Robbar

মৃত্যুর ডিফেন্স ভেঙে গোল

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 12, 2026 6:47 pm
  • Updated:June 12, 2026 6:48 pm  

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে যখন জুলিয়ান কুইনোসেসের গোলে গ্যালারিতে ‘মেক্সিকান ওয়েভ’-এর দাপট তখন কি প্রাণ পেয়েছিল ইগনাসিও-র ব্রোঞ্জের মূর্তি? না কি ভরা গ্যালারির চোখের আড়ালে মুষ্টিবদ্ধ হাত ছুড়ে দিয়েছিল, যখন গোলের পর খোলা আকাশে নিজের প্রয়াত বাবাকে খুঁজছিলেন রাউল জিমিনেজ? মেক্সিকান ফরোয়ার্ডের মতো তারও কি চোখ ভিজে গিয়েছিল জলে? প্লেয়ারদের মনের ব্যথা যে সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারে সমর্থকরাই!

সুমন্ত চট্টোপাধ্যায়

‘কলোসাস অফ সান্তা উরসুলা’! শহরের বুকে যেন আস্ত এক দানব। যে দানবের বুকে ফিসফিসিয়ে কথা বলে ইতিহাস। চুপিসারে হেঁটে চলে ফুটবলের রূপকথা। আদপে তা ফুটবল স্টেডিয়াম। মেক্সিকোর অ্যাজটেকা স্টেডিয়াম। মামুলি কোন‌ও স্টেডিয়াম নয়, প্রায় ৮৩,০০০ দর্শকের উপস্থিতিতে কত উত্থান-পতন, কত তারকার জন্ম দেখেছে ‘অ্যাজটেকা’! দেখেছে ’৭০-এ পেলের ‘ফুটবল সম্রাট’ হয়ে ওঠা। দেখেছে ’৮৬-র বিশ্বকাপে দিয়েগো মারাদোনার বিশ্বজয়। ২০২৬-এর বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ সেই সোনালি অধ্যায়ের আরও এক টাটকা পর্ব।

ইতিহাসের সেই জোয়ার-ভাঁটা আগলে অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে আছে একজন! দীর্ঘ ২৫ বছর! বসে আছে এক ব্রোঞ্জ-মূর্তি। গায়ে মেক্সিকোর জাতীয় দলের জার্সি। দু’-হাত মুষ্টিবদ্ধ। চোখেমুখে উচ্ছ্বাসের ঢেউ। স্থানীয়রা তাকে ডাকে ‘নাসিতো’ বলে। না, সে কোনও কিংবদন্তি ফুটবলার নয়, নেহাতই সমর্থক! একনিষ্ঠ ফুটবল অন্তপ্রাণ সমর্থক। নাম– ইগনাসিও ভিয়ানুয়েভা আগুইরে। ক্লাব-ফুটবলে মেক্সিকোর অন্যতম জনপ্রিয় ফুটবল টিম ক্লাব আমেরিকার সাপোর্টার। ২০ বছরের বেশি সময় ধরে প্রিয় ক্লাবের একটিও ম্যাচ মিস করেননি ‘নাসিতো’ ইগনাসিও। এস্তাদিও অ্যাজটেকার ৩৫ বছর পুর্তিতে, ২০০১ সালে গ্যালারিতে তাঁরই ব্রোঞ্জের মূর্তি বসিয়েছেন স্টেডিয়ামের কর্ণধার।

অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে ব্রোঞ্জ-মূর্তি

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে যখন জুলিয়ান কুইনিওনেসের গোলে গ্যালারিতে ‘মেক্সিকান ওয়েভ’-এর দাপট তখন কি প্রাণ পেয়েছিল ইগনাসিও-র ব্রোঞ্জের মূর্তি? না কি ভরা গ্যালারির চোখের আড়ালে মুষ্টিবদ্ধ হাত ছুড়ে দিয়েছিল, যখন গোলের পর খোলা আকাশে নিজের প্রয়াত বাবাকে খুঁজছিলেন রাউল জিমিনেজ? মেক্সিকান ফরোয়ার্ডের মতো তারও কি চোখ ভিজে গিয়েছিল জলে? প্লেয়ারদের মনের ব্যথা যে সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারে সমর্থকরাই! রাউল জিমিনিজ, প্রিমিয়ার লিগে খেলা এই মেক্সিকানের প্রত্যাবর্তনের কাহিনি টলিয়ে দেবে যে কোনও পাষাণের প্রাণ।

রাউল জিমিনেজ, বিশ্বকাপে গোলের পর

২০২০-র কোভিড-উত্তর কাল। কোভিডের চোখরাঙানি সঙ্গী করেই তখন বল গড়িয়েছে খেলার মাঠে। ইপিএলে মুখোমুখি আর্সেনাল-উলভার্ম্পটন। সেই ম্যাচই বদলে দিয়েছিল রাউলের সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন। বিপক্ষ বক্সে হেড দিতে উঠে তাঁর সংঘর্ষ লাগে আর্সেনালের ডিফেন্ডার দাভিদ লুইজের সঙ্গে। মাথা ফেটে চৌচির। এতটাই যে, রক্তক্ষরণে মাঠের জ্ঞান হারান রাউল। নাক দিয়ে গলগল করে বেরিয়ে আসছে রক্তধারা। বিপদ বুঝে তখনই মাঠ থেকে সটান তাঁকে হাসপাতাল নিয়ে যেতে হয়।

সেই প্রথম মৃত্যুর মুখোমুখি রাউল। মস্তিষ্কের ভিতর জমাট বেঁধে গিয়েছিল রক্ত। বাঁচবেন কি না, তা নিয়েই তৈরি হয়েছিল আশঙ্কা। আচ্ছন্নের মতো দিনের পর দিন তাঁর কেটেছে হাসপাতালের বিছানায়। একাকিত্বের চাদর গায়ে। জীবন যেখানে সংশয়ের খাদে, সেখানে ফুটবল খেলার স্বপ্নটা স্রেফ কষ্টকল্পনা। রাউল হাল ছাড়েননি তারপরেও। একটার পর একটা দিন গিয়েছে, আর রাউল নিজেকে তৈরি করেছেন প্রত্যাবর্তনের জন্য। ফিরেছেন। কিন্তু চোটের সেই দুঃস্বপ্ন তাঁর পিছু ছাড়েনি। মানসিকভাবে কুঁকড়ে গিয়েছেন। তাঁর ছাপ পড়েছে রাউলের ক্লাব পারফরম্যান্সে। উলভস তাঁকে ছেড়ে দিয়েছে। ফুলহ্যামে গিয়ে নতুন করে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। মনোবিদের সাহায্য নিয়েছেন। হাল না-ছাড়ার লড়াই লড়ে গিয়েছেন বছরের পর বছর।

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে সেই প্রত্যাবর্তনের বৃত্তটাই সম্পূর্ণ হল রাউলের। ম্যাচের ৬৭ মিনিটে গোল করে দলের জয় নিশ্চিত করলেন। আর সেটা করলেন সেই চিরাচরিত হেডেই। যে হেডিং করতে উঠেই সাক্ষাৎ মৃত্যুর সঙ্গে মোলাকাত হয়েছিল জিমিনেজের। অথচ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, ছেলের সেই প্রত্যাবর্তন দেখে যেতে পারলেন না রাউলের বাবা! বিশ্বকাপ শুরুর আগেই, মার্চে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হয়েছেন রাউলের বাবা রাউল জিমিনেজ ভেগা। মেক্সিকান তারকার লড়াকু ফুটবল কেরিয়ারের পথপ্রদর্শক, মেন্টর, এককাট্টা সমর্থক। যিনি না-থাকলে হয়তো আর ফুটবল মাঠে ফেরাই হত না রাউলের!

দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় গোলের পর যখন উদ্বেল মেক্সিকোর গ্যালারি, তখন উন্মুক্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে বাবাকেই খুঁজছিলেন রাউল। দু’-গাল বেয়ে নেমে আসছিল অশ্রুধারা। অলক্ষে থেকে কিছু কি বলছিলেন রাউলের গর্বিত বাবা? ঘাসের বুকে কান পাতলে হয়তো শোনা যেত সেই স্বর– ‘সন, নেভার সে নেভার’! তেমনটাই কি বলছিল গ্যালারিতে ২৫ বছর বসে থাকা ইগনাসিও-র ব্রোঞ্জের মূর্তি?

… পড়ুন বিশ্বকাপ নিয়ে ‘গোলগপ্‌পো’ সিরিজের অন্যান্য লেখা …

১. বৈষম্যের পৃথিবীতে ফুটবল আজও প্রতিরোধ

২. বাঁধভাঙা উত্তাপে কি পুড়বে বিশ্বকাপ?