Robbar

পিতৃস্নেহ বিষম বস্তু!

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 5, 2026 6:18 pm
  • Updated:July 5, 2026 6:18 pm  

সিদ্ধার্থ যখন গৃহত্যাগ করেন, তখন রাহুলের বয়স এক বছর, মতান্তরে জন্মের দিনই বা কয়েকদিন পরে। ‘রাহুল’ কথার অর্থ বন্ধন। সেই বন্ধন কাটিয়ে তিনি চলে গেলেন নিজের অভীষ্ট পূরণে। জ্ঞানের আলোকে জীবন দেখতে। নির্বাণ লাভের পথ প্রশস্ত করতে। একবার ফিরে এলেন। রাহুল তখন সাত বছরের। সে এতদিনে জেনে গিয়েছে ওই মানুষটি তার পরম আত্মীয়। শুধু তার নয়, এই কপিলাবস্তু নগরের ও পাশাপাশি সব জনপদের সব মানুষের কাছে তিনি প্রিয়। ছোট্ট রাহুল, পিতার স্নেহ-বঞ্চিত রাহুল অনুমতি চাইল সে কি তাকে ‘পিতা’ বলে ডাকতে পারে?

তনুশ্রী ভট্টাচার্য

মানবিক গুণাবলি সবসময়ই কি মানবিক দিকেই থাকে? ছোটদের প্রতি বড়দের স্নেহ যখন নির্ণায়ক হয়ে দাঁড়িয়ে যায় তখন কিন্তু বিপদ আসে, ধ্বংস আসে। আমাদের সমাজে রাজনীতির অন্দরে, পারিবারিক অলিন্দে দেখছি তার বিষময় ফল। স্নেহ-দাতা ও স্নেহ-গ্রহীতা উভয়ের দিক থেকেই– স্নেহ অতি বিষম বস্তু। তবে গুরুজনদের স্নেহচ্ছায়ায় ছোটরা বড় হবে– এই-ই চিরন্তন সমাজব্যবস্থা, পারিবারিক বন্ধন-ব্যবস্থা। কিন্তু সেখানেও অন্যথা হয় বইকি! আর তখনই আসে নানাবিধ জটিলতা, ব্যর্থতা, প্রশ্নচিহ্ন।

রামায়ণে পিতা দশরথের এত স্নেহ পেয়েছিলেন বলেই কৃতজ্ঞতাস্বরূপ পিতৃ-আজ্ঞা পালনে রাজত্ব ত্যাগ করে বিষম জীবনযাপন বেছে নিলেন রাম, জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টায়? এক্ষেত্রে পৃথিবীতে সব পিতার স্নেহ যদি দশরথের মতো সর্বগ্রাসী হয় তবে তো মুশকিল। রাম যদি একটু যুক্তিশীল বা একবগ্গা হতেন, লক্ষ্মণ বা ভরতের মতো, তাহলে অন্য কিছু দেখতাম আমরা। ভরত তো মাকে তিরস্কার করলেন, রাজদণ্ড গ্রহণ না করে দ্বিতীয় পথ আবিষ্কার করলেন। কৈকেয়ী কি ভরতকে স্নেহ করতেন না? রাম দ্বিতীয় কোনও পথ বাতলাতেই পারলেন না– নান্যঃ পন্থা।

রামের জন্ম, মালব্য চিত্র

মহাভারতে পঞ্চপাণ্ডব পিতার স্নেহ কী বস্তু জানলই না। তাদের মনোবেদনা গোটা মহাভারতে নেই কিন্তু। যেটা থাকতেই পারত। পিতৃস্নেহ-বঞ্চিত শিশুরা যখন খেলাধুলা করত, উপচানো পিতৃস্নেহ পাওয়া দুর্যোধনের সঙ্গে তারা কি অসহায় বোধ করত না? একথা ঠিক– সিঙ্গল মাদার হিসাবে কুন্তী মানুষ করে তুলেছেন পাঁচ ছেলেদের। মায়ের স্নেহের নমনীয়তার সঙ্গে কাঠিন্য থাকলেও পিতার শিক্ষার দৃঢ়তা বা দার্ঢ্য তারা পায়নি। পুরুষালি লৌহকঠিন ভাবটা তাই তাদের চরিত্রে পাওয়া যায় না। তাই হয়তো প্রতিবাদ করার, রুখে দাঁড়ানোর শিক্ষাটা তাদের সম্পূর্ণ হয়নি। তাই হয়তো‌ রাজ্য কেড়ে নেওয়ার প্রতিবাদ করতে বা দ্রৌপদীকে বাঁচাতে যে চারিত্রিক বা বাক্যের দৃঢ়তা লাগত, সময়কালে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেনি। ভীম ছাড়া সবাই নরম সুরে কথা বলতেই অভ্যস্ত ছিলেন। একজন স্নেহশীলা মায়ের কাছ থেকে যেটা পেয়েছেন– সেটাই তাদের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য হয়েছে। পিতা থাকলে হয়তো ব্যাপারটা অন্যরকম হত। আর অসহায় মাকেও ওইরকম আদেশ দিতে হত না যে, দ্রৌপদীকে পাঁচ ভাই ভাগ করে নাও।‌ বাপ-মরা ছেলেরা বিড়ম্বনা সহ্য করে গিয়েছেন– সেই হিসাবেই পঞ্চপাণ্ডবকে দেখব আমরা।

আবার পিতা ধৃতরাষ্ট্রের এত স্নেহ পেলেন, আসকারা পেলেন যে, দুর্যোধনের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে উঠল। পিতৃস্নেহ বিষম বস্তু হয়ে উঠল। পিতার সুশিক্ষার সুফল নেই, আছে কেবল তার পৌরুষ প্রদর্শন, পুরুষালি কুচক্রীপনা।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ, মেবার মিনিয়েচার

এদিকে রামায়ণে রাম নিজের পুত্রদের স্নেহ করার সুযোগই পেলেন না। লবকুশ তাদের পিতাকে চিনল একেবারে যুদ্ধক্ষেত্রে,‌ অশ্বমেধের ঘোড়া আটকে রেখে। পিতৃস্নেহ-বঞ্চিত হৃদয় নিয়ে তারা শৈশব কাটিয়ে যৌবনে পা দিল। পিতার পরিচয় জানার আকুল আগ্রহ নিবৃত্ত করার জন্য বশিষ্ঠ মুনি কায়দা করে শিশুদের রামভজনা শেখালেন। যাবতীয় সুগুণাবলি-সমৃদ্ধ এক মানুষের কীর্তি গাইতে গাইতে তারা হয়তো কল্পনা করত– তাদের পিতাও বাস্তবে এমনই সর্বগুণসম্পন্ন। পিতার স্নেহ পেল না অথচ পিতার গুণগান শিখে গেল! শিশু-হৃদয়ের আকুলতা– ‘আমাদের পিতা কই?’: মর্মস্পর্শী চিরন্তন এই প্রশ্নটি কেন যে তারা করেনি– রামায়ণ-রচয়িতা আমাদের জানাননি।

শকুন্তলা-দুষ্মন্তের পুত্র ভরতকেও পিতৃস্নেহ বঞ্চিত হতে হয়েছিল শৈশবে। হঠাৎই তপোবনে সিংহশাবকের সঙ্গে লড়াই করা একরত্তি শিশুটির কায়দাকানুন আর মায়াবী লাবণ্য দেখে দুষ্মন্তের মনে হয়েছিল শিশুটি উচ্চবংশজাত। প্রথম দর্শনেই তিনি শিশুটির প্রেমে পড়েছিলেন। চেয়েছিলেন কি মনে মনে এরকম এক শকুন্ত লাবণ্য ভরা শিশুসন্তান যদি তার থাকত? ভাগ্যের কী পরিহাস! শিশু ভরত কি পিতৃস্নেহের অভাব বোধ করেনি?

রবি বর্মার ছবিতে শকুন্তলা ও দূতী

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অপুর সংসার’ উপন্যাসের কথাই যদি ধরি। ‘অপুর সংসার’ বলতে আমরা কী বুঝি? প্রচলিত সংসারের সংজ্ঞায় তার সংসারের হিসেবনিকেশ মেলে না। আবার মিলেও যায় কোথাও-কোথাও। অল্প আয়ের এক তরুণ যুবক আকস্মিকভাবে বাধ্য হয়ে বিয়ে করেছে এক উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়েকে, যার নিত্যদিনের ঘর-গেরস্থালির কাজ করতে অভ্যাস নেই। কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না। সে দিব্যি চলনসই। চলছিল সংসার। বাপের বাড়িতে গেল। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেল। সেই সময়ের চিকিৎসা ব্যবস্থার অপ্রতুলতার এক সাধারণ সমস্যা। আবার কি না কলকাতা শহর থেকে এত দূরে! এই মৃত্যুসংবাদ শুনে অপু এমনই ভেঙে পড়ল যে সংসারের প্রতি বিমুখ হয়ে নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগল। এর পরের জীবনটা জীবনকে জানার জার্নি। লেখক সত্তার জাগরণ এবং হেথা-হোথা ঘুরে ঘুরে জীবনকে জানতে চাইল। লেখক হল কি হল না, তার লেখা গল্প-উপন্যাস ছাপা হল কি হল না– সেটা মুখ্য বিষয় নয়, কিন্তু সে যে একক জীবন বেছে নিয়ে একটি অনুসন্ধানী মন নিয়ে ঘরছাড়া বিবাগী হয়ে জীবনকে নানা ওঠাপড়ায় দেখেছে, চিনেছে আর বুঝেছে– এটাই অপুর জীবনদর্শন। রামায়ণে রামের বনগমন এমনই জীবনদর্শন বললে খুব একটা ভুল বলা হবে না।

এদিকে সন্তানের মুখ সে এখনও দেখেনি। শুধু জানে তার এক ছেলে আছে। এমনকী নামটা পর্যন্ত সে জানে না। নামটাও অনেক পরে বন্ধুর কাছ থেকে আচমকা জানল যে তার ছেলের নাম কাজল। তার জন্য সে ‘ডিউটির’ খাতিরে টাকা পাঠায়, কিন্তু কোনও টান অনুভব করে না। সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘অপুর সংসার’ সিনেমায় দেখাচ্ছেন– বন্ধু পুলুর কাছে অপুর স্বীকারোক্তি: ‘তার প্রতি আমার কোনও টান নেই, কারণ আমার কেবলই মনে হয় কাজল আছে বলে অপর্ণা নেই।’ এবং আরও বলে যে তার দায়িত্ব সে নিতে পারবে না, বরং বন্ধুকেই অনুরোধ করে তাকে বোর্ডিং-এ রাখার ব্যবস্থা করে দিতে। এ তো দেখা যাচ্ছে রামায়ণে পিতা রামের দায়িত্ব এড়িয়ে যাবার মতোই। কোনও তফাত আছে বলে মনে হচ্ছে না। এই প্রেক্ষিতে বলতে হয় যে বশিষ্ঠ মুনির বোর্ডিংয়েই রামপুত্রদ্বয় লবকুশ বড় হচ্ছিল।

অপু ও তার পুত্র, ‘অপুর সংসার’ ছবির শেষ দৃশ্য

কিন্তু একটি শিশুর মা নেই, বাবা থেকেও নেই– তার বেদনা কতখানি! অসমবয়সি কাঠখোট্টা দাদু আর চাকরবাকরদের সঙ্গে তার স্নেহবিহীন শৈশব কাটছে। কিছু অনিবার্য দুষ্টুমি আর তার প্রেক্ষিতে বড়দের বকাঝকা দাঁতখিঁচুনি– এই তার শৈশব। বাবা আছে তার কল্পনায়। তবে একটা সময় এল, যখন অপু ছেলের জন্য খুব অল্প টান অনুভব করে ফিরে এসে তার সাহচর্য পেল। এখানে কে যে কার সাহচর্য পাচ্ছে সেটাই বিচার্য। পিতা পুত্রের না পুত্র পিতার? দুটো বুভুক্ষু হৃদয় কাছাকাছি আসতে চেয়েও পারছে না দীর্ঘদিনের অদর্শন আর অনভ্যস্ততায়। বাবা-ছেলের প্রথম দেখায় কেউ কাউকে চেনে না। কচি শিশু স্নেহের কাঙাল হলেও তীব্র অভিমানী। কাছে ঘেঁষতেই দিচ্ছে না বহিরাগত লোকটিকে। লবকুশেরও এই মানসিক দাপট আমরা লক্ষ করেছি রামায়ণে।

কিন্তু অবশেষে অপু পিতৃত্ব স্বীকার করল। প্রশ্ন– পিতৃত্ব স্বীকার করল, না হার মানল নিজের অটল মনোভাবের কাছে? কারণ ফিরে যাবার সময় কী এক অসংজ্ঞায়িত টানে পিছন পিছন ছুটে আসছিল জ্বরে-ভোগা স্নেহ-কাঙাল শিশুটি। অপুর পিতৃস্নেহ উদ্বেল হয়ে উঠল। সে ছুটে গিয়ে চিরন্তন পিতার কর্তব্য ও স্নেহবোধে মাতৃহারা শিশুকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিল। শেষ পর্যন্ত এক মানবিক জয়। যতটা দূরত্ব ছিল ততটাই নৈকট্যে পিতাপুত্রের মিলন পর্ব সমাধা হল।

রাম পরবর্তীকালে লবকুশকে রাজ্যদান করে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন। দেবতা রাম আর মানুষ অপুর মধ্যে বুকে স্নেহ জমিয়ে রেখেও পিতৃত্বের দায় এড়িয়ে যাওয়া ও স্বীকার করার মধ্যে কোনও পার্থক্য করা যায় না।

অজন্তা চিত্রে বুদ্ধ, যশোধরা ও রাহুল

মিল খুঁজে পাওয়া যায় গৌতম বুদ্ধ আর রাহুলের সাক্ষাৎকারের। সিদ্ধার্থ যখন গৃহত্যাগ করেন, তখন রাহুলের বয়স এক বছর, মতান্তরে জন্মের দিনই বা কয়েকদিন পরে। ‘রাহুল’ কথার অর্থ বন্ধন। সেই বন্ধন কাটিয়ে তিনি চলে গেলেন নিজের অভীষ্ট পূরণে। জ্ঞানের আলোকে জীবন দেখতে। নির্বাণ লাভের পথ প্রশস্ত করতে। একবার ফিরে এলেন। রাহুল তখন সাত বছরের। সে এতদিনে জেনে গিয়েছে ওই মানুষটি তার পরম আত্মীয়। শুধু তার নয়, এই কপিলাবস্তু নগরের ও পাশাপাশি সব জনপদের সব মানুষের কাছে তিনি প্রিয়। ছোট্ট রাহুল, পিতার স্নেহ-বঞ্চিত রাহুল অনুমতি চাইল সে কি তাকে ‘পিতা’ বলে ডাকতে পারে? তার মা তাকে শিখিয়েছিল এই মানুষটিকে ‘পিতা’ বলে না ডাকলে বা শাক্যপুত্র সিদ্ধার্থ যদি পুত্রকে স্বীকার না-করেন, তবে পরবর্তীকালে সে উত্তরাধিকার ও উত্তরাধিকার-সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে। সাত বছরের রাহুল ‘পিতা’ ডাকতে উদ্‌গ্রীব, কিন্তু বুদ্ধদেব পিতাপুত্রের ব্যক্তিগত সম্পর্ককে প্রাধান্য না-দিয়ে তার জ্ঞানচক্ষু উন্মীলনের সব শিক্ষা দিতে লাগলেন। শেষে পুত্রকে নিরস্ত করতে না-পেরে, তাকে কনিষ্ঠতম শিষ্য হিসাবে সংঘে অন্তর্ভুক্ত করেন। পিতার পরিচয় মুছে গেল। তিনি রাহুলের পিতা নয়, তিনি সংঘের অধিকারী, রাহুল সেখানে বালক-ভিক্ষু। যদিও পুত্র কাছেই তো রইল– এই বোধ হয়তো জন্মেছিল বুদ্ধদেবের। পিতাকে কাছে পাওয়ার, পিতার স্নেহের পরশ পাওয়ার আকুলতা রাহুলের ছিল। থাকাটা স্বাভাবিক এবং নির্বাণলব্ধ তথাগত পুত্রকে একেবারে অস্বীকার করার ক্ষমতা দেখাতে পারেননি। বায়োলজিকাল সম্পর্ক ছাপিয়ে স্পিরিচুয়াল সম্পর্ক স্থাপিত হল। রাহুল উত্তরাধিকার পেলেন সংঘে যোগদানের– কনিষ্ঠতম সদস্য হিসাবে। বলা হল, রাহুল ভাগ্যবান পুত্র। পিতার স্নেহ ও‌ শিক্ষা– দুটোই পেল এতদিন পর হলেও। এখানে আবার পিতামহ শুদ্ধোদন আপত্তি জানালেন, কারণ সর্বহারা ব্যথা-জর্জরিত মানুষটি ওই নাতিকে আঁকড়েই বাঁচছিলেন– সে-ও গৃহত্যাগ করল। তিনি তীব্র প্রতিবাদ করে জানালেন এর পর থেকে যেন গুরুজনদের অনুমতি নিয়ে নাবালকদের সংঘে যোগদান করানো হয়। মনে রাখতে হবে, পিতার মহাপরিনির্বাণের আগেই রাহুল দেহরক্ষা করেন। বুদ্ধ কি পুত্রশোক পেয়েছিলেন?

রবীন্দ্রনাথের পিতৃস্নেহ আমরা সবাই জানি। সেই স্নেহের ধার ও ভার বহন করেছেন জ্যেষ্ঠপুত্র রথীন্দ্রনাথ। এত প্রতিভা থেকেও তিনি পিতার কাছে ম্লান হয়ে রইলেন। স্নেহের প্রতিদান?