Story of Elephant Seal Neil: Privacy Matters for Wildlife। Robbar
Robbar
  • ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২৬ আগস্ট ২০২৬

আমাকে আমার মতো থাকতে দাও

অস্ট্রেলিয়ায় সমুদ্র থেকে উঠে আসা এক বিশাল এলিফ্যান্ট সিল বারবার ঢুকে পড়ছে শহরে। কখনও পার্কিং লটে, কখনও গৃহস্থের বাড়ির সামনে, কখনও নির্বিঘ্নে বেড়ার পাশে সে ঘুমিয়ে কাদা! অস্ট্রেলিয়ার কর্তৃপক্ষ ব্যাপারটি জেনে একটি কথাই বলেছে: ওকে একটু একা থাকতে দিন।

 

Published by: Robbar Digital

Posted:July 8, 2026 11:11 am | Updated:July 10, 2026 12:11 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

মার্কিন সরকারের স্বাধীন মহাকাশ গবেষণা সংস্থার নাম যে সংক্ষেপে ‘নাসা’, এতে বাঙালি নির্ঘাত পরমানন্দ বোধ করেছিল। কারণ বাঙালির দু’-খানা নাক। একটায় সে শ্বাস নেয়, আরেকটা যেখানে-সেখানে গলায়। খোদ মার্কিন সংস্থা, মহাকাশে নাক গলাবে, নাম রেখেছে নাসা– এ নিয়ে বাঙালি উচ্ছ্বসিত না-হলে আর হবেটাই বা কে!

zoom
লম্বা নাকের পিনোচিও, নাক গলানোর সঙ্গে তার যদিও সম্পর্ক নেই

জীবন যে আসলে প্রাইভেট লিমিটেড, জানলার ফাঁকে গণতন্ত্র লুকিয়ে নেই, ভয়েরিজম আছে– একথা বাঙালির মগজে সহজে ঢোকে না। তাই ‘ব্যক্তিগত’ শব্দটা তাও যা মিনমিন করে মেনেটেনে নেয়, ‘প্রাইভেসি’ শব্দটা এখনও নাগরিকত্ব পায়নি। ব্যাপারটা অনেকটা যুবভারতীর মেসির কোমর, চাইলেই জড়িয়ে ধরা যায়। যা ব্যক্তিগত, তাই পবিত্র– এমন একটা দার্শনিক কথা উড়ে এসে পড়েছে বটে শীতের শুকনো পাতার মতো, তবে বেশিরভাগই, পবিত্র কে– এ নিয়ে ধুন্ধুমার করেছে!

ধুরন্ধর বাঙালি, কে না জানে, সাতসকালে হাগুমুতুব্রাশচান পেরিয়ে কৌতূহলের মুগুর ভাঁজে। তার তো শরীর নিয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই, সে বুদ্ধিবৃত্তির টবে জল দেয় রোজ। নিজেকে ফেলুদা কিংবা ব্যোমকেশ ভাবে। চেনা পরিচিতদের কেস হিস্ট্রি ও মিস্ট্রি নিয়ে মনের ভিতরে দেড়শোখানা হিড্‌ন ফাইল গড়ে ফেলেছে। খবরের কাগজ-নিবিষ্ট বাঙালির মন খাবলেছে ফেসবুক-ইন্সটাগ্রাম। মেটা যেটা চাইবে, হবে তো সেটাই বাপু! তাছাড়া এখানে আরও টাটকা এবং ফাটকা খবরের খয়রাতি। নিউজ চ্যানেলে তো সব বাটখারা সাইজের ভারী খবর। বাঘা বিশ্লেষণ, ফ্যাক্ট চেক, তক্কবিতক্ক। ফলে ইন্টারনেটকে মাসিক ভেট দিয়ে প্রাইভেট সব খবরাখবর ক্ষণে ক্ষণে ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের মতো টেনে নেওয়াই এখন আত্মতুষ্টি। মনের পুষ্টি।

zoom
শিল্পী: অ্যালবার্তো জিয়াকোমেত্তি

এতেও অবিশ্যি শান্তি নেই, রক্তমাংসে ক্লান্তি নেই। প্রাইভেসি ভাংচুর কি স্রেফ ডিজিটালে? সম্মুখ সমরে হবে না? ডিজিটাল ইন্ডিয়া যতই হোক না কেন, এক্স-কে স্টক করে ১০ খণ্ড হাড়হিম রগরগে অমনিবাস নামালেও, বাস-ট্রাম-মেট্রো সফরে পাশের ফোনের হোয়াটসঅ্যাপ স্মাইলির রহস্যভেদে কিছু নাকলম্বু বাঙালির জুড়ি নেই! এমন তদগতচিত্তে ভাবসমাধিস্থ হয়ে যায় তারা, যে, নাড়া দিলেও দু’-চার সেকেন্ড সাড়া মেলে না। বাধ্যত বাঙালির এককালীন কানের পোকা বের করে দেওয়া সংগীতের বুলি যে ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’ হবে, সে নিয়ে আর সন্দেহ কী! গোপনীয়তা কখন যে গপ্পনীয়তা হয়ে উঠবে, কে জানে!

তবে শুধুই কি পড়শির সাঁড়াশি কৌতূহল? নিজেও নিজের ব্যক্তিগত পরিসরের পর্দা সরিয়ে বারেবারে হাটখোলা করে দেওয়ার একটা ধাঁচ তো অনেককালই উদয় হয়েছে। কী পরছি, কী খাচ্ছি, কতগুলো মশা-মাছি মারছি, ডেস্টিনেশন চুম্বন থেকে সোলো ট্রিপের সবজে বনজঙ্গল, সদ্যোজাত সন্তানের সঙ্গে ভ্লগ থেকে শ্মশানে আত্মীয়বডির আনন্দলোক যাত্রা– কী না হয়ে উঠছে ‘কনটেন্ট’! বিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং গরিব– এই তিন তিরিক্ষের মধ্যেই ঘেঁটে-ঘ বাঙালির প্রাইভেসি বোধ। সেসব বস্তুত বোঝানো বহু শতাব্দীর মনীষীর কাজ।

এ-ও ঠিক যে, এই প্রাইভেট ফিউশনে বাঙালি বেশ মানিয়ে-গুছিয়ে নিয়েছে। কবে বিয়ে করবে থেকে কবে বাচ্চা– এহেন মিশমিশে ভদ্র প্রশ্ন তো বাঙালির ঐতিহ্যে মিলেমিশে গিয়েছে। কেউ কেউ যে আনলার্ন করেননি, তা নয়। সক্কলে তো আর কৌতূহলের হলাহল পান করেননি। অমৃতের সন্ধানও পেয়েছেন অনেকে। কিন্তু এসবই তো মানুষের প্রাইভেসি, না-মানুষের প্রাইভেসি নিয়ে কি খুব কথাবার্তা হয়?

নিতান্ত সাধারণ এক ঘটনা। অস্ট্রেলিয়ায় সমুদ্র থেকে উঠে আসা এক বিশাল পুরুষ এলিফ্যান্ট সিল বারবার ঢুকে পড়ছে শহরে। তার নাম নিল। ওজন প্রায় হাজার কেজি। বয়স ৫। নিল প্রতি বছর দু’বার সমুদ্রে দীর্ঘ সময় কাটানোর পর তাসমানিয়ার উপকূলে বিশ্রাম নিতে আসে। সামাজিক মাধ্যমে তার ভক্তকুল ১৪ লক্ষেরও বেশি! সে কী কাণ্ড করেছে? রাস্তার ব্যারিয়ার ভেঙেছে। ট্রাফিক বোলার্ড বাঁকিয়ে দিয়েছে। বেড়া ভেঙে ফেলেছে কোথাও কোথাও। এমনকী, কখনও কখনও রাস্তার মাঝখানে শুয়ে পড়ে যানচলাচলও বন্ধ করে দিয়েছে। পার্ক করে রাখা গাড়ির সঙ্গেও খণ্ডযুদ্ধ করতেও দেখা গিয়েছে তাকে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, নিল এইসব করছে, কারণ শক্তি পরীক্ষা করতে চাইছে সে। আশপাশে অন্য কোনও চাঙ্গা সিল না-থাকায় এই সমস্ত পরীক্ষানিরীক্ষা ! কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বন্যকর্মীরা এ-নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়। বরং উদ্বিগ্ন এ নিয়ে যে, বেশ কিছু মানুষ নিলের এহেন কর্মকাণ্ডে উত্তেজিত হয়ে ছবি-ভিডিও করতে যাচ্ছেন! এমনকী, শিশুরাও।

zoom
নিল। এলিফ্যান্ট সিল

নিল কখনও পার্কিং লটে, কখনও গৃহস্থের বাড়ির সামনে, কখনও নির্বিঘ্নে বেড়ার পাশে ঘুমিয়ে কাদা! এহেন পরিস্থিতি যদি ভারতে হত, ঘটনায় বাড়তি রং লাগত নির্ঘাত! হইহই রইরই! লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন। পাড়ার কেউ কেউ বলে উঠত, বলি হচ্ছেটা কী, যখন-তখন যে কেউ এসে, তায় একটা আজগুবি প্রাণী, ঝিমোবে– কেউ কোনও দায়িত্ব নেবে না! কাউন্সিলারগুলো হয়েছে মহা ঢ্যাঁটা। কেউ হয়তো ধারালো অস্ত্র দিয়ে খানিক খুঁচিয়ে দিত। কেউ দেশলাই জ্বালিয়ে টিপ প্র্যাকটিস। সদয় কেউ কেউ হয়তো বন দফতরে ফোন করতেন। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপার-স্যাপার বুঝে একটি কথাই বলেছে: ওকে একটু একা থাকতে দিন। নিরাপদ দূরত্বে থাকুন।

শুনে মজা লাগে বটে। কিন্তু গভীরতর অসুখটা বুঝে নেওয়া দরকার। পৃথিবীটা যে স্রেফ মানুষ জাতটার নয়, পৃথিবীটাকে একঘেয়ে তিতকুটে করে দেওয়ার কোনও অধিকারই যে নেই, ‘প্রাইভেসি’ শব্দটা স্রেফ মানুষের একচ্ছত্র নয়, প্রাণীকূলেরও তাতে শেয়ার রয়েছে– এই বিষয়টা আন্তরিকভাবে শরীরে-মনে গ্রহণ করা প্রয়োজন। চোখের সামনে ঘটে চলা সমস্ত কিছুই যে ‘কনটেন্ট’ নয়, যে কোনও জড় বা জীবিতকে দেখার-ছোঁয়ার-রেকর্ড করার অধিকার আমাদের নেই– এই ব্যাপারখানার আত্মীকরণ দরকার। যে-প্রাণী বহু বচ্ছর সমুদ্রের ধারে আপন ছন্দে বেঁচেবর্তে এসেছে, তারও তো ব্যক্তিগত পরিসর আছে। সে হয়তো-বা খানিক বিশ্রাম নিতেই এসেছে লোকালয়ে। তবে সেই বিশ্রামের ভবিষ্যৎ কি স্রেফ ‘ভাইরাল’ কনটেন্ট হয়ে ওঠা? নিজস্ব সময় বলে তার কিছুই থাকবে না? কেবলই থাকবে বিবিধ নিজস্বী?

প্রকৃতি ও তার উপাদান আমরা কীভাবে দেখি? প্রতিবেশ বা প্রতিবেশী হিসেবে? নাকি স্রেফ দর্শনীয় বস্তু হিসেবে? বনে হরিণ দেখলেই গাড়ি থামাই, পাহাড়ে ভালুক দেখলে ভিডিও করি, ডলফিন দেখলে নৌকায় বসে তাড়া করি। প্রাণীর সঙ্গে দেখা হওয়া আর সহাবস্থান নয়? শুধুই কনটেন্ট, কনটেন্ট এবং কনটেন্ট? হয় বন্দি নয় ক্যামেরাবন্দি– এই দু’প্রকার সভ্যতার আমরা চারিয়ে দিতে পেরেছি ডিজিটাল আধুনিকতায়।

অস্ট্রেলিয়ার এই এলিফ্যান্ট সিল অতিরিক্ত কিছু দাবি করেনি। চেয়েছে সামান্য একটু জায়গা। নিজের জীবনটাকে একটু বুঝেসুঝে নিতে চেয়েছে। সামুদ্রিক একঘেয়েমি থেকে সরে, একটু হাওয়াবদল চেয়েছে। কর্তৃপক্ষকে বলে দিতে হয়েছে বটে, তাকে যেন ঘিরে না-ফেলা হয়, তার দিকে বাড়তি না-তাকানো হয়, ক্লিক না-করা হয়– ইত্যাদি ইত্যাদি। যে শহরে নিল এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে, ঝিমোচ্ছে, মাঝেসাঝে দুষ্টুমিও করছে– সেখানকারই একজন বাসিন্দা, সংবাদমাধ্যমে বলেছেন: ‘এটা নিলেরই পৃথিবী, আমরা এখানে বাস করছি মাত্র।’

না-মানুষদের প্রতি মানুষের, এমন নীরবতাময় সম্মানজনক দূরত্ব রচনা, বা রচনার চেষ্টাটুকুও কি আমাদের খুব বেশি চোখে পড়ে?

ElephantSealNeil EnvironmentalAwareness Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar WildlifeConservation WildlifePrivacy

Share this article on