Robbar

ভ্রমণের অন্দরে ভ্রমণ

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 4, 2026 2:22 pm
  • Updated:June 4, 2026 2:22 pm  

এই বইটির একটি মূল আকর্ষণ হল খাবার। খাবার এই গল্পের এক মুখ্য চরিত্র। বইটির ১২টি অধ্যায়ের নামকরণ করা হয়েছে তাইওয়ানের ১২টি খাবারের নামে। যেমন বইটির প্রথম অধ্যায়ের নাম ‘রোস্টেড সিডস’। সেরকমই কোনও অধ্যায়ের নাম ‘জুট স্যুপ’, কোনওটার নাম ‘উইন্টার মেলন টি’ বা ‘ফ্রুট অ্যান্ড জেলি আইস’। চিজুকো যেসব খাবার খান, সেগুলো সবসময় যে তার সুস্বাদু মনে হয়, তা একেবারেই নয়। কিন্তু চিজুকো তাইওয়ানকে চেনেন মূলত বিভিন্ন ধরনের খাবার চাখতে চাখতে। সুতরাং, খাবার এই গল্পে পাঠকদের সামনে একটি সাংস্কৃতিক মানচিত্র তুলে ধরে।

রবীনা মিত্র

‘Every journey conceals another journey within its lines.’

–Martin Buber

একটা ঝরাপাতা হাওয়ায় ঘুরতে ঘুরতে নেমে আসছে মাটির দিকে। মাটি স্পর্শ করতে না করতেই তাকে আবার নতুন পথ দিচ্ছে ধুলো-হাওয়ার মৃদু ঘূর্ণি। ধুলোর ভিতর পাক খেতে খেতে সেই শুকনো পাতা এগিয়ে যাচ্ছে গল্পদের পায়ে পায়ে, মরচে-হলুদ শরীর সেঁকতে সেঁকতে সেই পাতা লাফাতে লাফাতে চলেছে, যেন কোথাও পৌঁছতে চায়, যেন খুঁজে চলে তার পাতা হয়ে জন্মানো, আর ঝরে পড়ার পর এই অনিবার্য যাত্রার অন্তর্নিহিত অর্থ! যেন এই ভ্রমণ তার পুনর্জন্ম এক! নতুন রং-রূপ-রস আস্বাদনের স্বাধীন সুযোগ। এই পাতাও কি নয় এক ভ্রামণিক? তার চলার সুরে সুরে, ছন্দে ছন্দে কি রাখা নেই এক আশ্চর্য ভ্রমণ? যে পৃথিবী নিজেই সর্বক্ষণ ভ্রমণরত, সেই গ্রহের বুকে মানুষ, প্রাণী, কীট-পতঙ্গ, উদ্ভিদ, জল, বাতাস, মেঘ, এমনকী পাহাড়, পাথর, মাটিরও যে একরকম ভ্রমণ আছে, তা আমরা কি অস্বীকার করতে পারি?

অনেক চলা আমরা দেখতে পাই, অনেক চলা পাই না। যেমন কোনও আপাত-স্থির বস্তুর সময়ের পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা। একটি শহর বা জনপদ কীভাবে ইতিহাসের স্তরগুলির মধ্যে দিয়ে ভ্রমণ করতে করতে এসেছে, তা আমরা কি ভাবব না একবারও? অথবা কোনও একটি জায়গার মানুষের জীবনযাত্রার ধরন, ভাষার ব্যবহার, খাদ্যাভ্যাস (যেমন কোনও খাবারে ব্যবহৃত উপকরণ বা মশলার বিবর্তন), পোশাকে আধুনিকতার প্রয়োগ বা কেতাদুরস্ত পোশাকের চাহিদার মধ্যেও ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধরে রাখার প্রচেষ্টা– এও কি সময়ের মধ্যে দিয়ে একরকম ভ্রমণ নয়?

ইয়াং শুয়াং-জি-র ‘Taiwan Travelogue’ শুধুমাত্র একটি ভ্রমণকাহিনি নয়। এই বইয়ে, ইয়াংয়ের প্রাঞ্জল গল্প বলার ধরনে বর্ণিত ঘটনাগুলো আসলে পাঠকের মনে একসঙ্গে অনেকরকম ভাবনার দরজা খুলে দেয়। এই বইটির কেন্দ্রে রয়েছেন জাপানি লেখিকা আওয়ামা চিজুকোর তাইওয়ান ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। বইটি পড়তে পড়তে বোঝা যায় যে, এই গল্প শুধুমাত্র এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাত্রার সুখপাঠ্য বর্ণনা নয়, কোনও নির্দিষ্ট দ্রষ্টব্য স্থান ঘুরে দেখার বিবরণ নয়– আসলে এই কাহিনি আমাদের সামনে তুলে ধরে তাইওয়ানের মানুষজন, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভাষা, ঔপনিবেশিক শাসনের ভারে সংকটে পড়া দেশবাসীর রাজনৈতিক ও মানসিক অবস্থান; এবং সাধারণ মানুষের ইচ্ছে ও আকাঙ্ক্ষার নানা স্তরভিত্তিক প্রকাশ।

এই বইটির একটি মূল আকর্ষণ হল খাবার। খাবার এই গল্পের এক মুখ্য চরিত্র। বইটির ১২টি অধ্যায়ের নামকরণ করা হয়েছে তাইওয়ানের ১২টি খাবারের নামে। যেমন বইটির প্রথম অধ্যায়ের নাম ‘রোস্টেড সিডস’। সেরকমই কোনও অধ্যায়ের নাম ‘জুট স্যুপ’, কোনওটার নাম ‘উইন্টার মেলন টি’ বা ‘ফ্রুট অ্যান্ড জেলি আইস’। চিজুকো যেসব খাবার খান, সেগুলো সবসময় যে তার সুস্বাদু মনে হয়, তা একেবারেই নয়। কিন্তু চিজুকো তাইওয়ানকে চেনেন মূলত বিভিন্ন ধরনের খাবার চাখতে চাখতে। সুতরাং, খাবার এই গল্পে পাঠকদের সামনে একটি সাংস্কৃতিক মানচিত্র তুলে ধরে। এই ট্র‍্যাভেলগে তাইওয়ানের চি-চান, চিজুকোর দোভাষী। কিন্তু তার দায়িত্ব শুধু ভাষার অনুবাদের মধ্যেই সীমিত নয়। তিনি চিজুকোকে তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ইতিহাস, তাইওয়ানের মানুষের সাধারণ জীবনধারা এবং তা কীভাবে অভিবাসন, ঔপনিবেশিক শাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, তা উপলব্ধি করতে সাহায্য করেন।

ইয়াং শুয়াং-জি

এই সূত্রে মনে পড়ে যাচ্ছে, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে লিখিত ‘A Moveable Feast’-এর কথা। যেখানে বিভিন্ন সস্তা রেস্তোরাঁ, ক্যাফে-কালচার, কফি, চিজ, কমদামি ওয়াইন অর্থাৎ খাবার হয়ে উঠেছে প্যারিসকে একটি ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার বিচিত্র পথ। এই বইয়েরও প্রতিটি অধ্যায়ে আমরা পরিচিত হই বিভিন্ন রকমের খাবারের সঙ্গে। কিন্তু তার পাশাপাশি আমরা দেখি, হেমিংওয়ের খিদের তাড়না এবং অর্থাভাবও। সেই খিদেকে মেনে নিয়ে তিনি যখন যা খেতে পেরেছেন, সেই খাবারকে সমস্তরকম ইতিবাচক অনুভূতির সঙ্গে মিলিয়ে, তা উপভোগ করেছেন। জীবনে চলার পথে সেইসব খাবার যেন লেখকের কাছে ছোট ছোট ট্রিট, যা তাঁর প্যারিস ভ্রমণকে পরিণত করেছে এক অনন্যসাধারণ অভিজ্ঞতায়।

‘Taiwan Travelogue’ পড়তে গিয়ে এই সূত্রে মনে পড়তে পারে ফ্রান্সেস মায়েসের বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনি ‘Under the Tuscan Sun’-এর কথা। এই বইতেও আমরা দেখি টাস্কানির বাজারে বিক্রি হওয়া শাকসবজি, ফল, রকমারি খাবার, রান্নাঘরের গল্প, আঙুরক্ষেতে তৈরি হওয়া ওয়াইন ইত্যাদি হয়ে ওঠে মায়েসের জায়গাটিকে গভীরভাবে চেনার সব থেকে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।

চিজুকো এবং চি-চানের মধ্যে যে শান্ত, গভীর বন্ধুত্বের এবং বন্ধুত্বের অধিক এক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তারও সূত্রপাত হয় একসঙ্গে ভিন্ন স্বাদের নানা খাবার চেখে দেখা এবং ভাগ করে খাওয়ার আনন্দ থেকে! দু’জনের সম্পর্ক এই গল্পে আবেগের একটি কেন্দ্রবিন্দু। চি-চান ও চিজুকোর মধ্যে যদিও সর্বক্ষণ অদৃশ্য এক স্রোতের মতো সক্রিয় থাকে শাসক-শাসিতের মধ্যেকার ঔপনিবেশিক দূরত্বের এক জাগ্রত চেতনা। এই গল্পের প্রেক্ষাপট ১৯৩৮ সাল, যখন তাইওয়ান জাপানের শাসনাধীন। চিজুকো শাসক-দেশের প্রতিনিধিত্ব করলেও, আসলে তিনি তাইওয়ানকে অন্তর থেকে চিনতে ও বুঝতে চান। সেখানকার মানুষের মধ্যে মিশে যেতে চান, কিন্তু গল্প যত এগতে থাকে, ততই বোঝা যায়– তাঁর প্রচেষ্টা যতই আন্তরিক হোক না কেন, তা সম্পূর্ণ সফল হওয়া সম্ভব নয়।

চিজুকো বুঝতে পারেন, চি-চান কখনওই নিজের অনুভূতিকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করেন না। চিজুকো ধীরে ধীরে চি-চানের প্রতি এক গভীর আকর্ষণ অনুভব করলেও, তাদের মধ্যে কাজ করে ঔপনিবেশিক শক্তির এক অসম সমীকরণ। সেক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে তাঁরা নিজেদের অনুভূতি বা আকর্ষণের কথা প্রকাশ করতে না-পারায়, দুই নারীর মধ্যেকার দীর্ঘ কথোপকথন, খাবারের বর্ণনা– এইসবই হয়ে ওঠে এক নিবিড়, অন্তরালবর্তী সংযোগের গোপনতম ভাষা। কিন্তু তাদের সম্পর্ক থাকে প্রচ্ছন্ন, কিছুটা একতরফাও। এখানেই প্রশ্ন জাগে পাঠকের মনে যে, ঔপনিবেশিক দূরত্ব না-থাকলে এই দু’জনের মধ্যে কি কোনও স্বাভাবিক গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারত?

চি-চানের অভিব্যক্তিহীনতা ও নীরবতা যেন একরকম আত্মরক্ষার উপায়। পাঠক বুঝতে পারেন, চি-চান তার তাইওয়ানীয় পরিচয় নিয়ে অত্যন্ত সচেতন এবং তাঁর মধ্যে জাপানি সংস্কৃতিকে সহজাতভাবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে একরকম মানসিক বাধা দেখা যায়। চিজুকো তাঁকে একটি কিমোনো উপহার দেওয়ায় চি-চান সেই উপহার নিতে অসম্মত হন এবং বলেন– “I’ve accepted my status as wild ginseng.”

যার অর্থ দাঁড়ায় যে, বুনো জিনসেং-এর ঝোপ অনিয়ন্ত্রিতভাবে জন্মায়, যেখানে সেখানে। তিনি নিজেকে সেই জিনসেং-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই কথার মাধ্যমে চি-চান আসলে জাপানি সংস্কৃতি থেকে নিজের তাইওয়ানীয় সংস্কৃতিকে পৃথক রাখতে চেয়েছেন। তিনি জাপানি শাসনকে অগ্রাহ্য করে তার তাইওয়ানীয় পরিচয়, তা হোক বুনো এবং অপ্রকৃষ্ট– সেই পরিচয়কেই সর্বান্তকরণে লালন করতে চান। বোঝা যাচ্ছে জাপানকে এখানে মহীরুহ বলতে চেয়েছেন চি-চান, কিন্তু সেই মহীরুহের ছায়ার তলায় বেড়ে উঠতে তিনি নারাজ।

প্রতি মুহূর্তে তিনি এই সত্য উপলব্ধি করেন যে, চিজুকোর ব্যবহার যতই আন্তরিক হোক, তারা দু’জন রাজনৈতিক ক্ষমতার দিক থেকে সমান অবস্থানে দাঁড়িয়ে নেই। এই প্রসঙ্গে বারবার মনে পড়ে যায়, E M Foster-এর ‘A Passage to India’ এবং Marguerite Duras-এর ‘The Lover’ উপন্যাসের কথা। এই দু’টি উপন্যাসই দেখিয়েছে সাংস্কৃতিক পূর্বধারণা এবং ঔপনিবেশিক ইতিহাস কীভাবে গভীর বন্ধুত্বের এবং নিবিড় প্রেমের সম্পর্কের মধ্যে ঢুকে পড়ে সেগুলির পূর্ণতা পাওয়ার রাস্তায় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

‘Taiwan Travelogue’ আরও একবার তুলে আনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একটি ঔপনিবেশিক শাসনাধীন দেশকে মানুষ কার চোখ দিয়ে দেখবেন? শাসকগোষ্ঠীর একজন সদস্যের চোখ দিয়ে, না কি শাসিতদের চোখ দিয়ে? এই দু’ ধরনের দেখা কি কোনও বিন্দুতে এসে মিলবে? তা না-হওয়াটাই খুব স্বাভাবিক। কিন্তু ক্ষমতার অসমতা সত্ত্বেও যখন শাসক-শাসিতের মধ্যে তৈরি হয় স্বাভাবিক আকর্ষণ, সেখানে গিয়ে ঔপনিবেশিক শক্তি মানবপ্রকৃতির কাছে হার স্বীকার করে। কিন্তু সেই শক্তিই আবার জয়ের শেষ হাসি হাসে, যখন দু’জন মানুষ একে অপরের প্রতি অন্তরের টান অনুভব করলেও, শেষপর্যন্ত রাজনৈতিক অবস্থানের নিরিখে সেই সম্পর্ক পূর্ণতা পায় না। এখানে মনে পড়ে যায় Sofia Coppola পরিচালিত ‘Lost in Translation’ অথবা Wong Kar Wai পরিচালিত ‘In the Mood for Love’ চলচ্চিত্রের কথা– যেখানে সম্পর্কের নীরব ঘনিষ্ঠতা এবং চরিত্রদের ইচ্ছে প্রকাশের ক্ষেত্রে সংযম এক শৈল্পিক স্তর স্পর্শ করে।

ভ্রমণ আসলে কী? এক যাত্রা, যার অন্তিমে থাকে বা থাকে না কোনও গন্তব্য। অনেক সময় গন্তব্য পূর্ব-নির্ধারিত হলেও ভ্রামণিক সেই উদ্দেশে যাত্রা করার পর উপলব্ধি করেন, আসলে তিনি একইসঙ্গে যাত্রা করছেন নিজের অন্দরেও। এই কাহিনি আত্মোপলব্ধি এবং একটি দেশকে এক স্বতন্ত্র দৃষ্টি দিয়ে দেখতে দেখতে নিজেকে আবিষ্কার করার, নিজের সীমাবদ্ধতাগুলিকে বোঝার একটি অনবদ্য প্রচেষ্টা, যা বারবার মনে করিয়ে দেয় Henry Miller এর সেই বিখ্যাত উক্তি–

One’s destination is never a place, but a new way of seeing things.