Robbar

সে ডাকে আমারে

Published by: Robbar Digital
  • Posted:August 14, 2026 9:48 pm
  • Updated:August 14, 2026 9:53 pm  

আমার চিরন্তন সমস্যা হচ্ছে, যত সহজে আমি কোনও প্রসঙ্গে, বিষয়ে বা ব্যক্তির প্রতি মনোযোগ কেন্দ্রিত করতে পারি, তত সহজে আমি সেই প্রসঙ্গ, বিষয় বা ব্যক্তির থেকে আমার ইচ্ছেমতো মন তুলে নিতে পারি না। ওই জন্যেই জীবনে আমার কিছুই হল না। সব সময়েই কানেকশন জুড়তে ওস্তাদ, যথাসময়ে কানেকশন কাটতে অপটু। এই ‘হরিবাবা’-র ক্ষেত্রেও একই দশা আরম্ভ হল আমার। না পারছি গিলতে, না পারছি ফেলতে।

সন্মাত্রানন্দ

১৮.

কাপড় ছেড়ে গামছা পরে দেবব্রতর সঙ্গে গড়ের পুকুরে চান করতে নেমে প্রথমেই যা মনে হল, তা হচ্ছে, পুকুর এ নয় সত্যিই। দেবব্রত বলেছিল দিঘি, আমি কিন্তু দেখলাম ঝিল। পাড়বাঁধানো এধারটা, তারপর কতদূর যে এর জলরাশির বিস্তার, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না, যতদূরে চাই, ততদূরেই শুধু জল আর জল। এর পাড়ে সারিসারি নারকেলগাছ, তালগাছ, খেজুরগাছ তো আছেই, তাছাড়াও নিম, জাম, আম, অর্জুনের ছায়াঘন আয়োজনও বিস্তর। অনেকটা দূরের দিকে চক্ষুস্থির করলে ইকড়িমিকড়ি কী যেন দেখা যায়। অনেকগুলো মাটির হাঁড়ি, কলসি, পাতিল, গেলাস একটা র‍্যাকের ওপর পাশাপাশি উলটে রেখে অনেক দূর থেকে দেখলে যেমন মনে হয়, দিঘির জললগ্ন দিগন্তরেখার ওপর ওই ইকড়িমিকড়িগুলোও তেমনই। সেদিকে দেবব্রতর দৃষ্টি আকর্ষণ করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা, ওই দূরের হুড়ুমদমাশ ব্যাপারগুলো কী, বলতে পারো?’

দেবব্রত তাচ্ছিল্য-সহকারে উত্তর দিল, ‘ওইটেই ছিল গড়। রাজার গড়। এখন ভাঙা ইঁটের পাঁজা আর সাপখোপের ঠেক!’

আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোন রাজা?’

দেবব্রত একই ভঙ্গিতে মুখ বেঁকিয়ে বলল, ‘ব্যাঙভাজা!’

‘ধ্যাৎ, এরকম বলছ কেন?’

“ঠিকই বলছি, দাদা। চুপচাপ চান করুন দেখি। যত্তসব! আরে এ দেশের বেশিরভাগ রাজাগজা নামেই রাজা, আসলে ব্রিটিশ প্রভুদের পা-চাটা গোলাম। প্রজাশোষণ করে নিজেদের ভোগসুখ, ঠাটপয়জার নিটোলভাবে বজায় রাখার জন্যে ব্রিটিশদের পায়ে তেল মাখিয়ে তুষ্ট রাখত। ব্রিটিশরা মোটা টাকার ট্যাক্স কামিয়ে জমজমে তাজা হয়ে উঠে এসব গ্রাম্য জমিদারদের ‘রাজা’, ‘মহারাজা’, ‘বাহাদুর’ এইসব টাইটেল দিয়ে বেশুমার তামাশা দেখত। সেকথা আপনি আমার চেয়েও অনেক বেশি ভালো করেই জানেন, দাদা!”

বুঝলাম, রাজামহারাজা সম্পর্কে দেবব্রতর ধারণাটি অতিশয় তিক্ত। তাও আরও একটু রগড় জমাতে প্রশ্ন করলাম, ‘কেন, ভালো কাজও তো তাঁরা করেছেন কিছু কিছু। এই যে দিঘিটা– এটাও তো ওঁরাই কাটিয়েছেন প্রজাসাধারণের উপকার হবে বলে। আরে উপকারও তো তাঁরা করেছেন মানুষের, না কি?’

দিঘির ঠান্ডা জলেও যেন তপ্ত তেলে পড়া পাঁচফোড়ন গোটাজিরের মতো চিড়বিড়িয়ে উঠল দেবব্রত, “হ্যাঁ, উপকার বলে উপকার! এসব দিঘিটিঘি ঘাটফাট ছিল ওদের ঠাটবাহারেরই অংশ। আর উপকার এত যে, বলে শেষ করা যায় না গো! ওই যে পাথরে বাঁধানো ঘাটগুলো দেখছেন, এই সব ঘাটে চান করতে আসা কত সাধারণ ঘরের বউঝিদের ইচ্ছেমতো তুলে নিয়ে গিয়ে এই রাজা ভোগ করে ছেড়ে দিয়েছে, জানেন? শুধুই কি রাজা? রাজা, রাজার শ্যালক, রাজার জামাই, রাজার পিসতুতো ভাই, কে নয়? সব ক’টা বদমাইশ। তবে রাজার শ্যালক চরিত্রটি কিন্তু দাদা, চিরকালই রঙদার। সে মহাভারতের শকুনি কিংবা কীচকই হোক আর বিশ শতকের শালাঠাকুরই হোক, সব শালারই এক রা!”

শিল্পী: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

বলতে বলতেই জলের মধ্যে টুপ টুপ করে ডুব দিয়ে মাথা ঠান্ডা করতে চাইল বোধহয় দেবব্রত। আমিও আর কথা না বাড়িয়ে বরফশীতল জলে অবগাহন ও তারপর সাঁতার-টাতার দিয়ে শরীর-মনের ক্লান্তি দূর করতে লেগে পড়লাম। স্নানটান সেরে ঘাটের উপর উঠে ভেজা গামছা দিয়ে গা-হাত-পা-মাথা-মুখ মুছে কাপড়জামা পরে ধোপদুরস্ত হয়ে দেবব্রতকে বললাম, ‘চলো, এবার পানিফলের বন্দোবস্ত করা যাক!’

দেবব্রত সোৎসাহে বলে উঠল, ‘চলুন, দাদা। ওই দিকে পশ্চিমপাড়ে লোকগুলো পানিফল নিয়ে বসেছে।’

তালসারির মাঝখান দিয়ে খোয়া-ছড়ানো লাল মাটির পথ। তারই একপাশে কতগুলো লোক স্তূপীকৃত পানিফল নিয়ে বসে আছে, দেখলাম। শুধু পানিফলই নয়, তালশাঁসও আছে। পাঁচটাকায় একগাদা পানিফল আর বরফানি ঠান্ডা স্বচ্ছ স্ফটিকের মতো তালশাঁস দিয়ে দিল শালপাতায় করে। দিঘির পাড়ে একটা বড় খেজুরগাছের নিচে বসে তালশাঁস আর পানিফল উদরস্থ করতে লাগলাম দু’জনে।

উদার মনে কর্মফল খেয়ে চলেছি, হঠাৎ দেখি, সামনের রাস্তায় এক বিচিত্রদর্শন সাইকেল-আরোহী চলেছেন। লোকটির বয়েস ৬০-৬৫-র কম হবে না। খাঁকি রঙের একটা ফুলপ্যান্টের ওপর ধূসররঙা একটা ঢিলে জোব্বা আর পায়ে একদা-সাদা কেডসজুতো পরা। বেশ লম্বা সিড়সিড়ে চেহারা। কিন্তু যেটা সব চেয়ে আকর্ষণীয় এবং সেই কারণেই লোকটিকে আমি বিচিত্রদর্শন বলেছি, তা হচ্ছে লোকটির গায়ের রং ও মাথার চুল। মানুষটির গায়ের রং যে একসময় চাঁপাফুলের মতো প্রায়-সোনালি ছিল, তাতে সন্দেহ নেই। বহুদিনের অযত্নে ও চোখা রোদ-জল ভ্যাপসানিতে গায়ের রং খানিকটা ঝাপসা হয়েছে, বলা যায়। আর তাঁর মাথার উড়িষ্টাখড়িষ্টা চুলগুলো কাঁধছাপানো সোনালি, তীক্ষ্ণ নাকচোখমুখ এবং চোখের নীলচে তারা– কোনওটা থেকেই ইনি যে এদেশীয়, তা মনে হল না আমার।

শিল্পী: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

আমি পানিফলখাওয়া থামিয়ে লোকটির দিকে হাঁ-করে তাকিয়ে আছি দেখে খেতে খেতেই নিতান্ত নিরাসক্ত, নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে উঠল দেবব্রত, ‘হরিবাবা।’

আমি বেজায় অবাক হয়ে পুনরাবৃত্তির আকারে প্রশ্ন করলাম, ‘হরিবাবা?’

‘হ্যাঁ, হরিবাবা। সায়েব,’ বলল দেবব্রত সেই একই উদাসীন ভঙ্গিমায়।

‘ধ্যার্‌, একজন সাহেবের নাম কী করে হরিবাবা হয়? আর এই পাণ্ডবর্জিত দেশে এলই বা কোত্থেকে এ সাহেব?’

চিবোনো পানিফলের টুকরোগুলো কপ্‌ করে গিলে ফেলে কোনওমতে উত্তর দিল দেবব্রত, ‘পাদ্রি, পাদ্রি। খ্রিশ্চান পাদ্রি!’

এতক্ষণে খানিকটা পরিষ্কার হল। তারপরেও বললাম, ‘পাদ্রি তো গলায় ক্রশ ঝুলতে দেখলাম না?’

‘হরিবাবা ক্রশ পরে না,’ দেবব্রত ঝামেলা চুকিয়ে দিল।

‘বেশ, তাও না হয় হল। কিন্তু একজন ক্রিশ্চানের নাম হরিবাবা; এটা বেশ অদ্ভুত নয় কি?’

দেবব্রত বলল, ‘তা জানি না, দাদা। আমরা ওঁকে ছোট থেকেই দেখছি। সবাই হরিবাবা বলেই ডাকে। এখান থেকে মাইল-আষ্টেক দূরে একটা খুব হতচ্ছেদ্দা করার মতো গাঁ আছে। নাম– কুহুডাঙা। কেউ যায়ই না ওদিকে। রাস্তাঘাটও নেই ভালোমতো কুহুডাঙার। সেখেনে ওঁর আশ্রম। বহুদিন হল আছেন হরিবাবা এ অঞ্চলে।’

হরিবাবা বা আর যা-কিছুই হোক, তা নিয়ে আর বেশি কথা এগল না আমাদের মধ্যে। কেমন যেন কথা এড়িয়ে যেতে লাগল দেবব্রত। অগত্যা পানিফল তালশাঁসের ভুট্টিনাশ করে দেবুর সাইকেলের পিছনে চেপে আমতলি ফিরে এলাম।

কিন্তু মাথার ভিতরে ওই যে কী যেন, ‘বোধ কাজ করে’। ব্যাপারটা সত্যিই বেশ উদ্ভট লাগছিল আমার। একসঙ্গে একগাদা প্রশ্ন ঢেঁকির পাড়ের মতো ক্রমাগত উঠছিল, পড়ছিল।

কে এই হরিবাবা?

তাঁর এমন অদ্ভুত নাম কেন?

খ্রিশ্চান পাদ্রি, অথচ গলায় ক্রশ নেই কেন?

কুহুডাঙার মতো অত নির্জন গ্রামে এত বছর কী করছেন?

কুহুডাঙা গ্রামটাকে লোকে অশ্রদ্ধা করে কেন?

দেবব্রত কুহুডাঙার প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে চাইল কেন?

আমার চিরন্তন সমস্যা হচ্ছে, যত সহজে আমি কোনও প্রসঙ্গে, বিষয়ে বা ব্যক্তির প্রতি মনোযোগ কেন্দ্রিত করতে পারি, তত সহজে আমি সেই প্রসঙ্গ, বিষয় বা ব্যক্তির থেকে আমার ইচ্ছেমতো মন তুলে নিতে পারি না। ওই জন্যেই জীবনে আমার কিছুই হল না। সব সময়েই কানেকশন জুড়তে ওস্তাদ, যথাসময়ে কানেকশন কাটতে অপটু। এই ‘হরিবাবা’-র ক্ষেত্রেও একই দশা আরম্ভ হল আমার। না পারছি গিলতে, না পারছি ফেলতে। দিনে রাতে হরিবাবাকে কেন্দ্র করে এসব সমস্যা আমাকে নিতান্ত উদ্বিগ্ন করে রাখল। রাতে নেই ঘুম, দিনে হরিমটর মানে প্রায়ই উপবাস।

যাকেই জিজ্ঞেস করি আমতলিতে, সে-ই ওই একই কথা মুখস্থের মতো বলে যায়। হরিবাবা। খ্রিশ্চান পাদ্রি। সায়েব। এ অঞ্চলে বহুদিন আছেন। কুহুডাঙায় তাঁর আশ্রম। এবং কুহুডাঙা খুব বাজে গ্রাম।

খুঁজতে খুঁজতে আমতলির এক অতিশয় বুড়ো মানুষ, নাম তার সুযতন প্রামাণিক, তার কাছে কিছুটা হদিশ পেলাম আমি। চাইলে নারান কবিরাজকেও জিজ্ঞাসা করতে পারতাম। কিন্তু দেবব্রত যেহেতু নারান কবিরাজেরই কম্পাউন্ডার এবং ডিসপেনসারিতে সে প্রায়শই হাজির থাকে, তাই তার উপস্থিতিতে ওসব কথা জিজ্ঞেস করাটা সমীচীন মনে হল না। কুহুডাঙার ব্যাপারে অনীহা দেবব্রত তো আগেই দেখিয়ে রেখেছে।

সুযতন প্রামাণিকের কাছ থেকে অতিরিক্ত যে-তথ্যগুলো পাওয়া গেল, তা এইরকম। আমতলি গাঁয়ের মানুষেরা যে কুহুডাঙাকে এড়িয়ে চলে, তার একটা কারণ হল, কুহুডাঙা যাওয়ার পথ বড়ই বিপদসঙ্কুল। পাশাপাশি দুই পাহাড়ের মাঝখানের খোঁদল দিয়ে সরু পথ কুহুডাঙা যাওয়ার। পথটা কাঁটাগাছ, জোঁক, বিছে, বিষাক্ত সাপ এবং ঘন কুয়াশায় ঢাকা থাকে প্রায়ই। ও পথ দিয়ে যারাই কুহুডাঙা যাওয়ার চেষ্টা করেছে, তাদের মধ্যে বেশির ভাগ লোকই পথ হারিয়ে গোলকধাঁধায় ঘুরে ঘুরে মরেছে, নয়তো সাপের কামড়ে প্রাণ হারিয়েছে। দু’-চারজন যারা কোনওমতে ফিরে এসেছে, তাদের অভিজ্ঞতা মোট্টে ভালো নয়।

কুহুডাঙাকে এড়িয়ে থাকার অন্যবিধ কারণ হচ্ছে, এই হরিবাবার আশ্রমে যারা থাকে, সমাজে তাদের অবস্থান আপত্তিজনক। কেন? সমাজ তাদের পরিহার করল কেন? তারা কি কুষ্ঠরোগগ্রস্ত? না, কুষ্ঠরোগী নয়। তাহলে? এই প্রশ্নের উত্তর সুযতন প্রামাণিকও এড়িয়ে গেলেন। শুধু এইটুকু বললেন, হরিবাবার আশ্রমের লোকেরা মাঝে মাঝে আমতলির বাজারে আসে উলের টুপি, মোজা, আম কিংবা চালতার আচার বেচতে।

বেশ। তা ‘হরিবাবা’ নামটা কেন?

নাহ্‌, সুযতন প্রামাণিক তা জানেন না!

শিল্পী: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

এরকম একটা রহস্য চোখের সামনে পেয়ে হাত নিশপিশ নিশপিশ করতে লাগল আমার। হরিবাবা ও তাঁর আশ্রমের চেয়েও আমাকে বেশি আকর্ষণ করতে লাগল কুহুডাঙার ওই বিপদাকীর্ণ পথ। কয়েকদিনের মধ্যে মনোতোষের সাইকেল সারানোর দোকান থেকে বেওয়ারিশ একটা ঝরঝরে সাইকেল জোগাড় করে ফেললাম।

দিনক্ষণ দেখে ‘দুগ্‌গা, দুগ্‌গা’ বলে কুহুডাঙার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ার জন্যে যেন দমবন্ধ অবস্থায় অপেক্ষা করতে লাগলাম আমি।

…………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন আয়নার ওধারে-র অন্যান্য লেখা

…………………….