


ক্যাপ্টেন হ্যাডক বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে– কালো ট্রাউজার, খয়েরি জুতো, নীল টার্টলনেক সোয়েটার যার মাঝখানে রয়েছে কালো সুতোয় এমব্রয়ডারি করা একটি নোঙরের ছবি, মাথায় নাবিকদের মতো কালো টুপি। মোটামুটি উচ্চতার, মধ্যবয়সি, ভুরু আর দাড়ি-গোঁফের জঙ্গলে ভরা মুখে বেশিরভাগ সময়েই বিরক্তির ছাপ। অ্যার্জে-র প্রথম স্ত্রী জার্মেইন কিয়েকেন্সের সাক্ষ্য থেকে জানা যায় যে, ‘হ্যাডক’ আসলে একটি খাবারের নাম, একটি বিশেষ মাছের পদ, যার আক্ষরিক অর্থ, ‘একটি দুঃখিত মাছ’।
যদি প্রশ্ন করি, এই ধরাধামে এমন কে আছে, যার জল খেতে ভালো লাগে না, কারণ জলে অ্যালকোহল নেই, তাহলে সম্ভাব্য বেশ কয়েকজনের নাম হয়তো মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাবে, কিন্তু যদি বলি সেই চরিত্রের সবচেয়ে পছন্দের হুইস্কি ‘লক লোমন্ড’, তাহলে অবশ্য সব নাম মুছে গিয়ে থেকে যাবে একটিই নাম– ক্যাপ্টেন আর্চিবল্ড হ্যাডক!

স্কটল্যান্ডের একটি হ্রদের নাম থেকে শতাব্দী প্রাচীন এই স্কটিশ হুইস্কির নামকরণ করা হয়। টিনটিন-এর গল্প ‘কৃষ্ণদ্বীপের রহস্য’-এ মালগাড়ির একটি ট্যাঙ্কারের গায়ে এই ‘লক লোমন্ড’-এর নাম আর লোগো দেখা যায়। কিন্তু আপনি যদি অরিজিনাল সাদা-কালো সংস্করণটি খেয়াল করেন, তাহলে দেখবেন সেখানে ‘লক লোমন্ড’-এর জায়গায় ছিল ‘জনি ওয়াকার হুইস্কি’র নাম। ‘কৃষ্ণদ্বীপের রহস্য’-এর সময়েও কিন্তু টিনটিনের সঙ্গে আলাপ হয়নি ক্যাপ্টেন হ্যাডকের, হ্যাডক আসবে আরও কিছু গল্পের পর। ঠিক কী কারণে জনি ওয়াকারের জায়গায় লক লোমন্ড এসেছিল, তা জানি না। তবে এই ‘লক লোমন্ড’ আর ক্যাপটেন হ্যাডক পরবর্তীকালে একে-অন্যের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে জড়িয়ে যায়।
তাই হ্যাডকের কথা বলতে গিয়ে ‘লক লোমন্ড’ নিয়ে আরেকটু বিস্তারে যাওয়া যায়।
একেবারে শেষতম দু’টি গল্পেও দিব্যি রয়েছে ‘লক লোমন্ড’। ‘বিপ্লবীদের দঙ্গলে টিনটিন’-এ দেখা যায় জেনারেল টাপিওকা আর কর্নেল স্পঞ্জ আরামবায়াদের আর বিপ্লবীদের মধ্যে প্যারাশুটে করে প্রচুর লক লোমন্ডের বোতল নামিয়ে দিয়ে গিয়েছে, যার ফলে দুর্বল হয়ে পড়ে জেনারেল আলকাজার আর টিনটিনদের দলবল। ‘টিনটিন অ্যান্ড অ্যালফ-আর্ট’ গল্পে ক্যাপ্টেন হ্যাডকের দুঃস্বপ্নে হানা দেয় লক লোমন্ড।

ক্যাপ্টেন হ্যাডকের কথা বলতে গিয়ে, যে-বিশেষ একটি হুইস্কির কথা উঠে এল, এর কারণ হ্যাডককে প্রথম যখন দেখা গেল কারাবুজান জাহাজে, তখন সেই জাহাজের ক্যাপ্টেন হওয়া সত্ত্বেও তিনি শেষ করে চলেছেন একটার পর একটা হুইস্কির বোতল। মদের ওপর ভয়ংকরভাবে নির্ভরশীল, মানসিকভাবে পঙ্গু, মদের নেশার নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন অপরাধীদের হাতে। অত্যধিক মদ্যপানের কারণে ভেঙে পড়েছে তাঁর শরীরও। তবু এই সবের মধ্যেও, টিনটিনের সত্য উদ্ঘাটনের পথে তিনি সঙ্গী হয়ে যান, থেকে যান বাকি প্রায় ১৬টি অভিযানে। মদ খাওয়া হয়তো তিনি ছাড়তে পারেননি কোনও দিনই, কিন্তু প্রথম দেখার হ্যাডকের থেকে অনেক বদলে গিয়েছিলেন তিনি, হয়ে উঠেছিলেন বন্ধুবৎসল, সাহসী, এক অত্যন্ত মজাদার লোক, মানুষ হিসেবে যাঁর তুলনা বড় একটা মেলে না।

অবশ্য মদ্যপান তিনি ছাড়বেন কী করে! এ যে তাঁর সুদীর্ঘ পারিবারিক ঐতিহ্য! ক্যাপ্টেন হ্যাডকের পরিবার সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না, একটি তৈলচিত্রে শুধু দেখা মেলে তাঁর এক পূর্বপুরুষ স্যর ফ্রান্সিস হ্যাডকের। হুবহু একরকমের দেখতে দু’জনকে। ইউনিকর্ন জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন এই ফ্রান্সিস, তাঁরও মেজাজ ছিল বেশ খোলতাই। জলদস্যুর সঙ্গে লড়ে যেতে বুক কাঁপেনি এই অসমসাহসী মানুষটার। ইউনিকর্ন জাহাজে কী হয়েছিল, তার বহু বছর পর সেই ইউনিকর্নকে ঘিরে কীভাবে ঘনীভূত হল রহস্য আর কীভাবে আমাদের ক্যাপ্টেন হ্যাডক পেলেন স্যর ফ্রান্সিসের লুকিয়ে রেখে যাওয়া গুপ্তধন, সেই সব প্রসঙ্গে আমরা আপাতত ঢুকছি না, আমরা শুধু খেয়াল করব দু’টি দৃশ্য।
প্রথম দৃশ্যটির জন্য আপনাদের যেতে হবে সেই দ্বীপে, যেখানে ফ্রান্সিস পালিয়ে গিয়ে কিছুদিন ছিল। গুপ্তধনের সন্ধানে সেখানে পৌঁছে যান টিনটিন, হ্যাডক আর তাঁদের দলবল। সেখানে একটি অদ্ভুত মূর্তির দেখা মেলে, যাকে অনেকটা হ্যাডকের মতো দেখতে। টিনটিনের মনে হয় সেই মূর্তিটি যেন এখুনি বলে উঠবে, ‘হুইস্কি লে আও’, আর অমনি সত্যি সত্যি কে যেন বলল, ‘হুইস্কি লে আও’। সবাই অবাক হয়ে যখন এদিক-ওদিক দেখছে, তখন ক্যাপ্টেন হ্যাডকের মতো কারা যেন শুরু করল গালাগাল দিতে– ‘বাঁদর… বেজি… গণ্ডার… জিরাফ…’।
তারপর দেখা গেল গাছে গাছে থাকা টিয়াপাখির ঝাঁক এইসব বলছে। আসলে বহু যুগ আগে যখন ফ্রান্সিস এখানে ছিলেন, তখন তাঁর মুখনিঃসৃত গালাগালগুলো রপ্ত করে নিয়েছিল টিয়াপাখিরা। টিয়াপাখিদের মধ্যে বংশপরম্পরায় সেই গালাগালগুলো আজও চলে আসছে, ঠিক যেমন ফ্রান্সিসের উত্তরপুরুষ বহন করে চলেছেন সেই সুললিত অননুকরণীয় বাচনভঙ্গিমা।
এইবার দ্বিতীয় দৃশ্য। সমুদ্রের যেখানে ইউনিকর্ন জাহাজকে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন ফ্রান্সিস, সেখানেও হাজির হন টিনটিনরা। খুঁজেও পান সমুদ্রের জলের নিচে ইউনিকর্নের ধ্বংসাবশেষ। টিনটিন কয়েকটি স্মারক তুলে আনলেও হ্যাডক যুদ্ধ জয়ের ভঙ্গিমায় তুলে আনলেন কয়েকশো বছরের পুরনো জামাইকান রামের বোতল। এ-যেন যেকোনও গুপ্তধনের চেয়েও দামি। পরে অবশ্য পরিত্যক্ত জাহাজের থেকে পাওয়া গেল অজস্র রামের বোতল। ফ্রান্সিসের সমুদ্র অভিযানের স্টক। ফ্রান্সিস এমন বলেই না তাঁর উত্তরপুরুষ হ্যাডক এইরকম– চন্দ্রলোক অভিযানে তামাক আর মদ সঙ্গে নেওয়া ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, কিন্তু হ্যাডক সঙ্গে নিলেন একটি ঢাউস বই, ‘গাইড টু অ্যাস্ট্রোনমি’; দেখতে বইয়ের মতো হলেও তার ভেতরে ছিল অন্তত দুটো হুইস্কির বোতল। তবে সে-যাত্রায় হুইস্কি অবাধ্য হয়েছিল ক্যাপ্টেনের। রকেটের মধ্যে কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ শক্তি হঠাৎ চলে যাওয়ায় গ্লাসের হুইস্কি বলের মতো হয়ে ভেসে যেতে থাকে, আর ক্যাপ্টেন আকুল স্বরে বলতে থাকেন, ‘আরে, হুইস্কি, তুমি এত অবাধ্য কেন? এসো… গেলাসের মধ্যে ফিরে এসো!’

ক্যাপ্টেন হ্যাডক বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে– কালো ট্রাউজার, খয়েরি জুতো, নীল টার্টলনেক সোয়েটার যার মাঝখানে রয়েছে কালো সুতোয় এমব্রয়ডারি করা একটি নোঙরের ছবি, মাথায় নাবিকদের মতো কালো টুপি। মোটামুটি উচ্চতার, মধ্যবয়সি, ভুরু আর দাড়ি-গোঁফের জঙ্গলে ভরা মুখে বেশিরভাগ সময়েই বিরক্তির ছাপ। অ্যার্জে-র প্রথম স্ত্রী জার্মেইন কিয়েকেন্সের সাক্ষ্য থেকে জানা যায় যে, ‘হ্যাডক’ আসলে একটি খাবারের নাম, একটি বিশেষ মাছের পদ, যার আক্ষরিক অর্থ, ‘একটি দুঃখিত মাছ’। হ্যাডক যে বিমর্ষ থাকেন, তা হয়তো অ্যার্জের ছবি থেকে মনে হয়, কিন্তু কোথায় যে তার সেই দুঃখের উৎস, তা স্পষ্ট নয় কোনওভাবেই। নারীসঙ্গ তাঁর কস্মিনকালে ছিল বলে তো মনে হয় না।

দুর্জনেরা বলে, ক্যাপ্টেন হ্যাডকের সঙ্গে না কি আমার কিছু মিল আছে। হুইস্কির প্রতি টান, মেজাজের ওঠাপড়া, মুখের সেই অনির্বচনীয় ভাষা– এই নিয়ে হয়তো সামান্য সাদৃশ্য আছে, কিন্তু হ্যাডকের মতো বন্ধু হওয়া, এমন খোলা মনের মানুষ কিংবা হ্যাডকের সারল্য বিরল। টিনটিন জটিল, হয়তো কিছুটা বর্ণবিদ্বেষী, উন্নাসিক, কিন্তু ভালোবাসার সিংহাসনে কাউকে যদি বসাতেই হয়, হ্যাডকের কোনও বিকল্প নেই। যে-মানুষ রেগে গিয়ে গালাগাল হিসেবে ‘আনারস’ বলে, তার সঙ্গে অন্তত আমার কোনও মিল থাকতেই পারে না!
…………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন ঋত্বিক মল্লিক-এর অন্যান্য লেখা
…………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved