


শিল্পধর্ম অনুযায়ী একজন চিত্রশিল্পী যেমন রং-তুলি-ক্যানভাস নির্বাচনে সচেতন থাকেন, অনুরূপভাবে গদ্যশিল্পীকে তাঁর নিজস্ব অনুভবের জগৎ ফুটিয়ে তুলতে বেছে নিতে হয় উপযুক্ত শব্দ। তারপর সেই শব্দকে এমনভাবে সাজাতে হয়, যাতে লেখকের উপলব্ধির একটি প্রকৃত পরিমণ্ডল তৈরি হয়ে ওঠে। গল্পকার প্রতিটি গল্পে যেহেতু ভিন্ন ভিন্ন উপলব্ধির প্রকাশ ঘটান, তাই শব্দ-পরিমণ্ডলটিও বদলে নিতে হয়। ফলে একটি গল্পের আঙ্গিক থেকে অন্য গল্পের আঙ্গিক আলাদা হয়ে পড়ে। বলরাম মনে করতেন গদ্যের পরিবর্তনেই গল্পের পরিবর্তন আনা সম্ভব। ফিউচারিস্টরা বস্তুজগৎকে যেমন চিত্রময়তায় ধরতে চাইতেন, বিটোফেন ছুঁতে চাইতেন নাদময়তায়, তেমনই বলরাম বস্তুজগৎকে নিজের মতো করে পেতে চাইতেন গল্পে; শব্দ সমাবেশে। শব্দের ধ্বনি এবং অর্থ– এই দু’টি মাত্রাকেই তিনি প্রাধান্য দিতে চাইতেন।
আজীবন প্রথাগতকে উপেক্ষা, অস্বীকার আর লাগাতার আক্রমণ করে বাংলা সাহিত্যে যিনি নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করে নিতে পেরেছিলেন, সেই প্রথাবিরোধী সাহিত্যিক বলরাম বসাক সদ্য (১৭.০৬.২০২৬) প্রথামাফিক জীবনের ইতি টেনেছেন। অবশ্য তাঁকে কেবল ‘শাস্ত্রবিরোধী গল্পকার’ হিসেবে দাগিয়ে দিলে ভুল হবে। বাংলা সাহিত্যের সমঝদার পাঠক মাত্রই জানেন, শাস্ত্র বিরোধিতায় বুঁদ হয়ে থাকলে তাঁর স্বীকৃতির ঝুলিতে ‘উপেন্দ্রকিশোর স্মৃতি পুরস্কার’, ‘বঙ্কিম পুরস্কার’ কিংবা সাহিত্য অকাদেমির ‘বাল সাহিত্য পুরস্কার’ থাকত না। শাস্ত্রবিরোধী সাহিত্যের সমান্তরালে ছোটদের জন্য তিনি লিখে গেছেন সমান উদ্যমে। যেখানে আবার বলরাম বহমান শাস্ত্রকেই মান্যতা দিয়ে ছুঁয়ে দিতে চেয়েছেন শিশু-কিশোর মন।

বিশ শতকের ছয়ের দশকে গতানুগতিক বাংলা সাহিত্যের খোলনলচে বদলে দিতে একজোট হয়েছিলেন একদল ঝকঝকে বুদ্ধিদীপ্ত তরুণ সাহিত্যিক। সদ্য স্বাধীনতা-প্রাপ্ত একটি দেশে কৈশোর যাপন করতে করতে স্বাধীনতার স্বাদহীনতা তাঁদের মধ্যে বুনে দিয়েছিল ধ্বংসবীজ। দাঙ্গা, দেশভাগ, উদ্বাস্তু সমস্যা, খাদ্য সংকট, বেকারত্ব তাঁদের মেধাবী মস্তিষ্কে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিয়েছিল। গতানুগতিক যা কিছু তাকে গোড়া সমেত উপড়ে ফেলতে উদ্যোগী হয়েছিলেন তাঁরা। বিমল করের নেতৃত্বে ‘ছোটগল্প: নূতনরীতি’, মলয় রায়চৌধুরী, দেবী রায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সমীর রায়চৌধুরী কিংবা পরের দিকে শৈলেশ্বর ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্তদের ‘হাংরি জেনারেশন আন্দোলন’ বাংলা সাহিত্যকে দেখতে শিখিয়েছিল অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে। সেই আঙ্গিকেই বাংলা ছোটগল্পে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিলেন শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলকারীরা।

পাঠক বিনোদনের যাবতীয় সাহিত্যিক কারসাজি বানচাল করে দিতে ১৯৬৬-র মার্চে ‘এই দশক’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদে শাস্ত্র বিরোধীরা ছাপলেন চারটি স্পর্ধিত শ্লোগান–
১. গল্পে আমরা আমাদের কথাই বলব।
২. আমরা এখন বাস্তবতায় ক্লান্ত।
৩. অতীতের মহৎ সৃষ্টি অতীতের কাছে মহৎ আমাদের কাছে নয়।
৪. গল্পে এখন যারা কাহিনি খুঁজবে তাদের গুলি করা হবে।

‘এই দশক’-এর প্রতিটি সংখ্যায় একের পর এক প্রবন্ধে, শাস্ত্রবিরোধী গল্পে গল্পে প্রচলিত বাংলা ছোটগল্পের গতানুগতিকতাকে ভেঙে ফেললেন রমানাথ রায়, সুব্রত সেনগুপ্ত, আশিস ঘোষ, শেখর বসু, কল্যাণ সেন, অমল চন্দ। কিছু পরেই ‘এই দশক’ পত্রিকার ষষ্ঠ সংকলনে (বৈশাখ, ১৩৭৫) ‘নিষেধ’ গল্প রচনার মধ্য দিয়ে শাস্ত্রবিরোধীদের দলে যোগ দিয়েছিলেন বলরাম বসাক। ‘এই দশক’-এর মোট ২৪টি সংখ্যার মধ্যে ১১টি সংখ্যায় বলরাম গল্প নিয়ে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। কখনও শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলনের বক্তব্যকে স্পষ্ট করতে আলোচকের ভূমিকা নিয়েছেন, কখনও আন্দোলনকারী হিসাবে পাঠকের চিঠির উত্তর দিয়েছেন দায়িত্ব নিয়ে। আবার হঠাৎই ‘এই দশক’ পত্রিকার অষ্টাদশ সংকলন (মাঘ, ১৩৮০) থেকে বলরাম সবরকম সংযোগ ত্যাগ করেছেন এই আন্দোলনের সঙ্গে। অথচ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ব্যক্তি-সম্পর্ক অটুট থেকেছে আজীবন।

আসলে অন্তরাত্মার রহস্যময় জটিল অনুভবের কথা বলতে বলরাম বেছে নিয়েছিলেন শাস্ত্রবিরোধী পথ। শাস্ত্রবিরোধীদের মতো সাহিত্যে অবাধ স্বাধীনতা উপভোগের বাসনায় তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন আন্দোলনে। ‘এই দশক’ পত্রিকার পঞ্চম সংখ্যায় (অগ্রহায়ণ, ১৩৭৪) রমানাথ রায় ‘খোলা চোখ এবং শাস্ত্রবিরোধী সাহিত্য’ শিরোনামে লুই আগঁরকে মান্যতা দিয়ে লিখেছিলেন: ‘শিল্প সাহিত্যের শাস্ত্রসম্মত পথকে বর্জন করতে হবে। শিল্পের ইতিহাস আঙ্গিকের বিবর্তনের ইতিহাস।’ এইসব কথা থেকে বলরাম সংগ্রহ করে নিয়েছিলেন প্রচলিত তথা প্রতিষ্ঠিতকে ভেঙে ফেলার সাহস, নতুন পথে এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা। কেবল শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলনের মুখপত্র ‘এই দশক’ পত্রিকায় নয়, ‘গল্প’, ‘চোখ’, ‘ঈগল’, ‘নির্মিতি’, ‘অব্যয়’, ‘কালক্রম’ প্রভৃতি সেই সময়ের প্রথাবিরোধী পত্র-পত্রিকায় একের পর এক শাস্ত্রবিরোধী গল্প লিখে প্রচলিত পাঠক-বিনোদ্য বাংলা গল্পকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন বলরাম।

গল্প পড়ার পুরনো সংস্কারকে বাতিল করে দিয়ে পাঠককে এক সম্পূর্ণ নতুন পাঠে অভ্যস্ত করে তুলতে চেয়েছিলেন শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলনকারীরা। ‘এই দশক’ পত্রিকার ত্রয়োদশ সংকলনে (কার্তিক, ১৩৭৭) বলরাম বসাক পাঠকের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে লিখেছেন– ‘দীর্ঘদিন ধরে পাঠক এক ধরনের রক্ষণশীল ভাববাদ আর অতি-আবেগী বস্তুবাদের সঙ্গে পরিচিত ও তার দ্বারা পরিচালিত। ফলে আজ পর্যন্ত লেখক ও পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে উঠেছে রক্ষণশীল, আবেগী। ভাববাদ আর বস্তুবাদের আতিশয্যে তারা প্রচণ্ড দর্শনবিলাসী আর সংকীর্ণ প্রয়োজনবাদী। এরকম পরিবেশে নতুন রচনা কীভাবে তুলে ধরব? পুরনো আমলের পাথর-দরজা নবীনত্বের উত্তাপে গরম হতে পারে কিন্তু কখনও নরম হবে না। তাই তো গুঁড়ো করে দেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। তার জন্য দরকার সাহিত্য আন্দোলন। আন্দোলনের প্রয়োজনে নতুন রচনা।’ এই বোধ এবং বিশ্বাস থেকেই বদলে গিয়েছে বলরাম বসাকের গল্প।

‘এই দশক’ পত্রিকার ষষ্ঠ সংখ্যায় বলরাম বসাকের প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘নিষেধ’। এ গল্পে কাহিনি খুঁজতে গেলে গুলি না খেলেও গুগলিতে আউট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। আসলে বলরামের শাস্ত্রবিরোধী গল্পগুলি কাহিনিলোভী পাঠককে ধোঁকা দেয়। কণামাত্র কাহিনি উপাদান ব্যবহার করেও ‘নিষেধ’ গল্পে বলরাম স্পষ্ট করে তোলেন একটি মানুষের অস্পষ্ট উদ্বেগ, অব্যক্ত অভিব্যক্তি। বুঝিয়ে দেন সমাজের চাপিয়ে দেওয়া ফরমানের সঙ্গে নিজের যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা মেলে না সর্বদা। পরিপ্রেক্ষিত বা দৃষ্টিভঙ্গির বদলে কোনও ব্যক্তি বা বিষয়ের মূল্যায়ন বদলে যেতে পারে। গল্পে একটি মানুষের অসহায়তাকে সঙ্গ দিতে বলরাম আবিষ্কার করেন অদ্ভুত এক ফর্ম। আপাত উদ্ভট কাহিনির মধ্যে এক্সপ্রেশনিস্টদের মতো কল্পনার অতিরঞ্জনে অত্যন্ত সততার সঙ্গে তুলে আনেন একটি মানুষের অন্তর্সত্য।

অন্তরাত্মার যে জটিল রহস্যময় অনুভবের কথা বলতে চেয়েছিলেন শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলনকারীরা, বলরামের অবচেতন থেকে সেকথাই যেন উঠে এসেছে ‘এই দশক’ পত্রিকার সপ্তম সংকলনে (শ্রাবণ, ১৩৭৫) প্রকাশিত ‘গগলস্’ গল্পে। এ গল্প যেন স্বপ্নের অনর্গল স্রোত। সেই স্রোত থেকেই জেগে ওঠে গল্পের শরীর। এ গল্পেও কাহিনি, প্লট কিংবা চরিত্র নির্মাণের বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেননি বলরাম। একটি মানুষের লাগামছাড়া উন্মাদনা যখন এ গল্পের বিষয়, তখন তার বিশ্বাসযোগ্য উপস্থাপন কৌশল হিসেবে বলরাম আশ্রয় নিয়েছেন পরাবাস্তবতার। ‘গগলস্’ গল্পে আমাদের পরিচিত উদ্ধৃতি চিহ্নটিকে অভিনব কৌশলে ব্যবহার করে পাঠকের প্রচলিত পাঠাভ্যাসে প্রচণ্ড ধাক্কা দিয়েছেন শৈলী-সচেতন শিল্পী বলরাম বসাক।

‘এই দশক’ পত্রিকার অষ্টম সংকলনে (পৌষ, ১৩৭৫) প্রকাশিত ‘কার্পেট’ গল্পটি বলরাম বসাকের শব্দ সচেতনতার আশ্চর্য অথচ উদ্ভট নিদর্শন। এ গল্পে শাস্ত্রের কোনও নিয়মকানুন মানেননি বলরাম। ‘কার্পেট’ গল্পে কাহিনি, চরিত্র, স্থান-কাল-পাত্রের পরম্পরা কিছুই নেই। এমনকী গল্পটিতে একটি সম্পূর্ণ-অসম্পূর্ণ বাক্যও নেই। আছে শুধু শব্দ, শব্দের প্রবাহ, বৈচিত্রময় শব্দসজ্জা। শব্দের বিচিত্র বিন্যাসে পাঠক মনে দৃশ্যগত প্রতিক্রিয়া তৈরির চেষ্টা করেছেন তিনি। বলরাম ‘কার্পেট’ গল্পে শব্দের অর্থ-ঐতিহ্য-ধ্বনি-রূপ এই চারটি মাত্রাকেই ব্যবহার করেছেন নিজের উপলব্ধির জগৎ আলোকিত করতে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাঠকের কাছে তা কোন আবেদনে ধরা পড়বে– সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সচেতন নন তিনি। এই গঠনগত দুর্বলতার কারণে ‘কার্পেট’ তাঁর শব্দ নিয়ে খেলা করার নিদর্শন হয়েই রয়ে গেছে, উন্নত শাস্ত্রবিরোধী গল্প হয়ে উঠতে পারেনি। এ গল্পে বলরাম নিজেকে পৃথক প্রমাণ করতে যতটা তৎপর, অনুভূতির নির্মাণে ততটা যত্নবান নন। গল্পটিতে শব্দের বিন্যাস অভিনব, কিন্তু কোন অর্থে এমন বিন্যাস তা বোধ করি অধিকাংশ পাঠকের কাছেই বোধগম্য নয়।

বলরাম বসাকের শব্দ নিয়ে খেলা করার এই নেশা প্রশ্রয় পায়নি আন্দোলনকারীদের কাছে। ‘কার্পেট’-এর পর তাই তাঁকে সংযত হতেই হয়েছিল। পরে আবারও তিনি গল্পে অভিনবত্ব দেখিয়েছিলেন ‘এই দশক’-এর পাতায়। শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন থেকে সরে গেলেও বলরাম বসাক সচেতনভাবে প্রতিনিয়ত নিজের মতো করে নির্মাণ করেছেন নতুন রীতির গল্প। বাংলা গল্পকে সব অর্থে গতানুগতিকতা মুক্ত করতে ১৯৭১ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত ‘গল্প সভা’ এবং ১৯৭৭ থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত ‘মুক্ত গল্প সভা’র আয়োজন ও পরিচালনা করেছিলেন। প্রথাবিরোধী বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় সেই সময় তাঁর নিয়মিত উপস্থিতি প্রমাণ করে শাস্ত্রবিরোধী বাংলা গল্পে তাঁর অবদান কতখানি।

‘গল্প’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় (জ্যৈষ্ঠ, ১৩৭৭) বলরাম বসাক ‘একদিন’ নামে একটি গল্প লিখেছিলেন। যথারীতি এ গল্পেও কোনও চমকপ্রদ ঘটনা নেই। আতঙ্কগ্রস্ত একটি মানুষের প্যানিক অ্যাটাকের অবচেতন ভাষ্যটিকেই গল্প বানিয়ে তুলেছেন বলরাম। এ গল্পে ডাডাইস্টদের সাউন্ড পোয়েট্রির স্টাইলে কথক মন্ত্রের মতো একই শব্দ বারবার উচ্চারণ করে চলে। একটি মানুষের যৌন অবদমন এবং অপরাধবোধ থেকে তৈরি হওয়া অস্বস্তি আর অনন্ত অপেক্ষাই এ গল্পের মূল অবলম্বন। আবার ‘ঈগল’ পত্রিকায় (ফাল্গুন, ১৩৭৭) প্রকাশিত ‘এখন একা জানিনা কটা’ গল্পে প্রকাশিত হয়েছে ভীষণ একা একটি মানুষের এলোমেলো চিন্তা, অসহায়তা, একাকিত্বের যন্ত্রণা। অথচ এ গল্পেও কাহিনি নির্মাণের কোনও চেষ্টাই করেননি বলরাম। নেই প্রথামাফিক প্লট, চিরচেনা চরিত্র। এ গল্পে আছে চেতনার বহমান স্রোত। আপাত অর্থহীন অসম্পূর্ণ কিছু বাক্য, বাক্য থেকে কখনও কেবল শব্দ, আবার শব্দ ছেড়ে অনেক সময় শুধু বর্ণের আশ্রয়ে বলরাম পাঠককে পৌঁছে দিয়েছেন একলা মানুষটির অবচেতনের অলিগলিতে। গল্প জুড়ে অবচেতনের কথা লিখতে এগজিস্টেনশিয়ালিস্ট বা স্যুররিয়ালিস্টদের মতো প্রচলিত ধারণা থেকে বেরিয়ে সম্পূর্ণ নতুন শব্দ খুঁজেছেন বলরাম। আসলে তিনি বাংলা ছোটগল্প থেকে সেকেলে কার্যকারণবাদকে ছুড়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। গল্পে গল্পে ভেঙে ফেলেছিলেন বাইনারি বৈপরীত্য।

বলরাম বসাক বিশ্বাস করতেন গল্প হল গল্পকারের একান্ত নিজস্ব শিল্পমাধ্যম; গল্প একটি গদ্যশিল্প। তাই শিল্পধর্ম অনুযায়ী একজন চিত্রশিল্পী যেমন রং-তুলি-ক্যানভাস নির্বাচনে সচেতন থাকেন, অনুরূপভাবে গদ্যশিল্পীকে তাঁর নিজস্ব অনুভবের জগৎ ফুটিয়ে তুলতে বেছে নিতে হয় উপযুক্ত শব্দ। তারপর সেই শব্দকে এমনভাবে সাজাতে হয়, যাতে লেখকের উপলব্ধির একটি প্রকৃত পরিমণ্ডল তৈরি হয়ে ওঠে। গল্পকার প্রতিটি গল্পে যেহেতু ভিন্ন ভিন্ন উপলব্ধির প্রকাশ ঘটান, তাই শব্দ-পরিমণ্ডলটিও বদলে নিতে হয়। ফলে একটি গল্পের আঙ্গিক থেকে অন্য গল্পের আঙ্গিক আলাদা হয়ে পড়ে। বলরাম মনে করতেন গদ্যের পরিবর্তনেই গল্পের পরিবর্তন আনা সম্ভব। ফিউচারিস্টরা বস্তুজগৎকে যেমন চিত্রময়তায় ধরতে চাইতেন, বিটোফেন ছুঁতে চাইতেন নাদময়তায়, তেমনি বলরাম বস্তুজগৎকে নিজের মতো করে পেতে চাইতেন গল্পে; শব্দ সমাবেশে। শব্দের ধ্বনি এবং অর্থ– এই দু’টি মাত্রাকেই তিনি প্রাধান্য দিতে চাইতেন। আবার শব্দের দৃশ্যগত রূপটিকে কাজে লাগিয়ে বৈচিত্রময় শব্দসজ্জায় তিনি পাঠক-মনে প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে চাইতেন গল্প রচনার মধ্য দিয়ে। কখনও কখনও শব্দ নিয়ে খেলা করার প্রবণতা তাঁর গল্পকে পৌঁছে দিয়েছে বিপজ্জনক সীমায়। তবে সেই সীমাবদ্ধতা তিনি আবার কাটিয়েও উঠেছেন। শব্দের ধ্বনি-ব্যঞ্জনাকে কাজে লাগিয়েও তিনি গল্পের অর্থ পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছেন অবিকৃতভাবে। তাঁর গল্পে কাহিনি কিংবা বক্তব্য খোঁজা অবান্তর। শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলনের আদর্শে গল্প লিখতে এসে বলরাম মুখরোচক কাহিনি কিংবা জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য উপস্থাপন করেননি কোনও গল্পে। শুধু অন্তর্জীবনের অনুভূতিটুকু তাঁর গল্পে ফুটে উঠেছে সচেতন শব্দ সমাবেশে। গতানুগতিক গল্পপাঠে অভ্যস্ত পাঠক দুর্বোধ্য বাহানা দিয়ে বলরামের গল্পগুলিকে বাতিল করতেই পারেন, কিন্তু সংখ্যা নয়, বলরাম দাবি করেন সহানুভূতি, সূক্ষ্ম সংবেদন। সংবেদনশীল পাঠক তাই বলরামকে খুঁজে নেন, ফিরে পড়েন তাঁর শাস্ত্রবিরোধী গল্পগুলি।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved