


আমি রাজার দেবতা নই, গণের দেবতা, মানুষের দেবতা। রাজা তার স্বার্থে আমাকে ব্যবহার করতে চাইলেও পারবে না শেষ অবধি। সব মানুষকে দীর্ঘদিন ঠকানো যায় না। একজন করে রাজা কমবে আর একজন করে সাধারণ গণবৃদ্ধি ঘটাবে। একদিকে বিয়োগ, অন্যদিকে যোগ।
১৬.
গণেশ কি আর যেমন তেমন দেবতা! মাঝরাতে স্বপ্ন দিলেন। আমি ছেলেবেলা থেকে লীলা মজুমদারের ভক্ত। তাঁর ‘গণশার চিঠি’ যে কতবার পড়েছি। ‘ভাই সন্দেশ’ বলে সেই চিঠি শুরু হত। আর মাঝখানে লীলা মজুমদার যে কী চমৎকার করে যোগ-বিয়োগ শিখিয়ে দিয়েছিলেন। ‘মানকে স্বচক্ষে দেখেছে, প্রথম সপ্তাহে ঘরের ভেতরে সাতটা ছেলে পেনসিল চিবুচ্ছে আর ঘরের বাইরে দুটো ছাগল নটে চিবুচ্ছে; মাস্টারমশাই গা নাচাচ্ছেন। পরের সপ্তাহে মানকে আবার দেখেছে, ঘরের ভেতরে ছয়টা ছেলে পেনসিল চিবুচ্ছে আর ঘরের বাইরে তিনটে ছাগল নটে চিবুচ্ছে; মাস্টারমশাই জিভ দিয়ে দাঁতের ফোকর থেকে পানের কুচি বের করছেন। আবার তার পরের সপ্তাহে হয়তো দেখবে, ঘরের ভেতর পাঁচটা ছেলে পেনসিল চিবুচ্ছে আর বাইরে চারটে ছাগল নটে চিবুচ্ছে; মাস্টারমশাই সেফটিপিন দিয়ে কান চুলকোচ্ছেন।’ একদিকে ছাত্র কমছে, অন্যদিকে ছাগলের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। একদিকে বিয়োগ, অন্যদিকে যোগ।

তা গণেশদাদা আমাকে যে স্বপ্ন দিলেন, তা এমন যোগ-বিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো, আমাদের উচ্চবর্ণ-মধ্যবিত্ত-হিন্দু পরিবারে চিরকাল গণেশ আর কার্তিককে ‘দাদা’ বলার চল। গণেশ তো চমৎকার। মাতৃভক্ত, বেশ আলসেমি-পরায়ণ। বাবা বলতেন, গণেশের জিতে যাওয়ার গল্প। মা দুর্গা না কি একবার গণেশ আর কার্তিকের মধ্যে বিশ্ব-দেখার দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন। যে আগে বিশ্ব দেখে ফিরবে, সেই জিতবে!
কার্তিক তো ময়ূরে চেপে উড়ে গেল। আর গণেশের বাহন ইঁদুর। সে ময়ূরের সঙ্গে পারবে কেন? তবু শেষ অবধি বুদ্ধির দৌলতে গণেশ এই দৌড় প্রতিযোগিতায় জিতে যায়। মা দুর্গার চারপাশে একবার পাক খেয়ে হাসি-হাসি মুখে গণেশ মাকে বলে, ‘তুমিই আমার পৃথিবী, বিশ্ব। তোমার চারপাশে একবার ঘুরলেই বিশ্বভ্রমণ সমাপ্ত।’ মা দুর্গা কী আর বলেন। গণেশকেই জয়ী ঘোষণা করলেন। বাবার মুখে এই গল্প শোনা ইস্তক গণেশকে আমি দাদা মেনেছিলাম। গণেশদাদার বুদ্ধি সন্দেহ নেই বাঙালি বুদ্ধি।

যাই হোক, গণেশ আমাকে কেবল স্বপ্ন দিলেন না, সেই স্বপ্নের কথাগুলি কী করে জানি চিঠিতে লিখে আমার মাথার কাছে রেখে গেলেন। সে-চিঠি সত্য না মিথ্যা, তা বিচারের ও বিশ্বাসের দায়-দায়িত্ব আপনাদের। আমি শুধু এখানে সেই স্বপ্নে পাওয়া পত্রখানি আপনাদের দৃষ্টিগোচর করার জন্য বাংলা-হরফে টাইপ করে দিলাম:
“ভাই বঙ্গ,
আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। তোমাদের স্বরসন্ধিতে আমি আছি। গণ+ঈশ=গণেশ। এই ‘গণ’ শব্দটি নিয়ে আলাদা করে কখনও ভেবেছ কি? রাজা-গজারা যে দেব-দেবীর পুজো করে, আমি ঠিক তাদের দেবতা নই। আমি গণের দেবতা। ‘গণ’ শব্দটি সমূহ অর্থে ব্যবহৃত হয়। জনগণ। অর্থাৎ জনসমূহ। আমার মাথাটিও মানুষের নয়, হাতির। তোমরা বঙ্গবাসীরা আমার মুখটিকে হাসি-খুশি হাতির মুখ করে তুলেছ। হাতিকে তোমরা ভালোবাসো। হাসি-খুশি ভালো মানুষ হাতিকে কে না ভালোবাসে। তোমাদের ছেলেবেলায় তোমরা আলেক্সান্দর কুপ্রিনের লেখা ‘হাতি’ পড়তে। প্রগতি প্রকাশনের সেই বইটি মূল রুশ থেকে বাংলায় অনুবাদ করা। হায়াৎ মামুদের অনুবাদ চমৎকার।

বাড়ির ছোট্ট মেয়েটি অসুস্থ। ডাক্তারবাবু আসেন, ওষুধ দেন। বাবা-মায়ের কপালে চিন্তার রেখা। অসুস্থ নাদিয়ার কিছুতেই মন যায় না, ভালো লাগে না। পুতুলগুলো নাদিয়ার অভাবে পড়ে আছে। নাদিয়ার যে কিচ্ছু ভালো লাগে না। একদিন নাদিয়া সকালবেলা ঘুম থেকে উঠল। রাতে সে স্বপ্ন দেখেছে। মাকে সে বলল ‘ মা… একটা হাতি… দিতে পারবে আমাকে? ঐ যেমন ছবির বইয়ে আঁকা সেরকম না কিন্তু… পারবে?’ মা পাশের ঘরে গিয়ে বাবাকে বললেন মেয়ে হাতি চাইছে। বাবা সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পরলেন। ফিরে এলেন সুন্দর দেখতে ছাইরঙা খেলনা একটি হাতি নিয়ে। নাদিয়া কিন্তু তাতে খুশি নয়। বলল, ‘জীবন্ত হাতি চেয়েছিলাম আমি, আর এটা তো মরা।’ শেষ অবধি নাদিয়ার বাবা বলে-কয়ে সার্কাসের হাতিকে নিয়ে এলেন বাড়িতে। হাতিকে দেখে নাদিয়ার অসুখ আর রইল না। হাতি যোগ, অসুখ বিয়োগ।
একটা কথা ঠিকই, সার্কাসে খেলা দেখানোর জন্য সেকালে যে মানুষ পশু-পাখিকে বন্দি করত এটা ভালো নয়। তবে নাদিয়ার কাছে এসে হাতির সত্যি ভালো লেগেছিল। এই হাসি-খুশি হাতির মুখ নিয়েই আমি বঙ্গবাসীর গণেশদাদা। তবে আমি তো সব-সময় হাসি-খুশি থাকি না। রেগে যাই, ক্রুদ্ধ হই।

আমি গণের দেবতা। গণ যেমন ক্রুদ্ধ হয়, জনসমূহ যেমন ক্রুদ্ধ হয়, আমিও ক্রুদ্ধ হই। জন কেন ক্রুদ্ধ হয়? ক্রুদ্ধ হয় অপশাসনে। কথায় বলে জনগণেশকে তুষ্ট রাখতে হয়। তুষ্ট রাখা মানে কিন্তু একটু-আধটু কিছু পাইয়ে দেওয়া নয়, লোক-দেখানো চাকচিক্য নয়, সত্যি যাতে জনসমূহের পুষ্টি হয় তাই করতে হবে শাসককে। যদি তা না হয় জন ও গণ তার শাসককে ঠিক বেছে নেবে। ‘জনগণমন’ খুব কঠিন শব্দ। রবিঠাকুর লিখেছিলেন। এমনিতে তিনি আমাকে দেখেছেন গ্রাম্য ছড়ায়,
তাড় কঙ্কণ সোন্ পৈঁছি শঙ্খ বাহুমূলে।
বাঁক-পরা মল সোনার নূপুর, আঁচল হেলে দোলে॥
সিংহাসন, পট্টবসন পরছে ভগবতী।
কার্তিক গণেশ চললেন লক্ষ্মী সরস্বতী॥
জয়া বিজয়া দাসী চললেন দুইজন।
গুপ্তভাবে চললেন শেষে দেব পঞ্চানন॥
গিরিসঙ্গে পরম রঙ্গে চললেন পরম সুখে।
ষষ্ঠী তিথিতে উপনীত হলেন মর্তলোকে॥
মায়ের সঙ্গে মর্তলোকে দুর্গাপুজোয় চলেছি, মায়ের ছেলেটি। তবে তাঁর গানে গণের অধিনায়কের যে কল্পনা, তাতে আমার উপস্থিতি। তিনি জ্ঞাতসারে হয়তো আমার কথা ভাবেননি অজ্ঞাতসারে ভেবেছেন।
ভাই বঙ্গ, তোমাকে আরেকটা কথা বলি। আমি তো মাথা উঁচু করা ‘ণ’, বাংলা ভাষায় মাথা নিচু করা ‘গন’-ও আছে। মাথা নিচু করল বলে ভেবো না সে বশ্যতা স্বীকার করল। ‘গন’ মানে রাস্তা। তোমাদের পণ্ডিত সুকুমার সেন তাঁর ‘ব্যুৎপত্তি-সিদ্ধার্থ’ নামের অভিধানে রূপরামের রচনা থেকে উদাহরণ দিয়েছেন, ‘পুনর্বার যাত্রা হইল শ্রীরামপুরের গনে।’ এখানে গনে মানে পথে। আমার যারা অনুগামী, তারা জানে ও মানে– রাস্তাই একমাত্র রাস্তা।

আমি রাজার দেবতা নই, গণের দেবতা, মানুষের দেবতা। রাজা তার স্বার্থে আমাকে ব্যবহার করতে চাইলেও পারবে না শেষ অবধি। সব মানুষকে দীর্ঘদিন ঠকানো যায় না। একজন করে রাজা কমবে আর একজন করে সাধারণ গণবৃদ্ধি ঘটাবে। একদিকে বিয়োগ, অন্যদিকে যোগ।”
সিদ্ধিদাতার এই চিঠিটিকে কি ‘গণার চিঠি’ বলা যায়? ‘গণা’ বলে গণেশদাদাকে ডাকলাম, কিছু মনে করবেন না। মুকুন্দ আর ভারতচন্দ্র দু’জনের কাব্যেই গণেশকে আদর করে ‘গণা’ বলে ডাকা হয়েছে।
………………………..
রোববার.ইন-এ পড়ুন সিরিয়াসলি নেবেন না-র অন্যান্য পর্ব
………………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved