Nilanjan Halder on philosophy of acting and art of Bijan Bhattacharya | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমাজসচেতন না হলে, অভিনেতা মঞ্চের পুতুল

এমনটাই মনে করতেন বিজন ভট্টাচার্য। বিশ্বাস করতেন, ‘মানুষের কল্যাণে রুটির লড়াই-এর সঙ্গে প্রাণের লড়াইকে এক সূত্রে বেঁধে নাট্য আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই গণনাট্যের মর্মকথা।’ তাঁর ১২০-তম জন্মবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে আজ আমরা বুঝতে পারি, তিনি কেবল মঞ্চের ক্যানভাসে ছবি আঁকেননি, তিনি এঁকেছিলেন মানুষের মুক্তির ছবি। 

শেষ আপডেট: জুলাই ১৭, ২০২৬, ২১:১২   
Facebook WhatsApp Messenger
Nilanjan Halder on philosophy of acting and art of Bijan Bhattacharya | Robbar

বাংলা নাটকের ইতিহাসে বিজন ভট্টাচার্য কেবল একজন নাট্যকার বা নির্দেশক নন, তিনি ছিলেন এক অবিস্মরণীয় পথপ্রদর্শক। ১৯১৫ সালের ১৭ জুলাই ফরিদপুরের খানখানাপুরে জন্মগ্রহণকারী এই মানুষটি বাংলা থিয়েটারকে ড্রয়িংরুমের গণ্ডি থেকে বের করে এনে বাংলার মাটির গন্ধমাখা মানুষের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর ১২০-তম জন্মবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে যখন আমরা তাঁর কর্মের দিকে ফিরে তাকাই, তখন বিস্মিত হতে হয় এই ভেবে যে, কীভাবে একজন মানুষ কেবল শিল্পের প্রয়োজনে নয়, বরং যাপিত জীবনের লড়াই থেকে উপকরণ সংগ্রহ করে মঞ্চকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন। বিজন ভট্টাচার্য আমাদের শিখিয়েছিলেন, ‘সংগ্রাম কথাটাই জীবনদর্শনের প্রথম ও শেষ কথা’। তাঁর এই জীবনদর্শন কেবল একটি কথার কথা ছিল না, বরং তাঁর প্রতিটি নাটকের প্রতিটি সংলাপে, প্রতিটি চরিত্রের রক্তক্ষরণে তা মূর্ত হয়ে উঠেছিল।

zoom
বিজন ভট্টাচার্য

বিজন ভট্টাচার্যের নাট্যজীবনের বাঁকবদল ঘটে ১৯৪৪ সালে, তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি ‘নবান্ন’ নাটকের মাধ্যমে। ‘নবান্ন’ কেবল একটি নাটক নয়, এটি বাংলা রঙ্গমঞ্চের প্রসেনিয়ামের দেওয়াল ভাঙার দলিল। দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাস এবং আমিনপুর গ্রামের প্রধান সমাদ্দারের পরিবারের বিপর্যয় ছিল এই নাটকের মূল উপজীব্য। এই নাটকে প্রধান সমাদ্দারের আর্তনাদ আজও দর্শকদের হৃদয়ে রেখাপাত করে, যখন তিনি বলেন, ‘ভেবেছিলাম অন্নহীনে অন্ন দেব, বস্ত্রহীনে বস্ত্র দেব– আজ তো আমার নিজেরই অন্ন জুটছে না’। এই সংলাপটি কেবল ব্যক্তিগত হাহাকার নয়, এটি তৎকালীন বুর্জোয়া সমাজ ও ব্রিটিশ প্রশাসনের ব্যর্থতার দর্পণ। ‘নবান্ন’ আমাদের দেখিয়েছে যে, শিল্প কোনও বিচ্ছিন্ন জগৎ নয়, তা জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। ঠিক তার আগের বছর, ১৯৪৩ সালে রচিত ‘জবানবন্দী’ নাটকেও আমরা দেখি দুর্ভিক্ষের করুণ চিত্র। মরণাপন্ন পরাণ মণ্ডলের লড়াই এখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র। পরাণ মণ্ডল তার শেষ জবানবন্দীতে বলেছিল, “ঘরে ফিরে যা রমজান– তোরা সব ঘরে ফিরে যা, আমার সেই মরচে-পড়া নাঙল ক’খানা আবার শক্ত করে, শক্ত করে চেপে ধরগে মাটিতি। সোনা বেন্দা, সোনা ফলবে। ফিরে যা ফিরে যা।” এ কেবল একটি সংলাপ নয়, ভূমিহীন কৃষকদের প্রতি বিজন ভট্টাচার্যের এক অমোঘ রাজনৈতিক বার্তা– সংগ্রামই মুক্তির একমাত্র পথ।

বিজন ভট্টাচার্যের নাটকে লোকসংস্কৃতি ও লৌকিক পুরাণের আধুনিক প্রয়োগ এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে। তিনি এই লোকায়ত উপাদানগুলোকে শোষিত মানুষের প্রতিবাদের ভাষা ও বাঁচার হাতিয়ার হিসেবে অত্যন্ত সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছেন। অন্ধ বাউল পবনের জীবনকাহিনি নিয়ে রচিত ‘মরাচাঁদ’ (১৯৪৬) নাটকে শিল্পী ও সমাজের দ্বন্দ্বের স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে। পবনের সেই বিখ্যাত গান, যা বিজনবাবু নিজেও বারবার গেয়েছেন, তা আজও শোষিত মানুষের প্রতিবাদের ভাষা: ‘বাঁচব বাঁচব রে, আমরা বাঁচব রে বাঁচব/ ভাঙা বুকের পাঁজর দিয়া নয়া বাংলা গড়ব।’ এখানে পবনের শিল্পসত্তা শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বিজন ভট্টাচার্য দেখিয়েছেন যে, শিল্পীর গান তার বেঁচে থাকার ও লড়াইয়ের প্রধান শক্তি। আবার ‘দেবীগর্জন’ (১৯৬৬) নাটকে বীরভূম অঞ্চলের সাঁওতাল চাষিদের জীবনসংগ্রাম ও জমিদার-জোতদারদের বিরুদ্ধে তাদের বিদ্রোহ ফুটে ওঠে মংলা ও রত্নার কণ্ঠে। রত্নার কণ্ঠে বিদ্রোহের অমোঘ আহ্বান আমাদের ভাবায়: ‘চামর লড়ব, চষব, ফসল তুলব– তারপর বাবুদের হাতে তুলে দেব? না, আর না!’ এই নাটকটি আমাদের জানায় যে, দেবীগর্জন কেবল পৌরাণিক নয়, এটি শোষিত মানুষের ক্রোধের গর্জন।

বিজন ভট্টাচার্যের মানবিক দর্শনের মহিমা ফুটে ওঠে তাঁর ‘ছায়াপথ’ (১৯৬১) নাটকের ফুটপাতের মানুষদের দর্শনে। দারিদ্রের কশাঘাতে পিষ্ট হলেও তাদের মধ্যে বেঁচে থাকে নিজস্ব সম্মানবোধ। ভিখারির সেই বিখ্যাত সংলাপ, যা আমাদের সমাজের তথাকথিত ভদ্রলোকদের দয়াশীলতার মুখোশ খুলে দেয়: ‘আগে হ্যাঁ বাবা। তবে এঁটো বাসন মাজতি পারব না, আর মেয়েমানষির পরনের কাপড় কাচতই পারব না বাবা।’ এখানেই বিজন ভট্টাচার্যের মানবিক দর্শনের মহিমা– ভিখারি হলেও সে তার স্বকীয়তা ও আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে নারাজ। আবার ‘গোত্রান্তর’ (১৯৫৬-’৫৭) নাটকে উদ্বাস্তু মাস্টার হরেনের চরিত্রটি দেশভাগের ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষের হাহাকারের দলিল। হরেন মাস্টার মধ্যবিত্তের খোলস ছেড়ে বস্তিবাসীদের সঙ্গে মিলেমিশে এক নতুন সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেন। তাঁর সেই অমর জবানবন্দি এখনও প্রাসঙ্গিক: ‘আমার বাধা এক সংস্কার কিন্তু ন্যায়ত ধর্মত যেটা সত্য, তারে আমি অস্বীকার করতে পারুম না।’ এটি কেবল হরেন মাস্টারের সংস্কারমুক্তি নয়, এ বিজন ভট্টাচার্যের নিজের গোত্রান্তর– শ্রেণিচ্যুতি ও গণমুখী হওয়ার অঙ্গীকার।

তাঁর নাট্যসৃষ্টির ক্যানভাসে যেমন স্থান পেয়েছে শোষিতের আর্তনাদ, তেমনই এসেছে রাজনীতির মুখোশ উন্মোচন। ‘জতুগৃহ’ (১৯৫১) নাটকে পুঁজিবাদের অন্তঃসারশূন্যতাকে কেন্দ্র করে রসময়বাবুর আক্ষেপ ফুটে ওঠে, ‘স্বাধীনতা যখন আমরা পেলাম, তখন তার সাতিশয় রূপ আমরা উপলব্ধি করতে পারলাম না। নিষ্ঠার অভাবে দশ হাতে সেই বিগ্রহকে আমরা সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারলাম না।’ এখানে নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য আক্ষেপ করছেন যে, আমরা স্বাধীনতা অর্জন করলেও মানসিকভাবে মুক্ত হতে পারিনি। আবার ‘জননেতা’ (১৯৫০) নাটকে রাজনীতিতে মুনাফাবাজদের দালালি উন্মোচিত হয়েছে নরেন্দ্রনাথের চরিত্রের মাধ্যমে, যে দম্ভ করে বলে, ‘আমার ভাগ আমি নিজে গড়েছি। বুদ্ধি দিয়া হোক, কৌশল করিয়া হোক, দান করিয়া হোক, কি লুঠ করিয়া হোক, আমিই আমার বিধাতা পুরুষ।’ এই সংলাপটি শোষক শ্রেণির নির্লজ্জ অহংকারের এক চরম নিদর্শন। এমনকী, শেষ জীবনে লেখা ‘হাঁসখালির হাঁস’ (১৯৭৭) নাটকেও জনার্দনের সংলাপে ফুটে ওঠে প্রচ্ছন্ন জীবনদর্শন: ‘আমরা আর মানুষনি। মানষির জঞ্জাল। আড়াকুঁড়ি থাকি। আড়াকুঁড়িই বাঁচি তারপর একদিন আড়াকুঁড়ি হয়ে যাই।’ এই জঞ্জাল বা প্রান্তিক মানুষরাই যে ইতিহাসের প্রকৃত নির্মাতা, বিজনবাবু তা তাঁর শেষ নাটকেও বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন।

বিজন ভট্টাচার্যের নাটকের অন্যতম শক্তি ছিল তাঁর ভাষা। ড্রয়িংরুমের মার্জিত ভাষার বাইরে গিয়ে একেবারে তৃণমূল স্তরের মানুষের আঞ্চলিক ভাষাকে তিনি যেভাবে মঞ্চে নিয়ে এসেছিলেন, তা ছিল বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। তিনি বুঝেছিলেন, মানুষের মুক্তির কথা বলতে হলে মানুষের ভাষাতেই বলতে হবে। তাঁর প্রতিটি নাটকের সংলাপ যেন কোনও কোনও সময় প্রামাণ্য দলিলের মতো কাজ করে। যেমন ‘জীয়নকন্যা’ (১৯৪৭) নাটকে তিনি হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গার রূপক হিসেবে মনসামঙ্গলের লোকায়ত পুরাণ ব্যবহার করেছিলেন। সেখানে উলূপীর আর্তনাদ ছিল অখণ্ড ভারতবর্ষের প্রতীক। তিনি দেখিয়েছেন যে, লোকসংস্কৃতি কোনও নিছক বিনোদন নয়, তা সাম্প্রদায়িকতার বিষ তোলার হাতিয়ার হতে পারে।

তাঁর এই নাট্যযাত্রা কেবল নাট্যরচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, ছিল অভিনয়ের নিপুণতায়। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত তিনি অভিনয় করেছিলেন। তাঁর অভিনয়ের আন্তরিকতা ছিল প্রবল। যে বিজন ভট্টাচার্য ‘নবান্ন’তে সাধারণ প্রধান সমাদ্দারের চরিত্রে অভিনয় করেন, তিনিই আবার ‘দেবীগর্জন’-এ খল চরিত্র ‘প্রভঞ্জনের’ চরিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর অভিনয় দক্ষতা দেখে দর্শকরা বিস্মিত হয়ে যেতেন, কারণ প্রতিটি চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়ার অদ্ভুত কৌশল তিনি জানতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, অতিরঞ্জিত অভিনয় নয়, বরং চরিত্রের ভেতরের মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনই অভিনয়ের আসল লক্ষ্য। তিনি মনে করতেন, অভিনেতাকে সমাজ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে, নয়তো সে মঞ্চে কেবল পুতুল হয়ে থাকবে।

zoom
‘মেঘে ঢাকা তারা’ ছবির একটি দৃশ্য

বিজন ভট্টাচার্য আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর নাটকগুলো এখনও আমাদের পথ দেখায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘মানুষের কল্যাণে রুটির লড়াই-এর সঙ্গে প্রাণের লড়াইকে এক সূত্রে বেঁধে নাট্য আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই গণনাট্যের মর্মকথা।’ তাঁর ১২০-তম জন্মবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে আজ আমরা বুঝতে পারি, তিনি কেবল মঞ্চের ক্যানভাসে ছবি আঁকেননি, তিনি এঁকেছিলেন মানুষের মুক্তির ছবি। তিনি ছিলেন সত্যিকারের এক ‘Fool for Theatre’, যিনি শিল্পের জন্য শিল্প নয়, বরং মানুষের জন্য শিল্প– এই দর্শনেই বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর সৃষ্টি ও সংগ্রাম বাংলা থিয়েটারকে চিরকাল প্রেরণা দেবে।

zoom
‘মেঘে ঢাকা তারা’ ছবির একটি দৃশ্যে

আজকের এই যান্ত্রিক সময়ে দাঁড়িয়ে যখন আমরা বিজন ভট্টাচার্যের নাটক দেখি, তখন সেই প্রান্তিক মানুষের কান্না ও প্রতিবাদের ভাষা আমাদের ভাবায়, নাড়া দেয়। আমরা বুঝতে পারি, আমাদের আজকের থিয়েটার চর্চায় সেই গণমুখী নাট্যধারাকে বাঁচিয়ে রাখা কতটা জরুরি। বিজন ভট্টাচার্যের নাটকগুলো কোনও আর্কাইভাল বস্তু নয়, বরং তা বর্তমানের সমাজব্যবস্থার প্রতি এক জরুরি প্রশ্ন। তিনি বেঁচে থাকবেন নাটকের সংলাপে, প্রান্তিক মানুষের লড়াইয়ে, বাংলা রঙ্গমঞ্চের প্রতিটি ইটে-পাথরে। তিনি বিজনমুখী নন, চিরকালই জনমুখী।

……………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন নীলাঞ্জন হালদার-এর অন্যান্য লেখা

……………………

Bijan Bhattacharya debi garjan Indian Theatre Meghe dhaka tara nabanna play Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Theatre

Share this article on