


উর্দু কবিতার জগৎ এই আঠেরো শতকের বাংলার সমাজের মতো সহজে সবাইকে নাকচ করে দিত। কোনও কবির ছন্দ বা কোনও কবির পোশাক– কবি হিসেবে কাউকে নাকচ করার জন্য সে সমাজের অজুহাতের অভাব ছিল না। মনে করা যাক, এই সেদিনও জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে প্যারডি কবিতা লেখা হত। সজনীকান্ত দাশের মতো সম্পাদক তাঁর সঙ্গে কী করেছিলেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। মিরের মতো উচ্চমানের কবিকেও লখনউ-এর মুশায়রাতে উপস্থিত কিছু ধৃষ্ট ও উদ্ধত দর্শকের শত্রুতা এবং অভদ্রতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
ফিরে যাওয়া যাক সেই সতেরো আর আঠেরো শতকের দিল্লি-আগ্রা-লখনউয়ের চাকচিক্যে। মনে করতে হবে কেমন ছিল সেই জগতের শিল্পসাহিত্যের বিস্তার। সেই হলুদ আলোর মায়াবী রাস্তাদের কথা। যমুনা নদী থেকে আজকের মৌলানা আজাদ মেডিকেল কলেজের সামনে দিয়ে দিল্লি গেট হয়ে ঢুকে পড়তে হবে দরিয়াগঞ্জের মধ্যে। (এই সেই দরিয়াগঞ্জ যেখানে বিশ শতকের কবি সমর সেনের কবিতা হারানো দিনগুলোর আস্তানা)। সেখান থেকে উত্তরে হেঁটে লালকেল্লার পাশ দিয়ে চাঁদনি চক। শাহজাহানের স্বপ্ন নির্মাণ। এই অঞ্চলের আদি নাম শাহজাহানাবাদ। এখানেই গড়ে উঠেছিল উর্দু কবিতার নিজস্ব রাজধানী।
উর্দু কবিতার রসিকদের কাছে ‘খুদা-এ-সুখান’ বা ‘কবিতার ঈশ্বর’ হিসেবে বিখ্যাত মির তকি মির (১৭২৩ -১৮১০) তাঁর অতলস্পর্শী কবিতা এবং কল্পনার বিস্তার ঘটানো চিন্তাজগতের মাধ্যমে সে ভাষার পাঠক জগতে অমর। তাঁর কবিতা এবং ব্যক্তিত্বের প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে তাঁকে একটি জীবদ্দশায় কিংবদন্তি করে তোলে। যেমন ছিল তাঁর কবিতার জনপ্রিয়তা তেমনই ছিল তাঁর উপস্থিতি।

সমস্ত কিংবদন্তির মতো মিরকে কেন্দ্র করেও অসংখ্য গল্প প্রচলিত রয়েছে। যার মধ্যে কিছু গল্প কাল্পনিক বলে মনে হলেও কিছু আবার বেশ সত্য। জলজ্যান্ত সব আকর্ষণীয় উপাখ্যান, যেখানে লখনউয়ের মতো এক অপরিচিত, অজানা জায়গায় এক বৃদ্ধ মিরের তাঁর জীবনের প্রথম মুশায়রায় (কবিসম্মেলন) যোগ দেওয়ার ঘটনা থেকে শুরু করে দিল্লি শহরের আদি প্রাণ উত্তর দিল্লির প্রায়ান্ধকার গলি সবই আছে।
পুরনো দিল্লির ‘কুচা চেলান’ অঞ্চল দীর্ঘকাল ধরে কবি মিরের বাসস্থান ছিল। তবে, ১৭৪৮ সালে ঘটনাক্রম এক ভিন্ন মোড় নেয়। দিল্লির সুলতান আহমদ শাহ আবদালি বরখাস্ত হন এবং মিরের প্রিয়তম শহর দিল্লি লুণ্ঠিত হতে শুরু করে। বছরের পর বছর ধরে তাঁর চোখ এই মহিমান্বিত শহরটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে দেখেছে। ধীরে ধীরে সাম্রাজ্যের কোষাগারও দেউলিয়া হয়ে যায়। এই শহর আর এই গুণী মানুষটির প্রতিভা এবং তাঁর জীবনধারণের জন্য যথেষ্ট ছিল না। তাঁর কবিতার কদর করার মতো মানুষ তখনও অনেক ছিল, কিন্তু কোনও পৃষ্ঠপোষক ছিল না। মির তকি মির, যিনি নিজের দারিদ্র নিয়ে গর্ব করতেন এবং জাগতিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য থেকে বঞ্চিত থেকেও সন্তুষ্ট থাকতেন, অবশেষে ১৭৭৮ সালে তাঁর প্রিয় ‘শহর-এ-দিল্লি’কে বিদায় জানান এবং লখনউ শহরে আশ্রয় নেন। সেখানেই তাঁর মৃত্যু ১৮১০ সালে।

আমার কাছে মির ফিরে আসেন তাঁর কবিতার মাধ্যমে করা স্বীকারোক্তির কায়দার জন্য। আজকের পৃথিবীতে মার্কিন কনফেশনাল কবিতা বা স্বীকারোক্তিমূলক অন্যান্য রচনার যে পরিসর তৈরি হয়েছে– তার যেন এক বীজতলা এই মির প্রদেশ। যতবার আমি আমার প্রিয় রবার্ট লোওয়েল-এর (১৯১৭-১৯৭৭) কবিতা পড়তে বসি, দেখি তাঁর জীবনের অজস্র ওঠাপড়া। কবিতার জন্য দু’বার পুলিৎজার পুরস্কার-সহ অজস্র পুরস্কার ও স্বীকৃতি। জীবদ্দশায় কিংবদন্তি হয়ে যাওয়া তাঁর কবিতা। এবং তাঁর অসুখ। বাইপোলার ডিসঅর্ডার। সেই রোগের আক্রমণ থেকে বাঁচতে ডাক্তারের পরামর্শে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে, তাঁর নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে খুলে বসা বিশেষ ক্রিয়েটিভ রাইটিং পাঠশালা। যেখান থেকে তৈরি হবে কনফেশনাল পোয়েট্রির দল। বেরিয়ে আসবেন অ্যান সেক্সটনের মতো দিকপাল কবি। মনে রাখতে হবে লোওয়েল ছিলেন এক বিখ্যাত বস্টন ব্রাহ্মিণ পরিবারের সদস্য। শুধুমাত্র পদবির জোরেই খুলে যেতে পারত অজস্র দরজা। আমাদের বাংলার যার তুলনা জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে করা যেতে পারে। কবি লোওয়েল খুঁজে বের করলেন এক চাবি, যা দিয়ে কেবলই অভিজাত বংশের অগভীর দুনিয়া উন্মুক্ত হয়। কেবলই বেরিয়ে আসে অন্ধকার জগৎ। তাঁর ভাষায় অভিজাত ইংরেজির সঙ্গে জোড়া দেশজ বুলি। সঙ্গে জুড়েছিল নিজের জীবনের ঘটনার সরাসরি বিবরণ। তাঁর লাইফ স্টাডিজ কাব্যগ্রন্থে জুড়ে দিয়েছিলেন ৪১ পাতার এক স্মৃতিকথা, যা আসলে তাঁর কবিতার পৃষ্ঠভূমি। পরে কোনও সম্পাদকই সেই স্মৃতিকথাকে তাঁর নির্বাচিত কবিতা বা কবিতা সংগ্রহ থেকে সরিয়ে দেননি।

কবি মির তকি মির দিল্লি শহরের ক্রমক্ষীয়মান আভিজাত্যের অন্ধকার জগতের প্রতীক। তাঁর ভাষা উর্দু হলেও তাঁর উত্তরসূরি ও অনেক বেশি বিখ্যাত কবি মির্জা গালিবের মতো ফার্সিপ্রাণ নয়। বরং উত্তর ভারতের, দিল্লি-আগ্রা-লখনউ এই দেশজ বুলিতে ঋদ্ধ। এক অর্থে তিনি কবীরের উত্তরসূরি। লুণ্ঠিত দিল্লি ছেড়ে ১৭৮২ সালে নবাব আসিফ-উদ-দৌলার আমন্ত্রণে ৬০ বছর বয়সে মির তকি মির অবশেষে লখনউ দরবারে এসে পৌঁছন। মজার ঘটনা, একজন সাধারণ ভ্রমণকারীর মতো একটি সরাইখানায় (পান্থনিবাস) থাকার সময় মির জানতে পারেন যে এক সন্ধ্যায় সেখানে একটি মুশায়রা অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে তিনি তখনই একটি গজল রচনা করেন এবং মুশায়রায় অংশ নেওয়ার জন্য রওনা হন।
আরও মজার ব্যাপার হল উর্দু কবিতার জগৎ এই আঠেরো শতকের বাংলার সমাজের মতো সহজে সবাইকে নাকচ করে দিত। কোনও কবির ছন্দ বা কোনও কবির পোশাক– কবি হিসেবে কাউকে নাকচ করার জন্য সে সমাজের অজুহাতের অভাব ছিল না। মনে করা যাক, এই সেদিনও জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে প্যারডি কবিতা লেখা হত। সজনীকান্ত দাশের মতো সম্পাদক তাঁর সঙ্গে কী করেছিলেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। মিরের মতো উচ্চমানের কবিকেও লখনউ-এর মুশায়রাতে উপস্থিত কিছু ধৃষ্ট ও উদ্ধত দর্শকের শত্রুতা এবং অভদ্রতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তারা মিরের খানিকটা প্রাচীনপন্থী পোশাকের পরিচ্ছদ দেখে উপহাস করতে শুরু করে।

ভাবছেন মুশায়রায় মির তকি মির কী পরেছিলেন? তাঁর মাথাটি একটি জরাজীর্ণ পাগড়িতে ঢাকা ছিল এবং শরীরটি এমন এক কাপড়ের তৈরি আলখেল্লায় ঢাকা ছিল যা যেন শেষ হতেই চাইছিল না। এই আলখেল্লার ওপর একটি রুমাল বেশ যত্ন সহকারে তাঁর কোমরের বেল্টে গোঁজা ছিল। এই লম্বা আলখেল্লার ঠিক নিচে একটি রেশম ও সুতির তৈরি পাজামা কোনওমতে দেখা যাচ্ছিল, যার পায়ের ঘের কাপড়ের চওড়ার মতোই চওড়া ছিল। তাঁর পা দু’টি ঢাকা ছিল সামনের দিকে বাঁকানো, সূচালো জুতোয়, যার অগ্রভাগ যেন তাঁর আলখেল্লার দৈর্ঘ্য ছোঁয়ার চেষ্টা করছিল। তাঁর বেল্টের দুই পাশেই অস্ত্র গোঁজা ছিল– ডানদিকে ছিল একটি ‘সাইফ’ বা সোজা তলোয়ার এবং বাঁদিকে ছিল একটি ছোরা। এই অদ্ভুত রূপটিকে সম্পূর্ণ করেছিল একটি দুর্বল লাঠি, যা এই বৃদ্ধ মানুষটিকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও আরও একটি পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করছিল!
স্বভাবতই, এই অদ্ভুত রূপের কারণে মির তকি মির হাসির পাত্রে পরিণত হন। উপহাসের চরম মুহূর্তে দর্শকদের মধ্য থেকে একজন ব্যঙ্গাত্মকভাবে জিজ্ঞেস করে বসে, ‘মহাশয়ের আদি বাসস্থান কোথায়?’ নিজের চোখের সামনে এই অচেনা দেশে যা ঘটছিল, তাতে মির ইতিমধ্যেই বেশ বিরক্ত ও ব্যথিত ছিলেন। তিনি তখনই তাৎক্ষণিকভাবে এই বিখ্যাত শ্লোকটি রচনা করে আবৃত্তি করলেন:
‘হে পূর্বাঞ্চলবাসী (লখনউয়ের মানুষ), কেন তোমরা আমার ঘর আর বংশের কথা জিজ্ঞেস করছ?/ আমাকে একজন অপরিচিত ভেবে কেন উপহাস করে ডাকছ?/ দিল্লি, যা ছিল বিশ্বের সেরা স্থান,/ যেখানে এই যুগের সেরা মানুষেরা বাস করতেন,/ যা ভাগ্য দ্বারা লুণ্ঠিত ও জনশূন্য হয়েছে,/ আমি সেই বিধ্বস্ত ভূমিরই একজন বাসিন্দা।’

এই কবিতার বেদনা ও আকুলতা দেখে উপস্থিত প্রত্যেকেই মিরের কাছে জোড়হাতে ক্ষমা চান। আর ভোরের আলো ফোটার মধ্যেই লখনউতে মিরের আগমন এক গৌরব ও উদ্যাপনের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এই ঘটনার কথা জানতে পেরে নবাব তাঁর জন্য দু’শো টাকার একটি মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করেন। দিল্লির মতোই, সম্মান ও খ্যাতি আবারও মির তকি মির নামের এই প্রতিভাধর কবি-ব্যক্তিত্বের কাছে ফিরে আসে পোষা প্রাণীর মতো।
রবার্ট লোওয়েল মারা যান নিউ ইয়র্কে। ট্যাক্সি দুর্ঘটনায়।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved