


১৯৬০-এর দশকে গঠিত হল সল্টলেক সিটি, ইস্টার্ন মেট্রপলিটন বাইপাস, কসবা শিল্পাঞ্চল, মুকুন্দপুর, রাজারহাটের একটি অংশ। গঠিত হল নিউটাউন। পরিকল্পিত এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের বিষে রোগাক্রান্ত হতে শুরু করল এই জলাভূমি। জীববৈচিত্রের জল-সমাধিতে তৈরি হল কংক্রিটের সাম্রাজ্যবাদ। উড়ল নগরায়নের জয়ধ্বজা। যে কলকাতা শহরের বিকেন্দ্রীকরণের জন্য এই নির্মাণ হয়েছিল, তার বাস্তব ছবি আলাদা। জলাভূমি ভরাটের সঙ্গে কোনও যথাযথ পুনর্বাসন এবং যথাযথ বিকল্প জীবিকা ছাড়াই বাস্তুচ্যুত হন স্থানীয় মানুষজন। এই উচ্চমধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের উপনিবেশে তাঁরাই আজ দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক।
ভূত মানে অতীত, আবার ভূত মানে অশরীরী। দেখা যায় না, শোনা যায়। একই অবস্থা পূর্ব কলকাতার জলাভূমির। ‘ছিল, নেই– মাত্র এই’। গণতন্ত্রের ধর্ম, রাজনীতি, ‘উন্নয়ন’, ‘আচ্ছে দিন’, গরু-শূকর, ‘মিম’, ‘রিলস’-এর ভিড়ে, পরিবেশ এমনিতেই সংখ্যালঘু স্বর। তার উপর খেলা-মেলার চাপে এবং টিআরপি-রিচের প্রতিযোগিতায় জীবন্ত জীবাশ্ম। বইয়ের পাতা এবং ক্যালেন্ডারের বাইরে পরিবেশ আলোচনায় আসে কখনও কখনও, নাজিরাবাদ জতুগৃহ হয় তপন দত্তরা স্বর্গীয় হলে, কিংবা এক শ্রেণির জনগণের প্রবল প্রতিরোধে। সঙ্গে সেই অস্বস্তিকর প্রশ্ন– ‘ভূতকালের এই জলাভূমির ভবিষ্যত কী?’
সেই কবে থেকে এই জলাভূমি– মানুষ, ‘না-মানুষ’ থেকে ‘অ-মানুষ’ সবার বিষ গ্রহণ করে নীলকন্ঠ হয়ে, পরিবেশে অমৃত বিলিয়ে চলেছে অকাতরে। পূর্ণেন্দু পত্রীর ভাষায়, ‘মারী মড়ক আছে, বন জঙ্গল আছে। জঙ্গলে বাঘ ভালুক আছে। জলে বিষ আছে, ডাঙায় লোভ লালসার ছোবল। তবু কলকাতা থেমে নেই। বেড়ে চলেছে তরতরিয়ে।’ কলকাতার আগের ‘কলিকাতা’, এমনকী ব্রিটিশ ক্যালকাটা থেকে আজকের কংক্রিট কলকাতার কিডনি এবং ফুসফুস এর ভূমিকায়– ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ড বা পূর্ব কলকাতা জলাভূমি। কিন্তু ‘দশচক্র-এ ভগবান ভূত’-এর মতোই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এই জলাভূমির অবস্থা।

১৯৭১ সালে ইরানের রামসার শহরের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিবিধ দেশ তাদের গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিগুলির সংরক্ষণের ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে ‘রামসার কনভেনশন’ চুক্তি সম্পাদন করে। উল্লিখিত জলাভূমিগুলি ‘রামসার সাইট’। ১৯৮২ সালে ভারতবর্ষ এই রামসার চুক্তির সাথে যুক্ত হয়। এবং ২০০২ সালে পূর্ব কলকাতার জলাভূমি ‘রামসার’ স্বীকৃতি পায়।
‘রামসার কনভেনশন’ অনুযায়ী জলাভূমি হল– স্যাঁতসেঁতে, পিটভূমি অথবা প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম উপায়ে সৃষ্ট স্রোতস্বিনী অথবা স্রোতহীন, স্বাদু, লবণাক্ত বা মৃদু লবণাক্ত জলের দ্বারা পূর্ণ জলাশয় এলাকা, যেখানে মাটি জলে নিমজ্জিত থাকে, বা জলের তল মাটির তলের সঙ্গে সমান থাকে, কিংবা খুব কাছাকাছি থাকে।
ভারতে ৯৯টি রামসার সাইট আছে। পশ্চিমবঙ্গে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি এবং সুন্দরবন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কলকাতা পুরসভার কিছু অংশ, উত্তর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার ৩৭টি মৌজার মোট ১২৫০০ হেক্টর অঞ্চল নিয়ে গঠিত এই পূর্ব কলকাতা জলাভূমিতে জলার ব্যাপ্তি হল ৩৫০০ হেক্টর, আর বাকি এলাকা ডাঙা। হ্যাঁ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পূর্ব কলকাতা জলাভূমি এলাকায় রয়েছে জল এবং ভূমি অর্থাৎ জলা এবং ডাঙা নিয়েই। যে জমি, কৃষি বা বসবাসের জন্য ব্যবহৃত; এবং এই এলাকায় আইনত নির্মাণ নিষিদ্ধ।
এই প্রসঙ্গে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সুপ্রিমকোর্টের সাম্প্রতিককালের একটি জনস্বার্থ মামলা। বিষয়– ২০১৭ সালের জলাভূমি সংরক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ বিধিতে উল্লিখিত ‘জলাভূমি’-এর সংজ্ঞার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে।

আবেদনকারী পক্ষের যুক্তি, ২০১৭ সালের জলাভূমি সংরক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ বিধি অনুযায়ী, ‘জলাভূমি’-র সংজ্ঞা সংকুচিত হওয়ায় পরিবেশের অনেক প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ জলা-এলাকা ‘জলাভূমি’ শিরোপা হারাচ্ছে। যাতে রয়েছে প্রাকৃতিক এবং কৃত্রিম জলাধার ইত্যাদি। যার জন্য দেশ জুড়ে বিবিধ জায়গায় এর ক্ষতিকর প্রভাব দেখা যেতে পারে। ‘সংজ্ঞা’-র অস্পষ্টতা নিয়ে এই বিষয়টি সুপ্রিমকোর্টের বিবেচনাধীন।
দেশের বিবিধ জলাভূমির মতোই এই পূর্ব কলকাতা জলাভূমি প্রাকৃতিক, বাস্তুতান্ত্রিক থেকে অর্থনৈতিক– সবদিকেই ত্রাতা মধুসূদন। কিডনি হিসেবে দৈনিক কলকাতার বর্জ্যভারের পরিশোধন। পাশাপাশি বাতাসের এবং জলের কার্বন শোষণ করে ফুসফুসের কাজ। সঙ্গে বিবিধ জলজ প্রাণী, উভচর প্রাণী, উদ্ভিদের স্থায়ী নিরাপদ ঠিকানা। এবং ভূ-জৈব রাসায়নিক চক্র পরিচালন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, চাষ ইত্যাদিতে এর অবদান বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
পূর্ব কলকাতার এই জলাভূমি মূলত গঙ্গার বদ্বীপ অঞ্চলের অংশবিশেষ। যা গঠিত হয়েছে গঙ্গার বিভিন্ন উপনদী এবং শাখানদী, বিশেষত অবলুপ্ত বিদ্যাধরীর সৌজন্যে। সেইসময় এই অঞ্চল ‘হাজার বাণিজ্য নায়, সাগর বহিয়া যায়।’ বঙ্গোপসাগরের দিকে অবস্থিত বিবিধ জায়গার সঙ্গে কলকাতার বাণিজ্য চলত এই এলাকা দিয়েই। একসময় এর বিস্তার ছিল দমদম থেকে শুরু করে রাজারহাট, লবণ হ্রদ ছাড়িয়ে দক্ষিণের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে। যার সাক্ষী ব্রিটিশ ভারতের মানচিত্র। সেকালের জনশূন্য সেই জায়গারই একটি খণ্ডিত অংশ আজকের এই পূর্ব কলকাতার জলাভূমি।
সেইসময় বিস্তীর্ণ এলাকার বৃষ্টির জল ভূমির ঢাল অনুসারে বইত পূর্বের এই জলাভূমির দিকে। পাশাপাশি জানা যায়, সমুদ্রের নোনাজলের সঙ্গে বিদ্যাধরী, সুতির জল জমত সেই জলাভূমিতে। বিদ্যাধরীর যে অংশ কলকাতার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হত, তার কাজ ছিল কলকাতার জলনিকাশিকে সুষ্ঠু রাখা। পরবর্তীতে বিবিধ কারণে বিদ্যাধরীর খাত মজে যাওয়ায় ক্রমশ কলকাতার নিকাশি ব্যবস্থা সংকটগ্রস্ত হয়।

এরপর নদী-নালা, খাল-বিল, ইতিহাস-ভূগোল, জল-জঙ্গলের বিবিধ পরিবর্তনে গঠিত হয়েছে আজকের কলকাতা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৮৬৫-তে কলকাতার জমা আবর্জনা ব্যবস্থাপনায় ভরসা ছিল লবণহ্রদ সংলগ্ন ধাপার মাঠ-এর ‘স্কোয়ার মাইল’। যেই নির্ধারিত মাইলখানেক জায়গায় শহরের ময়লা যেত রেলগাড়িতে। পরবর্তীতে বিকল্প হিসেবে, ইঞ্জিনিয়ার উইলিয়াম ক্লার্কের বুদ্ধিতে ১৮৭৫-এ মাটির নিচে ইট-পাইপের নিকাশি জালে কলকাতা ছেয়ে যায়। বিদ্যাধরী, পিয়ালি ইত্যাদি নদীগুলি মজে যাওয়ার পর, শহরের দূষিত জলে, চরিত্র বদলেছে পূর্ব কলকাতার এই জলাভূমির। আজ সেই একই পদ্ধতিতে পাম্পিং স্টেশন দিয়ে শহরের বর্জ্য জল পূর্ব কলকাতা জলাভূমিতে সরবরাহ করা হয়।
মানুষের বুদ্ধি আর চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমেছে জল-জঙ্গল-শ্বাপদসঙ্কুল বনাঞ্চল। ইংরেজ সরকারের উদ্যোগে ১৮৭২ সালে এই জায়গার আশেপাশে তৈরি হয় মাছ চাষের ভেড়ি। সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে, বার্ষিক খাজনার বিনিময়ে জমি ইজারা দিত সরকার। ১৮৭৮ নাগাদ ধাপা অঞ্চল নন্দলাল দাস জলাভূমি অঞ্চলের কিছু অংশ লিজ নিয়ে শাকসবজি চাষ শুরু করেন। আর ‘ফিস ঘাট’ এবং মাছের ভেড়িগুলির লিজ নেন দুর্গাচরণ কুণ্ডু। এরপর বাবু ভবনাথ সেন এই অংশের ইজারা নেন ২০ বছরের জন্য। এভাবে ইংরেজ সরকার সমস্ত ধাপা অঞ্চলটিকে জরিপ করে ইজারা দিত। যেমন জানা যায় যে, ১৯১৮ সালে, এই অঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে বর্জ্য জলে মাছ চাষের উদ্যোগ নিয়েছিলেন বিধুভূষণ সরকার।
এরপর ১৯৬০-এর দশকে গঠিত হল সল্টলেক সিটি, ইস্টার্ন মেট্রপলিটন বাইপাস, কসবা শিল্পাঞ্চল, মুকুন্দপুর, রাজারহাটের একটি অংশ। গঠিত হল নিউটাউন। পরিকল্পিত এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের বিষে রোগাক্রান্ত হতে শুরু করল এই জলাভূমি। জীববৈচিত্রের জল-সমাধিতে তৈরি হল কংক্রিটের সাম্রাজ্যবাদ। উড়ল নগরায়নের জয়ধ্বজা। যে কলকাতা শহরের বিকেন্দ্রীকরণের জন্য এই নির্মাণ হয়েছিল, তার বাস্তব ছবি আলাদা। জলাভূমি ভরাটের সঙ্গে কোনও যথাযথ পুনর্বাসন এবং যথাযথ বিকল্প জীবিকা ছাড়াই বাস্তুচ্যুত হন স্থানীয় মানুষজন। এই উচ্চমধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের উপনিবেশে তাঁরাই আজ দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক।

এই জলা জায়গায় ১৯৯১ সালে একটি প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার’ নাম্নী অফিস অঞ্চল তৈরির পরিকল্পনা করলে, সেই নির্মাণের বিরুদ্ধে জনস্বার্থ মামলা করে ‘পাবলিক’ নামক একটি সংগঠন। কলকাতা হাইকোর্টের তদানীন্তন বিচারপতি উমেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রায়ে আইনি রক্ষাকবচের সঙ্গে এই অঞ্চলটি পায় পূর্ব কলকাতার আবর্জনা পুনশ্চক্রায়ন [ওয়েস্ট রিসাইক্লিং] অঞ্চল-এর শিলমোহর। নিষিদ্ধ হয় নতুন উন্নয়ন কার্যক্রম। এরপর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘ইনল্যান্ড ফিশারিজ’ আইনে যোগ হয় যে, পাঁচ কাঠার বেশি জলাশয়কে আর বোজানো যাবে না।
কিন্তু এই জলাশয়কে যিনি প্রাপ্য স্বীকৃতি এবং যথাযোগ্য মনোযোগ এনে দেন, তিনি শ্রদ্ধেয় স্বর্গীয় ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ। পরিবেশবিদ এবং ইঞ্জিনিয়ার ধ্রুবজ্যোতি ঘোষের নিরলস প্রচেষ্টায় ২০০২ সালের ১৯ আগস্ট এই বিরল বাস্তুতন্ত্র রামসার শিরোপা লাভ করে। কৃষি বাস্তুতন্ত্রের উপদেষ্টা, ধ্রুবজ্যোতিবাবু বিশ্ববাসীর কাছে এর গুরুত্ব পেশ করেন। আর এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পরেই নিয়ম মেনে রাজ্য সরকার ২০০৬ সালে ‘দ্য ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ডস [কনজারভেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট] অ্যাক্ট’-এ গঠন করে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ [ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি]।
ধ্রুবজ্যোতি ঘোষের পরিভাষায় শহরের এই জলাভূমি– ‘পরিবেশগত ভর্তুকি’। আর সেই ‘ওয়েলফেয়ার ইকোলজি’র দৌলতেই এই জলাভূমি, দৈনিক কলকাতার ১৪০ কোটি লিটার তরল বর্জ্যের ৯১ কোটি লিটার পরিশোধন করে চলেছে প্রাকৃতিকভাবে এবং নিখরচায়। যেখানে তরল বর্জ্য পরিশোধন প্লান্ট [সুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট]-এর তৈরি এবং রক্ষণাবেক্ষণে বছরে খরচ হয় কয়েকশো কোটি টাকা। সঙ্গে এই জলাভূমির বর্জ্য পরিশোধন ক্ষমতা যন্ত্রের থেকে কয়েকগুণ বেশি।

আগেই বলেছি, স্থানীয় অর্থনীতি এবং জীববৈচিত্র সংরক্ষণে বিশেষ ভূমিকা আছে এই জলার। পাশাপাশি প্রাকৃতিকভাবে শোধিত এই জলে কয়েক হাজার টন মাছ-সবজি এবং শষ্যের চাষ, বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং আনুষঙ্গিক কাজকে কেন্দ্র করেই ক্ষুণ্ণিবৃত্তি চলে বেশ কিছু মানুষের। কলকাতা জলাভূমিই দেশের প্রথম এলাকা, যেখানে শহরের তরল বর্জ্যকে প্রাকৃতিক উপায়ে সম্পদে রূপান্তর করা হয়েছে। আশ্চর্য এবং অতুলনীয় এই উপহার।
কিন্তু
‘…আমরা টের পাইনি
আমাদের ঝরণা কলম কবে ডট্ পেন হয়ে গেছে…
আমরা বুঝতে পারিনি
আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে।’
যাকে নিয়ে এত কথা, সেই পূর্ব কলকাতা জলাভূমি হারিয়ে যাচ্ছে। এই হারিয়ে যাওয়া বা অপমৃত্যু আশ্চর্যের নয়। নতুন তো নয়ই। ‘মব যার মুলুক তার’-এর যুগে উন্নয়ন জোয়ারে জলাভূমিতে ভাটা। প্রশাসন, প্রতিষ্ঠান থেকে আদালত, গবেষণা এই নির্লজ্জ বেআইনি আগ্রাসনের সাক্ষী। কিন্তু পরিবেশ রক্ষার এই ‘সহজ’পাঠ অবোধ্য নয়। ‘প্রশ্নগুলো সহজ, আর উত্তরও জানা।’
টাকা মাটি, মাটি-ই টাকা। তাই ক্ষমতাশালীদের ছত্রছায়ায় জলাভূমির সমাধিতে চলছে ‘অর্থম অনর্থম’। এই মুদ্রারাক্ষসদের দাপটে জলাভূমি আজ অতীত। এই ‘পুকুর চুরি’ নিয়ে সঙ্গত প্রশ্ন– যদি এই আন্তর্জাতিক শিরোপা না থাকত, তবে?

সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, ‘পূর্ব কলকাতা জলাভূমি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ’, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলা প্রশাসন থেকে ‘সিইএসসি’ এবং রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থা-র প্রশ্রয় এবং উদাসীনতায় কংক্রিটের জবরদখল, বিজ্ঞাপনের বহর এবং প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মৃত্যু-মিছিলে পরিবেশ বিপর্যস্ত। যে নন্দিত নরকে রুদালি করার মানুষ বিরল।
গত কয়েক বছর থেকে কলকাতা হাইকোর্টে বিচারপতি অমৃতা সিংহের এজলাসে বিচারাধীন এই জলাভূমি-সংক্রান্ত মামলা। আইনভঙ্গের অভিযোগ, দায়ের হওয়া মামলা, বিবিধ রিপোর্ট কিংবা নিছক চোখের দেখাতেই কঙ্কালটা স্পষ্ট। তথ্যানুযায়ী, ৫০৫টি অবৈধ নির্মাণ-রয়েছে এই জলাভূমি এলাকায়, তবে প্রকৃত সংখ্যাটা বেশি হওয়া আশ্চর্যের না। শিবঠাকুরের আপন দেশে ‘পুকুর চুরি’ সর্বনেশে।
আদালত এই বিষয়ে সাহায্য চেয়েছে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এবং পরিবেশ মন্ত্রকের, কীভাবে বেআইনি নির্মাণ ভেঙে, জলাভূমি পুনরুদ্ধার করা যায়।
তবু জলাভূমি নিয়ে আইন আদালতের বিবিধ নির্দেশ, পরিবেশবিদদের আন্দোলনের পরেও কলকাতা আছে কলকাতাতেই। এতদিন প্রশাসনের তরফে আদালতে জমা পড়েছে শুধু রিপোর্ট এবং নিয়ম রক্ষার্থে শুধু ভাঙা হয়েছে অস্থায়ী ছোট নির্মাণ। দফতরে ফাইল চালাচালির মতোই এই বিষয়ে প্রশাসনের বিবিধ দফতরে চলছে, দায় ঠেলাঠেলি, ‘আমরা-ওরা’ এবং অসহযোগিতার অভিযোগ। আইনকানুন নিয়ে রাখালছেলেরা চিরকালই বেপরোয়া। পরিকাঠামোগত খামতি, সদিচ্ছার অভাব, সঙ্গে রাষ্ট্রের উদাসীনতায় বিপর্যস্ত পরিবেশ।
জলাভূমি রক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলিই আজ জলাভূমি ধ্বংসের হাতিয়ার, আইনি রক্ষাকবচকেই সুবিধামতো ব্যবহার করে চলছে জলাভূমি খুন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার-এর ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিয়োর’ অনুযায়ী, জলাশয় বুজিয়ে তার পরিবর্তে একটি ক্ষতিপূরক জলাশয় তৈরি করা বাধ্যতামূলক। যদি গাফিলতি, দুর্নীতি, উদাসীনতা, রক্ষণাবেক্ষণ-এর অভাব এগুলিকে সরিয়ে রাখা যায়, তাহলেও প্রশ্ন থেকে যায় যে, জলাশয় শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট জলাধার না। সঙ্গে আছে সেই অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র। ধ্বংস হওয়া বাস্তুতন্ত্রের বিকল্প কী? তাই এই ক্ষতিপূরক জলাশয়টি খাতায়-কলমে পরিসংখ্যানেই থাকবে, কিন্তু কাজে লাগবে না। ঠিক যেমন কলকাতায় কিছু জলাশয় খাতায়-কলমে ‘বাস্তু’ হয়ে যায় আগেভাগেই, যাতে পরে ভরাট করা যায় আইন ফাঁকি দিয়ে।

আজ কয়েক ঘণ্টার অতিবৃষ্টিতে কলকাতার যে ‘জলছবি’ দেখা যায়, তা বোঝায়– জলের সহজলভ্যতাকে ‘টেকেন ফর গ্রান্টেড’ নিলে বিপর্যস্ত হতে হবে। আক্ষরিক অর্থেই এই জাতীয় ‘জ্বলন্ত’ উদাহরণ আজকের দিনে বিরল নয়। সমস্যা মেটানোর বদলে নেতা-মন্ত্রীদের থেকে শোনা যায় জলাভূমি নিয়ে অদূরদর্শিতা এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য– উদ্যান সাফ করে মরুদ্যান তৈরির হাস্যকর প্রচেষ্টা। রাষ্ট্রের খাণ্ডবদহন অব্যাহত।
আগেই উল্লেখ করেছি যে, জলাভূমির ডাঙা অঞ্চলে আইন অনুযায়ী কোনও নির্মাণ করা যাবে না। ফলে এই শ্রেণির ব্যক্তিগত জলাভূমির মালিকরা ‘পরিবেশ উদ্বাস্তু’ হল। এদের জন্য অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা বা পরিবেশ রক্ষার্থে উপযুক্ত মূল্যে প্রয়োজনীয় ডাঙা অঞ্চলটুকু অধিগ্রহণ করতে পারে সরকার। কিন্তু এতদিন থেকে বিবিধ ব্যাপারে গৌরীসেন প্রশাসন এই ব্যাপারে ছিল উদ্বাহু। তাই মানুষ বেআইনি লেনদেনে ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজছে। যেই উপায় সহজ করে দিচ্ছে সুবিধাবাদীরা। শহর এবং শহরতলিতে আবাসনের চাষ হচ্ছে জলাভূমি বুজিয়ে। নিয়মরক্ষায় আবাসনের ভেতরে চৌবাচ্চার মতো একটি জলাশয় রাখা হচ্ছে, মূল জলাশয়টির ক্ষতিপূরণ হিসেবে। এবং ফ্ল্যাট বিক্রির সময় যা ক্রেতাকে সুইমিং পুল বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মধ্যবিত্ত বাঙালির মেট্রোপলিটন মন-এর স্বপ্ন প্রাণকেন্দ্র কলকাতা এবং শহরতলি। জীবনযন্ত্রণা থেকে বাঁচতে, এই বিষ ধুলো কংক্রিটের জঙ্গলে একটু শান্তি স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজতে চায় মানুষ। আর এই চাহিদা এবং সরাবরাহের চক্রে হারিয়ে যাচ্ছে জলা। স্বীকৃতিটুকু ঢাল করে লড়াই চলছে।

তবু বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির প্রতিবাদীরা যুদ্ধ জারি রেখেছে। জলাভূমি রক্ষায় এই স্বৈরাচার এবং স্বেচ্ছাচার শেষ না হলে আইন, মন্ত্রক, বিবিধ সংস্থা, কর্মসূচি, কমিটি, রিপোর্ট ইত্যাদি শুধু ‘নাম কা ওয়াস্তে’ থেকে যাবে। আর জলে যাবে কোটি কোটি টাকা। সদিচ্ছা সচেতনতা না থাকলে, শুধু আইনি দাওয়াইতে এই রোগমুক্তি হবে না। এই জলছবি এভাবে চললে, এই জলাভূমি একদিন মানচিত্রে ‘নেই’ হয়ে যাবে। একইসঙ্গে প্রকৃতি সুন্দর এবং প্রকৃতি ভয়ংকর। অতএব এই ‘ভয়ংকর সুন্দর’ প্রকৃতিকে আমরা যতটা দেব, ঠিক ততটাই ফিরে পাব– ভালোবাসা বা অবহেলা। সভ্যতার অসভ্যতামিতে বা অসভ্যতার সভ্যতায় ‘the mills of god grind slowly, but they grind exceedingly fine’, আর প্রকৃতিই ইশ্বর। এই ব্যাপারে প্রকৃতি বরাবরই সাম্যবাদী। তাই সময় থাকতে মহাকালের খাতায় হিসেবনিকেশ শুধরে নেওয়াতেই দেশ এবং দশের মঙ্গল।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved