


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জীবিত ও মৃত’ (১৯৮২) গল্পে কাদম্বিনী যেমন ‘মরিয়া প্রমাণ করিল, সে মরে নাই’, ঠিক তেমন ‘পরমা’ ছবির মূল চরিত্র পরমা আত্মহননের পথ বেছে নিতে, তাঁর প্রতি বাড়ির লোকের খানিক দরদের উৎপত্তি হয়েছিল। তাঁকে হাসপাতালে সকলে বোঝাতে এসেছিল যে সাইকোথেরাপির কতটা প্রয়োজন তাঁর এখন। কিন্তু পরমা তাঁর সব ভেঙে-পড়া, সবরকম পরাধীনতা এবং সব পিছিয়ে থাকার এক অপরূপ সমাধান ততক্ষণে বের করে ফেলেছেন।
ঝকঝকে একটা সকাল। হাসপাতালের বেশ উঁচুতলার কেবিনে পরমা (রাখী গুলজার) তাঁর বাড়ি থেকে আসা সব লোককে বললেন, ‘বোসো!’ পরমা এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিলেন বড় জানলাটার সামনে। পরনে স্নিগ্ধ সাদা শাড়ি একটা, সাদা ব্লাউজ। ভেন্ট্রিকিউলোগ্রামের সময় ব্রেনে সূচ প্রবেশ করাতে হয়েছিল বলে পরমার ঘন, কালো একঢাল চুল কুচিকুচি করে কেটে ফেলা হয়েছে। মাথার পিছনে তাঁর ব্যান্ডেজ। আজ বাড়ির অনেকে– পরমার স্বামী ভাস্কর (দীপঙ্কর দে), মেয়ে এষা (চৈতি ঘোষাল), ননদ মিনু (শকুন্তলা বড়ুয়া) আর ভাসুরপো বুবু (সৌমিত্র ব্যানার্জি)– এসে উপস্থিত হয়েছে তাঁকে খানিকটা বোঝানোর জন্য যে, সাইকোথেরাপি করালে পরমার মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে। প্রক্রিয়াটা বোঝাচ্ছেন ডা. দাশগুপ্ত (অনিল চট্টোপাধ্যায়)। শরীর খারাপ হলে ওষুধ খেতে যেমন পরমা ‘না’ করেন না, তেমন সাইকোথেরাপিতে ওঁর আপত্তি থাকার কথা নয়; এটাই ডা. দাশগুপ্তের বক্তব্যের সারমর্ম।
সকলের দুশ্চিন্তা পরমার অভ্যন্তরীণ অপরাধবোধ নিয়ে। পরমা আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন। ধারালো ব্লেড দিয়ে কেটে ফেলেছিলেন কবজির শিরা। প্রচুর রক্তক্ষরণ হলেও তিনি প্রাণে বেঁচেছেন। সৌভাগ্যক্রমে, অপারেশনও করাতে হয়নি। এবার কিছুদিনের সাইকোথেরাপির পর হাসপাতাল থেকে ছুটি মিলবে পরমার। কিন্তু কেবিনে উপস্থিত সকলকে খানিকটা আশাহত করে, খানিকটা অবাক করে দিয়ে পরমা জানান, ‘কিন্তু আমার তো কোনও অপরাধবোধ নেই!’

অপর্ণা সেন পরিচালিত ‘পরমা’ (১৯৮৫) সিনেমাটি নারীবাদের এক অপূর্ব পাঠ, আজও। রাহুল রায় (মুকুল শর্মা) ছেলেটির সঙ্গে আলাপ হওয়ার আগে পরমার নিজস্ব কোনও পরিচয় ছিল না। সে স্ত্রী, মা, বউমা, বউদি, কাকিমা এবং আরও অনেক কিছু ছিল, কিন্তু সে পরমা ছিল না। বন্ধুদের রিইউনিয়নে যখন তাঁর বান্ধবীরা নিজেদের জীবন নিয়ে বলতে থাকে– আরতি (রেণু রায়) আর্ট-সেলিং-এর সঙ্গে যুক্ত, শীলা (অপর্ণা সেন) তাঁর স্প্যাস্টিক শিশুদের স্কুল নিয়ে ব্যস্ত কিংবা মায়া (গৌরী ঘোষ) ‘অ্যাডাল্ট এডুকেশন’ নিয়ে একটা বই লিখেছে– তখন একমাত্র পরমা ‘থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড়’ করে বলে জানান অর্থাৎ, তথাকথিত সংসার! দিনরাতের সমস্ত ব্যস্ততা তাঁর পরিবারের লোকজনকে ঘিরে। তিনি যে একসময় ভালো সেতার বাজাতেন, কিংবা কবিতা পড়তে ভালোবাসতেন (প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতার কয়েক লাইন তিনি ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে গড়গড় করে রাহুলকে বলেছিলেন); সেসব কথা কেউ আর মনে রাখেনি। ভুলে গেলে চলে না ‘পরমা’ সিনেমাটি আটের দশকের। তখন উচ্চপদস্থ স্বামীর উচ্চবিত্ত জীবন আর গড়িয়াহাট-বালিগঞ্জে ফ্ল্যাট, কিংবা স্বামীর দেওয়া মোটা হাতখরচ– যাতে নিউমার্কেটে নিয়মিত শপিং করা যায়– এসব নিয়ে নিশ্চিন্তের জীবন কাটানো হয়তো ছিল বিবাহিত নারী-জীবনের বাধ্যকতা। আবার একরকমের সাফল্যও। কিন্তু পরিচালক ‘পরমা’ চরিত্রকে সেই নিস্তরঙ্গ জীবনে থিতু হতে দেননি। পরমার জীবনে প্রেম এসেছে।
আটের দশকে কেন, আজও বিবাহিত মেয়ের প্রেমকে ধরে নেওয়া হয় চরিত্রের অসঙ্গতি হিসেবে। আমরা সকলেই জানি, মানব-মন একগামী না-ও হতে পারে, কিন্তু সমাজ প্রেম, বিবাহ– সকল সম্পর্কে একগামিতা দাবি করে। তবে প্রেম এমন অতর্কিত এক আবেগ, যা কখন আমাদের জীবনে এসে উপস্থিত হয়, তা আমরা অনেক সময় টের পাই না। পরমা ‘ভারতীয় গৃহবধূ’ হিসেবে মডেলিং করতে প্রথমে রাজি হননি রাহুলের প্রস্তাবে। বাড়ির সকলে জোর করেছিল তাঁকে এ-ব্যাপারে। রাহুল তাঁকে কয়েকদিনের আলাপে যে-উড্ডীন জীবনের স্বাদ দিয়েছিল, তাতে পরমার নিজেকে বেঁধে রাখা সম্ভব হয়নি। বহু বছর পর পরমা বৃষ্টিতে ভিজেছিলেন, হাঁটতে হাঁটতে জুতো ছুঁড়ে ফেলেছিলেন দূরে, বিপজ্জনক ব্রিজ পার হয়েছিলেন শাড়ি পরে, পারফিউম মাখছিলেন নতুন নতুন, শাড়ির রং তাঁর বদল হচ্ছিল। শুধু তাই নয়, পরমা শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি ফিরে পাচ্ছিলেন– সেই শিল-কুড়ানো, সেই ছাদের সিঁড়ি আর সেই সুধাপিসির ‘ক্যালেন্ডুলা’। সব থেকে বড় কথা পরমা তাঁর সেতারের সুরে ফিরছিলেন। সেই যে রোববারগুলো সেতারের মাস্টারমশাই সৌমেনবাবু আসতেন, সেই বাইরে বৃষ্টি আর সৌমেনবাবু নিমগ্নচিত্তে সেতার বাজাচ্ছেন– সেই স্মৃতি পরমাকে তখন খুঁজে দিচ্ছে তাঁর হারানো মিজাব। তিনি নিজের সেতারটা টেনে বসছেন। মেঘ রাগ পরমার সেতারে ঝংকৃত হয়ে কলকাতা শহর জুড়ে বৃষ্টি নামাচ্ছে। ছবির সংগীত পরিচালক ভাস্কর চন্দ্রভারকরের অনন্য-সাধারণ আবহ-সংগীতে ভরে উঠছে সিনেমা।

নিউইয়র্কবাসী ‘লাইফ ম্যাগাজিন’-এর নিয়মিত ফটোগ্রাফার রাহুল তাদের ছেড়ে যাওয়া কলকাতার বাড়িতে পরমাকে নিয়ে যায়। বাড়ির এখনকার বাসিন্দাদের সঙ্গে রাহুল আর পরমা আলাপ করে, যারা ১৯৬৫ সালে এ-বাড়ি কিনে নিয়েছিল। সেখানে পরমাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করায় রাহুল। যা কোনওদিন ঘটেনি আর ঘটবে না, সেইসব ঘটনাই অপরিচিত মানুষগুলোর কাছে মেলে ধরে রাহুল আর পরমা। তারা না কি আমেরিকায় যাযাবর জীবন কাটায়, শিকার করে, তাদের কোনও বাসা নেই, একটি ট্রলারে করে আমেরিকার এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে ঘুরে বেড়ায়– কখনও নেব্রাস্কা, কখনও প্রেইরিজ! আর যেখানে তারা থামে, পরমা সেখানে সেতার বাজানোর অনুষ্ঠান করেন। তবলায় সঙ্গত করে কে? আল্লারাখা! এই সম্পূর্ণ কাল্পনিক ঘটনাবলি, রাহুলের সঙ্গে মাত্র কয়েকদিনের কাছে আসা পরমাকে সেই স্বাধীনতা, সেই সুখানুভূতি দেয়– যা তিনি বিবাহিত জীবনের এতগুলো বছর পাননি!
অপরাধবোধ কি তাঁর হয় না? হয় তো। না-হলে তাঁর ছোটবেলার যে-সুধাপিসি (ছন্দা চট্টোপাধ্যায়) এক স্ক্যান্ডালে পাগল হয়ে ঘরবন্দি থাকতেন, যাঁকে বাড়ির কেউ দেখত না, সেই সুধাপিসির স্বপ্ন তিনি বারবার দেখবেন কেন? কেনই-বা স্বপ্নে সুধাপিসি তাঁকে বলবেন, ‘শেকলটা একটু খুলে দিবি?’
সিনেমা হিসেবে ‘পরমা’ এক গভীর নারীবাদী পাঠ কেবল নয়, নারী জীবনের অনেক সূক্ষ্ম বিস্তারের কথা এ-সিনেমায় মজুত। এ-ছবি শুধু পরমার কথা বলে না, সামগ্রিকভাবে পরমার চারপাশে থাকা সমস্ত মেয়ের কথা বলে। তখনকার কলকাতায় ডিভোর্সি হিসেবে শীলার যাপন, পরমার মা (ভারতী দেবী) মানুষটির ছোটখাটো বিষয়ে ছেলের বউয়ের কাছে হাত পাতার গ্লানি; পরমার শাশুড়ি (সন্ধ্যারানি) মায়ের ঘৃণা– যিনি বউমা যতদিন সেবা করত ততদিন ভালো, আর যখন বউমা কোনও সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে, তাকে উদ্দেশ্য করে বলা– ‘ওকে যেতে বলো’ অর্থাৎ সে যেন চোখের সামনে না-থাকে; কিংবা মিনুর সন্তানহীনতা; সুন্দরী মায়ের কারণে এষার কমপ্লেক্স; শীলার বাড়ির কাজের মেয়েটি, যে জানে– ফাঁকা ফ্ল্যাটে পরপুরুষের সঙ্গে দিদির বন্ধুর প্রেমে কোনও বাধা নেই– তার স্মার্টনেস অথবা সেই তিনটি আত্মীয়া– যারা ম্যাগাজিনে পরমার স্বল্পবাস ছবি প্রকাশের কথা জেনেও কিছু না-জানার নাটক করে চলে আর মুখ টিপে হাসে– পরিচালক এমন এক বিরাট নারীবিশ্বের দর্শন আমাদের করান, যা থেকে স্পষ্ট হয় নারীত্ব একরৈখিক কোনও অস্তিত্ব নয়। নারীর ভুবন বহুধাবিস্তৃত।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জীবিত ও মৃত’ (১৯৮২) গল্পে কাদম্বিনী যেমন ‘মরিয়া প্রমাণ করিল, সে মরে নাই’, ঠিক তেমন ‘পরমা’ ছবির মূল চরিত্র পরমা আত্মহননের পথ বেছে নিতে, তাঁর প্রতি বাড়ির লোকের খানিক দরদের উৎপত্তি হয়েছিল। তাঁকে হাসপাতালে সকলে বোঝাতে এসেছিল যে, সাইকোথেরাপির কতটা প্রয়োজন তাঁর এখন। কিন্তু পরমা তাঁর সব ভেঙে-পড়া, সবরকম পরাধীনতা এবং সব পিছিয়ে থাকার এক অপরূপ সমাধান ততক্ষণে বের করে ফেলেছেন। তিনি বাড়ির সকলকে এবং ডা. দাশগুপ্তকে জানান, ‘আমি একটা চাকরি করব ঠিক করেছি। বিরাট একটা কিছু নয়। ওই খাদি গ্রামোদ্যোগ ভবনে শাড়ি-টাড়ি বিক্রি করার কাজ।’ এই দৃশ্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। আজ যে তিনি চাকরি করতে চাইছেন, তাতে স্বামীর ওপর নির্ভরশীলতা থেকে যেমন মুক্তি আশা করছেন, তেমন আগের দিন বিকেলবেলায়, আজানের সময় হাসপাতালের এই জানলা দিয়ে তিনি রাহুলের খবর-থাকা কাগজটিও উড়িয়ে দিয়েছেন। ভাস্কর কিংবা রাহুল– কাউকেই তাঁর আর প্রয়োজন নেই।
রাহুলের সঙ্গে পরমার সম্পর্ক জানাজানি হওয়াতে এবং ম্যাগাজিনে রাহুলের তোলা পরমার স্বল্পবাস ছবি প্রকাশ পাওয়াতে পরমার গোছানো সংসার কাচের দেওয়ালের মতো ভেঙে পড়েছিল। বাড়ির সমস্ত মানুষ তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু করল। বেশ কয়েকদিন পরমা নিজের বাড়িতেই ঘরবন্দি এবং অচ্ছুৎ হয়ে রইলেন। ছেলে, মেয়ে, স্বামী, শাশুড়ি, কাজের লোক– সকলে এমন ব্যবহার করতে শুরু করল, যেন পরমা ভীষণরকম অস্পৃশ্য কেউ। যেন সংক্রামিত শরীর একটি। তাঁদের ছেলে টুটুলকে পড়ানোর ব্যাপারে স্বামী জানালেন, ‘এখন থেকে টুটুলকে আমিই পড়াব। আই ডোন্ট ওয়ান্ট মাই চিলড্রেন টু বি ব্রট আপ বাই আ হোর!’ যে নারীর বি.এ ফাইনাল শেষ হওয়ার আগে বিয়ে হয়ে গেল, যে শ্বশুরবাড়ির জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ পর্যন্ত করতে বাধ্য হয় নিজের সমস্ত কিছু ভুলে, তাঁর তরফ থেকে একটা অন্যায় কিছু হয়ে যাওয়া মানে সে এখন থেকে একজন ‘হোর’ অর্থাৎ বেশ্যা? এবং সেটা কে বলছে? শিক্ষিত, উচ্চপদে চাকরি করা, বাঙালি বনেদি বাড়ির ছেলে, পরমার স্বামী ভাস্কর চৌধুরী! এরপর আত্মহনন ছাড়া পরমার উপায় থাকে কি?
একটা প্রশ্ন উঠতে পারে যে, পরমা তো স্বামী এবং সংসারের অন্যান্য সদস্যদের ঠকিয়েছেন রাহুলের সঙ্গে প্রেমে জড়িয়ে, তাহলে তাঁকে আমরা ক্ষমার্হ ভাবব কেন? ভাস্করও তো লোলুপ দৃষ্টিতে অ্যাসিস্ট্যান্ট মেয়েটির সমস্ত শরীর নিরীক্ষণ করে, তবে কি সে খুব একগামী সৎ মানুষ?

৪০ বছর আগে ১৯৮৫ সালের ৯ জুন ‘পরমা’ ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল কলকাতায়। একটি আদ্যন্ত বাঙালি উচ্চবর্ণ, উচ্চবিত্ত পরিবারের বিবাহিত নারীর কাহিনি এই ছবি। কিন্তু নারীর অস্তিত্ব, নারী-জীবনের বাস্তবতা ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রে বাস করা নারীকে যে হেনস্থা-হিংসার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, কেবলমাত্র সিকিভাগ স্বাধীনতার জন্য, সেই ক্যানভাস আজকের ভারতে এতটুকু পুরনো হয়নি। ‘পরমা’ এক্কেবারে বাঙালি মেয়ের গল্প। দুর্গাপুজো, লালপাড়ের সাদা গরদের শাড়ি, আলতা, ধোপা, কাজের মেয়ে, শাখা-সিঁদুর, খোলাচুল, কালীঘাটের পুজো, গড়িয়াহাট-বালিগঞ্জ– সব কিছু নিয়ে এ-সিনেমা বাঙালি জীবনের কথাই বলে। কিন্তু পরমার চাকরি করতে চাওয়া, নারী স্বাধীনতার মূল কথা যে আর্থিক স্বাধীনতা, সে-বিষয়টি প্রত্যেক ভারতীয় মেয়ের জন্য সত্য। সেদিন এবং আজও।
……………………..
রোববার.ইন-এ পড়ুন ভাস্কর মজুমদার-এর অন্যান্য লেখা
……………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved