


শিল্প আর শিল্পীর কাজই তো তাই। শুধু আনন্দ দেওয়া কখনওই শিল্পের একমাত্র কাজ বোধহয় না, বোধহয় ভীষণ সুন্দরের মাঝেও একরাশ অস্বস্তি ছুঁড়ে ছুঁড়ে দেওয়া শিল্পের আরও একটি কর্তব্য। হ্যাঁ, কর্তব্যই বটে। যখন এই নীরবতার আস্ফালন মহামারিতে পরিণত হয়, তখন শিল্পেও সেই অস্বস্তি আসা কাম্য আর সেখানেই এই প্রদর্শনীর সার্থকতা। এই প্রদর্শনী আমাদের সেই সব প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়, যা হয়তো আমরা প্রত্যেক দিনের জীবনে নানাভাবে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। এই প্রদর্শনী দেখাতে পারে, কীভাবে কতগুলো ব্যক্তিগত বেদনা আসলেই একটি বৃহত্তর সামাজিক কাঠামোর অংশ।
সখা, আপন মন নিয়ে কাঁদিয়ে মরি, পরের মন নিয়ে কী হবে।
আপন মন যদি বুঝিতে নারি, পরের মন বুঝে কে কবে॥

কথায় বলে মনের খবর বোঝা জটিল কাজ। পৃথিবীর সবথেকে সরল সাধাসিধে মানুষের মনও বোধহয় বুঝে নেওয়া জটিলতর একটি কাজ– মনের তল পাওয়া এতটাই কঠিন। রবীন্দ্রনাথের কথা টেনে তাই বলাই যায় নিজের মনের তল পাওয়াই যেখানে দুঃসহ, সেখানে পরের মন বোঝা তো অসাধ্যসম।


বোধহয়, মন আর মননের এমন অধরা মাধুরীর জন্যই মনের খোঁজে বারবার আমরা ডুব দিই। হবে নাই বা কেন! এই দশকের সবথেকে বেশি আক্রান্ত কিছু যদি থেকে থাকে আমাদের জীবনে, তা হল মন। কোভিডের কথাই ভাবুন, কী অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে বন্দিজীবন কাটিয়েছি আমরা।


NCRB রিপোর্ট বলছে করোনা মহামারির পর থেকে মানুষের মধ্যে আত্মহননের প্রবণতা ক্রমেই বেড়েছে। সরকারি এই তথ্য থেকেই জানা যায়, বিগত কয়েক বছরে আত্মহননের ক্ষেত্রে সমগ্র ভারতের অবস্থান বেশ ওপরেই দিকেই। এপ্রিল ২০২২-এর একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, সে বছর ভারতবর্ষে প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করে মারা গিয়েছেন।


একজন মানুষ যখন মারা যান, যিনি জানেন, যিনি নিশ্চিত তাঁর জীবনে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, যিনি নিজেকে স্বেচ্ছায় নিয়ে যেতে পেরেছেন মৃত্যুর দোরগোড়ায়, তার মনে কেমন ভাবনা চলে তখন? কেমন হয় তার আত্মহননের ডায়েরি। এ প্রশ্ন বোধহয় চিরন্তন। নানান গুণীজনে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন বারবার, ঠিক যেমন খুঁজেছেন শিল্পী সৌম্য শঙ্কর বসু, তাঁর সাম্প্রতিক কাজ ‘We Need to Talk in Whispers’-এ। কলকাতার বালিগঞ্জ প্লেসের প্রসিদ্ধ এক্সপেরিমেন্টার গ্যালারিতে এপ্রিল মাসের দু’ তারিখ থেকে শুরু হয়েছে তাঁর এই কাজের প্রদর্শনী।


সমাজে যখনই কোনও বিষয় অস্বস্তির জায়গা তৈরি করে, একজন শিল্পীর তখনই দায় বর্তায় সেই অস্বস্তিকে নিয়ে কথা বলার। নিজের কাজের মাধ্যমে সে বিষয়কে বারবার উল্লেখ করার। সেই কাজটাই এই একক প্রদর্শনীতে নিপুণভাবে করেছেন শিল্পী সৌম্য শঙ্কর বসু। মানসিক স্বাস্থ্যের এক চরমতম বিষয়কে তিনি অত্যন্ত নিপুণভাবে তার মানস সৃষ্টি ‘ব্রিন্নীর ডায়েরি’র মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন। তুলে ধরার সঙ্গে সঙ্গে সেই সংক্রান্ত নানান আলোচনার প্রেক্ষিতকেও তিনি আরও জোরালো করে তুলেছেন।


ব্রিন্নির ডায়েরির পাতা ঘাঁটলে খুঁজে পাওয়া যায় বিচ্ছিন্ন কিছু আত্মহননের নোট, যে নোট এক একজন মানুষের অবসাদ ও অন্তর্ধানের প্রসঙ্গকে তুলে আনে। এখানে শিল্পী সৌম্য শঙ্করের অবদান একজন নিছক আলোকচিত্রী নন, বরং তিনি একজন লেন্স হাতে দাঁড়িয়ে থাকা অনুসন্ধানকারী, যার অনুসন্ধানের পথ দিয়ে একজন দর্শক যেতে যেতে এক অদ্ভুত মনমুগ্ধকর অস্বস্তি অনুভব করে ফেলতে পারে– আর সেখানেই বোধহয় শিল্পীর আসল সাফল্য।

দীর্ঘদিন ধরে এই পৃথিবীর ইতিহাসে ফটোগ্রাফি বা আলোকচিত্র বোধহয় স্মৃতির ধারক ও বাহক হিসেবেই কাজ করে এসেছে। আর সেটাই স্বাভাবিক, কারণ মাধ্যমটির একটি সুস্পষ্ট প্রামাণ্য শক্তি আছে। কিন্তু বারবার এ প্রশ্নও উঠে আসতে পারে, সেই প্রামাণ্য শক্তির বেড়াজাল ছিঁড়ে আলোকচিত্র কি শিল্প হয়ে উঠেছে কখনও?


সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শিল্পী সৌম্য শঙ্করের এই প্রদর্শনী দেখতে আসা খুব প্রয়োজন বলে মনে হয়। এর আগেও বারবার তাঁর নানান কাজে ধরা পড়েছে যে তিনি কখনওই আলোকচিত্রের প্রামাণ্য শক্তির বেড়াজালে নিজেকে বন্দী রাখেননি, বরং তাঁর আলোকচিত্র শিল্প বারবার ইতিহাস খননের কাজ করেছে।


তার সেই খুঁড়ে নেওয়া, খুঁজে পাওয়া ইতিহাস কিন্তু কোনওভাবেই ঠিক ইতিহাস বলতে আমরা যা বুঝি তা নয়। কারণ সে ইতিহাসে রাজা-বাদশার কোনও অস্তিত্ব নেই। বরং সে ইতিহাস সার্বজনীন। সে ইতিহাসে চরিত্রের কোনও আস্ফালন নেই, কিন্তু সেই ইতিহাস অজান্তেই যেন হয়ে ওঠে আমার, আপনার, আমাদের সকলের গল্প।


আর এভাবে শিল্পী বারবার কখনও হারিয়ে যেতে বসা যাত্রাশিল্পের কথা, কখনও প্রান্তজনের স্বপ্নের কথা, আবার কখনও মরিচঝাঁপির কালো অধ্যায়ের কথা তুলে এনেছেন তাঁর আলোকচিত্র শিল্পের মাধ্যমে, ইতিহাস খুঁড়ে বের করা সাধারণের আর্কাইভ ঘেঁটে।


তাঁর এই সাম্প্রতিক কাজেও সেই সাধারণ মানুষের মনের অন্দরের গোপন কিছু টুকরো ছেঁড়া ছেঁড়া পাতার কথাই তুলে ধরেছেন। তুলে এনেছেন আত্মহননের ইতিহাস। মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে আমরা প্রায়শই আলোচনা করে বসি যে, আত্মহত্যাকারী মানুষটির সাথে যদি একটু কথা বলা যেত, তাহলে হয়তো তিনি নিজেকে শেষ করতেন না।


সৌম্য শঙ্করের কাজের এই চরিত্রগুলোর মধ্যে আত্মহননের মুহূর্তের যে একাকিত্ব, যে অবসাদ, তা তাঁর এই ছবিগুলোয় অদ্ভুতভাবে সুস্পষ্ট। সমুদ্রের ধারে ছোট্ট একটি ঘরে রাখা একটি ফুলদানি যে কতটা মর্মস্পর্শী হতে পারে, কতটা না প্রকাশ করতে পারা যন্ত্রণার ধারক হয়ে উঠতে পারে, তা জানতে গেলে এই প্রদর্শনীকক্ষে বারবার ফিরে যেতে হয়। আবার কোথাও মধ্যবিত্ত ঘরের সামান্য ছোট ছোট বস্তু যে সেই একইভাবে প্রামাণ্য শক্তির বেড়াজাল ছিঁড়ে কখন যে রহস্যময় অন্তর্ধানের আর্কাইভ হয়ে ওঠে তা বুঝে ওঠা দায়।

আর সেখানেই প্রদর্শনীর নামকরণের সার্থকতা। গোটা প্রদর্শনীকক্ষে একাকী বেশ খানিকটা সময় কাটালে এই আর্কাইভগুলো জীবন্ত হয়ে কানের কাছে বোধহয় ফিসফিসিয়ে ওঠে, দর্শককে একটা খুব হালকা ধাক্কায় আরামদায়ক জায়গার থেকে সরিয়ে কেমন যেন একটা অস্বস্তির মধ্যে টেনে আনে।


শিল্প আর শিল্পীর কাজই তো তাই। শুধু আনন্দ দেওয়া কখনওই শিল্পের একমাত্র কাজ বোধহয় না, বোধহয় ভীষণ সুন্দরের মাঝেও একরাশ অস্বস্তি ছুঁড়ে ছুঁড়ে দেওয়া শিল্পের আরও একটি কর্তব্য। হ্যাঁ, কর্তব্যই বটে। যখন এই নীরবতার আস্ফালন মহামারিতে পরিণত হয়, তখন শিল্পেও সেই অস্বস্তি আসা কাম্য আর সেখানেই এই প্রদর্শনীর সার্থকতা। এই প্রদর্শনী আমাদের সেই সব প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়, যা হয়তো আমরা প্রত্যেক দিনের জীবনে নানাভাবে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। এই প্রদর্শনী দেখাতে পারে, কীভাবে কতগুলো ব্যক্তিগত বেদনা আসলেই একটি বৃহত্তর সামাজিক কাঠামোর অংশ।


শিল্পী সৌম্য শঙ্কর বসুর এই কাজ সমকালীন ভারতের, তথা বিশ্বের আলোকচিত্র শিল্পে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। ফিসফিসানির শব্দ এখানে চিৎকারের রূপ না নিতে পারলেও এর প্রভাব যে কতটা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, তা জানতে গেলে এই প্রদর্শনী কক্ষে একবার আশা জরুরি। জুন মাসের ২ তারিখ পর্যন্ত Experimentar বালিগঞ্জ প্লেসের গ্যালারিতে চলবে এই প্রদর্শনী।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved