rangan chakraborty on bengali language | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলা ভাষার থেকে আমি কী পেলাম

বাঙালিদের আকাশ-বাতাস-নিঃশ্বাস একজনই। জোড়াসাঁকোর রেড়ির তেলের বাতির জগতে বড় হওয়া রবিঠাকুর। তিনি না-থাকলে আমার মতো অনেকেরই, বার্থ সার্টিফিকেট ছাড়া কোনও কিছুই থাকত না। আমরা ভাষাহীন, আশাহীন জনসমষ্টি হয়ে থাকতাম, হয়তো কুয়োর ব্যাঙের মতো ‘গ্যাঙর গ্যাং’ হত আমাদের একমাত্র উচ্চারণ। ভাগ্যিস আপনি হয়েছিলেন, আমাদের জন্মের আগে। নইলে কী করতাম, কী বলতাম, কী লিখতাম, কী ভাবতাম, কী বাঁচতাম আমরা?

প্রচ্ছদের ছবি: অর্ঘ্য চৌধুরী

শেষ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬, ২০:৫৯   
Facebook WhatsApp Messenger

মাঝে মাঝে তব দেখা পাই
গতকাল আমার ডানচোখে ছানি অপারেশন হল। দেখলাম, এই অপারেশনে অজ্ঞান-ফজ্ঞান করার কোনও ব্যাপার নেই। ইঞ্জেকশনও দিল না কেউ! একটা আলোর নিচে শুইয়ে দিয়ে, চোখে বৃষ্টির মতো জলধারা ফেলে, কখন যে অপারেশন হয়ে গেল বুঝলাম না… শুধু ‘দেখেছিলাম আলোর নিচে অপূর্ব সেই আলো।’ আর কী আশ্চর্য, ঠিক তখনই ওটি-র সাউন্ড সিস্টেমে বাজছিল, ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না’… ভাবতে পারেন? বাংলা ছাড়া অন্য কোনও দেশে হত এটা? আর ৭০ বছর বয়সে ছানি অপারেশনে কী আশ্চর্য-প্রযুক্ত এই গান! না-ই বা হল অর্ণবের গলায়, তবু এই গানের কোনও তুলনা হয়? আমার মনে হয় না কেউ চোখের হাসপাতালে ওটির কথা মাথায় রেখে এই প্লে-লিস্টটা বানিয়েছেন! কিন্তু যিনিই বানিয়ে থাকুন তাঁর পছন্দের সঙ্গে আমার পছন্দের কী মিল! এর পরের গানটাই হল, ‘আমার ভিতর বাহিরে…’ এই জন্যই তো আমি বাংলায় থাকি, বাংলায় বাঁচি। বাংলায় ছানি কাটাই! ওই হিন্দি উপত্যকা আমার দেশ নয়!

এলিফেন্ত না মা, আতি আতি
বছরখানেক, বা হয়তো তারও আগে ফেসবুকে কেউ একজন একটা ভিডিও-পোস্ট দিয়েছিলেন। একটি দু’-তিন বছরের বাচ্চা মেয়েকে তার মা ইংরেজি শেখাচ্ছেন। বাচ্চাটার চেনা নানা প্রাণীর ইংরেজি নামগুলো শিখতে বলছেন। বাচ্চাটা বুঝতে পারছে না, কেন তার মা এই রকম করছে, কেন তার চেনা জগতকে এইভাবে ভেঙেচুরে নষ্ট করে দিচ্ছে। মা যত ছবি দেখিয়ে বলছেন ‘ক্যাট’, সে আর্ত আবেদনে বলছে– ‘ক্যাত না মা, বিয়াল বিয়াল’। তার উচ্চারণ এখনও স্পষ্ট নয়, কিন্তু আকুতিটা মর্মান্তিক: ‘এলিফেন্ত না মা আতি, আতি!’ ভিডিওটা দেখে আমার মনে হয়েছিল বাচ্চাটার কাছে আসলে একটা চেনা জগৎ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ভাষার মধ্য দিয়েই তো আমাদের বোধ তৈরি হয়। আমরা অনেকেই তো সারাজীবন ইংরেজি লেখার কাজ করেছি, এখনও করে যাচ্ছি। কিন্তু হাতিকে তো আমি কখনও ‘এলিফ্যান্ট’ ভাবতে পারি না। বাংলা ভাষাই তো আমার পৃথিবীর ৯৯% বস্তু ও ধারণার সংজ্ঞা নির্ণয় করে। ইংল্যান্ডে স্থায়ীভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাসকারী করা পাঞ্জাবি মহিলাদের মধ্যে সমীক্ষা করে দেখা গিয়েছিল যে, বয়স বাড়লে তাঁরা আস্তে আস্তে ইংরেজির ব্যবহার কমিয়ে দিয়ে নিজের ভাষায় ফিরে যান। আমি আমার নিজের মধ্যে দেখি, বহু চেষ্টা করে শেখা ইংরেজি এখন আর বলতে বা লিখতে ইচ্ছে করে না। বাংলা ভাষা অনেক বেশি নিজের। সেখানে আমার চলাচলের স্বাধীনতা অনেক বেশি। বাংলা লেখক হিসেবে আমি অনেক বেশি ‘আমি’, যেমন ইংরেজি লেখক উডহাউস বাংলা অনুবাদের চেয়ে অনেক বেশি ‘উডহাউস’।

টোকা নয় ভেতরে ঢোকা!
আমি টুকটাক লিখি, সম্প্রতি একটা বই লিখেছি। সেই বইটা বেরনোর পর একদিন আমি দেখার চেষ্টা করছিলাম যে, এই যে বাংলাটা লিখেছি, সেটা শিখলাম কী করে? দেখলাম ভেতর অনেকটাই আছেন সুকুমার রায়। ‘হযবরল’ হল আমার ‘গীতা’। শুধু লেখা কেন? জীবন যখন প্রশ্ন করে ‘‘সাত দু’গুণে কত হয়?” জানি যে, তার উত্তর সবসময় এক হয় না। সুকুমারের পরেই ‘দিনে দুপুরে’ লেখায় ঢুকে পড়েন লীলা মজুমদার। অবনীন্দ্রনাথের ‘জোড়াসাঁকোর ধারে’ আর ‘ঘরোয়া’-র স্টাইল তো ভীষণভাবেই ইনফ্লুয়েন্স করে (‘প্রভাবিত করে’ ধরনের বাংলা লিখতে পারি না)। ‘মিক্সড’-কে আমি ‘মিশ্রিত’-র চেয়ে অনেক বেশি বাঙালি মনে করি, যেমন অঞ্জন দত্তর ‘স্যামসন’ আমার বিটলস বা সাইমন গারফাঙ্কেল বাজানো বাঙালি বন্ধু। তার মানে, আমাদের হতে হবে সৈয়দ মুজতবা আলী-র মতো লেখক, পৃথিবীর সব ভাষাই যাঁর কাছে প্রয়োজনমতো বাংলা। তিনি তাদের ব্যবহার করেন, তাদের হাতে পড়ে যান না। এছাড়া শিব্রাম তো আছেনই। সম্ভবত অবিন্যস্ত জীবনের কারণে এবং একজন ভালো এডিটর (মানে যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে লেখকদের লেখা সম্পাদনা করে দেন) না পাওয়ায় তিনি অতিলিখনের দোষে দুষ্ট হয়ে যান এবং বেশি মিষ্টি যেমন তেতো লাগে, অনেক সময়েই তাঁর লেখায়, সেই দুর্যোগ ঘটে। এর বাইরে অন্তত আমার নিজের ভাষা নির্মাণের চেষ্টায় রাজশেখর বসুর ইট চুরি করতে হয়, বিশেষ করে, তাঁর পরশুরাম নাম নিয়ে লেখা সমগ্রের। ‘প্রেয়সী গাড়ু হাতে কোথায় যেন যাইতেছেন’ বা পলিটিকালি ইনকারেক্ট হলেও ‘লালিমা পাল (পুং)’-এর ‘শয়তানি’ আপনাকে কে দেবে? শুনছি বিলেতে না কি বহু পুরনো দিনের লেখাকে ‘পলিটিকালি ইনকারেক্ট’ বলে সেনসর করা হচ্ছে। জানি না, এই ধরনের কারণে ‘আবোল তাবোল’ বা ‘ হারবার্ট’-এর ছড়াও বাদ পড়বে কি না।

আমার ভাষার ঋণস্বীকারের তালিকায় অবশ্যই থাকবে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কিশোর সাহিত্য। কবিদের মধ্যে নানা বোধের উক্তির জন্য জীবনানন্দ, সুভাষ মুখোপাধ্যায় আর শঙ্খ ঘোষ। নবারুণদার (ভট্টাচার্য) কাছে আমি জীবন দেখার ও লেখার আশ্চর্য শিক্ষার জন্য ঋণী। কিন্তু আমাদের মতো মধ্যচিত্তের মানুষের জীবনে সেই আগুন নেই– যা দিয়ে বিশ্বজোড়া এই শ্মশানে আর তোশকে লুকোনো ডাইনামাইটের বিস্ফোরণ ঘটানো যায়। বা ক্রমাগত ‘কলকাতার সংস্কৃতি’ নামক নর্দমা, যাতে সাহিত্য, নাটক, কবিতা পাঁক হয়ে জমছে, তার মধ্য দিয়ে সাবমেরিন চালানো যায়। আমি তাঁর ঘোষিত ভক্তদের মধ্যে পড়ি না, কিন্তু একদিনও নেই যেদিন আমি নবারুণদাকে মনে করি না বা হিংসা করি না। আমি খাটিয়ার বিজ্ঞাপন  করে জীবন কাটিয়েছি, শ্মশানে আত্মীয়দের সামনে খুনির বন্দনা-জিঙ্গল গেয়েছি, তবু মনে করি এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়।

না পাওয়ার রং
এই তালিকায় আরেকজনের নাম না-থাকলে সত্যি পাপ হবে এবং কুম্ভীপাক নরকেও আমার স্থান হবে না– তাঁর নাম কবীর সুমন। কী করে ভুলব যে, তিনি আমাদের বিধাতার সঙ্গে সাপলুডো খেলতে শিখিয়েছিলেন। ‘না পাওয়ার রং’-এর মতো অসাধারণ বোধ আমাদের ভালোবাসায় এনেছিলেন। সত্যি, আমরা যারা একসময় স্বপ্ন দেখেছিলাম কিন্তু নানা কিছু এবং নিজেদের পিতৃতান্ত্রিক পুংত্বকে অতিক্রম করতে না-পেরে ভালোবাসায় সাম্য এনে জীবন ও বিপ্লব ভাগ করতে পারিনি, তাদের জীবন তো না-পাওয়ার রঙেই রঙিন। আর সেই রংকে ‘আগামীর রং’-এ বদলে নেওয়ার দায়িত্বও তো আমাদের সবার নিতে হবে। কোনও পার্টির সদস্য পদ নয়। আর আমার মনে হয়, এই পুংত্ব কেবল পুরুষের সমস্যা নয়, কেবল বিসমকামী সম্পর্কের সমস্যা নয়, সব মানুষের সমস্যা, স্বয়ং গীতিকার-গায়কও যার বাইরে নন। এই বোধ না এলে বাংলা তো এগবে না। তাই তো আজকে আমাদের বেশিরভাগ রাজনৈতিক নাটক অসহায়, আমাদের কবিতা পেশাদারি সার্কাস, আমাদের উপন্যাস কচুরিপানা, আমাদের সিনেমা উঠে যাওয়া বাতাসার দোকান, যার সামনে লটারির টিকিট বিক্রি হচ্ছে।

শিকড়ের সন্ধানে উদ্বাস্তু ভাষা
বঙ্কিম আমাদের ভাষার ভিত্তি, শরৎচন্দ্র এক মহান কারিগর। এঁদের আমি শ্রদ্ধা করি, যেমন দেবতাদের শ্রদ্ধা করতে শেখানো হয়। তাতে ঠিক কে– সেটা না-জানা ব্রহ্মাও থাকেন। আবার চেনা মেয়েদের মতো কালী বা সরস্বতীও থাকেন। এঁদের প্রতি সরাসরি আমার কী ঋণ, আমি জানি না। আমি অবশ্যই এঁদের অস্বীকার করি না, যেমন লুই বা কাহ্ণপাদকে আমি অস্বীকার করি না, করবই বা কী করে! কিন্তু আমার ভাবনায় ঠিক এঁদের সাড়া পাই না। বরং উদ্বাস্তু পল্লিতে বড় হওয়া একটা ছেলে অনেক বেশি শিকড় পায় কীর্তনে বা ভাটিয়ালিতে আর বাউল গানে। বঙ্কিমচন্দ্র কেন যেন আমাকে টানেন না, সেটা বোধহয় আমার দুর্ভাগ্য, তাঁর ভাষায় আমার উৎসাহ নেই, ‘কমলাকান্তের দফতর’ ছাড়া। শরৎচন্দ্রের মুনশিয়ানা আমি বুঝি, কিন্তু ‘শ্রীকান্ত’ সিরিজ ছাড়া বাকি অনেক লেখাই আমার অতিকথন আর ‘পপুলার’-এর আরাধনা মনে হয়। ক্ষমা করবেন।

ঠিকানা: জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি
কিন্তু বাঙালিদের আকাশ-বাতাস-নিঃশ্বাস একজনই। জোড়াসাঁকোর রেড়ির তেলের বাতির জগতে বড় হওয়া রবিঠাকুর। তিনি না-থাকলে আমার মতো অনেকেরই, বার্থ সার্টিফিকেট ছাড়া কোনও কিছুই থাকত না। আমরা ভাষাহীন, আশাহীন জনসমষ্টি হয়ে থাকতাম, হয়তো কুয়োর ব্যাঙের মতো ‘গ্যাঙর গ্যাং’ হত আমাদের একমাত্র উচ্চারণ। ভাগ্যিস আপনি হয়েছিলেন, আমাদের জন্মের আগে। নইলে কী করতাম, কী বলতাম, কী লিখতাম, কী ভাবতাম, কী বাঁচতাম আমরা?

Bengali bengali language Kabir suman Lila Majumdar Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Sukumar Ray

Share this article on