Aynar Odhare: Across the Mountain, Towards the Unknown| Robbar
Robbar
  • ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মৃত্যু উপত্যকার বন্ধু

একটা মৃত মানুষের করোটি। আর ইতস্তত বিক্ষিপ্ত পাঁজরের ক’টা হাড়। করোটিটা সেই আলো-আঁধারির ভিতর ব্যাপকভাবে মুখব্যাদান করে আছে। অস্বস্তি লাগছিল, তাই ম্যাক্সিলা আর ম্যান্ডিবল চেপে ধরে ওর মুখটা বন্ধ করে ওকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম। কে জানে এ কোন হতভাগা! কত বছর আগে এ লোক এসেছিল এই পথে। তারপর এমন কিছু হয়েছিল, যাতে সে তৎক্ষণাৎ মৃত্যুবরণ করে। কী হতে পারে? সম্ভবত ভয়ানক বিষাক্ত সর্পদংশন। দংশন এবং লহমাপরেই মৃত্যু!

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬, ১৩:৪২   
Facebook WhatsApp Messenger

২১.

ক্রমশ ভূপ্রকৃতি আর সামতলিক রইল না। প্রথমে উঁচুনিচু জমি, পরে পাথর-কাঁকরই বেশি হয়ে দাঁড়াল। গ্রামজীবনের শ্যামলিমা অদৃশ্য হতে লাগল ধীরে ধীরে। বেশ কিছুটা এগনোর পরে চোখে পড়ল দিগন্তের কাছে পাশাপাশি উত্তল দু’টি মাটির ঢেউ। প্রথমে মনে হয়েছিল পাহাড় দুটো পরস্পরের থেকে বেশ দূরত্বে রয়েছে। কিন্তু যতই সামনে এগতে লাগলাম, ততই পাহাড় দু’টি উভয়ে উভয়ের কাছে যেন সপ্রেমে সরে আসতে লাগল। শেষে ব্যাপারটা এমন হয়ে দাঁড়ালো যে, যেন একটাই পাহাড় রয়েছে আর ওরা দু’টি সেই পাহাড়েরই উন্নত দু’টি শৃঙ্গ। আমি ধীরে ধীরে স-সাইকেল পাহাড়ের পাদদেশে এসে দাঁড়ালাম।

আরও একটা ব্যাপার চোখে পড়ার মতো। কিলোমিটার-খানিক দূরত্ব থেকে এই পাহাড়কে মনে হয়েছিল নয়নাভিরাম; সবুজ গাছে আর ঘাসে ঢাকা এ নগরাজ যেন হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকছিল তখন। কিন্তু কাছে যতই এগিয়ে গেলাম, ততই অনুভবান্তর হতে লাগল। অত কিছু শ্যামলিম বলে মনে হল না আর আমার এ পাহাড়কে। পাহাড়ের গায়ের গাছগুলো যেন পরস্পরের থেকে সরে গিয়েছে দূরে, পিঙ্গল বর্ণের রুক্ষ প্রস্তর কঙ্কর বেরিয়ে পড়েছে সবুজের আস্তর ভেদ করে। এখন আর সপ্রেম আমন্ত্রণ নেই, বরং দাঁতে দাঁত চেপে কপিশ দৃষ্টি হেনে এ পাহাড় যেন আমাকে প্রতিস্পর্ধী আহ্বান জানিয়ে বলছে, ‘এসো হে, দেখি, কতখানি তাকত আছে তোমার, আমাকে জয় করো!’

zoom
শিল্পী: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

একটু ঘাবড়েই গেলাম। তারপর মনে হল, কী দরকার? পাহাড় জয় করতে তো আসিনি এতদূরে! আমি এসেছি এ পাহাড়ের মধ্য দিয়ে যে-রাস্তা আছে, সেইটুকু ধরে ফ্রের আঁরি থমাস-এর আশ্রমের হদিশ পেতে। পথের মধ্যে আমার উদ্দেশে যে-কেউ চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতেই পারে, কিন্তু আমি সে-চ্যালেঞ্জ আদৌ নেব কি না-নেব, সেটা আমার নিজস্ব ব্যাপার। সেই চ্যালেঞ্জ আমার নিজস্ব লক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্যে প্রয়োজনীয় না কি পরিপন্থী, সেটাই তো প্রধানত বিচার্য! এই বিচারটা করতে পারি বলেই আমি সচল মানুষ। আর ও ওটা করতে পারে না বলেই, ওর নাম অচল পাহাড়।

মনে পড়ল সুযতন প্রামাণিকের কথাগুলো। পাশাপাশি দুই পাহাড়ের মাঝখানের খোঁদল দিয়ে সরু পথ কুহুডাঙা যাওয়ার। কথা ঠিক। যতই বলি, একই পাহাড়ের দু’টি উত্তুঙ্গ শৃঙ্গ, তবুও আদতে ওরা তো দুটো পাহাড়ই দু’দিক থেকে এগিয়ে এসে মাঝখানে মিলে গিয়েছে। তো সেই মাঝখানটা ধরে হাঁটছি আর হোঁচট খাচ্ছি। কোথাও সাইকেলে চড়া যায়, কোথাও যায় না। যেখানে টিলাপাহাড়ের উচ্চাবচতায় সাইকেলের ওপরে বসে থাকা অসম্ভব মনে হচ্ছে, সেখানে সাইকেল থেকে নামছি। এরই মধ্যে সাইকেলটার একটা নামকরণ করে ফেলেছি! সাইকেলের নাম ‘শম্ভু’। আমি আর শম্ভু– দুই ভাই পাশাপাশি হাঁটছি কোথাও কোথাও। শম্ভু মাথা নিচু করে হাঁটছে, আমি শম্ভুকে ধরে ধরে হাঁটছি মাথা উঁচু করে। পায়ের নিচে মোটামুটিভাবে পাথরের ছোটবড় চাঁই, তাতে ধাক্কা খেয়ে ঢাঁই-ঢকাস্‌ করতে করতে শম্ভু তড়বড়িয়ে হেঁটে চলেছে। আমি শম্ভুর গলা জড়িয়ে ধরে ‘ওরে থাম, থাম! আমিও যাব, আমিও যাব রে তোর সঙ্গে’ বলতে বলতে তার পাশে পাশে দৌড়োচ্ছিই বলা যায়। একবার তো শম্ভুর চেইন গেল খুলে! পাথরের চাঁইয়ের ওপর উবু হয়ে বসে চেন পরাতে লেগেছি, এমন সময় মাথার উপর দিয়ে ‘ক্যার্‌ ক্যার্‌ চ্যার্‌ চ্যার্‌’ তীক্ষ্ণ পাথর-চেরা আওয়াজ করতে করতে উড়ে গেল বিশালপক্ষ হিংস্র বাজপাখি। চোখ তুলে চেয়ে দেখলাম উপরে। বুঝি সে সাবধান করে দিচ্ছে আমাকে, যেন কোন মৃত্যু-উপত্যকায় হাতে প্রাণটা নিয়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছি আমি!

কী আর করা যাবে! ভারতীয় দর্শনে প্রাণ পাঁচটা– প্রাণ, অপান, ব্যান, উদান, সমান। তবে কেজো হিসেবে ওই পাঁচটা মিলে একটিই। হ্যাঁ, একটিই পৈতৃক প্রাণ। তো প্রাণ যাবে তো না-হয় তা একবারই যাবে। বেশি ভেবে আর কী করব?

খোঁদলই বটে! নিখুঁত বর্ণনা সুযতন প্রামাণিকের। দুটো পাহাড় যেখানে মিলে গিয়েছে দু’দিক থেকে এসে পঞ্জরাস্থির মতো, সেই প্রস্তর-প্রাকারের ঠিক মাঝখানে একটা গোটা মানুষ সেঁধুতে পারে, এমন একটা মুখ হাঁ-করা ফাটল। এই ব্যাদিত আনন গহ্বরটির মধ্য দিয়েই এগতে হবে বুঝতে পারলাম।

ফাটলের ওদিকটা অন্ধকার কেন, বুঝতে পারছিলাম না। বুঝব পরে, আগে তো ঢুকি– এই ভেবে আগে নিজে ফাটলের মধ্যে গিয়ে ঢুকলাম। তারপর শম্ভুকে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে গহ্বর পার করিয়ে ভিতরে টেনে নিয়ে গেলাম। বেশ হাঁপাচ্ছিলাম। জলতেষ্টা পেয়েছে। বোতল মাথার ওপর তুলে জল খেলাম ঢক্‌ঢক্‌ করে। জল খাওয়ার বুগ্‌বুগ্‌ আওয়াজ স্বাভাবিকের তুলনায় অধিক মনে হল। যেন সে-আওয়াজ কোথাও ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসছে আমার কানে।

আলো থেকে অন্ধকারে এসেছি। চোখদুটোকে সইয়ে নিতে সময় লাগল। কিছু পরে দৃষ্টি স্বাভাবিক হতে দেখি, যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেটা আসলে একটা পাথরের সুড়ঙ্গের মুখ।

আশেপাশে উপরে-নিচে তাকালাম। চারিদিক থমথম করছে। এ-কোনও মনুষ্যসৃষ্ট সুড়ঙ্গ নয়। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে সৃষ্ট সুড়ঙ্গ। জানি না কত হাজার হাজার কি কত লক্ষ লক্ষ বছর আগে এই দু’টি পাহাড় দুই প্রিয় সখীর মতো আহ্লাদে এ ওর গায়ে হেলে পড়েছিল। আর সেই হেলে পড়ার মুহূর্তে দুই পাহাড়েরই গা-থেকে বড় বড় অজস্র পাথর খসে পড়ে প্রকৃতির কী বিচিত্র খেয়ালে এই সুড়ঙ্গটি সৃষ্টি হয়েছে। মাথার উপর প্রস্তরনির্মিত ছাদ, দু’পাশে পাথরের নিরেট দেওয়াল। লম্বা, টানা একটা তমসাচ্ছন্ন পথ সামনে এগিয়ে গিয়েছে কতদূর, কে জানে! মাথার উপরে ছাদের দিক থেকে কোথাও কোথাও আলো আসছে পাথরের চাঁইয়ের ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে, সেই অল্প আলো আর অন্ধকার– দুয়ে মিলে সুড়ঙ্গটাকে আলো-চকচকে বুদবুদে ভরা একটা কালো শীতল পানীয়ের চিত্তাকর্ষক রহস্যমদির বোতল বলে মনে হতে লাগল আমার।

zoom
শিল্পী: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

‘রহস্যমদির’ কথাটাই ঠিক এক্ষেত্রে। সুড়ঙ্গের দেওয়ালে অন্ধকার-সবুজ শ্যাওলার পুরু স্তর, পায়ের নিচের মাটি কী যেন শুঁড়ওয়ালা, রোঁয়া-বের-করানো কালো পাহাড়ি লতায় আচ্ছন্ন, যেন একটা কালো জাজিম কেউ এই আদিম সর্পিল অবপথের মেঝেতে পেতে রেখেছে। পা-ফেলা মাত্রই সেই অদ্ভুত লতার রোঁয়াগুলো উত্তেজিত হয়ে জেগে উঠছে, হিংস্রভাবে জড়িয়ে ধরতে চাইছে আমার পায়ের পাতা। পায়ে মোটা চামড়ার গামবুট পরে আছি, তাই রক্ষে। তা না-হলে আমাকে এক পা-ও এগতে দিত না এই অজ্ঞাতপরিচয় রহস্যময় লতাগুল্ম। শম্ভুর হেলদোল নেই, সে দিব্বি কিত্‌-কিত্‌ করতে করতে চাকা গড়িয়ে হেঁটে চলেছে জাজিমের ওপর। কী একটা আর্দ্র এবং কটু গন্ধ নাকে এসে লাগল। গন্ধটা পাওয়ামাত্রই মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল আমার। প্রথম প্রথম খইনির টিপ অনভ্যস্ত জিভের তলায় রাখলে যেমন মাথাঘোরানিটা হয়, এ-ও ঠিক সেই রকম। কেমন নেশার ঘোরে টলমল করতে করতে হাঁটছিলাম। চোখের সামনে সুড়ঙ্গের দৃশ্যপট কুয়াশার আবরণে ঢাকা অস্পষ্ট অস্বচ্ছ বলে মনে হতে লাগল। কিছুদূর যাওয়ার পরে সেই কালো লতার জাজিম সরে গিয়ে খোঁচা খোঁচা কাঁটাওয়ালা একটা বিশেষ ধরনের উদ্ভিদ সুড়ঙ্গের গা-থেকে বেরিয়ে এসে বারবার আমার যাওয়ার পথ আটকাচ্ছিল। দুয়েকবার সেই তীক্ষ্ণ কাঁটার খোঁচায় আমার গাল, গলা, বাহু কেটেও গেল এখানে-ওখানে। ঘোরলাগা পদক্ষেপে হাঁটতে হাঁটতে এক জায়গায় কীসে যেন হোঁচট খেয়ে আছড়ে পড়লাম মাটিতে হঠাৎ! শম্ভু হাতছাড়া হয়ে ছিটকে পড়ল আরেকদিকে। কোনওমতে উঠে কীসে ধাক্কা খেলাম, দেখতে গিয়ে যা আবিষ্কার করলাম, তাতে বুকের রক্ত যেন জল হয়ে গেল!

একটা মৃত মানুষের করোটি। আর ইতস্তত বিক্ষিপ্ত পাঁজরের ক’টা হাড়। করোটিটা সেই আলো-আঁধারির ভিতর ব্যাপকভাবে মুখব্যাদান করে আছে। অস্বস্তি লাগছিল, তাই ম্যাক্সিলা আর ম্যান্ডিবল চেপে ধরে ওর মুখটা বন্ধ করে ওকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম। কে জানে এ কোন হতভাগা! কত বছর আগে এ লোক এসেছিল এই পথে। তারপর এমন কিছু হয়েছিল, যাতে সে তৎক্ষণাৎ মৃত্যুবরণ করে। কী হতে পারে? সম্ভবত ভয়ানক বিষাক্ত সর্পদংশন। দংশন এবং লহমাপরেই মৃত্যু! তারপর লোকটার নিষ্প্রাণ শরীর পড়েছিল এখানেই। নিশ্চয়ই বন্য জানোয়ার আর শকুনে মৃতদেহের মাংস ছিঁড়ে খেয়ে সাফ করে দেয় কিছুদিনের মধ্যে। অতঃপর কঙ্কালটা এই পুরু ঘাসের জাজিমের নিচে চলে যেতে থাকে। ধীরে ধীরে আবহবিকারের ফলে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় হাড়গুলো। যা যতটুকু টিকেছিল এতদিনে, আজ আমার পায়ের চাপে আবার ঘাসের জাজিম ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে।

কিছুটা কার্বলিক অ্যাসিড ছড়িয়ে হাঁটু মুড়ে বসলাম। হাতের পাতায় করোটিটা তুলে নিয়ে চোখের কাছে এনে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিলাম। ছাত্রজীবনে একটি বিদ্যে শিখেছিলাম। কপালের হাড়ের দুটো রগের মধ্যেকার দূরত্ব থেকে পরিসংখ্যানতত্ত্বের প্রয়োগের দ্বারা মৃত মানুষটি পুরুষ না নারী ছিলেন, তা যথাসম্ভব নির্ধারণ করা যায়। এখানে নিখুঁত মাপনী নেই, কাগজ-কলম নেই, কাজেই ওই পদ্ধতি প্রয়োগের সুষ্ঠু উপায়ও নেই। তবে ছাত্রাবস্থায় ওই কাজটার অভিজ্ঞতা থেকে অনেকটাই অনুমান করা গেল। এবং সেই অনুমিত সিদ্ধান্তটি অদ্ভুত। মৃত ব্যক্তিটি খুব সম্ভব পুরুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন নারী।

কিছু তো একটা সম্বোধন করতেই হয়। আর তার জন্যে একটা যুতসই নাম থাকা দরকার। মনে মনে নাম দিলাম, মিতালি। এ ভয়ানক পন্থায়, এই বিপদসংকুল সুড়ঙ্গে শম্ভুকে বাদ দিলে ইনিই আপাতত আমার বন্ধু। তাই, মিতালি বলাই যায়।

‘এভাবে কতদিন পড়ে আছেন, মিতালি?’

কথাটা উচ্চারণ করেই মনে হল, এ কী পাগলামি করছি! জনশূন্য পাহাড়ি সুড়ঙ্গ, পদে পদে মৃত্যু ছড়ানো, এর মধ্যে হাঁটু মুড়ে বসে মড়ার মাথা হাতে তুলে নিয়ে আমি আবিষ্ট হ্যামলেট এ কীসব অতিনাটকীয় সংলাপ উচ্চারণ করে চলেছি? পাগলামির তো একটা লিমিট থাকে! ছোটবেলায় এক দূর সম্পর্কের পিসিমার হাতে মানুষ হয়েছিলাম। নানা প্রকার উদ্ভট নির্যাতন করতাম আমি তাঁকে। বেশি রেগে গেলে সেই পিসি বলতেন, ‘ডানপিটে ছেলের মরণ গাছের আগায়!’ কিন্তু এ তো গাছের আগা নয়, এ যে পাহাড়ের চূড়া! তবে কি এই পাহাড়চূড়াতেই আমার জন্যে মৃত্যু বসে বসে অপেক্ষা করছিল এতদিন?

zoom
শিল্পী: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

এসবে আমার একদম বিশ্বাস নেই, কিন্তু তা সত্ত্বেও কী করে যেন… আমিও ঠিক বোঝাতে পারব না আজ কী করে সেটা হল… শুনতে পেলাম, অনেক দূর থেকে ক্ষীণ স্বরে কে যেন বলে উঠল থেমে থেমে কথাগুলো, ‘অনেক… দিন… আগে…’

আমি আবিষ্টের মতো জিজ্ঞেস করলাম, ‘অনেক দিন আগে… কী? কী হয়েছিল আপনার? সাপের আক্রমণ?’

‘না। সাপ নয়।’

‘তা হলে কী, মিতালি?’

‘অভিশপ্ত জীবন। শেষ করে দিয়েছিলাম নিজের হাতে…’

‘কীভাবে? বিষ?’

‘হ্যাঁ, বিষ,’ উচ্চারণে কেমন ম্লান বিষাদখিন্ন সুর!

‘কিন্তু তার জন্যে এতদূর আসতে হল কেন আপনাকে?’

কোনও উত্তর নেই কিছুক্ষণ। সব চুপ। তারপর আবার সরু বাঁশির শব্দের মতো চিকন কণ্ঠস্বরে যেন কে বলে উঠল, ‘পালাচ্ছিলাম। পালাচ্ছিলাম। পিছন থেকে ছুটে আসছিল ওরা।’

‘কারা?’

আবার নিরুত্তর। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোথায় যাচ্ছিলেন?’

এবার উত্তর এল, ‘কুহুডাঙায়… হরিবাবার কাছে…’

‘তাহলে বিষ খেতে হল কেন?’

‘ভেবেছিলাম পিছন থেকে ছুটে আসা লোকগুলোকে এড়াতে পেরেছি। কিন্তু এখানে ঢুকে কিছুটা এগনোর পরে পিছনে চেয়ে দেখলাম, সুড়ঙ্গের খোঁদল পেরিয়ে ওরা ঢুকে পড়েছে…’

‘আর উপায় ছিল না, না?’

‘না।’

‘সঙ্গেই ছিল বিষ?’

‘হ্যাঁ। বিপদ আশঙ্কা করে আগে থেকেই কোঁচড়ে নিয়ে বেরিয়েছিলাম… ওরা আমাকে বাঁচতে দিল না গো…’ কেমন ডুকরে কেঁদে উঠল সেই কণ্ঠস্বর। কাঁদতেই লাগল ডুকরে ডুকরে।

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওরা আসলে কারা, বলুন তো, মিতালি?’

সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত শব্দ, না কি আমার নিজেরই মনের সেই অনর্গল প্রলাপ একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল। আর কোনও উত্তর নেই, সব চুপ, সব নিঃশব্দ।

অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে থেকেও যখন আর কিছুই শুনতে পেলাম না, তখন মিতালির করোটি, মিতালির শরীরের হাড় সেই ঘাসের জাজিম সরিয়ে মাটিতে পুঁতে দিতে লাগলাম। থাক, নিঃশব্দে ঘুমোক। কে জানে, কে এই মেয়েটি! নাকি সমস্তই আমার কল্পনা?

মিতালিকে মাটিতে ফিরিয়ে দিয়ে অতঃপর ওধার থেকে শম্ভুকে টেনে তুলে ওর পিঠের ওপর উঠে বসলাম আমি।

…………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন আয়নার ওধারে-র অন্যান্য লেখা

…………………..

adventure Ascetic life column Cyclist Human remains Mountain Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar serial skeleton

Share this article on