


গত ১৫ বছরে, তসলিমাকে কলকাতায় ফিরিয়ে আনার পক্ষে আমি একটি লেখাও লিখিনি। এখন সমস্ত জায়গায় একথা নিশ্চয়ই বলা হচ্ছে। তসলিমা কি জানতেন না আমার এই নীরব থাকা? নির্ভুলভাবেই জানতেন! কিন্তু কখনও ব্যক্তিগত কথাবার্তায় একবারের জন্যও বলেননি, জয়, আপনি কেন কিছু বলছেন না? এখানেই তাঁর ডিগনিটি, তাঁর আত্মসম্মান, তাঁর অভিজাত আত্মসংবরণের পরিচয়। তা সত্ত্বেও তসলিমা, যেহেতু আমাকে লেখক হিসেবেই দেখেছেন, তাই আমাকে তাঁর অনুষ্ঠানে যেতে বলেছেন। কী অতুলনীয় ঔদার্য তাঁর! আমার নীরব থাকা ওঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়নি, গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে ‘এই লোকটা লেখে’– এই কথাটাই।
আমি কবিতা লিখতে এসেছিলাম স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য। জীবনটা ছিল চতুর্দিক থেকে বন্ধ, তাই চেয়েছিলাম, আমার মনটা যেন স্বাধীন হয়। মনের স্বাধীনতার কথা, মনের বন্যতার কথা, মনের মুক্তির কথা, জীবনের সমস্ত রকম ঢাকাচাপা দেওয়া কথা যেন বলতে পারি। শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছি। পরাজিত হননি তসলিমা।

তসলিমা কী করেছেন? একজন মানুষের যে-স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তার প্রধান প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছেন– সাহিত্যকে করে তুলেছেন মতপ্রকাশের অস্ত্র। আমি তাঁকে নিজের বন্ধু বলতে সংকোচ করি, তার কারণ বন্ধু হওয়ার জন্যও তো কিছু যোগ্যতার দরকার হয়। তিনি যে-লড়াই করছেন, যে-জীবন বাঁচছেন– তার সহস্রাংশের একাংশও তো আমি করতে পারিনি। সুতরাং, যদি বলি, ‘তসলিমা আমার বন্ধু’– তাহলে নিজেকে অযথা অতিরিক্ত গৌরবান্বিত করা হয়। কিন্তু একথা ঠিকই যে, তসলিমা নাসরিন সত্যিকারের গভীর বন্ধুত্বের পরিচয় দিয়েছেন তাঁর দিক থেকে। আমার জীবনে তা একটা পুরস্কারের মতোই। যদিও সেই পুরস্কারের মর্যাদা রক্ষা করতে পারিনি। তাতেও তাঁর বন্ধুত্বের প্রতি সম্মান কমেনি। তাই তাঁকে আমি বন্ধু বলব– এত বড় সাহস আমার নেই। কিন্তু তাঁর এত ঔদার্য যে, তিনি প্রকাশ্যে আমাকে বন্ধু বলেছেন। প্রকাশ্য সভায় আমাকে ডাকতে পেরেছেন।

সৌমিত্র মিত্র প্রথম তসলিমাকে নিয়ে আসেন কলকাতায়। ‘আবৃত্তিলোক’ সংস্থার কবিতা উৎসবে। ’৮৫ সালে শুরু হয় সেই কবিতা উৎসব। তসলিমাকে নিয়ে আসা হয় ’৮৬ সালে। তখন তিনিই ওই উৎসবের তরুণতম কবি। সেখানে আমিও ছিলাম। সেই প্রথমবার ওঁকে দেখি। আলাপ হয় আমাদের। নির্বাসিত হয়ে তিনি তখন দেশে দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। রক্ষী পরিবৃত হয়ে। তখন তসলিমার বয়স ২৪। তিনি তখনও একইরকম ভাবে স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন। তখনও তিনি বিশ্বাস করতেন না উচ্চস্বরে বা চিৎকারে। আজকাল অনেক লেখকই যখন ভাষণ দিতে ওঠেন বা কবিতা পড়তেও– দেখা যায় তিনি হয়ে পড়েছেন প্রায় এক রাজনৈতিক নেতা! কবিতা পড়ার সময় বই-কাগজ দেখার প্রয়োজন পড়ছে না। মুখস্থ বলে চলেছেন দর্শককে উদ্দীপিত করার জন্য, হাততালি আদায়ের জন্য। তা কবিতা লেখার মধ্য দিয়ে হোক বা ভাষণের মাধ্যমে। আবেগে উদ্দীপ্ত হয়ে বক্তৃতা দিতে আমি গৌতম ভদ্র বা অরিন্দম চক্রবর্তীকেও দেখেছি, সেই উদ্দীপন মুহূর্তেও নিখুঁত গাণিতিক যুক্তিক্রম ব্যবহার করে গিয়েছেন তাঁরা, মন্তব্যনির্ভর হননি। পাঁচের দশক থেকে অদ্যাবধি– মূলত মন্তব্যপ্রধান, যুক্তিবিহীন, পিঠ চাপড়ানো অথবা বসিয়ে দেওয়ার প্রচলন অগ্রজ লেখকদের মধ্যে অব্যাহত। কোথাও কোথাও জীবনী ঘেঁটে ‘তথ্যমৃগয়া’য় বেরনো ত্রুটিসন্ধানীদেরও আমরা দেখতে পাই।

কথাগুলো বলছি কারণ, ১ আগস্ট, তসলিমা যে-বক্তৃতা দিয়েছেন, তার উচ্চতা অভাবনীয়। শুধু এক ভাষণই নয়, তাঁর সেই বলায় উঁচু দরের সাহিত্য ও দর্শন মিলেমিশে গিয়েছিল। শান্ত স্বরে পাঠ করেছেন তাঁর লিখিত বক্তব্য। সে ভাষণে অগ্নিস্ফুরণ আছে যথেষ্টই। কিন্তু গলার মধ্য দিয়ে সেই আগুন প্রকাশ পায়নি। চিৎকার করার প্রয়োজন বোধ করেননি তিনি। তাঁর ভাষণে যে চিরস্থায়ী দার্শনিকতা, সেই স্তম্ভে পৌঁছতে গেলে সেই রকম জীবনযাপনের দরকার পড়ে। প্রতিষ্ঠিত প্রধান পত্রিকাগুলিতে লিখতে পাওয়ার দ্বারা লব্ধ খ্যাতি– সেই সঙ্গে সাহিত্য প্রশাসকের উচ্চপদে অধিষ্ঠান করা ও ‘পৌরজনতার তালি’ যাঁরা কৌশলে আয়ত্তে এনেছেন– এই দার্শনিকতা কোথা থেকে উদ্ভুত হয়, তাঁদের তা অনুমানমাত্র করার সাধ্য নেই। জানি না, এই ভাষণ কবে, কোথায়, ছাপার অক্ষরে প্রকাশ পাবে।
গত ৪০ বছর ধরে তসলিমাকে দেখছি। আর দেখে চলেছি তাঁর অনমনীয়তাকে। স্বাধীনতার পক্ষে নিরন্তর কথা বলে চলা– তাঁর জেদ নয়, সংকল্প। জেদকে অনেক সময়ই খুব প্রশংসাবাক্যে ভরিয়ে দেওয়া হয় সাধারণ বিচারে। ১৯৮৭ সালে, সুনীল গাভাসকর জীবনের শেষ ইনিংসে ৯৬ রান করেছিলেন। খেলেছিলেন ২৬৪ বল। প্রায় সাড়ে ৫ ঘণ্টা তিনি ক্রিজে ছিলেন। হানিফ মহম্মদ, ১৯৫৮ সালে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভয়াবহ পেস আক্রমণের বিরুদ্ধে ৯৭০ মিনিট ছিলেন ক্রিজে, রান করেছিলেন বিশালাকায় ৩৩৭! এগুলোকে সাধারণত আমরা ‘জেদ’ বলে চিহ্নিত করে থাকি। কিন্তু আমার কাছে এগুলো ‘জেদ’ নয়, ‘সংকল্প’। জেদ তখনই সংকল্প– যখন জেদ যুক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়। ক্রোধ সবসময়ই যুক্তিকে মেরে ফেলে, নষ্ট করে দেয়। জেদ অন্ধ, ক্রোধের দ্বারা, ভুল অহংয়ের দ্বারা ফুটন্ত। আমাকে জিততেই হবে– এই চিন্তাই জেদের মূলে। সংকল্পের দ্বারা যিনি পরিচালিত, তিনি বলবেন: আমাকে জানতে হবে। তাঁর জয় সাময়িক নয়। তসলিমা এই সংকল্পের পথে দীর্ঘকাল হেঁটে চলেছেন।

কীরকম সেই সংকল্প? বিভিন্ন দেশে সরকারি নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তসলিমা নির্বাসিত জীবন কাটালেন বহুকাল। এক সময় দুই বাংলা থেকেই কোনও নতুন বই বেরল না নিষেধাজ্ঞার কারণে। কিন্তু তসলিমা তখনও বাংলা ভাষায় লিখে চলেছেন! এ-কথা জেনেও, তাঁর লেখা প্রকাশের সম্ভাবনা নেই। অথচ তসলিমা নাসরিনের একটা বই লিখলে, বাংলায় লিখলেও, সারা পৃথিবীর ২৮-৩০টি ভাষায় অনুবাদ হওয়া কোনও বিস্ময়কর ব্যাপার নয়। দুই বাংলা থেকে নির্বাসিত হয়েও তিনি কিন্তু বাংলা ভাষাকেই আগলে রাখলেন। একটানা ৩৩ বছর, জোড়া মৃত্যুদণ্ডের ফতোয়া মাথায় নিয়ে, তিনি বাংলাতেই লিখতে চান এবং লিখছেন।

তসলিমা তাঁর লেখার জন্য ক্ষমা চাননি। ক্ষমা চেয়ে যদিও রেহাই পাননি সলমন রুশদি। তাঁকে জীবনহানির আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে। তসলিমা শুধুমাত্র মৌলবাদের বিরুদ্ধেই লেখেননি, বাকস্বাধীনতার জন্য, নারী অধিকারের পক্ষেও লিখেছেন। এবং ক্রমে একা হয়ে পড়েছেন। সলমন রুশদির ওপর যখন মৃত্যু পরোয়ানা, যখন তিনি আন্ডারগ্রাউন্ডে, তখন তাঁর সঙ্গিনী-সম্পর্কটি ছিন্ন হয়েছিল। তসলিমার ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটে। তাঁর ফরাসি প্রেমিক, যাঁর সঙ্গে বারদুয়েক আমার কথাবার্তা হয়েছিল এই কলকাতাতেই, তাঁর সঙ্গে তসলিমার সম্পর্কটি ভাঙে– তসলিমার অনিশ্চিত ও প্রহরীবেষ্টিত জীবনযাপন ছিল তার একটি প্রধান কারণ। কিন্তু তাতেও সংকল্প ভাঙেনি তসলিমার। জীবনের অসহনীয় একাকিত্ব নিয়েও তসলিমা লিখে চলেছিলেন তাঁর নতুনতম বাংলা লেখা। তিনি বিদেশে, এমন জায়গায় থেকেছেন, যেখানে কারও সঙ্গে বাংলায় কথা বলার কোনও অবকাশ নেই, বাইরে থেকে কোনও বাংলা শব্দ এসে পড়ে না কানে– সেখানে, তসলিমা পোষা বিড়ালের সঙ্গে বাংলায় কথা বলেছেন। মাতৃভাষাকে এভাবেও জীবন্ত রাখতে পেরেছেন তসলিমা!
চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায় তসলিমাকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র করেছিলেন, নাম: ‘নির্বাসিত’ (২০১৪)। পরিচালক দেখিয়েছিলেন তসলিমার প্রধান অবলম্বন ছিল তাঁর পোষ্য বেড়াল মিনু। সেই মিনুর কাছে তসলিমা নাসরিন তো আর সাহিত্যিক নন, তার পালনকর্ত্রী, প্রধান আত্মীয়। মনে পড়ে, তসলিমা আমাকে বারবার বলেছেন, ‘আমি বাংলায় সেসময় কথা বলতাম শুধু মিনুর সঙ্গে।’ বিড়ালের দৃষ্টি কী, তা দেখিয়েছিলেন চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়। আর তসলিমা, নিজে, ওই নির্বাসনে, সত্যিকারের স্থায়ী সম্পর্ক হিসেবে পাচ্ছেন কাকে? একমাত্র মিনুকে। জেলখানার থেকে কিছু কম কি এইভাবে বেঁচে থাকা? এইরকম বেঁচে থাকা, এভাবে বাংলায় কথা বলা– লেখার জন্য সাধনা নয়?

নয়ের দশকের মাঝামাঝি। তসলিমার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে তখন। যখন তাঁর প্রথম নির্বাসন ও মৃত্যুদণ্ডাদেশ ঘোষণা হল বাংলাদেশে, তখন পশ্চিমবঙ্গের কয়েকজন লেখক-চিন্তক প্রতিবাদস্বরূপ একত্রে হাঁটতে হাঁটতে গিয়েছিলেন পার্ক সার্কাসে, বাংলাদেশের উপরাষ্ট্রদূতের দফতরে। সেই পদব্রজ লেখকদের মধ্যে ছিলেন অন্নদাশঙ্কর রায়, শিবনারায়ণ রায়, অম্লান দত্ত, গৌরকিশোর ঘোষ, শঙ্খ ঘোষ, দেবেশ রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। আমার স্বচক্ষে দেখা। তাঁরা একটা চিঠি দিয়েছিলেন এই মৌলবাদের বিরুদ্ধে। জানিয়েছিলেন এই মৃত্যুপরোয়ানা অন্যায়। একজন লেখকের বই নিষিদ্ধ করাও অনুচিত, এমনটা কখনও করা যায় না।

’৯৪ সালের আশপাশে ঘটছে এ ঘটনা। তখন প্রায় সব প্রতিষ্ঠিত কবি ও সাহিত্যিক ছিলেন তসলিমার পক্ষে। সেসময় তসলিমার বই মানেই শত শত পাঠকের উন্মাদনা। কাছাকাছি সময়ে, বইমেলায় এসেছেন তসলিমা। এই খবর বাইরে চাউর হতেই, জনতা ধেয়ে যাচ্ছে তাঁর দিকে। তসলিমার ওই ভিড় দেখে মনে হয়েছিল তাঁর স্বদেশের কথা, যে ভিড় তাঁকে ধিক্কারধ্বনি দিয়েছে। কিন্তু তিনি খেয়াল করলেন এই ভিড় আসলে সাধারণ পাঠকের। যে পাঠক তাঁর বইকে আঁকড়ে ধরেছে। বইয়ের স্টলে কোলাপসেব্ল গেট টেনে দেওয়া হয়েছিল নিরাপত্তার কারণে। স্টলের ভিতর থেকে একের পর এক বইয়ে সই করতে শুরু করেছিলেন তসলিমা।

নয়ের দশকেরই আরেকটি ‘ঘটনা’। কলকাতায় আসা-যাওয়া যে শুরু হয়েছে তসলিমার তখন, তাও নয়। তখন তিনি বিদেশে, রক্ষী পরিবৃত হয়ে। এই সময় তিনি বাংলাভাষার এক প্রথম সারির পত্রিকায়, যেখানে আমি ছিলাম কবিতা দেখাশোনার দায়িত্বে, সেখানে কবিতা পাঠিয়েছিলেন। পরে সে কবিতাগুচ্ছ বইয়ে ঠাঁই পায়– ‘নির্বাসিত নারীর কবিতা’। কর্মসূত্রে, তসলিমার দুটো বইয়ের পাণ্ডুলিপি করার সুযোগ হয়েছিল আমার। তার মধ্যে একটি– ‘নির্বাসিত নারীর কবিতা। পাণ্ডুলিপি তিনিই করে পাঠিয়েছিলেন। আমি তাঁর কবিতা সংশোধন করার কথা, কোনও দিন ভাবিওনি। শুধু সে বই সাজানো, গড়ে তোলা, এই সমস্ত দায় ছিল আমার আর রাতুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের। আশ্চর্য সাহসী ও সংবেদনশীল কবিতায় ভরে আছে তাঁর কবিতার বইগুলি। যে-কবিতা তিনি লিখেছেন সরল ভাষায়, যে-সরল ভাষা সরাসরি মনকে বিদ্ধ করে। অথচ তার বিষয় প্রধানত তিনি নিজে এবং সেইসঙ্গে তার ভিতর থেকে উদগত হয়ে উঠছে আবহমান নারীসত্তার সর্বাত্মক জাগরণ। কারণ, প্রত্যক্ষভাবে, আরেক যুবতীর সঙ্গে শারীরিক আশ্লেষের কথার বর্ণনায় তাঁর কবিতা তীব্র ও অন্তরাল হারা। নির্বাসিতের দেশচ্যুত হওয়ার হাহাকারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রণয়চ্যুত হওয়ার গোপন দাবানল।

পত্রিকার দফতরে পাঠিয়েছিলেন যেসব কবিতা, তা-ও তিনি লিখেছিলেন খোলা ভাষাতেই। আমরা অনেকেই, আমি তো বটেই, কবিতায় নানা কারুকৃতি করেছি। তসলিমা কি কারুকৃতি জানতেন না, তাই করেননি? ওঁর প্রথম দিককার কবিতা পড়লে দেখা যাবে, দিব্যি জানতেন! কিন্তু সহজ ভাষাই হয়ে উঠল তাঁর পথ। তাঁর কবিতা ছাপা হল পত্রিকায়। মনে পড়ে, পাঠকরা সেসময় খুব কাছে টেনে নিয়েছিলেন এই কবিতাগুলিকে। এই কবিতা বেরনোর আশপাশেই একদিন অফিসে পৌঁছতেই ঝর্ণাদির ডাক, ‘তসলিমা ফোন করেছিলেন আপনাকে। খুঁজছেন। আমি ওঁকে বলেছি, পরে বা পরের দিন ফোন করতে।’ আমি খুব অবাকই। ভারতের অল্প লোকের সঙ্গেই তসলিমার যোগাযোগ। সারাটাদিন কাটল। কিন্তু ফোন এল না। কারণ অন্য টাইম জোনে রয়েছেন তিনি। একদিন পরে, ঝর্ণাদিই, গলায় খানিক সমীহ নিয়ে আমাকে বললেন, ‘ আপনার ফোন ভাই, উল্টোদিকে তসলিমা নাসরিন…’।
…………………………………………………………………………….
পড়ুন তসলিমা নাসরিনের জয় গোস্বামীকে নিয়ে লেখা: আমার বন্ধু জয়
…………………………………………………………………………….
‘ভালো আছেন জয়? অনেক দিন দেখা হয় না।’
‘হ্যাঁ, ভালো আছি। আপনি?’
‘এ-ই, আছি আর কী। আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করার জন্য ফোন করেছি, কবিতাগুলো তো আপনি খুব যত্নে ছেপেছেন…’
‘আমি ছাপিনি। কবিতাগুচ্ছ আমার খুব ভালো লেগেছে। সব কর্মীই খুব পরিশ্রম করে পাতা তৈরি করেছেন। ছাপাও, সত্যিই সুন্দর হয়েছে।’
‘জয়, কবিতাগুলোর মধ্যে কি কোনও দোষত্রুটি দেখতে পেয়েছেন? কবিতাগুলো কি তত ভালো হয়েছে? নাকি কোথাও বদল করলে আরেকটু ভালো হতে পারত? যা পারি লিখেছি…’

উল্টোদিকে ফোন কানে ধরে দাঁড়িয়ে থাকা আমি, বিশ্বাস করতে পারছি না, ওই পর্যায়ের এক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখিকা, যাঁর কবিতা বহু ভাষায় অনুবাদ হচ্ছে, যাঁর কবিতা পড়ার সময় যুবকরা জ্যাজ মিউজিক পরিবেশন করছেন বিদেশে– তিনি জিজ্ঞেস করছেন আমাকে? এই আঞ্চলিক কবিকে? কলকাতা, আসানসোল, বহরমপুর, চম্পাহাটির মতো গুটিকতক অঞ্চলে আমার কবিতা ঘুরছে-ফিরছে। আর ওঁর কবিতা ঘুরছে বিশ্বজুড়ে। তিনি জানতে চাইছেন আমার থেকে! ‘কবিতা ঠিক হয়েছে তো?’ বিশ্বজোড়া পাঠকপ্রাপ্তির পরও তসলিমা সংশয়ে থাকেন, আত্মসন্দেহে থাকেন– এ আমার নিজের দেখা।
আজ বলে নয়, তসলিমা কলকাতায় যতবার এসেছেন, ভিড় গ্রাস করেছে তাঁকে। বরাবর এমনটাই দেখে আসছি। সেবার তসলিমা উঠেছেন গ্রেট ইস্টার্নে। আমিও গিয়েছি। মিডিয়াও উপস্থিত। ইলেকট্রনিক বা প্রিন্ট মিডিয়ার বহু সংবাদকর্মীই ব্রেকিং নিউজ, ডেডলাইন, কপি লেখার অত্যধিক চাপের কারণেই সাহিত্যপাঠের সময় পান না। স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা তসলিমার লেখা পড়ে প্রশ্ন করতে আসতেন, এমন নয়। অথচ তাঁদের বিপথগামী প্রশ্নেও তসলিমাকে এতটুকু বিরক্ত হতে দেখিনি কখনও। শান্তভাবে উত্তর দিতেন তসলিমা। সেদিন, গ্রেট ইস্টার্নে, তসলিমা শুরুতেই আমাকে বললেন, ‘আপনি ভিতরের ঘরে গিয়ে বসুন। এই হই-হট্টগোলের মধ্যে আপনাকে থাকতে হবে না।’ আমি বসলাম ঘরে গিয়ে। কিছুক্ষণ পর, হঠাৎ, প্রায় ছুটতে ছুটতে এসে কম্পিউটারের সামনে বসে পড়লেন তসলিমা। তখন বাংলার খুব কম সাহিত্যিকই লিখতেন কম্পিউটারে, তসলিমা তাঁদেরই একজন।
‘এক মিনিট জয়।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, বসুন।’
বললেন এক মিনিট, কেটে গেল এক ঘণ্টা। হু হু করে লিখলেন। আমি চুপ করে বসে দেখলাম। কম্পিউটার থেকে উঠে তসলিমা বললেন, ‘সেভ করে গেলাম। যেটা লিখছি, আত্মজীবনীর পরের খণ্ডটা, তার একটা অংশ মাথায় ঘুরছিল। সময় তো পাচ্ছি না। এরপর যদি ভুলে যাই, সে জন্য এসে লিখে রাখলাম।’ তসলিমাকে এভাবে লিখতে দেখা একটা অভিজ্ঞতা! এই তসলিমা না কি জিজ্ঞেস করেছেন, ‘কবিতাগুলো ঠিক হয়েছিল তো?’ এগুলোই প্রমাণ করে, তসলিমা শেষ পর্যন্ত একজন লেখক। পুরস্কারে, প্রশংসায় তাঁর লেখার প্রতি নিমগ্নতা সরে যায় না।

যে-আত্মজীবনী তিনি ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন, ভারতের কোনও লেখক কি এরকম আত্মজীবনী লিখে চলার সাহস করেছেন? আমার জানা নেই। তাঁর জন্য তিনি সম্মানিত। অনেকের কাছে ঘৃণিতও। কিন্তু এই প্রতিবাদী, লড়াকু তসলিমার পাশাপাশি আরেক তসলিমাকে আমরা দেখি, যে-তসলিমা লিখে চলেছেন প্রেমের কবিতা ও উপন্যাস। ফলে, তাঁর লেখা যে কেবলই বিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অক্ষরমালা– তা নয়। ‘ফরাসি প্রেমিক’ নামে তাঁর একটি উপন্যাস রয়েছে। প্রকৃত প্রেমের উপন্যাস।
তসলিমা– এই নামটি প্রবলভাবে ছড়িয়ে পড়ছিল যখন, কেউ কেউ বলেছিলেন তসলিমা একজন কলাম লেখকের বেশি নন– কবিতা লিখতে পারেন না, উপন্যাস লিখতেও না, প্রচারের আলোর দিকে নজর, ফলে নাম তো করবেনই। এমনই ছিল অভিযোগ। কয়েক বছরের মধ্যে তসলিমার ‘দ্বিখণ্ডিত’ এ বঙ্গে নিষিদ্ধও হল।

শিশির মঞ্চে সভা হল। তসলিমার থেকে ৫-৭ বছরের বড়, সমবয়সি এবং বয়সে অনুজ কবিরা ছিলেন সেই সভায়। পাশাপাশি, সম্পূর্ণ ধর্মীয় কারণে একটি ধিক্কারসভাও কলকাতা প্রত্যক্ষ করেছিল শহিদ মিনারের নিচে। যেখানে তসলিমার মৃত্যুফতোয়া দ্বিতীয়বার উচ্চারিত হয়। শিশির মঞ্চের সেই সভায় কী হয়েছিল? তসলিমা যে কোনও কবিই নন– তা প্রমাণের চেষ্টা। ফলে দুটো বিপক্ষ তসলিমার বিরুদ্ধে উত্থিত হয়ে উঠেছিল কলকাতায়, একইসঙ্গে। একটির প্রযোজক তসলিমার সমসাময়িক কবিকুলের কয়েকজন। আরেকটি, ধর্মোন্মাদরা। দু’টি ‘খবর’ই আমি পেয়েছিলাম, সংবাদপত্রে কাজ করার দরুন। এর ক’দিন পরই তসলিমা কলকাতা থেকেও নির্বাসিত হবেন। তখন রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়ে খুব জোরালো একটি উত্তর সম্পাদকীয় লিখিয়েছিলেন ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এ। ‘রোববার’ পত্রিকার সম্পাদক ঋতুপর্ণ ঘোষ নিজের ব্যক্তিগত চেষ্টার শেষ সীমায় পৌঁছে ‘রোববার’-এ তসলিমাকে দিয়ে একটি ধারাবাহিক লেখানোর ব্যবস্থা করলেন। অসাধারণ শুরু করলেন তসলিমা।
এগতে পারলেন না দু’টি সংখ্যার বেশি!
কারণ? মৌলবাদীদের একটি দল ঘিরে ফেলল পত্রিকার অফিস। ‘তসলিমা নাসরিন’ নামক ব্যক্তির লেখা কেন ছাপা হচ্ছে, এই কারণে তারা দলবদ্ধভাবে পত্রিকার অফিসে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছিল।
হার মানতে হল ঋতুপর্ণকে। সেই থেকে তসলিমার নতুন কোনও লেখা আর প্রকাশিত হয়নি। গত জুলাই পর্যন্ত। হয়তো এবার হবে। তেমন প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়েছে।
তসলিমার এই নির্বাসনের বিরুদ্ধে আমিও লিখেছিলাম আরেকটি লেখা। শর্মিষ্ঠা বাগ, সুজাত ভদ্র, স্বাতী বলে একটি মেয়ে ছিল; খুব সক্রিয়– এরকম কেউ কেউ প্রতিবাদ সভা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। সেখানে আমি সইও করেছি, প্রতিবাদে হেঁটেওছি। সেসব অন্য কথা।
১ আগস্ট, তসলিমার অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম ওঁর নতুন কবিতা শুনব বলেই। তসলিমা আসলে কী চাইছিলেন? চাইছিলেন সাহিত্যের মানুষদের (স্বপ্নময় চক্রবর্তী, অমর মিত্র এবং এখনকার কবি-সাহিত্যিকদের)। অনুষ্ঠানের মধ্যেও তো বলেছেন, এখনকার লেখকদের সঙ্গ পেতে চাইছেন তিনি।

সেদিন যে-ভাষণ তসলিমা দিলেন, ওই উচ্চতার ভাষণ মানুষ নজর না করে, চাপানউতোর চলতে লাগল আমার মঞ্চে ওঠা, ধিক্কার ও মঞ্চ থেকে নেমে যাওয়া নিয়ে। আমাকে কী বলা হয়েছে, সেটা বড় কথা নয়। পরে, অনেকেই তো বলেছে: ‘এটা জয় গোস্বামীর প্রাপ্য ছিল।’ কথাটা সবার আগে বলেছিলাম অবশ্য আমিই। ঘটনার বেশ কিছুদিন আগে, এক সাক্ষাৎকারে। বলেছিলাম, ওঁকে স্বাগত জানানোর কোনও অধিকারই তো নেই আমার। গত ১৫ বছর আমি একটা লেখাও তো লিখিনি ওঁকে ফেরানোর দাবিতে। তসলিমা সে সাক্ষাৎকারের ভিডিও নিজের ফেসবুকে শেয়ার করেন, আর আমাকে ফোন করে বলেন, ‘আপনি এরকম ভাববেন না, আপনি আসবেন।’ ওসমান মল্লিক, তরুণ ছেলেটি, অনুষ্ঠানের পরিচালক, তিনিও আমন্ত্রণ করেন। এবং কোনও অসম্মান তো এঁদের দু’জনের থেকে পাইনি। আমি মঞ্চ থেকে নেমেও ধৈর্য ধরে বসেছিলাম তসলিমার বক্তৃতা শোনার জন্য। বক্তৃতার পর বেরিয়ে যাই। ওঁর কবিতা শোনা হয় না অবশ্য। পরে তা শুনি ইউটিউবে। সেই কবিতাপাঠের সঙ্গে চমৎকার সংগীত পরিবেশন। মনে পড়ল, ‘অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস’-এ, একবার, সৌমিত্র মিত্ররই আয়োজনে, মোহন সিংয়ের গানের সঙ্গে কবিতা পড়েছিলেন তসলিমা। ফলে সংগীতের সঙ্গে কবিতাপাঠের এই অনুষঙ্গ তিনি আগেও ঘটিয়েছিলেন। এবং দেশে দেশেই এমনটা করেছেন তিনি। কখনও জ্যাজ মিউজিকের সঙ্গে, কখনও রবীন্দ্রগানের সঙ্গে।

দিল্লিতে কবিতা পড়তে গিয়েছি। ‘অলমোস্ট আইল্যান্ড’-এর ডাকে। কবিতা পড়ে, স্টেজ থেকে নেমে এসে দেখি– তসলিমা দাঁড়িয়ে। বললাম, ‘আপনি!’ ‘শুনলাম ৫টার সময় আপনি কবিতা পড়বেন, অনেক দিন তো আপনার কবিতা শুনিনি। তাই এসেছি।’
দিল্লিতে দু’বার তসলিমা চলে এসেছিলেন কবিতা শুনতে। আমি বলিনি। খোঁজ পেয়েছিলেন তসলিমা। এখানে অল্পবয়সি কবিরাও কি না ডাকলে কবিতা শুনতে চলে যান? কিংবা তখনই কবিতা শুনতে যান, যখন বড় ক্ষমতার পদে আছেন– এমন কেউ কবিতা পড়ছেন। কিংবা তাঁকে শাসানো হলে, বা শাসানোর আগে আগেও চলে যান ভয়ে। অথচ তসলিমা, এমন খ্যাতিবান কবি, নিজে নিজেই চলে এসেছিলেন।
কথা হল, গত ১৫ বছরে, তসলিমাকে কলকাতায় ফিরিয়ে আনার পক্ষে আমি একটি লেখাও লিখিনি। এখন সমস্ত জায়গায় একথা নিশ্চয়ই বলা হচ্ছে। তসলিমা কি জানতেন না আমার এই নীরব থাকা? নির্ভুলভাবেই জানতেন! কিন্তু কখনও ব্যক্তিগত কথাবার্তায় একবারের জন্যও বলেননি, জয়, আপনি কেন কিছু বলছেন না? এখানেই তাঁর ডিগনিটি, তাঁর আত্মসম্মান, তাঁর অভিজাত আত্মসংবরণের পরিচয়। তা সত্ত্বেও তসলিমা, যেহেতু আমাকে লেখক হিসেবেই দেখেছেন, তাই কবিবন্ধু হিসেবে আমাকে তাঁর অনুষ্ঠানে যেতে বলেছেন। কী অতুলনীয় ঔদার্য তাঁর! আমার নীরব থাকা ওঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়নি, গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে ‘এই লোকটা লেখে’– এই কথাটাই। মনে করেছেন, একজন সমঝদার যাবেন, তাই ডেকেছেন। সেদিন ধিক্কার মাথা পেতে নিয়ে আমি যে বসেছিলাম, তসলিমার ভাষণ শুনেছিলাম– ওই ভাষণ ওভাবে শোনাটা আমার জীবনের মস্ত বড় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে!

তসলিমা নাসরিনের লড়াই, সাহিত্য, জীবনের দার্শনিকতা– আত্মজীবনী, উপন্যাস ও কবিতার মধ্য দিয়ে যেখানে পৌঁছল, সেই স্বাধীন পৃথিবীর নাগরিক এখন কারা? এখন তাঁর পাঠক কারা? শিউলি বলে একটি মেয়ে আছে। তিনি ইংরেজি কাগজের ট্রেইনি জার্নালিস্ট। বয়স ২২-২৩। তাঁর বন্ধু, নীলাঞ্জন, সেক্টর ফাইভে আইটি সেক্টরে কাজ করে। বয়স ২৬-২৭। আরেকজন, তাঁর বয়স ২৫, নাম সোহম। এঁরা প্রত্যেকেই আমার চেনা। তাঁদের কাছ থেকেই জানি, তসলিমার বিভিন্ন লেখা আইফোনে ছবি তুলে তুলে তাঁরা একজন আরেকজনকে পাঠাচ্ছে। সে-ছবিতে দেখা যাচ্ছে, অক্ষরের তলায় দাগ দিয়ে দিয়ে লেখা রয়েছে আরও কিছু। এই তরুণেরা কবিতা-গল্প-উপন্যাস কিচ্ছু লেখেননি, এঁরা পাঠক। এই পাঠকরা জন্মাননি যখন তসলিমা নির্বাসিত হচ্ছেন। যখন নিষিদ্ধ হচ্ছে তাঁর গ্রন্থ। যখন তাঁর প্রতি মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হচ্ছে… আজকে তাঁরাই তসলিমার পাঠক।
এক পুজোসংখ্যার বিখ্যাত লেখক, একবার সরাসরি তসলিমাকে বারাঙ্গনা বলেছিলেন। উচ্চারণ করেছিলেন ‘বেশ্যা’ শব্দটা। তসলিমা নীরবে চুপ করে সহ্য করে গিয়েছিলেন। একটিও উত্তর দেননি। আবারও, তসলিমার বিস্ময়কর ডিগনিটি!
রোববার.ইন-এ, প্রাইড মান্থে যে-মিনি সিরিজ বেরিয়েছিল, সেইখানে এক নবীন লেখিকা, শেক্সপিয়রের ১০৮ নং সনেটের একটি উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন। ঈশ্বরকে রোজ একই মন্ত্র দ্বারা, স্তোত্র দ্বারা বন্দনা করা হয়। শেক্সপিয়র বলছেন, যাঁর প্রতি এই বন্দনা, তাঁর সঙ্গে কথা বলার কোনও নতুন ভাষা নেই। একই কথা বারবার বলতে হবে। অবশ্য এ শুধু শেক্সপিয়র বলেননি। মহাভারতকার বলেছিলেন, এই সেই কাহিনি, যা আমি বলছি, আমার পরেও লোকে বলবেন, আবার আগেও বলা হয়েছে।

তসলিমা সম্পর্কে এই যে কথাগুলো বলতে বলতে এলাম এতক্ষণ, এই কথাগুলো বহুবার বলেছি। পরেও বহুবার বলব। তসলিমা ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না। আমাকে বলেছিলেন, ‘ছিঃ! জয়, আপনি ধার্মিক!’ তাতে এই কথাগুলো মিথ্যে হয়ে যায় না। তাঁকে ‘বন্ধু’ বলার যোগ্যতা আমি হারিয়েছি। ওঁকে স্বাগত জানানোর কোনও অধিকারই আমার নেই। কিন্তু এই তসলিমা যদি ডাকেন, তাহলে না করার ক্ষমতাও আমার নেই। কলকাতায় প্রথমবার এসে, রবীন্দ্র সদনে, নিজের ২৪ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে, তিনি যে কবিতা পাঠ করেছিলেন, সেই পঙ্ক্তি মনে আছে আমার এখনও: ‘শৃঙ্খল ভেঙেছি আমি/পান থেকে খসিয়েছি সংস্কারের চুন’। নিজের লেখা এই লাইনটাকে তিনি ৪০ বছর ধরে অনুসরণ করে চলেছেন।
আমার জীবনে যদি কতকগুলো ভাগ্য থাকে– যেমন বিলায়েত খাঁ সাহেবকে বাজাতে শুনেছি, শম্ভু মিত্রের ১২ বছর ধরে পরপর অভিনয় দেখে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি, তাঁর ছোট ছোট বইগুলো পড়ার সুযোগ পেয়েছি, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয় দেখার সুযোগ পেয়েছি, একই নাটক ৪-৫ বার– তেমনই তসলিমা নাসরিনকেও চোখের সামনে দেখেছি আমি। ঈশ্বরকে তসলিমা বিশ্বাস করেন না, অম্লান দত্ত বা শিবনারায়ণ রায়ের মতোই– কিন্তু আমি বিশ্বাস করি তসলিমাকে দেখা দৈবের করুণা।
সাহিত্যের জন্য নিজেকে কতদূর সমর্পণ করা যায়, নিজের সংকল্পে স্থির থাকা যায়– তার মস্ত উদাহরণ হয়ে থাকবেন তসলিমা। আজ যাঁরা পক্ষে বা বিপক্ষে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করছে ওঁকে, হয়তো বেশিরভাগই সেই প্রশ্ন করার যোগ্য নয়। কারণ তসলিমার জীবনের লড়াই, তাঁর সাহিত্যের দর্শন সম্পর্কে তাঁরা জানেন না। কারণ তসলিমা তাঁরা পড়েননি। সেই প্রশ্ন করতে পারেন শুধু ওই নবীন পাঠকেরাই– যাঁরা পড়ে, উত্তেজিত হয়ে, তসলিমা-লিখিত বইয়ের পাতার ছবি বিলিয়ে দিচ্ছেন এদিকে-সেদিকে।
…………………………
অনুলিখন: সম্বিত বসু
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved