


একদিকে প্রথাগত মন্দির অর্থনীতি, তার সঙ্গে ঔপনিবেশিক শক্তির উত্থান, ব্রিটিশদের আসার সঙ্গে সঙ্গে কলেরা, স্বাস্থ্য, মহামারি নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর। এরই সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জাতপাত নিয়ে আন্দোলন। ১৯৩০-এর প্রখ্যাত টেম্পল এন্ট্রি মুভমেন্টের প্রায় ৫০ বছর আগে যে উড়িষ্যাতেও দলিত আন্দোলন হয়েছে, এই বহুমাত্রিক ইতিহাস অনুধাবন জরুরি। ধর্মীয় ঐতিহ্যের গরিমা নিয়ে লিখে যাওয়া একরকম, কিন্তু ইতিহাসচর্চা বোধহয় তার থেকে বেশি কিছু দাবি করে।
‘সুর উঠছে তালে তালে; ঢোল, করতাল সহযোগে। রথে আরোহিত পূজারীরা উৎসাহিত হয়ে কিছু একটা বলছেন… সামনেই অপ্রতিরোধ্য ভিড়, প্রবল ঝাঁকুনি বা তরঙ্গের ন্যায় অনেকে রথের দড়ি টানছে। ঘর্মাক্ত অবস্থায়, উচ্চস্বরে, প্রায় লাফিয়ে, গান গেয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে প্রার্থনারত জনতা।’
স্কটিশ ঐতিহাসিক W. W. Hunter, তার বিখ্যাত বই ‘History of Orissa’-তে এমনই বর্ণনা দিয়েছিলেন পুরীর রথযাত্রা সম্পর্কে। ব্রিটিশ শাসক বা সাহেব মিশনারিরা এদেশে এসে জগন্নাথকে দেখে বলেছিলেন ‘Juggernaut’ (অপ্রতিরোধ্য); ক্লডিয়াস বুকাননের এই কুখ্যাত উক্তি বেশ অনেকদিন ধরেই সমালোচিত ভারতীয় ইতিহাসে। প্রবল ভিড়ে তীর্থযাত্রীরা নিজেদের মধ্যে ঠেলাঠেলি করে কী পুণ্য অর্জন করতে চাইছেন; এই নিয়ে ধন্দে থাকা বুকানন মনে করেছিলেন যে, ধর্মে আর যা-ই থাকুক না কেন, এমন বিশৃঙ্খলা বা অরাজকতার কোনও স্থান নেই। সাম্রাজ্যবাদীদের এ হেন নিন্দা; চরক, রথ বা লোক-উৎসব নিয়ে ভ্রু-কুঞ্চন আসলে ওরিয়েন্টালিস্ট গেজ বা প্রাচ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির নামান্তর। এই নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে পণ্ডিতমহলে। আপাতত সেই মতাদর্শে না-গিয়ে, এই প্রবন্ধে ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে পুরীর অবস্থা খুব সংক্ষেপে বিশ্লেষণ করা যাক। প্রাচীন তীর্থস্থান থেকে একটি আধুনিক জনবসতিপূর্ণ শহরে রূপান্তরিত হওয়ার এই গাথা বেশ অভিনব।

‘নীলাচল’, ‘নীলাচল-পুরী’, ‘পুরুষোত্তম ক্ষেত্র’– এমন নানা অভিধায় পুরীর উল্লেখ ‘স্কন্দ পুরাণ’ বা ‘ব্রহ্ম পুরাণ’-এ পাওয়া গেলেও এই শহরে স্থায়ী বসতি বৃদ্ধি পেতে শুরু করে উনিশ শতকে। ভারতের অন্যান্য তীর্থস্থান– গয়া, কাশী বা বেনারসের সঙ্গে পুরীর একটি মৌলিক পার্থক্য আছে। বেনারস বা গয়াতে স্থায়ী জনবসতিকে কেন্দ্র করে শহর গড়ে উঠেছে সেই প্রাচীনকাল থেকেই। কিন্তু পুরীর জনসংখ্যা সর্বদাই ভ্রাম্যমাণ (ফ্লোটিং পপুলেশন)। অর্থাৎ তীর্থযাত্রীরা পুজো শেষে ফিরে যাবেন নিজভূমে– এই ছিল রেওয়াজ, অন্তত আঠেরো শতক পর্যন্ত। পার্শ্ববর্তী কটক, বালাশোরে জনপদ গড়ে উঠলেও পুরীতে পুজো দিয়ে প্রায় সকলেই প্রত্যাবর্তন করতেন। উনিশ শতক থেকে এই অভিবাসনের চিত্র খানিক বদলাতে শুরু করে, মূলত দু’টি কারণে। এক, মেদিনীপুর থেকে পুরী অবধি নিউ জগন্নাথ ট্রাঙ্ক রোড আরও উন্নত হয় ব্রিটিশদের প্রয়াসে। এছাড়া ১৮৯৮ সালে পুরীতে রেলস্টেশন তৈরি হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হয়ে যাওয়ায় সাহেবসুবোরা পুরীর সমুদ্র সৈকতের কাছে বাড়ি বানিয়ে থাকতে শুরু করেন। মুঘল আমল বা মারাঠি শাসনে যা সম্ভব ছিল না, রেলের আগমনে বিদেশি জেসুইটস, আমলা, ভক্তকূল– প্রত্যেকেই বসতি গড়তে উদ্যোগী হন পুরীতে। কলকাতায় যেমন ‘ন্যাটিভ মানুষকে’ বাদ দিয়ে ‘হোয়াইট টাউন’ তৈরি করেছিল ব্রিটিশরা, তেমনই পুরীর মন্দিরের কাছে না-থেকে, সমুদ্রের ধারে নিজেদের কাছারি বা বাংলো তৈরি করা শ্রেয় মনে করেছিলেন সাহেবরা। কলকাতার ব্ল্যাক টাউন-হোয়াইট টাউনের আদলে পুরীতেও স্বতন্ত্র বসতি তৈরি হয়েছিল বর্ণ বা রেসের নিরিখে।

পুরীর রথযাত্রার ইতিহাস বলতে গেলে ব্রিটিশ আমলের কলেরা মহামারীর প্রসঙ্গ উত্থাপিত হবেই। ঐতিহাসিক ডেভিড আর্নল্ড বলছেন যে, ১৮৬৬ সালে কনস্ট্যানটিনোপলে সংঘটিত একটি সভায় পুরীর তীর্থ সমাগমকে দায়ী করা হয় বিশ্বে বিবিধ স্থানে কলেরা ছড়ানোর জন্য। ইতিপূর্বে মক্কাকেও দায়ী করা হয়েছিল এই রোগ সংক্রমণের হেতু হিসেবে। পুরীর সরু গলি, জুন-জুলাই মাসে বর্ষার প্রারম্ভে প্রচুর মানুষের সমাগম, রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে মিছিল, অব্যবস্থা, থাকার জায়গার অভাব এবং সর্বোপরি মন্দিরের ভোগের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলে ব্রিটিশরা। রথযাত্রা মানেই প্রচুর দর্শনার্থী আসবে, তারা মন্দিরের পাণ্ডাদের মধ্যস্থতায় অত্যন্ত ছোট, কুঠুরির মতো ঘরে থাকতে বাধ্য হবেন, আর সেই অস্বাস্থ্যকর আবাসনগুলোই কলেরার আখড়া– এমনই মনে করেছিল প্রশাসন। একটি সরকারি রিপোর্টে বলা হচ্ছে যে, পুরীর ১২/২০ ফিটের একটি ঘরে উৎসবের সময় ৪৫ জন পর্যন্ত তীর্থযাত্রী বসবাস করেছে। ঐতিহাসিক উজান ঘোষ বলছেন যে, এই খুপরি ঘরগুলোকে ব্রিটিশরা মজা করে আলিপুর জেলের সেল বা সিরাজের অন্ধকূপ হত্যার সঙ্গে তুলনা করতেন। ১৮৬৯ সালের জুলাই মাসে পুরীতে এত সংখ্যক তীর্থযাত্রীর মৃত্যু হয় যে সরকার কলেরা হাসপাতাল তৈরি করতে বাধ্য হয়। কোয়ারেন্টাইন করে রুগীদের রাখা, কলেরার ওষুধ, ডাক্তার, বিবিধ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। কিন্তু এই সবই ব্রিটিশদের মহানুভবতা ভেবে নিলে ভুল হবে, বরং কলেরার জন্য বারবারই তারা দায়ী করেছে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরকে। এই তিরস্কারের নেপথ্যে যতটা না ছিল সাধারণ মানুষকে বাঁচানোর স্পৃহা তার থেকে অনেক বেশি ছিল ক্ষমতার প্রশ্ন। কলকাতা, বোম্বে বা দিল্লিতে যত সহজে তারা যুদ্ধ পরবর্তী শাসন কায়েম করতে পেরেছিল, পুরীতে তা হয়নি। এই এলাকার বেশিরভাগ জমি, জল এবং সম্পত্তির মালিক ছিল জগন্নাথ মন্দিরের পুরোহিত শ্রেণি। চাষের জমি থেকে নিয়মিত ধান নিয়ে প্রতিদিনের ভোগ তৈরি কিংবা অতিকায় জলের ট্যাঙ্ক নিজেদের অধীনে রেখে মন্দিরের নিত্যদিনের কাজ চালানো, সবেতেই ছিল তাদের একচ্ছত্র অধিকার। এমতাবস্থায় ব্রিটিশদের রাজস্ব ব্যবস্থা বা ট্যাক্স আদায়ের পথ ছিল বিপন্ন। আসলে কলকাতা বা বোম্বেতে রাজনৈতিক পটবদল যেভাবে হয়েছে, এক শাসক চলে গিয়ে বিদেশি রাজা/বণিকের আগমন, পুরীতে তা হয়নি। সেখানে জগন্নাথ মন্দির যে শুধুমাত্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়, বরঞ্চ অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক কেন্দ্রও বটে, এটি বুঝতে ব্রিটিশদের খানিক সময় লাগে, এবং সেই মর্মে কিছুটা পিছুও হটতে হয় তাদের। রথের সময় অব্যবস্থা চূড়ান্ত হলে মন্দিরের হাইজিন, শৃঙ্খলা বা দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে প্রশাসনের পক্ষ থেকে। প্রথমদিকে ব্রিটিশরা ‘পিলগ্রিম ট্যাক্স’ বা তীর্থস্থানে কর বসাতে চাইলে তা একেবারে নিষ্ফল হয়। শেষ পর্যন্ত ‘পুরী লজিং হাউস অ্যাক্ট’ পাশ হয় ১৮৭১ সালে। এখানে বলা হয় যে, অস্বাস্থ্যকর ঘর তৈরি করে, পাণ্ডাদের মধ্যস্থতায়, তীর্থযাত্রীদের যত্রতত্র ঠাঁই দেওয়া যাবে না। এর জন্য আগে থেকে লাইসেন্স করাতে হবে ম্যাজিস্ট্রেটের থেকে। একজন হেলথ ইন্সপেক্টর সেই আবাসন পর্যবেক্ষণ করে জানাবে তা বাসযোগ্য কি না! লাইসেন্স করার ক্ষেত্রে এক টাকা মজুরি লাগবে এবং সেই সরকারি অর্থ দিয়েই পুরীর স্যানিটারি ব্যবস্থা মেরামত হবে। এই প্রকল্প যেন পুরীর পুরোহিত শ্রেণি ও ব্রিটিশদের মধ্যে একটি সমঝোতা রূপে গড়ে ওঠে।

পুরীর মন্দিরের পুরাণ গাথা বা ধর্মীয় ইতিহাস নিয়ে প্রবল চর্চা হলেও, উনিশ শতকের এই পর্বগুলি অনেকেরই অজানা। মহামারী, ধর্ম ও সাম্রাজ্যবাদ: এই তিন একসঙ্গে মিলে গিয়ে এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় উড়িষ্যায়। ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে প্রাচীন মন্দির আর কলোনিয়াল রাষ্ট্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব ভারতীয় ইতিহাসে বিরল। তবে শাসক-শাসিত কিংবা ব্রিটিশ-নেটিভের সংঘাত ছাড়াও আর একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল পূর্ব ভারতে জাতপাত বিরোধী আন্দোলন। পুরীর মন্দিরকে কেন্দ্র করে উনিশ শতকে কাস্ট মুভমেন্টও হয়েছে। ১৮৮১ সালে জগন্নাথ মন্দিরে কুম্ভী পটুয়া জাতি প্রবেশ করে একবাটি ভাত নিয়ে, তারা ব্রাহ্মণ্যবাদ বা জাতপাতের কঠোরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে চেয়েছিল, ছুৎ-অচ্ছুতের বর্ম ভেঙে। ঐতিহাসিক ঈশিতা বন্দ্যোপাধ্যায় দুবে এই নিম্নবর্গের ইতিহাসের কথা তুলে ধরেছেন তাঁর বইয়ে। কয়েক বছর আগেই প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোভিন্দকে পুরীর মন্দিরে গর্ভগৃহে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়েছিল (জাতিতে কোরি বা দলিত বলে); স্বাধীনতার পূর্বেও দেখা গিয়েছে মহাত্মা গান্ধী বা বাবাসাহেব আম্বেদকরের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ। এমন দৃষ্টান্তের মধ্যে ১৮৮১ সালের দলিত আন্দোলন উড়িষ্যার ইতিহাসে আলাদা মাত্রা যোগ করে।

সব শেষে বলা যায় যে, উনিশ শতকের পুরী নিয়ে হয়তো আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন আছে। একদিকে প্রথাগত মন্দির অর্থনীতি, তার সঙ্গে ঔপনিবেশিক শক্তির উত্থান, ব্রিটিশদের আসার সঙ্গে সঙ্গে কলেরা, স্বাস্থ্য, মহামারী নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর। এরই সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জাতপাত নিয়ে আন্দোলন। ১৯৩০-এর প্রখ্যাত টেম্পল এন্ট্রি মুভমেন্টের প্রায় ৫০ বছর আগে যে উড়িষ্যাতেও দলিত আন্দোলন হয়েছে, এই বহুমাত্রিক ইতিহাস অনুধাবন জরুরি। ধর্মীয় ঐতিহ্যের গরিমা নিয়ে লিখে যাওয়া একরকম, কিন্তু ইতিহাসচর্চা বোধহয় তার থেকে বেশি কিছু দাবি করে। উনিশ শতকের পুরী নিয়ে লিখতে গেলে চলে আসে নানা প্রসঙ্গ: ক্ষমতার লড়াই, জাতপাতের বৈষম্য এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের সামাজিক জীবন। এই জটিল অথচ অভিনব প্রতর্কগুলি নিয়ে আগামী দিনে সুদূরপ্রসারী গবেষণা হবে, সেই আশা রাখা যায়।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved