


শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ শ্রীজগন্নাথ দর্শনের জন্য পুরীতে এসেছেন। ফিরে যাওয়ার সময় তাঁরা সঙ্গে নিয়ে গেছেন পটচিত্র, কাঠের জগন্নাথ মূর্তি, তালপাতার চিত্র, মুখোশ এবং অন্যান্য শিল্পসামগ্রী। ফলে তীর্থযাত্রার পথই হয়ে উঠেছে পুরীর শিল্প ও সংস্কৃতির বিস্তারের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
ভারতের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে পুরী এক অনন্য তীর্থনগরী। এখানে ধর্ম, আচার, শিল্প এবং দৈনন্দিন জীবন পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। শ্রীজগন্নাথ মন্দিরকে কেন্দ্র করে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে উঠেছে এক বিস্ময়কর শিল্পজগৎ। কাঠে, পাথরে, কাপড়ে, তালপাতায়, মুখোশে, শঙ্খ ও খেলনায় শিল্পীরা ফুটিয়ে তুলেছেন পুরীর ধর্মীয় বিশ্বাস, লোককথা, পুরাণ, উৎসব এবং মানুষের জীবনবোধ। রথযাত্রার সময় এই শিল্পজগতের তাৎপর্য যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশাল তিনটি রথ নির্মাণের কর্মযজ্ঞ থেকে শুরু করে শ্রীজগন্নাথের অনসরকালের পটচিত্র, রথের অলংকরণ, কাঠের বিগ্রহ, মুখোশ, খেলনা, তালপাতার সূক্ষ্ম খোদাই এবং পাথরের ভাস্কর্য– সব মিলিয়ে পুরীর শিল্প একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক পরম্পরা। পুরীর শিল্পকে তাই শুধু ‘হস্তশিল্প’ বলে চিহ্নিত করলে তার সম্পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায় না। এই শিল্পের গভীরে রয়েছে শ্রীজগন্নাথ সংস্কৃতির ধর্মীয় দর্শন, মন্দির-কেন্দ্রিক সেবাপরম্পরা, তীর্থযাত্রার ইতিহাস এবং বংশপরম্পরায় শিল্পচর্চার এক দীর্ঘ ঐতিহ্য।

পুরীর কাষ্ঠশিল্প
দারুব্রহ্ম জগন্নাথ, বিশাল শঙ্খক্ষেত্র পুরী– সেখানে যে শিল্প উৎপন্ন হয় তা সর্বক্ষেত্রে প্রাকৃতিক। পুরীর শিল্প-ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল কাষ্ঠশিল্প বা কাঠের কাজ। এর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রকাশ শ্রীজগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার দারুবিগ্রহ এবং প্রতিবছর নির্মিত রথত্রয়। ভারতীয় মন্দির-ভাস্কর্যের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেববিগ্রহ পাথর বা ধাতুতে নির্মিত। কিন্তু পুরীর শ্রীজগন্নাথ সংস্কৃতিতে কাঠ বা ‘দারু’ লাভ করেছে পবিত্রতার বিশেষ মর্যাদা। জগন্নাথদেবের পরিচয়ের সঙ্গেই যুক্ত হয়েছে ‘দারুব্রহ্ম’ ধারণা। কাঠ এখানে নিছক শিল্পের উপকরণ নয়; তা ধর্মীয় বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক দর্শনের বাহক।
রথযাত্রার আগে অক্ষয় তৃতীয়া থেকে শুরু হয় তিনটি রথ– নন্দিঘোষ, তালধ্বজ ও দর্পদলন নির্মাণের বিশাল কর্মযজ্ঞ। নির্দিষ্ট প্রজাতির কাঠ, ঐতিহ্যগত নির্মাণপদ্ধতি এবং বংশপরম্পরায় অর্জিত কারিগরি জ্ঞান অনুসরণ করে মহারানা সেবকরা রথ নির্মাণ করেন। প্রতি বছর নতুন করে রথ নির্মাণের এই ঐতিহ্য ভারতীয় শিল্প-ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এখানে স্থায়ী শিল্পবস্তুর পরিবর্তে সৃষ্টি, ব্যবহার এবং পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়ে শিল্পের ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয়। রথ যেন এক চলমান স্থাপত্য– কাঠের উপর নির্মিত এক বিশাল গতিশীল মন্দির। রথের বিভিন্ন অংশে কাঠের খোদাই, অলংকরণ, ঘোড়া, সারথি, পার্শ্বদেবতা এবং নানা প্রতীকী মোটিফ ব্যবহৃত হয়। এই শিল্পকর্মের মধ্যে মন্দির-ভাস্কর্য, লোকশিল্প এবং ধর্মীয় প্রতীকবাদের এক আশ্চর্য সমন্বয় দেখা যায়।

কাঠের খেলনা: লোকশিল্পে জগন্নাথের আনন্দময় রূপ
পুরী ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের কাঠের খেলনা ও ক্ষুদ্র মূর্তি ওড়িশার লোকশিল্পের একটি জনপ্রিয় ধারা। কাঠ খোদাই করে প্রথমে তৈরি করা হয় খেলনা বা মূর্তির মূল অবয়ব। তারপর তার উপর প্রলেপ দিয়ে উজ্জ্বল রঙে আঁকা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই পটচিত্রের চিত্রভাষা, রেখা ও অলংকরণ কাঠের খেলনার গায়ে ব্যবহার করা হয়। জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার ক্ষুদ্র মূর্তি সবচেয়ে জনপ্রিয়। এছাড়া দশাবতার, কৃষ্ণলীলা, রামায়ণের চরিত্র, হাতি, ঘোড়া, পাখি এবং লোকজীবনের নানা দৃশ্য কাঠের খেলনায় ফুটে ওঠে। অপূর্ব কারুকার্য, চোখ জুড়িয়ে মন তৃপ্তি করে। এই খেলনাগুলি বিনোদনের সামগ্রী হলেও তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভূমিকা অনেক গভীর। তীর্থযাত্রীরা স্মারক হিসেবে এগুলি সঙ্গে নিয়ে যান। ফলে একটি ক্ষুদ্র কাঠের খেলনার মাধ্যমে পুরীর ধর্মীয় ও শিল্প-ঐতিহ্য ছড়িয়ে পড়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে। লোকশিল্পের সহজতা এবং পটচিত্রের অলংকরণধর্মী সৌন্দর্য– এই দুইয়ের মিলনে পুরীর কাঠের খেলনা এক স্বতন্ত্র শিল্পরূপ লাভ করেছে।

মুখোশশিল্প: দেবতা, পুরাণ ও লোকনাট্যের রূপান্তর
পুরী ও রঘুরাজপুর অঞ্চলের মুখোশশিল্প ওড়িশার লোক ও ধর্মীয় শিল্পপরম্পরার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কাঠ, কাগজের মণ্ড বা পেপর-ম্যাশে এবং অন্যান্য সহজলভ্য উপকরণ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের মুখোশ তৈরি করা হয়। মুখোশের উপর উজ্জ্বল রং, বলিষ্ঠ রেখা এবং অলংকরণে পটচিত্রের প্রভাব সুস্পষ্ট। জগন্নাথ সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন দেবদেবী, নরসিংহ, গণেশ, হনুমান, দুর্গা, কালী, রামায়ণ ও কৃষ্ণলীলার চরিত্র এবং বিভিন্ন পৌরাণিক রূপ মুখোশে স্থান পায়। রঘুরাজপুর গ্রামের অনেক পরিবার এই মাস্ক তৈরি করছে। ওড়িশার লোকনাট্য, নৃত্য, ধর্মীয় শোভাযাত্রা এবং উৎসবের সঙ্গে মুখোশের ব্যবহার দীর্ঘদিনের। মুখোশ পরার মাধ্যমে শিল্পী কেবল একটি চরিত্রের অভিনয় করেন না; লোকবিশ্বাস অনুযায়ী তিনি সাময়িকভাবে সেই চরিত্রের শক্তি ও পরিচয় ধারণ করেন। এই কারণে মুখোশ পুরীর শিল্পে একইসঙ্গে ধর্মীয় প্রতীক, লোকনাট্যের উপকরণ এবং শিল্পবস্তু। বর্তমানে অনেক মুখোশ গৃহসজ্জার সামগ্রী হিসেবে ব্যবহৃত হলেও তার ঐতিহাসিক ভিত্তি নিহিত রয়েছে ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং লোকজ অভিনয়-পরম্পরায়।

তালপত্র চিত্র: পাতার শরীরে খোদিত এক পুরাণকথা
পুরীর শিল্প-ঐতিহ্যের অন্যতম সূক্ষ্ম ও বিস্ময়কর শিল্পরূপ হল তালপত্র চিত্র বা তালপাতার খোদাইচিত্র। ওড়িশায় তালপাতার পুথি নির্মাণের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। একসময় ধর্মীয় গ্রন্থ, পুরাণ, সাহিত্য, জ্যোতিষশাস্ত্র এবং চিকিৎসাবিষয়ক জ্ঞান তালপাতায় লিখে সংরক্ষণ করা হত। ধীরে ধীরে লেখার পাশাপাশি তালপাতার উপর চিত্র অঙ্কন ও খোদাই করার বিশেষ শিল্পরীতি বিকশিত হয়।
প্রথমে পরিণত তালপাতা সংগ্রহ করে বিশেষ পদ্ধতিতে শুকিয়ে ও প্রক্রিয়াজাত করা হয়। তারপর সমান আকারে কেটে পাতাগুলিকে সুতো দিয়ে যুক্ত করা হয়। তালপত্র চিত্রকর্ম তৈরি করা একটি কঠোর পরিশ্রম এবং দক্ষতার কাজ। শিল্পী সূক্ষ্ম লোহার লেখনী বা খোদাইয়ের যন্ত্র দিয়ে পাতার উপর রেখা কেটে চিত্র নির্মাণ করেন। পরে খোদাই করা সেই রেখার মধ্যে কালো রঞ্জক ঘষে দেওয়া হয়। পাতার উপরিভাগ আস্তে আস্তে এবং আলতো করে নরম সুতির কাপড় দ্বারা পরিষ্কার করলে খোদাই করা রেখাগুলি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই শিল্পের প্রধান শক্তি হল রেখা। পটচিত্রের মতো উজ্জ্বল রঙের পরিবর্তে তালপত্র চিত্রে সূক্ষ্ম রেখা, অলংকরণ এবং অত্যন্ত সংযত বিন্যাসের মাধ্যমে কাহিনি নির্মিত হয়। রামায়ণ, মহাভারত, ভাগবত, কৃষ্ণলীলা, দশাবতার, গীতগোবিন্দ এবং শ্রীজগন্নাথ সংস্কৃতির নানা বিষয় তালপত্র-চিত্রের জনপ্রিয় বিষয়।

কিছু তালপত্র-চিত্রে শিল্পীরা বিশেষ ভাঁজ ও স্তরবিন্যাসের কৌশল ব্যবহার করেন। বাইরে একটি চিত্র দেখা গেলেও পাতার অংশ খুললে তার ভিতরে প্রকাশিত হয় আরেকটি দৃশ্য। এই ধরনের শিল্পকর্মকে কখনও কখনও ‘গুপ্তচিত্র’ বা লুকায়িত চিত্ররীতির সঙ্গে তুলনা করা হয়। একটি ছোট তালপাতার উপর অসংখ্য চরিত্র, স্থাপত্য, বৃক্ষ, পশুপাখি এবং অলংকরণ নির্মাণের জন্য যে অসাধারণ ধৈর্য ও দক্ষতার প্রয়োজন, তা পুরীর শিল্পীদের দীর্ঘ সাধনার পরিচয় বহন করে।
পাথরের ভাস্কর্য: কলিঙ্গ স্থাপত্যের উত্তরাধিকার
পুরী, ভুবনেশ্বর ও কোনার্ককে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ওড়িশার পাথর-খোদাই শিল্প ভারতের প্রাচীন ভাস্কর্য-ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা। লিঙ্গরাজ, মুক্তেশ্বর, শ্রীজগন্নাথ এবং কোনার্ক সূর্যমন্দিরের স্থাপত্য ও ভাস্কর্য এই অঞ্চলের শিল্পীদের অসাধারণ দক্ষতার সাক্ষ্য বহন করে। মন্দির নির্মাণের যুগ শেষ হয়ে গেলেও পাথর খোদাইয়ের ঐতিহ্য বিলুপ্ত হয়নি। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান ও কারিগরি দক্ষতা অনুসরণ করে শিল্পীরা এখনও দেবদেবীর মূর্তি, মন্দিরের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ, অলংকরণ, পশুপাখি, প্রদীপ, পাত্র এবং বিভিন্ন গৃহসজ্জার সামগ্রী নির্মাণ করেন। পুরী ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের শিল্পীরা বিভিন্ন ধরনের পাথর ব্যবহার করেন। নরম পাথরে সূক্ষ্ম অলংকরণ সহজে নির্মাণ করা যায়, অন্যদিকে কঠিন পাথরের স্থায়িত্ব ও ভাস্কর্যের বলিষ্ঠতা বৃদ্ধি করে। ওড়িশার ভাস্কর্যে মানবদেহের ছন্দময়তা, অলংকারের সূক্ষ্মতা, নৃত্যভঙ্গি, লতাপাতা, পদ্ম, মকর, গজসিংহ এবং বিভিন্ন পৌরাণিক প্রাণীর ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। রঘুরাজপুর গ্রামে কয়েকজন শিল্পী চমৎকার পাথরের শিল্প করছেন, আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে গরুড় বহনকারী বিষ্ণু আছে। চমৎকার মূর্তি। বর্তমান সময়ে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পীরা একদিকে প্রাচীন মন্দির-ভাস্কর্যের প্রতিরূপ নির্মাণ করছেন, অন্যদিকে আধুনিক শিল্পবাজারের উপযোগী নতুন শিল্পবস্তুও সৃষ্টি করছেন। ফলে পাথর-খোদাই শিল্পে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে একটি স্বাভাবিক সংলাপ তৈরি হয়েছে।

পটচিত্র: পুরীর শিল্পপরিচয়ের প্রাণ
এই শিল্পকলার পরে আমরা দেখতে পাই সবচেয়ে সুন্দর পুরীর ক্লাসিক শিল্প, অর্থাৎ ওড়িশা পটচিত্র। পুরীর শিল্প-ঐতিহ্যের কথা বলতে গেলে পটচিত্রের কথা সর্বাগ্রে আসে। ‘পট্ট’ অর্থ কাপড় বা প্রস্তুত চিত্রপট এবং ‘চিত্র’ অর্থ ছবি। কিন্তু ওড়িশার পটচিত্র নিছক কাপড়ের উপর আঁকা ছবি নয়। এর উৎস ও বিকাশ গভীরভাবে যুক্ত শ্রীজগন্নাথ মন্দিরের আচার এবং ধর্মীয় পরম্পরার সঙ্গে। বিশেষ করে স্নানযাত্রার পর অনসরকালে যখন শ্রীজগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা সাধারণ দর্শনের বাইরে থাকেন, তখন তাঁদের পরিবর্তে ‘অনসর পটি’ বা পটচিত্রে অঙ্কিত দেবরূপ দর্শন ও পূজার জন্য ব্যবহৃত হয়। এই আচার পটচিত্রকে সাধারণ লোকশিল্প থেকে একটি পবিত্র ধর্মীয় শিল্পরূপে উন্নীত করেছে। পটচিত্র নির্মাণের প্রক্রিয়াও অত্যন্ত শ্রমসাধ্য। কাপড়ের একাধিক স্তর তেঁতুলবীজ থেকে প্রস্তুত আঠা ও চকজাতীয় উপাদানের মিশ্রণে যুক্ত করা হয়। তারপর পৃষ্ঠটি ঘষে মসৃণ করে তৈরি করা হয় চিত্রাঙ্কনের উপযোগী পট্ট। প্রথাগতভাবে শিল্পীরা প্রাকৃতিক ও খনিজ উপাদান থেকে রং প্রস্তুত করেন। শঙ্খ থেকে সাদা, প্রদীপের কাজল থেকে কালো, হিঙ্গুল থেকে লাল এবং হরিতাল থেকে হলুদ রং তৈরির ঐতিহ্য রয়েছে। তা ছাড়া কোরাপুট জেলা থেকে তিনটি বিরল নরম পাথর পাওয়া যায়, তারা এটি গুঁড়ো হিসাবে পিষে বিশেষ প্রাকৃতিক আঠার সাথে মিশিয়ে বিভিন্ন রং তৈরি করে।

পটচিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল বলিষ্ঠ ও ছন্দময় রেখা। আলো-ছায়ার সাহায্যে ত্রিমাত্রিকতা নির্মাণের পরিবর্তে সমতল রঙের ব্যবহার, স্পষ্ট বহির্রেখা, অলংকরণ এবং সুশৃঙ্খল বিন্যাসের মাধ্যমে চিত্রের সৌন্দর্য প্রকাশিত হয়। জগন্নাথ, কাঞ্চি বিজয়, নব গুঞ্জরা দশাবতার, কৃষ্ণলীলা, রামায়ণ, মহাভারত, গীতগোবিন্দ এবং বিভিন্ন পুরাণকাহিনি পটচিত্রের প্রধান বিষয়। পটচিত্রে প্রায় কোনও স্থানই শূন্য রাখা হয় না। ফুল, লতা, পাতা, পশুপাখি এবং অলংকরণে সমগ্র চিত্রপট পূর্ণ হয়ে ওঠে। চিত্রের চারদিকে আঁকা অলংকৃত সীমানা বা বর্ডার পটচিত্রের অন্যতম পরিচায়ক বৈশিষ্ট্য। পুরীর কাছে রঘুরাজপুর আজ পটচিত্র শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। গ্রামের বহু পরিবার বংশপরম্পরায় পটচিত্র, তালপত্র খোদাই, কাঠের খেলনা, মুখোশ এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী শিল্পচর্চার সঙ্গে যুক্ত। মূল অনসর পটচিত্র এই গ্রামের কোনও শিল্পী তৈরি করেন, শিল্পী সম্প্রদায় জগন্নাথ মহাপ্রভুকে তাদের জীবন সম্পূর্ণরূপে উৎসর্গ করে জীবনযাপন করে। এখানে শিল্প কোনও বিচ্ছিন্ন পেশা নয়। বাড়ির দেওয়াল, কর্মশালা, পারিবারিক জীবন, ধর্মীয় আচার এবং জীবিকার সঙ্গে শিল্প একাত্ম হয়ে রয়েছে।

রঘুরাজপুরের শিল্পী-পরিবারগুলিতে শিল্পচর্চা কোনও ব্যক্তিবিশেষের পেশা নয়; বরং তা পারিবারিক ও বংশানুক্রমিক ঐতিহ্যের অংশ। পরিবারের প্রবীণ শিল্পীদের পাশাপাশি বাড়ির ছোট ছেলেমেয়েরাও শৈশব থেকেই এই শিল্প-পরম্পরার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠে। পরিবারের আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করার পাশাপাশি শিল্পের প্রাথমিক পাঠ গ্রহণের জন্য তারাও ছোট ছোট শিল্পবস্তু তৈরির কাজে অংশ নেয়। এইভাবেই এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে শিল্পের কৌশল, নকশা ও নান্দনিক বোধ প্রবাহিত হতে থাকে। পটচিত্রের পাশাপাশি রঘুরাজপুরের শিল্পীরা বর্তমানে নানা ধরনের ব্যবহারিক ও অলংকারমূলক শিল্পবস্তু নির্মাণ করছেন। চিত্রিত গহনার বাক্স, মুখোশ, কাঠের খেলনা, ছোট কাঠের ভাস্কর্য, রথ ও মন্দিরের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ, বুকমার্ক, মাটির পাত্রের উপর পটচিত্র এবং এমনকী পরিত্যক্ত কাচের বোতলের উপরেও তাঁরা পটচিত্রের ঐতিহ্যবাহী রেখা, রং ও অলংকরণের ভাষাকে সৃজনশীলভাবে প্রয়োগ করছেন। এর ফলে একদিকে যেমন শিল্পীদের জীবিকার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে প্রাচীন শিল্পরীতিও নতুন উপকরণ ও ব্যবহারিক শিল্পবস্তুর মাধ্যমে সমকালীন জীবনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

গহনার বাক্স বা ‘যৌতুক পেড়ি’
রঘুরাজপুরের শিল্পীদের তৈরি একটি বিশেষ আকর্ষণীয় শিল্পবস্তু হল গহনার বাক্স বা ‘যৌতুক পেড়ি’। এটি মূলত কাঠের তৈরি একটি সুদৃশ্য বাক্স, যার মধ্যে গহনা, অর্থ, মূল্যবান নথিপত্র কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী সংরক্ষণ করা যায়। বাক্সটির গঠন অনেকটা ‘পীড়া দেউল’ রীতির মন্দিরের মতো– ধাপে ধাপে উপরে উঠে যাওয়া চূড়ার আদলে নির্মিত। এর পিরামিডাকৃতি ঢাকনাটি বাক্সের স্থাপত্যধর্মী সৌন্দর্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। ভিতরের অংশটি ফাঁপা এবং ব্যবহারিক সামগ্রী সংরক্ষণের উপযোগী। কাঠের কাঠামোর উপর প্রথমে কাপড়ের আস্তরণ দেওয়া হয়। পটচিত্রের পট্ট প্রস্তুতের প্রথাগত পদ্ধতি অনুসরণ করেই এই কাপড়কে বিশেষভাবে প্রস্তুত করে শুকিয়ে নেওয়া হয়। এরপর তার উপর শিল্পীরা সূক্ষ্ম রেখা, উজ্জ্বল রং ও অলংকরণের সাহায্যে চিত্র অঙ্কন করেন। রামায়ণ, মহাভারত, কৃষ্ণলীলা এবং বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি এই গহনার বাক্সের চিত্রাঙ্কনের প্রধান বিষয়। ফলে ‘যৌতুক পেড়ি’ কেবল মূল্যবান সামগ্রী রাখার একটি ব্যবহারিক বাক্স নয়; কাঠের নির্মাণশৈলী, পটচিত্রের চিত্রভাষা এবং ভারতীয় পুরাণকথার সমন্বয়ে এটি রঘুরাজপুরের শিল্পীদের সৃজনশীলতার এক স্বতন্ত্র নিদর্শন।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ শ্রীজগন্নাথ দর্শনের জন্য পুরীতে এসেছেন। ফিরে যাওয়ার সময় তাঁরা সঙ্গে নিয়ে গেছেন পটচিত্র, কাঠের জগন্নাথ মূর্তি, তালপাতার চিত্র, মুখোশ এবং অন্যান্য শিল্পসামগ্রী। ফলে তীর্থযাত্রার পথই হয়ে উঠেছে পুরীর শিল্প ও সংস্কৃতির বিস্তারের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। এক অর্থে পুরীর শিল্পীরা ছিলেন ভারতের প্রাচীন সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁদের তৈরি শিল্পবস্তু ধর্মীয় স্মারক হিসেবে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ভ্রমণ করেছে এবং শ্রীজগন্নাথ সংস্কৃতির পরিচয় বহন করেছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুরীর ঐতিহ্যবাহী শিল্পও নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। বাজারের পরিবর্তন, দ্রুত উৎপাদিত সস্তা সামগ্রীর প্রতিযোগিতা, প্রথাগত কাঁচামালের অভাব এবং তরুণ প্রজন্মের পেশা পরিবর্তনের প্রবণতা শিল্পীদের জীবনে প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে পর্যটন, প্রদর্শনী, সংগ্রহশালা, ডিজিটাল বিপণন এবং আন্তর্জাতিক শিল্পবাজার পুরীর শিল্পীদের সামনে নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করেছে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved