

রাগে, দুঃখে ও প্রবল অভিমানে একদিন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর পরম আদরের পাণ্ডুলিপি ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন জ্বলন্ত উনুনের আগুনে। এর বহু বছর পরে ১৯৯৩ সালের ১ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে পথচলা শুরু করে ‘দিশারী সাংস্কৃতিক চক্র’। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত খুব কমই আছে, যেখানে একজন লেখকের সাহিত্য ও জীবনদর্শন তাঁর মৃত্যুর এত বছর পরেও একটি এলাকার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
শিল্পের বেদিতে নিজেকে সঁপে দেওয়া শিল্পীর পরিণতি যে কতখানি নির্মম হতে পারে, সেই ঘটনা আমরা পেয়েছি তারাশঙ্করের কালজয়ী উপন্যাস ‘কবি’-র নিতাই কবিয়ালের জীবনে। তারাশঙ্কর তাঁর জীবনে ও সাহিত্যে শিল্পীর যে অর্থনৈতিক ট্র্যাজেডি দেখেছেন, ড. উজ্জ্বল মুখোপাধ্যায় যেন তার একটি চিরস্থায়ী, বাস্তব সমাধান খুঁজলেন লাভপুরের মাটিতে। ২০২০ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ৮.১২ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা ‘গুরুকুল নাট্য আশ্রম’-এ প্রায় ৫০ জন নাট্যশিল্পী কোনও অনুদান বা টিকিট বিক্রির করুণার ওপর নির্ভরশীল নন। তাঁরা সকালে জমিতে লাঙল চষেন, নিজেদের ফসল নিজেরা ফলান এবং সন্ধ্যায় সেই শ্রমস্নাত শরীরেই অভিনয় করেন তারাশঙ্করের সাহিত্যনির্ভর নাটকে! তারাশঙ্করের নিতাই কবিয়ালরা যেখানে পেটের দায়ে ধুঁকে মরেছে, উজ্জ্বলবাবুর শিল্পীরা সেখানে স্বনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতির এক নতুন মডেল তৈরি করেছেন। এই বিশাল আশ্রমের ঘরবাড়িতে কোনও তালাচাবি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই, কোনও চুরির ভয় নেই। একটি আদর্শ, স্বয়ংসম্পূর্ণ, করালগ্রাসমুক্ত গ্রামবাংলার যে ছবি তারাশঙ্কর হয়তো তাঁর লেখাতেও পুরোপুরি গড়ে উঠতে দেখে যেতে পারেননি, সেই ইউটোপিয়া আজ বাস্তব রূপ পেয়েছে বীরভূম সংস্কৃতি বাহিনীর এই নাট্যগ্রামে।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও কিন্তু এই নাট্যচর্চা আর অভিনয়ের সঙ্গে ছিলেন সম্পৃক্ত। লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের ঘোষণায় তখন সারা বাংলা অগ্নিগর্ভ। সেই উত্তাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে লাভপুরের বুকে নির্মলশিব বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘বন্দেমাতরম থিয়েটার’। তারাশঙ্করবাবুর কলমে পাওয়া সেই বর্ণনা আজকের দিনেও সমান প্রাসঙ্গিক– সেই থিয়েটারে মঞ্চের পর্দা উঠতেই দর্শকরা দেখতেন, মধ্যস্থলে দাঁড়িয়ে আছেন শেকল-পরা ভারতমাতা। আর তাঁর দুই পাশে দাঁড়িয়ে দুই সন্তান– একদিকে হিন্দু, অন্যদিকে মুসলমান। ভারতমাতা সস্নেহে দুই সম্প্রদায়ের হাত ধরে মিলিয়ে দিচ্ছেন। উপরে জ্বলজ্বলে লাল অক্ষরে লেখা– ‘বন্দেমাতরম থিয়েটার’, আর ঠিক নিচে লেখা– ‘হিন্দু মুসলমান একই মায়ের দুই সন্তান’। রাজরোষের প্রবল হুমকিতে একসময় বাধ্য হয়ে থিয়েটারের নাম বদল করে রাখতে হয় ‘অন্নপূর্ণা থিয়েটার’। এমনকী, লাইব্রেরির বইগুলোর ওপর মারা ‘বন্দেমাতরম’ রাবার স্ট্যাম্পটিতেও কালো কালি লেপে দিতে হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে ১৯১৭ সালে গড়ে ওঠা ‘অতুলশিব ক্লাব ও রঙ্গমঞ্চ’-এ যুবক তারাশঙ্কর আশ্চর্য দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন ‘সীতা’ নাটকে সীতার চরিত্র। একইভাবে ‘প্রতাপাদিত্য’ নাটকে কল্যাণী, ‘চাঁদবিবি’তে মরিয়ম, ‘গৃহলক্ষ্মী’তে মেজবউ, ‘প্রফুল্ল’ নাটকে জ্ঞানদা এবং ‘বঙ্গলক্ষ্মী’তে বিনোদিনীর মতো নারী চরিত্রে তাঁর সাবলীল অভিনয় দর্শককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত। কেবল নারী চরিত্রেই নয়, বলিষ্ঠ পুরুষ চরিত্রেও তাঁর দাপট ছিল সমান। ‘কর্ণার্জুন’ নাটকে কূটকৌশলী শকুনি, রবীন্দ্রনাথের ‘চিরকুমার সভা’য় শ্রীশ, ‘বৈকুণ্ঠের খাতা’য় কেদার, ‘শেষরক্ষা’য় চন্দ্র ও বিনোদ, ‘বশীকরণ’-এ ভৃত্য এবং ‘বঙ্গনারী’ নাটকে যজ্ঞেশ্বরের মতো বিচিত্র মাত্রার চরিত্রে অভিনয় করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁর শিল্পীসত্তার গভীরতা কতটা। এরপর দেশপ্রেম ও নাট্যস্পৃহার সম্মিলিত আবেগে জন্ম নিল তাঁর প্রথম লেখা নাটক– ‘মারাঠা তর্পণ’। নিজের প্রতিভায় অগাধ বিশ্বাস এবং এক-বুক স্বপ্ন নিয়ে তিনি সেই পাণ্ডুলিপি তুলে দিয়েছিলেন তাঁর গুরু নির্মলশিব বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে। নির্মলশিব সেই লেখা পড়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে তা নিয়ে গিয়েছিলেন কলকাতার এক নামকরা পেশাদার নাট্যদলের (আর্ট থিয়েটার) কাছে। সে যুগের বিখ্যাত নাট্যকার ও পরিচালক অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের হাতে পাণ্ডুলিপিটি তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু ফল হল মর্মান্তিক। অপরেশচন্দ্র লেখাটি পড়ে দেখারও প্রয়োজন মনে করলেন না। চরম অবজ্ঞায় তিনি নির্মলশিবকে ফিরিয়ে দিয়ে রূঢ় কণ্ঠে বললেন, “নিজে নাটক লিখে নাম করেছেন ঠিক আছে, কিন্তু নিজের আত্মীয়স্বজনকে এনে ঢোকাবেন না। আজকে সূচ ঢোকাব, কাল ফাল হয়ে বেরোলে আমাদের পস্তাতে হবে।” রাগে, দুঃখে ও প্রবল অভিমানে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় সেদিন তাঁর পরম আদরের পাণ্ডুলিপিটি ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন জ্বলন্ত উনুনের আগুনে।

লাভপুরের লাল মাটি এখনও কিন্তু ভোলেনি তাঁর ভূমিপুত্রের এই থিয়েটারপ্রেম। বইয়ের মলাট বন্ধ হলেই উপন্যাসের চরিত্রদের আয়ু ফুরিয়ে যায়। কিন্তু তাঁর লেখার ওপর নির্ভর করে যখন বীরভূম সংস্কৃতি বাহিনী বা দিশারী সাংস্কৃতিক চক্র একের পর এক নাটক উপস্থাপনা করে সমসময়-কে চিহ্নিত করে চলে, তখন সেকালের মলাটবন্দী গুমটে জুড়ে যেতে থাকে একালের হাওয়ারা। ২০১৪ সাল থেকে তারাশঙ্করের বসতবাড়ি ‘ধাত্রীদেবতা’র রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয় সংস্কৃতি বাহিনী। তাঁরা প্রমাণ করেছেন, একজন সাহিত্যিকের ভিটে কেবল মৃত অতীতকে কাচের বাক্সে সাজিয়ে রাখার মিউজিয়াম হতে পারে না। ২০১৭ সালে তারাশঙ্করের প্রথম দিকের গল্প ‘রসকলি’-কে তাঁরা মঞ্চস্থ করেন। কিন্তু কোনও গতানুগতিক প্রসেনিয়াম মঞ্চে নয়, খোদ ‘ধাত্রীদেবতা’ বাড়ির উঠোনে, গাছের তলায়, বারান্দায়। স্রষ্টার নিজের ভিটের স্পেসকে ব্যবহার করে, সাইট-স্পেসিফিক বা ইমারসিভ থিয়েটারের মাধ্যমে তাঁরই চরিত্রদের জীবন্ত করে তোলার এই অদ্ভুত শিল্পরীতি বাংলা থিয়েটারে সত্যিই এক নতুন দিগন্ত।

তারাশঙ্কর কেবল তাঁর চরিত্রদের গল্পই বলেননি, তিনি রাঢ় বাংলার বেদে, লাঠিয়াল, সাপুড়েদের মতো হারিয়ে যাওয়া লোকজ জীবনকে অমর করে গিয়েছেন। আর উজ্জ্বলবাবু সেই লোকজ উপাদানকে একুশ শতকের গ্লোবাল থিয়েটারের রূপ দিয়েছেন। তারাশঙ্করের কালজয়ী গল্প ‘আখড়াইয়ের দিঘি’র ডাকাত কালী বাগদির আখ্যানকে উজ্জ্বল মুখোপাধ্যায় মঞ্চে আনলেন ‘রায়বেঁশে’ লোকনৃত্যের ফর্মে। লাঠিকে তিনি কেবল দস্যুতার হাতিয়ার হিসেবে না-রেখে, প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ‘শ্যামা’ চরিত্রের হাতে তুলে দিলেন। আবার, ‘নাগিনী কন্যার কাহিনী’তে পিঙ্গলার ট্র্যাজেডিকে পটগান ও সাপের ঝাঁপি দিয়ে রাঢ় বাংলার জীবন্ত ক্যানভাসে আঁকলেন। এই লোকজ উপাদানকে আধুনিক মঞ্চভাষায় রূপান্তরের চূড়ান্ত পরিণতি হল তাঁদের মেগা প্রযোজনা ‘বেহুলা-লখিন্দর পালা’।

মানুষের শরীরকে পুতুল (Live Human-Puppet) হিসেবে ব্যবহার করে, লাভপুরের ফুল্লরা মেলার হারিয়ে-যাওয়া পুতুলনাচের স্মৃতিকে তাঁরা পৌঁছে দিলেন মিশরের ‘কায়রো ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভ্যাল ফর এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটারের’ (২০২৪) মঞ্চে। লাভপুরের মাটি থেকে উঠে আসা একটি লোকগাথা আন্তর্জাতিক ট্রান্স-ওশেনিক ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়ছে এবং ৫০০ রজনী অতিক্রম করছে– এ কেবল একটি নাট্যদলের সাফল্য নয়, এ হল তারাশঙ্করের লোকদর্শনের বিশ্বজয়।
তারাশঙ্করের চিন্তার একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল রাঢ় বাংলার প্রান্তিক মানুষ। ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত লেখা তাঁর ‘গ্রামের চিঠি’গুলিতে তিনি বারবার গ্রামের ভূমিহীন চাষি, পতিত জমি এবং শোষণের কথা লিখেছেন। তিনি এমন একজন ‘সর্বত্যাগী মানুষ’-এর খোঁজ করেছিলেন, যিনি কোনও রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় না-থেকে, সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে দরিদ্রদের নেতৃত্ব দেবেন, তাদের অন্ধকারে আলো জ্বালবেন। অন্যদিকে, ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’-য় তিনি এঁকেছেন কাহার, বাউরি, ডোমদের অন্ধকারের জীবন। করালী বা বনোয়ারীরা শত লড়াই সত্ত্বেও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল, সমাজ তাদের মূলস্রোতে গ্রহণ করেনি।

তারাশঙ্কর তাঁর ‘গ্রামের চিঠি’তে যে সর্বত্যাগী, নেতৃত্বপ্রদানকারী মানুষের স্বপ্ন দেখেছিলেন, উজ্জ্বলবাবু যেন নীরবে সেই শূন্যস্থানই পূরণ করে চলেছেন। ২০২২ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় ‘আনন্দ শিক্ষায়তন’ সেই কাহার ও বাউরিদের উত্তরসূরি, জনজাতীয় শিশুদের জন্যই তৈরি। বনোয়ারী বা করালীদের যে উত্তরসূরিরা আজও শিক্ষার মূল আলো থেকে দূরে, তাদের হাতে বই তুলে দিয়ে উজ্জ্বলবাবু যেন সাহিত্যিকের সেই খেদ মেটাচ্ছেন। যে সমাজ একদিন তারাশঙ্করের চরিত্রদের মূলস্রোতে জায়গা দেয়নি, সংস্কৃতি বাহিনীর এই শিক্ষায়তন যেন সেই সমাজের হয়ে এক ঐতিহাসিক প্রায়শ্চিত্ত। এই বছর থেকে তাঁরা এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবা ও সমাজকল্যাণমূলক কাজের জন্য পরিচালনা করছেন ‘আনন্দ ভবন’, যে আনন্দ ভবন আসলে ‘ধাত্রীদেবতা’র বিখ্যাত চরিত্র বিশু ডাক্তারের আজীবন লালিত স্বপ্ন।

শুধু উজ্জ্বলবাবুর বীরভূম সংস্কৃতি বাহিনী-ই নয়, ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত দিশারী সাংস্কৃতিক চক্র-র কথাও বলতে হয়। ১৯৯৩ সালের ২৪ জুলাই, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিনে এক শ্রুতিনাটকের আসরে বসে লাভপুরের ভূমিপুত্র পার্থপ্রদীপ সিংহ এবং তাঁর সঙ্গীরা অনুভব করেন, নিজেদের মাটির স্রষ্টাকে এভাবে কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। ১ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে পথচলা শুরু করে দিশারী। তাঁদের সামনে কোনও বিশাল পুঁজি বা আধুনিক পরিকাঠামো ছিল না, ছিল কেবল একটি ধ্রুব বিশ্বাস– ‘তারাশঙ্কর চর্চাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য।’ এই একটিমাত্র মন্ত্রকে বুকে ধারণ করে পার্থপ্রদীপ সিংহ বিগত তিন দশক ধরে লাভপুরের মাটিতে যে নিরলস তপস্যা করে চলেছেন, তা সমকালীন বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে এক অভাবনীয় দৃষ্টান্ত। পার্থপ্রদীপ সিংহ তারাশঙ্করের ২০টি সাহিত্যকর্মকে নাট্যরূপ দিয়েছেন এ যাবৎ এবং সেই সবক’টি মঞ্চস্থ হয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর হল, পার্থবাবু তারাশঙ্করের সাহিত্যকে কেবল অতীতের আখ্যান হিসেবে ফেলে রাখেননি, তাকে সমকালের প্রতিবাদী হাতিয়ার হিসেবে শাণিত করেছেন। ২০১৭ সালে মঞ্চস্থ ‘জটায়ু’ নাটকের মূল সুর– ‘রাবণে ভরে গেছে দেশ, জটায়ুর আজ বড়ো প্রয়োজন’– যেন আজকের এই অস্থির, দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজের বুকেই সজোরে চাবুক মারে। জটে কামারের জটায়ু হয়ে ওঠার এই রূপক বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে এক জোরালো ধিক্কার। একইরকমভাবে, ২০২৫ সালে মঞ্চস্থ ‘জাগরণ’ নাটকে রামায়ণের প্রচলিত আখ্যানকে এক নতুন, সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। ২০২২ সালে তারাশঙ্করের বিখ্যাত উপন্যাস ‘রাধা’ অবলম্বনে নির্মিত নাটকে বৈষ্ণব ধর্মের নামে চলা ব্যাভিচারের বিরুদ্ধে মাধবানন্দের যে দীর্ঘ সামাজিক লড়াই, তা আঠারো শতকের প্রেক্ষাপটে লেখা হলেও একুশ শতকের ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে সমানে প্রাসঙ্গিক। ‘বেদেনী’, ‘কালিন্দী’, ‘শশে ডোম’ বা ‘ডাইনি’-র মতো চরিত্রগুলিকে মানুষের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে চলেছেন আজও। তাঁর নাট্যরূপ দেওয়া নাটকগুলির কোনও কোনওটি শত রজনী অভিনয় হয়েছে। অতুলশিব ক্লাবের মঞ্চের ধুলোমাখা বোর্ড, জরাজীর্ণ গ্রিনরুম আর ভাঙা চেয়ারগুলোর মধ্যে পার্থপ্রদীপ সিংহ যেন একদল ঘর্মাক্ত, সাধারণ গ্রামীণ শিল্পীকে নিয়ে প্রতিদিন তারাশঙ্করের শব্দের সঙ্গে বসবাস করছেন। কোনও সরকারি অনুদানের ভরসায় নয়, কিংবা শহরের বিলাসবহুল থিয়েটার হলের মোহ নয়– কেবলমাত্র শেকড়ের টানে, মাটির প্রতি অমোঘ দায়বদ্ধতায়।

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত খুব কমই আছে, যেখানে একজন লেখকের সাহিত্য ও জীবনদর্শন তাঁর মৃত্যুর এত বছর পরেও একটি এলাকার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। শান্তিনিকেতনের উত্তরায়ণে বাসকালে একদিন তারাশঙ্করকে পেয়ে রবীন্দ্রনাথ অভিমানভরে বলেছিলেন, ‘তুমি শান্তিনিকেতনে আসো-না কেন? তোমার বাড়ি তো কাছেই, নিত্য আসা-যাওয়া চলে।… আমি আশা করেছিলাম, এখানকার একটি কোণ আগলে তুমি বসবে।’ আমতা-আমতা করে সেদিন তারাশঙ্কর জবাব দিয়েছিলেন, ‘মানে এদিকটায় আসা হয়ে ওঠে না।’ কবিগুরু উত্তরে বলেছিলেন, ‘বুঝেছি তোমার ইচ্ছে নেই, তোমায় টানা অন্যায় হবে!’ তিনি বুঝেছিলেন লাভপুর তারাশঙ্করের হৃদয়ে মগজে কীভাবে জেঁকে বসেছে। তিনি বোধহয় জানতেন, ‘হেরিটেজ বোলপুর ব্র্যান্ড’ নিয়ে ব্যবসা হবে একদিন। আর লালমাটির লাভপুরে নিরলস চলতে থাকবে তারাশঙ্কর-ধারাপ্রবাহ!
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved