


‘হর-পার্বতী কথা’। রামকুমার অভিনব দৃষ্টিকোণ থেকে সেই চিরপুরাতন অথচ নবীন আলেখ্যে আলো ফেলেছেন। এই উপন্যাস হল পুরাণের নবনির্মাণ, চেনা গল্পের অচেনা বিন্যাস। এই ধারায় মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব বসু কাব্য ও নাটকে তাঁর পূর্বসূরি। পৌরাণিক, কালিদাসীয় এবং লোকায়ত সংস্কৃতির সঙ্গে মিশেছে লেখকের নিজস্ব দর্শন। এখানেও ভাষা ও শব্দ ব্যবহারে নিবিড় পরীক্ষা করেছেন লেখক। আছে বাঁকুড়া বিষ্ণুপুরের লৌকিক ঐতিহ্য ও মিথের ব্যবহার, শিবায়ন কাব্যের সঙ্গে সংযোগ, প্রাচীন বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের নানা দ্বান্দ্বিকতা। সব মিলিয়ে উপন্যাসটি যেন আমাদের নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতি উদ্যাপনের উৎসব।
প্রথম বাংলা সাহিত্যে প্রান্তিক মানুষের জীবনকাহিনি এনেছিলেন শরৎচন্দ্র। অবশ্যই আমরা রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের কথা ভুলে যাচ্ছি না। চন্দরা, ছিদাম ও দুখীরাম রুই, অছিমদ্দি, মৃণ্ময়ী, ফটিক, সুভা, তারাপদ, বোষ্টমী– তাঁরই অমর সৃষ্টি। পূর্ববঙ্গে জমিদারি দেখতে গিয়ে গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের দিনযাপনের ছবি, তাদের জীবনসমস্যা, আনন্দ-বিষাদ– রবীন্দ্রনাথের সৃজনের দুয়ারে ঘা দিয়েছিল। গল্পগুচ্ছে বয়েছিল সেই চলচ্ছবি। তবু আভিজাত্যের বলয়টুকু তাঁকে কিছুটা দূরবর্তী করে রেখেছিল। তিনি নিজেই ‘ঐকতান’ কবিতায় গভীর সৎ উচ্চারণে তা স্বীকার করেছেন–
‘পাই নে সর্বত্র তার প্রবেশের দ্বার;
বাধা হয়ে আছে মোর বেড়াগুলি জীবনযাত্রার।’
শরৎচন্দ্র তাঁর প্রথম দিকের ছন্নছাড়া ব্যক্তিগত জীবনে আমাদের দেশের মৃত্তিকালগ্ন মানুষকে সরাসরি স্পর্শ করলেন। ইন্দ্রনাথের মতো আপাতদৃষ্টিতে বয়ে যাওয়া ছেলে, পিয়ারী বাইজির মতো সংসার সীমান্তের রমণী, গৌরী তেওয়ারীর হতভাগিনী কন্যা, কপর্দকহীন অনাথ অরক্ষণীয়া জ্ঞানদা, কুলমর্যাদাচ্যুত প্রিয়নাথ, সন্ধ্যা, বিবাহ-সম্পর্কের বাইরে বর্মাতে ভালোবাসার নীড় বেঁধে সমাজের বাইরে নিক্ষিপ্ত অভয়া ও রোহিণী, মেসের পরিচারিকা সাবিত্রী, সাপুড়ে ঘরের মেয়ে বিলাসী, সতীর স্বর্গের স্বপ্ন দেখা দুলে ঘরের মেয়ে অভাগী, জমিদারের অত্যাচারে ভিটেমাটি ছেড়ে বৃত্তি পরিবর্তনের পথে চলা গফুর জোলা– বাংলা সাহিত্যে এদের কণ্ঠ এবার শোনা গেল।

রামকুমার মুখোপাধ্যায় ইংরেজি সাহিত্যে সুপণ্ডিত, সাহিত্য অকাদেমি ও বিশ্বভারতীর উচ্চপদে দীর্ঘকাল কাজ করেছেন, কিন্তু অন্তরে এই বিদগ্ধ মানুষটি সর্বদা জাগিয়ে রেখেছেন তাঁর নিজস্ব বাঁকুড়া জেলার গ্রামটিকে। দেশজ মানুষ, দেশজ প্রকৃতি, দেশজ আচার-সংস্কৃতিকে গভীরভাবে ভালোবেসেছেন। তাঁর লেখায় নানাভাবে দেখা দিয়েছে তারা। সেদিক দিয়ে তিনি শরৎচন্দ্র, জগদীশ গুপ্ত, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ, মানিক, সতীনাথ, মহাশ্বেতা দেবীর উত্তরসাধক। যদিও এঁদের প্রত্যেকের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা, রামকুমারও তাঁর নিজস্বতা কখনও হারাননি।
পুরস্কার রামকুমার মুখোপাধ্যায়ের জীবনে নতুন নয়। সাহিত্য-কর্মের জন্য বহু পুরস্কার তিনি পেয়েছেন। তবু ২০২৬ সালে পাওয়া ‘সরস্বতী সম্মান’ অবশ্যই বিশেষ। বাঙালি কবি ও কথাসাহিত্যিকের মধ্যে এর আগে সরস্বতী সম্মান পেয়েছেন শঙ্খ ঘোষ ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ভারতের ২২টি ভাষার যে কোনও একটিতে গদ্য বা কবিতায় অসামান্য সৃষ্টির জন্য এই সম্মান দেওয়া হয় কে. কে. বিড়লা ফাউন্ডেশনের তরফ থেকে।
তারাশঙ্করের যেমন বীরভূম, রামকুমারের তেমনই বাঁকুড়া। রাঢ় বাংলার প্রকৃতি, মানুষ, সমাজ ও অর্থনৈতিক অবস্থাকে তিনি হাতের তালুর মতো চেনেন। এই গভীর পরিচয়ের সঙ্গে মিশেছে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ও আখ্যান রচনার আধুনিক কৃৎকৌশল। তাই তাঁর প্রতিটি উপন্যাসই একটি নতুন অভিজ্ঞতা। ছোটগল্পকার হিসেবেও তিনি একইরকম প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।

তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘চারণে প্রান্তরে’ (১৯৯৩) জানিয়ে দিয়েছিল– তিনি কেন্দ্র নয়, প্রান্তের কথা বলতে এসেছেন। তাঁতিঘরের বিশু পুরুষানুক্রমিক জীবিকা হারিয়েছে। এখন সে গরু চরায়। কিন্তু সেই জীবিকাও অনিশ্চিত। পুরনো জীবিকার দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, নতুন কোনও জীবিকার পথ খুলছে না। এই পরিস্থিতিতে গ্রামীণ মানুষের টিকে থাকার লড়াইয়ের দলিলীকরণ করেছেন লেখক। তাঁত বন্ধের পাশাপাশি চারণক্ষেত্রগুলি রূপান্তরিত হচ্ছে চাষের খেতে। অভাবের চাপে ঘর ছাড়ছে মানুষ। বাড়ির কুমারী মেয়েদের বিয়ে করতে ভিন-রাজ্য থেকে উপস্থিত হচ্ছে বরের ছদ্মবেশে নারীপাচারকারীর দল! নানারকম ভাবে লোভ দেখিয়ে অভিভাবকদের রাজি করাচ্ছে তাদের সঙ্গে বিয়ে দিতে। তারপর এই মেয়েরা বিলীন হয়ে যায় অন্ধকারের গর্ভে! তারা আর ফেরে না নিজেদের গ্রামে, দু’-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া। হয় দেহব্যবসার অন্ধগলি, না-হয় ধারাবাহিক গার্হস্থ্য হিংসার বলি হচ্ছে তারা। ১৯৯৩ সালে এই সমস্যার কথা বলেছিলেন রামকুমার, আজ তা আরও তীব্র। আমরা আজ জানি, ক্রমাগত কন্যাভ্রূণ-হত্যা, কন্যাসন্তান হননের ফলে ভারতের কোনও কোনও রাজ্যে নারীপুরুষের অনুপাত ক্রমে বিপজ্জনক জায়গায় পৌঁছেছে। ফলে পূর্বভারত থেকে পাচার করা হচ্ছে দরিদ্র ঘরের মেয়েদের। বিবাহিত স্ত্রীর সম্মান তাদের বেশিরভাগেরই জোটে না! তারা গার্হস্থ্য-শ্রমের যন্ত্র, যৌনক্রীতদাসী ও সন্তান ধারণের জমিমাত্র। প্রয়োজন ফুরলে তাদের বিক্রি করে দেওয়া হয়।
রামকুমারের ‘ভাঙা নীড়ের ডানা’ (১৯৯৭) বিপন্ন পরিবেশ ও মানুষের কথা বলে। গ্রামের সন্নিহিত জঙ্গলে, মাংসাশী মানুষের লোভের ফলে মুছে যাচ্ছে একটি বিরল প্রজাতির পাখি। তেমনই লুপ্ত হয়ে যাওয়ার মুখে খাদের কিনারায় টলমল করছে অন্ত্যজ মানুষের অস্তিত্ব। পাখিটির নাম– ‘বেঙ্গল ফ্লোরিক্যান’, স্থানীয় ভাষায় ‘চিকপাখি’। এই প্রায় বিলুপ্ত পাখিটির সন্ধানে দিশা চৌধুরী নামে এক তরুণী পরিবেশবিদ রাঢ় বাংলায় আসে। তার ডায়েরির মাধ্যমে প্রবাহিত হয় এই উপন্যাস। পরিবেশের ধ্বংস ও নিম্নবর্গের মানুষের কোনওমতে বেঁচে থাকার প্রয়াস– সব মিলিয়ে পাখিটির মধ্যে যেন প্রতিবিম্বিত হয় বৈনাশিক পরিপার্শ্ব। চিকপাখি যেন একটি প্রতীক। অরণ্য ধ্বংস, নির্বিচারে পশুপাখি হত্যা, অন্ত্যজ মানুষকে শোষণের শেষসীমায় নিয়ে যাওয়া, বাঁকুড়ার গ্রাম হয়ে ওঠে ইন্ডিয়া নয়, ভারতবর্ষ! লোভী মানুষের আকাশ-পাতাল ব্যাদানের সামনে সেই ভারতবর্ষ বিনাশের সম্ভাবনায় কম্পমান।

‘মিছিলের পরে’ (১৯৯৮) উপন্যাসও পাঁচটি গ্রামীণ মানুষের অসহায় অবস্থার কথা বলে। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে একটি রাজনৈতিক দলের সভায়, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসেছিল অজস্র মানুষ দল বেঁধে। সভা ভাঙার পর পাঁচটি মানুষ দলছুট হয়ে দিশেহারা হয়ে যায়। পাঁচজন এসেছে পুরুলিয়া, জলপাইগুড়ি, হুগলি, বর্ধমান, বাঁকুড়া থেকে। এই নিষ্ঠুর শহর তাদের কোনও আশ্রয় দেয় না। শীতার্ত রাত তারা কাটায় ব্রিগেডের এক কোণে, একটু আগুন জ্বেলে। তিনজন পুরুষ, একজন নারী ও একটি কিশোর, গোটা রাত পরস্পরের সঙ্গে তারা কথা বলে। উঠে আসে তাদের জীবনের গল্প। এইসব গল্পের সুতোয় বোনা হয় গ্রামের গরিব মানুষের জীবনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। রামকুমার বারবার আমাদের ঔপনিবেশিক আমলের শিক্ষাদীক্ষার ফলে লব্ধ শেকড়ছেঁড়া ধ্যানধারণাকে আঘাত করেন। উনিশ শতকের নবজাগরণের আলোর পাশেই ছিল এই অন্ধকার। মনে পড়ছে, মেকলের বিখ্যাত মিনিটে ছিল– তাঁরা একদল পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ভারতবাসী গড়ে তুলতে চান, যারা গায়ের রং ও রক্তে ভারতীয় হলেও চিন্তা, চেতনায় ও অভিমতে হবে ব্রিটিশ। তারাই হবে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের সবচেয়ে বড় সমর্থক! রামকুমার নানাভাবে পরানুকরণ ও ঔপনিবেশিক প্রভাবের অভিশাপ থেকে বেরিয়ে আসার কথা বলেন। ঔপনিবেশিক অতীতই তথাকথিত শিক্ষিতদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের থেকে আলাদা করে রেখেছে। ‘মিছিলের পরে’ উপন্যাসে উপনিবেশের সময়কার বিচিত্র স্ববিরোধ, ভ্রান্তি, অহমিকা এবং ধারাবাহিকভাবে রাজনীতির নানা রূপ বদলের, স্বার্থান্বেষী অথবা বিভ্রান্ত লিডার ও ক্যাডারদের ছবি ফুটে উঠেছে।
সমকালীন সমাজের অর্থনীতি ও রাজনীতিকে দু’টি ভিন্ন স্বরের বয়ানে ধরা হয়েছে পরবর্তী দু’টি উপন্যাস– ‘দুখে কেওড়া’ (২০০২) এবং ‘ভবদীয় নঙ্গরচন্দ্র’ (২০০৬)-এ। দুখে গ্রাম্য-সমাজের একেবারে নিচের থাকের মানুষ। সে আর তার বউ ফুলু, একটি দিশি মদের ঝুপড়ি চালায়। মাঝেমাঝেই পুলিশের তাড়া খেয়ে জায়গা বদল করে। লেখক তাদের অতিথি হন মাঝেমাঝে। দুখের সঙ্গে লেখকের কথোপকথন অনেকটা ড্রামাটিক মনোলগের মতো। দুখেই একমাত্র বক্তা, লেখক আছেন শ্রোতা রূপে, সংলাপহীন। এই উপন্যাস আদ্যন্ত স্যাটায়ারের সুরে বাঁধা। সরকারের যত বদলই হোক, দুখেদের অবস্থা বদলায়নি, বদলায় না। দিন আনা, দিন-খাওয়ার বৃত্তে বন্দি তারা। দুখের বয়ানে নেতাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, উন্নয়নের আড়ালে উচ্ছেদ ও প্রান্তিক মানুষের অপরিবর্তনীয় দুর্ভাগ্য, অপ্রিয় অজস্র আর্থ-সামাজিক সত্য ও রাজনৈতিক ফাঁকিবাজি উঠে আসে।

‘–নাম? দুখে কেওড়া।
–হ্যাঁ। দুঃখহরণ। তবে দুঃখহরণ বললে আপনাকে বামুনপাড়ায় লিয়ে যাবে। দুঃখহরণ ভট্চায ইস্কুলের মাস্টার। গাঁয়ের মাথা, পঞ্চায়েতের প্রধান। দুখিরাম হল তেলিপাড়ার। চাষাবাদ আছে। বারান্দা দেওয়া ঘর। বেশ গুছিয়ে কথা বলতে পারে। আমি হলুম দুখে।’
‘হ্যাঁ, খিদে। খিদে মিটবে কিসে? খুদে। খুদ ঘাঁটায় বেশ দম। দামেও সস্তা। আশ্বিনে আউস ধান উঠল। কাত্তিক মাসে ভাত খেলেন। অঘ্রান-পৌষে মাঠের ধান উঠল। ভাতে টান নাই। ফাগুন-চৈত অবদি সুখে গেল। বোশেখ থেকে ভাদর মাস হল গিয়ে টান মাস। খুদ খেলেন।… গরিবদের কম দামে চাল-গম দিচ্ছে? শুনেছি। রেশন দোকানের যোগেন কাঁচি খেতে এসে বলেছিল। তবে আমাদের ঘরে আসেনি। সে মাল দোকানে বিক্রি হচ্ছে। টিভিতে বলেছে কথাটা মন্ত্রীর কানে গেছে। মন্ত্রী খেপে বোম। বলেছে দলবাজির কারণে এতদিন কিচ্ছু করতে পারেনি, আর চুপ থাকবেনি। ফাটাফাটি করে ছাড়বে। চালবাজি নাকি বলতে পারবনি।’
লেন্স একটু ঘুরিয়ে, ভিন্ন দৃষ্টিকোণে রামকুমার উপস্থিত করেছেন নঙ্গরচন্দ্রকে। নামটি গ্রামের একটি বাড়ির দেওয়ালে আলকাতরা দিয়ে লেখা দেখেছিলেন। গ্রামের এক গল্প-বলিয়ে পিসি তাঁর প্রেরণা, যে রাজা-রানির গল্প বলতে গিয়ে পুনকো শাক, পোস্ত ইত্যাদি দিব্যি গল্পে বুনে দিত। নঙ্গরচন্দ্র দুখের মতো অভাজন নয়। কিছু জমিজমা আছে, অষ্টম শ্রেণি অবধি স্কুলে পড়েছিল। বিদ্বান বন্ধু প্রভাকর তাকে বাংলা কাগজ পড়ার অভ্যাসটি ধরিয়েছিল। কোনও কোনও খবর পড়ে, চিন্তিত হয়ে নঙ্গর পত্রিকা সম্পাদকের কাছে পত্র লেখে। নির্দিষ্ট খবরের কাটিংটি দিয়ে সে সম্পাদকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং সম্পাদকের মাধ্যমে খবরটির সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্তরের ব্যক্তিদের পত্র পাঠায়। এসব চিঠিপত্রের ব্যবহারে উপন্যাসটি গড়ে উঠেছে।

নঙ্গর বিখ্যাত ব্যক্তিদের ভুলগুলি ধরিয়ে দেয়, কখনও দুশ্চিন্তা প্রকাশ করে, গ্রামীণ সংস্কৃতির উদারতায় নানা পরামর্শ বা উপদেশ দেয়। স্যাটায়ার ও হিউমারে রামকুমারের অসামান্য দখল এখানে ঝিলিক দিয়ে ওঠে। অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদবানির বার্ধক্যজনিত জড়তা নিয়ে কিছু কথাবার্তা বলেছিলেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়। তাঁর আক্রমণাত্মক মেজাজ দেখে নঙ্গরচন্দ্র অভিভাবক-সুলভ উপদেশ দিয়েছে, ‘সপ্তাহে একদিন ব্রাহ্মীশাক খাবে। মাথায় প্রত্যহ তেল দেবে। রোদে ছাতা নিয়ে বেরোবে। এগুলি মাথা ঠান্ডা রাখে।’
আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষায় ধরা পড়েছে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর গর্ভস্থ সন্তানটি ছেলে, রাজধানীর গঙ্গারাম হাসপাতালে যত্নে আছেন প্রিয়াঙ্কা, সব মিলিয়ে খরচ হচ্ছে প্রায় সাড়ে দশ লাখ টাকা। সংবাদমাধ্যমের এবং গোটা কংগ্রেস দলের নজর এখন প্রিয়াঙ্কার দিকে। এই খবর পড়ে প্রিয়াঙ্কাকে চিঠি লিখেছে নঙ্গরচন্দ্র। তাতে ভাবী-মাকে সতর্ক থাকার জন্য নানা উপদেশ দিতে দিতে ইন্দিরা গান্ধীর তেজি স্বভাবের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে, ‘সেই ঠাকুমার নাতনি তুমি। বলদ না গাই তাই নিয়ে তুমি ভাববে কেনে?’ হাসপাতালের খরচটাও কিছু বেশি মনে হয়েছে নঙ্গরচন্দ্রের। ইন্দিরা গান্ধী যে সম্পত্তির হিসেব দিয়েছিলেন তার উল্লেখ করেছে সে, ‘সব সম্পত্তি মিলে বিশ লাখ টাকা। ওর চেয়ে বেশি সম্পত্তি এখন এ জেলার বিশটা নেতার।’ নিরীহ ভঙ্গিতে নির্লজ্জ পিতৃতান্ত্রিকতা ও নেতাদের ভুয়ো সম্পত্তির হিসেবকে বিদ্রুপবিদ্ধ করেছে নঙ্গরচন্দ্র।
রামকুমার আখ্যানের যাত্রাপথে বারবার দিকবদল করেন। ‘ধনপতির সিংহলযাত্রা’ (২০১০) মধ্যযুগের চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের ‘বণিক খণ্ড’কে অনুসরণ করে লেখা এক অভিনব আখ্যান। আশ্চর্য এই উপন্যাসের ভাষা। মধ্যযুগের বাংলাভাষার বিচিত্র শব্দ, সেকালের জলপথ, গ্রাম ও শহর, পারিবারিক যাপন, প্রাকৃতিক পরিবেশ উপনিবেশপূর্ব বাঙালিকে চিনিয়ে দেয়। শিকড়ের সঙ্গে পরিচয় ঘটান লেখক, উপন্যাসের আধুনিক বিন্যাসে। মঙ্গলকাব্যের কাহিনি মিশে যায় রূপকথার আঙ্গিকে, ছুঁয়ে যায় কুহক বাস্তবের মায়া। বরাবর আমার আক্ষেপ, চণ্ডীমঙ্গলের আখেটিক খণ্ড নিয়ে একটি উপন্যাস কেন লিখলেন না রামকুমার! কালকেতু, ফুল্লরাদের দিনযাত্রা কীভাবে দেখতেন তিনি, জানতে ইচ্ছে করে। ব্রাহ্মণ কবি মুকুন্দ চক্রবর্তীর লেখা সেই আশ্চর্য বারমাস্যা মনে পড়ে।

‘শ্রাবণে বরিষে মেঘ দিবস রজনী।
সিতাসিত দুই পক্ষ একই না জানি।।
আচ্ছাদন নাহি অঙ্গে পড়ে মাংস জল।
কত শত খায় মাছি করমের ফল।।’
আর শীতকালে?
‘দুঃখ কর অবধান দুঃখ কর অবধান।
জানু ভানু কৃশাণু শীতের পরিত্রাণ।।’
পুনরাবৃত্তি তাঁর স্বভাব নয়, তবু অনুরোধটি রইল।
রামকুমারের যে বইটি সরস্বতী সম্মান পেল, তার নাম ‘হর-পার্বতী কথা’ (২০২০)। এখানেও তিনি আমাদের কালান্তরের স্মৃতি দুলিয়ে দিয়েছেন। ‘কালেকটিভ মেমরি’ বা সমষ্টিগত স্মৃতির দুয়ার খুলেছেন। শিব ও পার্বতীর আখ্যান হাজার হাজার বছর ধরে ভারতের শিরায় শিরায় বইছে। দক্ষযজ্ঞ ভঙ্গ, দক্ষকন্যা সতীর পার্বতী রূপে হিমালয় ও মেনকার ঘরে জন্ম, শিবের জন্য তাঁর তপস্যা, শিব ও পার্বতীর বিবাহ ও দাম্পত্য নিয়ে কালিদাসের ‘কুমারসম্ভব’ কাব্য থেকে মধ্যযুগের বাংলার ‘শিবায়ন’, বিদ্যাপতির ‘শৈব পদাবলি’– এ যেন এক ধুয়া ফিরে ফিরে আসে। ধ্রুপদী ও লৌকিক ভঙ্গিতে কবিরা এই আখ্যানকে নব নব রূপ দিয়েছেন। অষ্টাদশ শতকে ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর লিখেছিলেন,
‘লটাপট জটাজুট সংঘট্ট গঙ্গা।
ছলচ্ছল টলট্টল কলক্কল তরঙ্গা।।’
কিংবা,
‘অদূরে মহারুদ্র ডাকে গভীরে।
অরে রে অরে দক্ষ দে রে সতীরে।।
ভুজঙ্গ প্রয়াতে কহে ভারতী দে।
সতী দে সতী দে সতী দে সতী দে।।’

মনে পড়ছে, রবীন্দ্রনাথের ‘মরণ মিলন’ বা ‘তপোভঙ্গ’, অভিনব মাত্রা সংযোজন।
‘তাঁর লটপট করে বাঘছাল,
তাঁর বৃষ রহি রহি গরজে,
তাঁর বেষ্টন করি জটাজাল
যত ভুজঙ্গদল তরজে।
তাঁর ববম্ ববম্ বাজে গাল,
দোলে গলায় কপালাভরণ,
তাঁর বিষাণে ফুকারি উঠে তান,
ওগো মরণ, হে মোর মরণ।’
রামকুমার অভিনব দৃষ্টিকোণ থেকে সেই চিরপুরাতন অথচ নবীন আলেখ্যে আলো ফেলেছেন। এই উপন্যাস হল পুরাণের নবনির্মাণ, চেনা গল্পের অচেনা বিন্যাস। এই ধারায় মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব বসু কাব্য ও নাটকে তাঁর পূর্বসূরি। পৌরাণিক, কালিদাসীয় এবং লোকায়ত সংস্কৃতির সঙ্গে মিশেছে লেখকের নিজস্ব দর্শন। এখানেও ভাষা ও শব্দ ব্যবহারে নিবিড় পরীক্ষা করেছেন লেখক। আছে বাঁকুড়া বিষ্ণুপুরের লৌকিক ঐতিহ্য ও মিথের ব্যবহার, শিবায়ন কাব্যের সঙ্গে সংযোগ, প্রাচীন বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের নানা দ্বান্দ্বিকতা। সব মিলিয়ে উপন্যাসটি যেন আমাদের নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতি উদ্যাপনের উৎসব।
শিবের উৎস আর্যেতর সংস্কৃতিতে, অন্তত পণ্ডিতরা তাই বলেন। ইন্দ্রাদি দেবতার থেকে একান্ত আলাদা তিনি। তাঁর বেশবাস ও বাহন, শ্মশানচারিতা, অনুচরদল সবই স্বাতন্ত্র্যের অভিজ্ঞান। অন্যদিকে, গিরিরাজ হিমালয়কন্যা পার্বতী বৈভব ও আর্যসংস্কৃতিসম্ভূতা। এঁদের দু’জনের মিলন যেন ভারতের অন্তরাত্মাকে তুলে ধরে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে রামকুমার এই দেবদম্পতির যোগাযোগ ঘটিয়েছেন। এখানেও সুপ্রাচীন ঐতিহ্যকে নতুন রূপ দিয়েছেন। বিদ্যাপতি শিবকে ‘কিরিষ’ অর্থাৎ, কৃষিতে মন দিতে বলেছেন। ভিখারি শিবের ছবি এসেছে মঙ্গলকাব্যে, এসেছে হর-পার্বতীর দারিদ্র্যময় সংসারের কাহন। রামকুমারের উপন্যাসে গিরিবাসী হর-পার্বতী শস্যবিরল ঊষর দেশে ক্ষুধাকাতর মানুষের সহযাত্রী হয়েছেন। মঙ্গলকাব্যে ভিক্ষায় না-বেরিয়ে শিব গৌরীকে একদিন বলছেন–
‘আজি গণেশের মাতা রান্ধ মোর মত।
নিমে সীমে বেগুনে রান্ধিয়া দিবে তিত।।
রান্ধিবে মুসুরী ডাল তাহে দিবে খণ্ড।
আলস্য ত্যজিয়া জ্বাল দিবে দুই দণ্ড।।’
গৌরী জানান, ঘরে একদানা চাল নেই, যে রান্না করেন!
‘আজিকার মত যদি বান্ধা দেহ শূল।
তবে সে রান্ধিতে পারি প্রভু হে তণ্ডুল।।’

এই দারিদ্র্যই মায়ার ছোঁয়ায় রূপান্তরিত হয় পার্বতীর অন্নপূর্ণা রূপে। দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে আঁকা নন্দলাল বসুর শিব ও অন্নপূর্ণার অপরূপ চিত্রটি আমাদের মনে পড়বে। রামকুমারও তেমনই অক্ষর দিয়ে অনবদ্য চলচ্ছবি রচনা করেছেন। ইতিহাস, পুরাণ, ধ্রুপদী কাব্য, লোকগাথার বিচিত্র প্রবাহে নিজের কল্পনাকে মিশিয়ে লেখক ভারতের চিরন্তন কাহিনিকে নতুন রূপ দিয়েছেন, চর্বিতচর্বণ করেননি। প্রতিটি অনুষঙ্গ তাঁর সৃজনী কল্পনার স্পর্শে কথা বলে উঠেছে।
উত্তর ঔপনিবেশিক ভাবনার ছোঁয়া রামকুমারের অনেক উপন্যাসের মর্মে রয়েছে। ‘কথার কথা’ বইটি পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। উত্তর-পূর্ব ভারতের লোকগাথা কিংবদন্তি বিষয়ক একটি সেমিনারে, পাশ্চাত্যতত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত গবেষক অধ্যাপকদের ধরা-বাঁধা ব্যাখ্যার পরে, মোষ চড়ে আসা এক জরাগ্রস্ত প্রজ্ঞাবান জনজাতির বৃদ্ধ সম্পূর্ণ অন্যভাবে কাহিনির ব্যাখ্যা করছেন। একটির পর একটি মন্তব্য, বৃদ্ধের গোষ্ঠীচেতনা থেকে উঠে আসা জীবন্ত ঐতিহ্যের উৎসারণ– এইভাবে উপন্যাসের স্থাপত্য তৈরি হয়েছে। রামকুমার যেন সুকৌশলে বঙ্কিমচন্দ্রের কমলাকান্তের মতো বিলিতি ধরনে প্রাচ্যচর্চাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

২০২৩ সালে প্রকাশিত ‘জোব মুখুজ্যে বাক্যালাপ’ও আমাদের ঔপনিবেশিক ইতিহাসকে ভিন্নভাবে দেখা। তাঁর প্রায় সব উপন্যাসেই কথোপকথন একটি বিশেষ জায়গা পায়। চরিত্রগুলির সংলাপের ভাঁজে ভাঁজে গল্পটির বুনট গড়ে ওঠে। শ্রেণিচরিত্র, ভাষার আঞ্চলিকতা, দেশকাল ধরা পড়ে। কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা রূপে কথিত জোব চার্নক এবং এক দেশজ ব্রাহ্মণ মুখুজ্যে (রামকুমারও মুখোপাধ্যায়) নানা সময়ে নানা পরিস্থিতিতে কথা বলছে। এই দুই বন্ধুকে ঘিরে আছে দেশজ আবেষ্টনী। দেশজ সংস্কৃতি, লোকাচার, খাদ্যাভ্যাস– কোনওটিতেই জোব পিছিয়ে নেই। কুহক বাস্তব এই উপন্যাসে তীক্ষ্ণ স্যাটায়ার, প্রসন্ন হিউমারের সঙ্গে মিলে সরস আখ্যান তৈরি করেছে। কলকাতাকে লন্ডন বানানোর বদলে লন্ডনকে কলকাতা বানানোর চেষ্টা করছে জোব আর মুখুজ্যে। পরশুরামের ‘উলটপুরাণ’ ছাড়া এমন বিদ্রুপ ও কৌতুকময় লেখা আর চোখে পড়েনি।

সম্প্রতি তিনি রুশ সংগীতজ্ঞ, অনুবাদক, নাট্যপরিচালক গেরাসিম লেবেদেফকে নিয়ে একটির পর একটি পর্ব রচনা করছেন। লেবেদেফ কলকাতায় এসে কীভাবে জনজীবনে মিশে গিয়েছিলেন, সেই কাহিনি সেকালের চালচিত্র-সহ জড়ানো পটের মতো খুলে যাচ্ছে। আমরা আরেকটি অসাধারণ উপন্যাসের প্রত্যাশায় আছি।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved