Robbar

দ্বিতীয়, অদ্বিতীয়

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 1, 2026 4:07 pm
  • Updated:June 1, 2026 4:07 pm  

এখনও কিছু শট বিস্ময় জাগায়। অব্যর্থ সবুজ গালিচা চিরে যাওয়া শট। কিংবা কিছুদিন আগে পাঞ্জাব ম্যাচে আফগান বোলার আজমাতুল্লাহ্কে ডিপ পয়েন্টের ওপর দিয়ে মারা ছয়টা। বা পরপর দুটো ম্যাচে ডাকের পর যখন নাইটদের বিরুদ্ধে প্রথম রানটি সম্পূর্ণ করলেন। ছুড়ে ফেলে দিলেন রাজমুকুটের ঔদ্ধত্য, আড়ম্বর। যেন এক সদ্য অভিষেক ঘটানো বছর ষোলোর কিশোর, যে প্রথমবার স্কোরবোর্ডে নিজের নামের পাশে রানসংখ্যাকে প্রত্যক্ষ করছে।

স্বস্তিক চৌধুরি

আমোর। হাব। ভালোবাসা। ভিন্ন ভাষার অভিন্ন শব্দছক। আভিধানিক অর্থ– মূলটুকু জাপটে ধরি। রঙিন মানচিত্র জোড়ে না। কাঁটাতার পেরিয়ে ভালোবাসা জুড়ে যায়। কখনও ছুঁয়ে যায় সুদূর প্যালেস্টাইনের ভাঙা পাঁচিলের পাশে বড় হওয়া গোলাপ চারা। কখনও স্পর্শ করে ফ্রান্সের শান্ত রাজপথে হঠাৎই ফুটবলের আগুনে হাত সেঁকে নেওয়া একদল বিক্ষুব্ধ পথিককে। ওরা প্রত্যেকে খারাপ সময়গুলোতে জোট বেঁধেছে।

ভালোবাসা মানে গোপন গোপন খেলা, ভালোবাসা মানে কান্নাভেজা চোখ। ১৯ বছর একই জার্সিতে। তাঁকে দেখে সমাহিত হতে হয়। প্রতিনিয়ত দলবদলের যুগে ১৮ নম্বর জার্সি পরে যখন নামেন, এক অদ্ভুত বলয় তাঁকে ঘিরে। গত বছর ছিঁড়েছিল যাবতীয় বাঁধন, এ বছর যা শুধু অভ্যাস মাত্র। কত ক্লান্তি, অবসাদ ও নিয়তির দেওয়াল লিখন ঘিরে ধরেছে বিগত কয়েক বছরে। অফস্ট্যাম্পের বাইরের বলগুলো আগের মতো আর ব্যাটে-বলে হয় না। ক্যাপ্টেন্সি ছেড়ে দাও ক্যাপ্টেন, টেস্ট থেকে অবসর নাও। তবু ভিতর থেকে আওয়াজ আসে মতি নন্দীর স্ট্রাইকারের। এবার সর্বশক্তি দিয়ে ঘা মারতে হবে।

আইপিএল ফাইনালে বিরাট-বিক্রম

এখনও কিছু শট বিস্ময় জাগায়। অব্যর্থ সবুজ গালিচা চিরে যাওয়া শট। কিংবা কিছুদিন আগে পাঞ্জাব ম্যাচে আফগান বোলার আজমাতুল্লাহ্কে ডিপ পয়েন্টের ওপর দিয়ে মারা ছয়টা। বা পরপর দুটো ম্যাচে ডাকের পর যখন নাইটদের বিরুদ্ধে প্রথম রানটি সম্পূর্ণ করলেন। ছুড়ে ফেলে দিলেন রাজমুকুটের ঔদ্ধত্য, আড়ম্বর। যেন এক সদ্য অভিষেক ঘটানো বছর ষোলোর কিশোর, যে প্রথমবার স্কোরবোর্ডে নিজের নামের পাশে রানসংখ্যাকে প্রত্যক্ষ করছে। চলে গিয়েছে বিভিন্ন ফরম্যাটে তেরঙা প্রতিনিধিত্বের বটবৃক্ষ। আপাতত ওয়ান ডে-তে স্থিতধী। তবু ধেয়ে আসা শক্ত ডিউজ এমআরএফ ছুঁয়ে চলে যায় অজুত-নিজুত সংখ্যাতত্ত্বের ভিড়ে। গিল-বৈভব-অভিষেক পরবর্তী যুগে যেখানে বদলে গিয়েছে টি-টোয়েন্টির সংজ্ঞা, সেখানেও অদম্য তাগিদে উইলোর উইলে কিছু প্রামাণ্য খোদাই। ছুটে চলছেন প্রতিনিয়ত, বদলে ফেলছেন নিজেকে, সিঙ্গেলকে ডাবল করছেন, ফ্লিক শটে কবজির মোচড়ে বল পৌঁছে দিচ্ছেন গ্যালারির ঠিকানায়।

এক অদ্ভুত অমোঘ মাদকতা। ভালোবাসা এক খ্যাপাটে জুয়ার নেশা, ভালোবাসা সব বাজি ধরা নির্বোধ। যেভাবে দু’রাত আগে কলকাতা বাজি ধরেছিল নিজের জীবিকাকে। মধ্যবিত্ত নয়, নিতান্তই নিম্নবিত্ত দিনমজুরির কলকাতা। ওরা আমাদের পাশেই থাকে। খবর নিই না বিশেষ। ট্রেন থেকে নেমে কথা হয় মাঝেসাঝে। খুচরো নাহলে লিখে রাখতে বলি। এক রাতে সবটুকু ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে দিব্যি। হেলদোল নেই আমাদের। কারও কারও পৈশাচিক উল্লাস। অবৈধভাবে বসবে কেন? ‘কেন’র উত্তর সন্ধানে আগ্রহ হারানো আমরা উইকেন্ডে স্কচবিলাসী আর ক্রিকেটপ্রেমী। আমরা বুঝি আইপিএল জুয়া, তবু হটস্টারে ভিউয়ার্স রেকর্ড নতুন কীর্তি স্থাপন করে। তেমনই এক ভাঙা রোল সেন্টারের যুবক ভোলা। যদিও মলিন হয়ে আসা লালচে বাদামি জার্সিতে নাম কোহলি, সংখ্যা ১৮। ভাঙা দোকান। গড়াগড়ি খাচ্ছে বেঁকে যাওয়া খুনতি। আর ছিঁড়ে যাওয়া হিসাবের খাতা। সকাল থেকে উদ্ধার করেছে কিছু। কিন্তু অধিকাংশটাই নষ্ট। ডিমের ট্রে-র ফাটা উচ্ছিষ্টে ভনভন করছে মাছি। তারই পাশে ইটের ভাঙা পাটাতনে হেলান দিয়ে বসে ক্লান্ত ভোলা। গায়ে তেলচিটে জার্সিটা। ম্যাচ দেখছে সঙ্গীর ফোনে। দিনশেষে ওটুকুই অবকাশ। খোলা হাওয়ার পরশ। আহমেদাবাদে কোহলির ব্যাট যখন প্রথমবার দক্ষিণ আফ্রিকান পেসারের বলটা আছড়ে ফেলছে বাউন্ডারি লাইনের ওপারে, খানিক কাঁধ ঝাঁকিয়ে নিল ভোলা। রাত-পাহারা দেওয়া রাষ্ট্রীয় লেঠেলের যাবতীয় অবজ্ঞাকেও বোধহয় ছুড়ে ফেলে দিল ওই আঁস্তাকুড়ে।

মাধ্যমিক দিয়ে সদ্য গোঁফের রেখা উঠেছে। আশপাশটা বদলে যাচ্ছে দ্রুত। ফোনে ফ্রি নেট আর সোশ্যাল মিডিয়ায় হেট স্পিচ পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। অন্যদিকে অ্যাডিলেড, সেঞ্চুরিয়ান, এজবাস্টন দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন এক ৫ ফুট ৯ ইঞ্চির যুবক। সঙ্গী বলিউড তারকা। ইতিউতি প্রায়শই দৃশ্যমান গ্যালারির হটসিটে। ক্যামেরাও খুঁজে নেয় তাঁকে দিব্যি। যখনই ছেলেটা ব্যর্থ হত, ম্যাচ কা মুজরিম হতেন ওই মহিলা। গ্যালারিতে একসময় পোস্টারেও দেখা গিয়েছে, তাঁর না-আসার আকুতি। জবাব এসেছে মাঠ থেকে। বারবার সেঞ্চুরি করে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। লড়েছেন দর্শক কিংবা সাংবাদিকদের সঙ্গেও। কিন্তু বদলাননি ভারতীয় ক্রিকেটের ব্যাড বয়। রোয়াবে কলার তুলে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ। তখনও ‘পেট্রিয়ার্কি’ শব্দবন্ধ সম্পর্কে অবগত না হওয়া কৈশোর, সাহস পেয়েছে ১৮ নম্বর জার্সির থেকে। আর সাহস দিয়েছে বুড়ো পুরনো গিটার। ফেলে আসা সাহস, ফেলে আসা ভয়, ফেলে আসা জুতো জামা ফেলে দিতে হয়, ফেলতে ফেলতে কিছু কথা থেকে গিয়েছে, যেমন ভালোবাসি তোমায়!

ফাইনালে জয়ের পর বিরুষ্কা

আরেকজনের কথাই বা ভুলি কী করে। যিনি অবলীলায় রোহিত কিংবা ধোনির জুতোয় পা গলালেন। ক্রিকেটটাই তো খেলার কথা ছিল না। ডান পায়ের এসিএল ইনজুরি প্রায় শেষই করে দিয়েছিল কেরিয়ার। আট মাসের জন্য ক্রিকেটের বাইরে। পরিবার থেকে পাহাড়প্রমাণ চাপ। এবার এসব বন্ধ করে পড়াশোনাটা সম্পূর্ণ করুক। সময় থাকতে পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরতে হবে। তবু হাল ছাড়েননি রজত পাতিদার। খাদের কিনারা থেকে উঠে আসা। কান্না ভুলে স্বপ্নে মাতাল এক যুবক। রঞ্জিতে প্রথমবারের জন্য মধ্যপ্রদেশকে জেতালেন। সেঞ্চুরি ছাড়াও মুম্বইয়ের মতো শক্তিশালী টিমকে দুরমুশ করেছিলেন দু’ইনিংসে। এহেন উত্থান নজর কেড়েছিল সিলেক্টরদের, কিন্তু দাগ কাটেনি হৃদয়ে।

ট্রফি হাতে আরসিবি অধিনায়ক রজত পতিদার

আইপিএলেও কোয়ালিফায়ারে সেঞ্চুরি ২০২২ মরশুমে। কিন্তু তখনও ট্রফি জেতাতে পারেননি দলকে। তবে পাকাপাকিভাবে দলে জায়গা করে নেন পাতিদার। তারপর আসে ২০২৫ মরশুম। ১৮ বছরের খরা কাটলেও তাঁকে নিয়ে আলোচনা কমই হয়। জনপ্রিয় দৈনিকগুলির পিছন পাতায় অতিকায় দানবসম কোহলির ছায়ায় নিতান্তই ম্রিয়মাণ ইন্দোরের যুবক। জাতীয় দলের দরজা খুললেও ভাগ্য সহায় হয়নি বিশেষ। আদতে তিনিও কি খানিক আমাদের মতোই মধ্যবিত্ত? শত-সহস্র ক্যামেরার ভিড় যখন শ্যামাপোকার মতো রচনা করেছে এক অদৃশ্য আলোকবৃত্ত, তিনি সেখান থেকে বহু দূরে স্মিত হাসিতে বাউন্ডারি লাইনে দাঁড়িয়ে। হাসছেন বা স্মরণ করছেন হাঁটু মুড়ে কান্নার দিনগুলো। বুকে অদৃশ্য কিছুর খোঁচা। কত কাঁচ রক্তাক্ত করে ফেলে আসা দিনগুলো। কত কাছে এসেও বেড়ে চলে অপেক্ষার প্রহর। তারপর একদিন সব বাধা টুটে যায়। যেভাবে হারতে হারতে একদিন জেতে মানুষ। প্রবল অসন্তোষ ঠিকড়ে বেরয় পিএসজির জয় পেরিয়ে। টায়ারে আগুন দিয়ে হাত সেঁকে জনতা। রিফিউজি রশিদ আগলে রাখে ছিন্নমূলের স্বপ্ন। তারপর বেদম মার খেতে খেতে একদিন ভোলার মতো হেরোরা ঠিক জিততে শিখে যায়…।

একবার, দু’বার, বারবার!

………………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন স্বস্তিক চৌধুরি-র অন্যান্য লেখা

………………………