোট অসম্পূর্ণ কাহিনিসূত্রে জীবনের গ্রন্থিগুলো মায়া দিয়ে গেঁথে নেন। এই জীবন আদতে ভারতের আদিকল্প জীবন। দেবদাস একে সযত্নে রক্ষা করেন কবিতায় কবিতায়। ‘বাবা’ কবিতায় লেখেন:
‘ঐ, আমার বাবা হেঁটে যাচ্ছেন, ধুকড়ি গায়ে
তাঁর হাঁটু অবধি ধুলো
তাঁর চলার পথে বেজে উঠছে
শঙ্খ, ঘণ্টা, খিদে, শ্রম’

কোনও সন্দেহ নেই, এই পিতা সনাতন ভারতের ‘Archetype’ (আদিরূপ)। ধুকড়ি গায়ে হাঁটু পর্যন্ত ধুলো মেখে যিনি কাঁচা রাস্তা বা মেঠো পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, তাঁর চলার প্রতিটি পদক্ষেপ গড়ে তুলছে সংগীত, যে সংগীত কখনও ধান-কাটার, কখনও মাটি কোপানোর। সেই আবহমান সাংগীতিক মূর্ছনাটি কেমনভাবে দেখাচ্ছেন দেবদাস? দেখাচ্ছেন এক-একটি শব্দের রূপকল্প গড়ে তুলে– শঙ্খ (গ্রামীণ জীবনের মাঙ্গলিক চিহ্ন), ঘণ্টা (অধ্যাত্মচিহ্ন), খিদে (অর্থনৈতিক চিহ্ন), শ্রম (অর্থনৈতিক চিহ্ন)। এইভাবে দেবদাস আসলে প্রমাণ করতে চাইলেন, ভারতের প্রেক্ষাপটে সমাজতন্ত্রের বোধটি গ্রামীণ জীবনের ভূকেন্দ্র থেকেই উৎপন্ন, যেখানে শঙ্খধ্বনির সঙ্গে, ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে মাঙ্গলিকতার কৌম সংস্কৃতির চিরায়ত কাঠামোটি সুস্পষ্ট হয়েছে। এই মাঙ্গলিক কাঠামোই এই কৃষিজীবনের ভিত্তিকে নিয়ে গিয়েছে সমাজতন্ত্রের দিকে। এই দুয়ের মধ্যে এক্ষেত্রে কোনও স্ববিরোধ নেই। বরং একে অপরের পরিপূরক। লক্ষণীয়, দেবদাস কিন্তু নিজে নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ হয়েও, নিজের অবস্থান থেকে বেরিয়ে শ্রমজীবী মানুষের জীবনভঙ্গিমার মধ্যে নিজের চেতনাকে সংস্থাপিত করেই, তাকে ভারতের রাজনৈতিক স্বজ্ঞায় রূপদান করতে চেয়েছেন। এই চাওয়ার সঙ্গে রয়েছে শৈশবের অমোঘ যোগ।
আত্মকথা ‘দেবদাসের জীবনপ্রভাত’-এ দেবদাস লিখেছেন: ‘আমাদের বাড়িটা ছিল গ্রামের এক প্রান্তে। ঠাকুরদা যৌথ পরিবার থেকে আলাদা হয়ে এসে, আমাদের জন্মের আগেই, ঐ বাড়িটা করেছিলেন।’ গ্রামের প্রান্তে নির্মিত ওই বাড়ির করোগেট টিনের বড় বড় ঘর, একটা খড়ের দোচালা রান্নাঘর, গোয়াল, ঢেঁকিশাল। গ্রামের শেষ প্রান্তে বাড়ি, আর তারপরেই মাঠ। ফাঁকা, সবুজ মাঠ। লক্ষণীয়, দেবদাস যখন পরে কৃষ্ণনগরে বাড়ি করবেন, তখনও কিন্তু এমনই এক প্রান্তিক অঞ্চলকে খুঁজে বের করবেন, যে-স্থান জনবিরল। যার পরিপার্শ্বে নির্জন প্রান্তর। দেবদাস এই প্রান্তেবাসী হয়েই জীবনসংগ্রামের তাৎপর্য বুঝে নিচ্ছেন কীভাবে, কীভাবে শৈশব থেকেই জাতি-পার্থক্যের বৈষম্য তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তার পাঠ শুরু হয়েছিল বাড়ির পেয়ারাগাছের শক্ত ডাল বেয়ে ট্রেন দেখতে ওঠার মধ্য দিয়ে। দু’টি পথ বিভাজনের মাধ্যমে– একটি গিয়েছে জমিদার-জোতদার-কায়েত-বদ্যি-বামুনদের এলাকায়; অন্য পথটি ‘সবজিখেতের পা ছুঁয়ে’ ডোবার পাশ দিয়ে চলে গেছে কলুপাড়া, জেলেপাড়ার দিকে। বাবা সম্পর্কে লিখছেন: ‘বাবার ছিল ব্যয় করার মতো অফুরন্ত সময়। তিনি ঐ সময় জুড়ে মাছ ধরতেন আর যাত্রাদলে অভিনয় করতেন।’ দেবদাসের ঠাকুরদার কৌলিক বৃত্তি ঠিকুজি, কোষ্ঠী, কররেখা বিচার, শান্তিস্বস্ত্যয়ন এবং কিছু যজমানি। ফলে তাই নিম্নবিত্ত ও কখনও নিম্ন-মধ্যবিত্ত হলেও উন্মুক্ত প্রকৃতির সাহচর্যে একটি হিন্দু-বাড়ির পৌত্তলিক অধ্যাত্মবাদ যেভাবে গড়ে ওঠে, সেভাবেই তার সংস্পর্শে বড় হয়েছিলেন দেবদাস। দেবদাসের জ্যাঠামশাই ছিলেন সংসার-বিমুখ, মেধাবী ছাত্র, যিনি বৈষ্ণবীয় আখড়ায় মিশে কীর্তনের দল গড়ে তোলেন। দেবদাসের এই শৈশবস্মৃতির অমলিন মাধুর্যে প্রথম আঘাত আসে দেশভাগে। যে গ্রামে দেবদাসের শৈশব কেটেছিল, তা পাকিস্তানের অন্তর্গত হওয়ায়, সে গ্রামের হিন্দুরা ক্রমশ গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়। সেখানে যেমন প্রাইমারি স্কুলে বা গ্রামে দেশভাগের খুশিতে বাতাসা বিতরণের চিত্র রয়েছে, তেমনই আবার সন্ধেয় পাশের গ্রাম থেকে মুসলমানদের দল এসে লাঠিখেলার সঙ্গে তরোয়াল ও বর্শা নিয়ে আসত– এ ঘটনাও নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে ওঠে। দেবদাস লিখছেন: ‘আমাদের গ্রামে যা কিছু হচ্ছিল নীরবেই হচ্ছিল। তখনও কোনো বড় রকমের হাঙ্গামা হয়নি। তবু ঐ নিয়মিতভাবে লাঠিখেলা দেখাতে আসার পিছনে যে একটা অভিসন্ধি আছে এটা সবাই বুঝেছিল। হিন্দু হয়ে এদেশে আর থাকা চলবে না, ধর্মান্তরিত হলে অবশ্য আলাদা কথা।’ এর ফলশ্রুতি দেবদাসের সপরিবারে গৃহত্যাগ, তথা দেশত্যাগ, এবং ঐ উন্মুক্ত মাঠঘাট ছেড়ে বীরনগরে পোড়ো ও পরিত্যক্ত বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া।
শৈশবেই ঘটে যাওয়া এইসব ইতিবৃত্তে কি দেবদাসের মনে প্রভাব পড়েছিল? পড়লেও, তা অস্বাভাবিক নয়। সেকারণেই ‘বাবা’ কবিতায় যে আদিকল্প অদিরূপ পুরুষটিকে দেখা যায়, দেবদাসের অবচেতন তাকে হিন্দু সংস্কৃতির আবহে সীমায়িত করে ফেলেছে। শঙ্খ, ঘণ্টার পরেই তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খিদে ও শ্রমের অনিবার্য ক্রমপরিণতি। দেবদাস তাঁর স্মৃতির কাছে, মগ্নচৈতন্যের কাছে কতটা সৎ, তা এখান থেকেই বোঝা যায়। স্মৃতির ওপর সুকৌশলে কোনও কৃত্রিম চিন্তা আরোপ করে তিনি বাঙালির বিবেক হতে চাননি। মিথ্যাচরণ করেননি কবিতায়। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, দেবদাসের জীবনের গ্রাউন্ড রিয়েলিটি কি তাঁর ভারতীয়ত্বের পথে কোনও বাধা হয়ে উঠেছে? কখনও-ই নয়। দেবদাসের অস্তিত্বে যে অস্তিক্যবোধ নিমগ্ন রয়েছে তাঁর পারিবারিক সূত্রে– তা লোকসংস্কৃতি, বৈষ্ণব দর্শন, আবার জ্যোতিষশাস্ত্রকে ধারণ করে আছে। এর সঙ্গে রয়েছে এসব থেকে মুক্ত হয়ে ডাক্তার কিংবা সন্ন্যাসী হওয়ার পারিবারিক আত্মীয়ের ইতিহাস। ফলে হিন্দুত্বের শিকড় দেবদাসের মজ্জায়। আর লক্ষ করবার বিষয় এটাও, দেবদাস উদ্বাস্তু হয়ে বীরনগর থেকে যাচ্ছেন কৃষ্ণনগরে। খুঁজছেন প্রান্তর, যে প্রান্তর প্রাচ্য দর্শনে নিহিত ঐশিকতাকে খুঁজে চলার প্রবণতাকেই চিহ্নিত করে।
বীরনগরে থাকাকালীন দেবদাস প্রত্যক্ষ করছেন: ‘আমাদের বাড়ির পিছন দিকের রাস্তাটা বীরনগর ছাড়িয়ে, মাঠঘাট পার করে দূরের গ্রামের মধ্যে চলে গিয়েছে। কিছুদিন ধরেই একটা করুণ দৃশ্য, ভোরবেলা উঠে, প্রাচীরের ওপর বসে দেখতাম আমরা– দলে দলে মুসলমান পরিবার হেঁটে চলেছে। একেকটি দল এক-একটি পরিবার। রিফিউজি ও স্থানীয় হিন্দুরা এদের গ্রাম আক্রমণ করেছিল রাতে। সকালবেলাই তারা তাদের পবিত্র ভূমির দিকে চলেছে নিঃস্ব, অসহায়।’ ফলে দেবদাস জীবন দিয়েই বুঝেছেন, বিষয়টা একরৈখিক নয়। আগেই বলা হয়েছে, জীবন ও মানুষ দেখার অভিজ্ঞান দেবদাসের মর্মজগতের ভিত্তি; সেই ভিত্তিই অবিরাম ভাবপ্রবাহ হয়ে সমাজতন্ত্রের পথ দেখিয়েছে তাঁর কবিতায়। ‘মানুষের মূর্তি’ বইয়ের একাধিক কবিতায় দেবদাসের পারিবারিক হিঁদুয়ানির পরিসর যুক্ত হয়ে পড়ে, দেশভাগের পরবর্তী ভারতের বৃহত্তর সামাজিক সত্যতে। তখন দেবদাস নিজেই লক্ষ করেন, পারিবারিক গোঁড়ামিগুলো খসে পড়ছে অসহনীয় দারিদ্রের কারণে। এই অসহনীয় দারিদ্রই ঘাড় ধরে মিলিয়ে দিচ্ছে হিন্দু-মুসলমান-বাঙালি-অবাঙালিকে। এই ভাবনা থেকেই সৃষ্টি হয় ‘প্রতীক্ষা’-র মতো কবিতা। সমস্ত বিভেদ ভুলে হতদরিদ্র একটি পরিবার তাঁদের রক্ষাকর্তা রোজগেরে পুরুষটির জন্য হাপুস নয়নে অপেক্ষা করে থাকে:
‘সন্ধেয় আমি আর মা লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে থাকি
পথের বাঁকে
এখন ঘরে আসার সময়
এখন সমস্ত বাইরের ছড়ানো জগৎ যেন গুটিয়ে আসে ঘরের দিকে
আমি এবং মা লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে থাকি বাবার প্রতীক্ষায়
ধরামিকাকা ফিরে আসেন, গাড়োয়ান পিসেমশায় ফিরে আসেন
পাঁউরুটি হাতে ফিরে আসেন মিস্ত্রিদাদু
এবং মোষগুলিও ফিরে আসে, সন্ধে সন্ধের ভিতরে ডুবতে থাকে
শোনা যায় দরগাতলার সান্ধ্য আজান
একসময় পিঠে একটা বোঁচকা নিয়ে বাবার ফিরে আসা বোঝা যায়
আর মা তৎক্ষণাৎ বলেন–
ঐ তো, ঐ তো উনি আসছেন, দেখ ঐ তো উনি’

একজনের প্রতীক্ষা অনেকজনের কালেক্টিভ প্রতীক্ষা হয়ে ওঠে। একজনের জন্য প্রতীক্ষা, অনেকের জন্য প্রতীক্ষার সমান্তরাল হয়ে ওঠে। শুধু বাবার ফেরাটাই সেখানে মুখ্য থাকছে না; সমবেত বেঁচে থাকার যে একীভূত চেতনা– তার অংশীদার শুধু আমার পরিবারের মানুষটি নন, সেইজন্যে হিন্দু গাড়োয়ান পিসেমশাইয়ের সঙ্গে মুসলমান ধরামিকাকা ও পাঁউরুটি হাতে ফিরে আসা মুসলমান মিস্ত্রি কাকার জন্য অপেক্ষা একীভূত হয়ে যায়। সন্ধে দেওয়ার মাঙ্গলিক অনুভূতির সঙ্গে অনায়াস জীবনভঙ্গিমায় একমাত্রায় যুক্ত হয় দরগাতলার সান্ধ্য আজান। দৈনন্দিন স্বাভাবিকতা দিয়েই গড়া হয় সংগ্রামী মানুষের রোজনামচা। দেবদাস, তাঁর কবিতাজগতে এই সমাজতন্ত্রকেই অধ্যাত্মবাদের মরমিয়া ছেনি-হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে শানিত করে গিয়েছেন, ‘urban’ জীবন থেকে বহুদূরে, কোনও প্রান্তিক ভাষা ও জীবনচর্চার পিঁড়িতে বসে। দেবদাস সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন যে মতামত, সেখান থেকেই ‘Subaltern’ জগৎ যে তাঁর কবিতার জরুরি বিষয় হয়ে উঠছে, সে সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন: ‘আমার ধারণা, মঙ্গলকাব্যের পর কৃষিজীবী, শ্রমজীবী, গ্রামীণ মানুষদের কথা এলেও এত প্রত্যক্ষভাবে আসেনি– এটাও অনেক পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।’ কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের হয়ে কথা বলতে গিয়ে দেবদাস কয়েকটি ব্যাপার খেয়াল করেছেন, সেখানেই তাঁর নিজস্বতা: ‘একথা সত্যি যে আগেও শ্রমজীবী মানুষের কথা বাংলা কবিতায় এসেছে কিন্তু তাঁরা এসেছেন কোনও মহান ঐতিহ্যের বাহক হিসেবে। মিছিল করেছেন, সংগ্রাম করেছেন। এখানে তা নয়, এখানে আমার উদ্দেশ্য ছিল জীবনকে হুবহু তুলে আনা এবং জীবনের মধ্যে ব্যঞ্জনা নিয়ে আসা।’ এ-কারণেই দেবদাস মন্ত্রময় এক শুদ্ধ ভাষাকে নিয়ে আসেন অলংকার-বর্জিত গ্রামীণ আদিম জীবনবৃত্তির ও কথনবৃত্তর খুব কাছাকাছি। তাঁর কবিতায় দিগন্তবিস্তৃত মাঠ, মানুষের অসহায়ত্ব, গ্রামীণ মানুষের দ্বিধাবোধ যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী নাগরিক বিষাদ ও দ্বিধাবোধ থেকে আলাদাই, এর সঙ্গে এমন এক জনপদের মায়া, যার মধ্যে দেশভাগের যন্ত্রণা ও অনিশ্চয়তা রয়েছে। দেবদাসের কবিতাজগৎ আসলে দেবদাসের আত্মন-কে মুছে ফেলে, ক্রমশ জাগিয়ে তোলে নিম্নবর্গীয় মানুষের অস্তিত্ব খুঁজে বেড়ানোর সমাজতন্ত্রকে।
সনাতন ভারতের আদিতম রূপটি সেই রোজগেরে মানুষের ঘর খুঁজে বেড়ানোর গল্প। রাজা আসবে যাবে। কিন্তু এই জীবনের আধার ও সংকল্প সাধনের ইতিহাসের যে চিরসত্য বয়ে চলেছে মাটিতে-বাতাসে-ধ্বনিতে, তার কোনওদিন মৃত্যু হবে না।
……………………..
রোববার.ইন-এ পড়ুন রাজদীপ রায়-এর অন্যান্য লেখা
……………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved