The Literary world of Vijaydan Detha | Robbar
Robbar
  • ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
  • রবিবার
  • ১১ অক্টোবর ২০২৬

রুখু মাটির লোককথাকার

বিজয়দান দেথা, যিনি ‘বিজ্জী’ নামে বেশি পরিচিত, ১৯২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর যোধপুর জেলার বোরুন্দা গ্রামে জন্মেছিলেন। সাধারণত ধুতি আর ফুলহাতা শার্ট পরতেন। বুকপকেটে সামান্য কিছু কাগজের সঙ্গে খান চারেক কালির কলম থাকত। শখ ছিল কলমের আর প্রাণের টান ছিল লেখার। জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কখন লেখেন?’ উত্তর দিয়েছিলেন, সকালে গরুগুলোকে খড়-খোল মেখে দিয়ে লিখতে বসেন। তারপর খাওয়া-দাওয়ার পর্ব বাদ দিলে লেখালেখির মধ্যেই থাকেন। পুরো সময় লিখবেন বলে কোনও বাঁধা চাকরির চেষ্টাই করেননি। 

শেষ আপডেট: অক্টোবর ১১, ২০২৬, ২০:৩২   
Facebook WhatsApp Messenger

১১.

‘মুখুজ্জের লিটফেস্ট’-এ গতবার লিখেছি কেতকী কুশারী ডাইসনকে নিয়ে। সেপ্টেম্বরের ১৩ তারিখে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান বলে তাঁকে নিয়ে কিছু কথা লিখি। সেইসঙ্গে তাঁকে নিয়ে সামান্য কিছু স্মৃতিরও উল্লেখ করি। এবারের লেখা এমন একজনকে নিয়ে যাঁর জন্ম ও কর্ম বঙ্গদেশ থেকে অনেকখানি দূরে। রাজস্থানে। তিনি হলেন বিজয়দান দেথা (১৯২৬-২০১৩)। এ বছর তাঁর জন্মের শতবর্ষ। তাঁকে কেন্দ্র করে উত্তর ভারতে নানা আলোচনাসভা হচ্ছে। মনে হল তাঁকে নিয়ে বাংলা ভাষাতেও কিছু লেখা দরকার। তা না-হলে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সাহিত‍্যের মাধ্যমে ভারতবর্ষের সঙ্গে যে যোগসূত্র গড়ে তুলেছিলেন, তা ছিঁড়ে যাবে। এমনিতেই দেশভাগের কারণে তাঁদের ভারতবর্ষের থেকে এখনকার ভারতবর্ষ অনেকটাই খণ্ডিত। এরপরেও দেশের অন‍্যান‍্য ভাষা ও সাহিত্য থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রাখলে, বড় বেশি ছোট হয়ে যাব। রেশমকীটের মতো নিজেদের তৈরি গুটিতে নিজেরাই আটকে পড়ব।

zoom
বিজয়দান দেথা

বিজয়দান দেথা, যিনি ‘বিজ্জী’ নামে বেশি পরিচিত, ১৯২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর যোধপুর জেলার বোরুন্দা গ্রামে জন্মেছিলেন। পুরনো মাড়োয়ার অঞ্চল বলতে যা বোঝাত, এ গ্রামটি তারই অংশ। মরুভূমি ৬০-৭০ কিলোমিটারের মতো দূরে, কিন্তু তার জল-হাওয়ার বেশ প্রভাব এ অঞ্চলটিতে। গরমকালে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠে যায়, আর শীতে ৭ ডিগ্রিতে নেমে আসে। ধান, গম এবং অন্যান্য ফসলের চাষও গত শতকের পাঁচের দশক পর্যন্ত তেমন হত না। জলের জন‍্য সহায় ছিল আকাশ আর চাষের জন্যে লাঙল। এমন এক পরিবেশে বিজ্জীর বড় হওয়া।

বাড়িতে সাহিত্য রচনার পরিবেশ ছিল। দাদু জুগতীদান ও বাবা সবলদান প্রাচীন দিংগল রীতিতে কবিতা বা গীত রচনা করতেন। দিংগল কবি হিসেবে দাদু জুগতীদাসের বেশ খ‍্যাতিও ছিল। এটি হল বীররসের কবিতা। দিংগলের বিপরীত হল পিংগল, যার মূল রস হল প্রেম ও ভক্তি। ব্রজবুলি ভাষায় লেখা কবিতার সঙ্গে এর মিল আছে। রাজস্থানের মীরাবাইয়ের গীতে এই পিংগল রস মেলে। বিজ্জী বড় হয়েছেন প্রায় ১২০০ বছরের প্রাচীন দিংগল লোকধারার গীত শুনতে শুনতে। এটা তাঁর জীবনে বেশ প্রভাব ফেলেছিল। বিজ্জীর প্রাথমিক পড়াশোনার সূচনা জইতারণে, যা বর্তমানে পালি জেলার অন্তর্গত। সেখানের পড়াশোনা শেষ করে বারমেরে যেতে হয় পরবর্তী পড়াশোনার জন‍্যে। দূরত্ব প্রায় ২৮৬ কিলোমিটার। তাঁর কবিতা লেখার ঝোঁক সেই স্কুল থেকেই শিক্ষকদের চোখে পড়েছিল। কিছুদিন পরে সেই স্কুল থেকে তুলে তাঁকে যোধপুরের দরবার হাইস্কুলে ভর্তি করা হল। কিছুদিন পরে দেখা গেল, তাঁর কাব্য-প্রতিভা দুষ্টুমিতে রূপান্তরিত হয়েছে। সহপাঠীরা নিত‍্যদিন অভিযোগ করছে। প্রধান শিক্ষক ঠিক করেছেন দেখতে পেলেই পেটাবেন । কিন্তু তাতেও বিশেষ কাজ হল না। তাই স্কুল থেকে তাড়িয়েই দিলেন। মনে হয়েছিল এখানেই পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে । কিন্তু পরে পাঞ্জাব বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় বসে উত্তীর্ণ হলেন।

zoom
রাজস্থানের মীরাবাইয়ের গীতে পিংগল রস মেলে

উচ্চশিক্ষার জন্যে ভর্তি হলেন যোধপুরের জসওয়াল কলেজে। এই কলেজে পড়ার সময় ১৯৪৭এ প্রকাশিত হল তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঊষা’। নাম শুনে অধ্যাপক-অধ্যাপিকা থেকে ছাত্রছাত্রীরা ভাবল প্রকৃতিপ্রেমিক এক নতুন কবির জন্ম হল। বই খুলে দেখা গেল এই ‘ঊষা’ হল কলেজের ছাত্রী ঊষা পাঠক আর তাঁর উদ্দেশে কবিতাগুলি লেখা। ফলে প্রকৃতি ও নারী মিলে তালগোল পাকিয়ে গেল। তবে ‘নারী’ বলে আলাদা কিছু নেই, একথা গত শতকের আটের দশকে এক সংগীত শিল্পীর মুখে শুনেছিলাম। ঘটনাটা ছিল এইরকম। একটি আশ্রমিক প্রতিষ্ঠানে সতীনাথ মুখোপাধ্যায়কে গান গাওয়ার জন্যে আমন্ত্রণ জানাতে গিয়েছি। তিনি রাজি হলেন। বাড়ির ভিতর থেকে উৎপলা সেন বললেন যে তিনিও যাবেন। সতীনাথ মুখোপাধ্যায়কে নীচু গলায় বললাম যে, উৎপলা সেন গেলে আমরা খুব খুশি হব, তবে আশ্রমের মঞ্চে মেয়েদের গান গাওয়ার রীতি নেই। আমার নীচু স্বরের কথা সতীনাথ মুখোপাধ্যায় উঁচু গলায় বাড়ির ভিতরে শুনিয়ে দিলেন। উৎপলা সেন ভিতর থেকে গলা তুলে বললেন, ‘নারী বলে কিছু নেই। যা আছে তা হল পুরুষ ও প্রকৃতি।’ উৎপলা সেনের চার দশক আগে ২০-২১ বছরের যুবক বিজয়দান একইরকম ভেবেছিলেন বলে মনে হচ্ছে।

zoom
সতীনাথ মুখোপাধ্যায়

কলেজ থেকে ডিগ্রি নিয়ে বেরনোর পর বিজয়দান স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শুরু করলেন কিন্তু বছর খানেক পড়ার পর সব ছেড়েছুড়ে লেখার কাজে ঢুকে পড়লেন। তখন তাঁর লেখার মাধ্যম ছিল হিন্দি, কারণ বড় পত্রপত্রিকা সবই হিন্দি ভাষায় প্রকাশিত হত। সাপ্তাহিক ‘জ্বালা’ পত্রিকার নামে ও বেনামে তিনটি লেখা লিখতেন। পরে ‘আগ’, ‘অঙ্গারে’ ইত‍্যাদি আরও দু’-তিনটি পত্রিকায় লিখতে শুরু করেন। এই সময়ে কবিতা থেকে তিনি ক্রমশ কথাসাহিত্যের দিকে ঝুঁকছেন। অন্য দিকে ১৯৫৯ সালে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন হিন্দি ভাষার পরিবর্তে তিনি শুধু তাঁর মাতৃভাষা রাজস্থানিতে লিখবেন। এমনকী যোধপুর ছেড়ে নিজের গ্রাম বোরুন্দাতে ফিরে গেলেন। রাষ্ট্রভাষা থেকে রাজ‍্যের ভাষায় ফিরলেন আর শহর ছেড়ে গ্রামের মানুষের কাছাকাছি গেলেন। এই যাওয়ার পিছনে নিশ্চয়ই কোনও বড় তাগিদ ছিল। যার একটি অবশ্যই রাজনৈতিক। রাজপুতানা অঞ্চলের প্রধান চারটি দেশীয় রাজ‍্য জয়পুর, যোধপুর, বিকানের আর জয়সলমীরকে যুক্ত করে রাজস্থান রাজ্য হিসেবে তৈরি হল ১৯৪৯ সালের মার্চে। ১৯৫৬ সালের নভেম্বরে আজমীর, মেরওয়াড়, আবু ও দেলওয়াড় তালুক যুক্ত করে বর্তমান বৃহত্তর রাজস্থান চেহারা নিল। রাজ্যের ভৌগোলিক বিস্তার ঘটলে তার ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক চেহারা সুনির্দিষ্ট রূপে আত্মপ্রকাশ করবে, এমন আশা করা বৃথা। তখন রাজস্থানিকে বলা হত হিন্দির উপভাষা। তেমন এক পরিস্থিতিতে বিজয়দান দেথা গ্রামে ফিরলেন একদিকে রাজস্থানি লোকসাহিত‍্য, সংগীত ও শিল্পকলা সংগ্রহের কাজে, অন্যদিকে নিজের লেখা ছোটগল্প ও উপন্যাসের মাধ্যমে আধুনিক রাজস্থানি সাহিত্যকে গড়ে তুলতে।

zoom
বিজয়দান দেথার বইয়ের প্রচ্ছদ

১৯৬০ সালে গ্রামে ফিরেই কোমল কোঠারিকে সঙ্গে নিয়ে বিজয়দান দেথা প্রতিষ্ঠা করলেন ‘রূপায়ণ সংস্থান’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এর মাধ্যমে অসংখ্য লোকসংগীত সংগ্রহ এবং রেকর্ডিং করার কাজ হতে থাকল। সে সঙ্গে বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ, সাজপোশাক সংরক্ষণ ও শিল্পসামগ্রীর সন্ধান চলতে থাকল। রাজস্থানি সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে রক্ষা করা, এবং একইসঙ্গে সবার সামনে তুলে ধরা। এর পাশাপাশি বিজয়দান দেথা লোকগল্পের বীজগুলিকে সংগ্রহ করে ১৪ খণ্ডে তাঁর গল্প সংগ্রহ প্রকাশ করলেন গত শতকের ছয়ের দশক থেকে সাতের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত। নাম ‘বাতাঁ রি ফুলওয়ারী’, যার অর্থ ‘গল্পের ফুলবাগান’। ১৯৭১ সালে সাহিত্য অকাদেমির কাছে বেশ কয়েকটি ভাষা তাদের স্বীকৃতির জন্যে আবেদন করে। তার মধ্যে রাজস্থানিও ছিল। সিদ্ধান্তের জন‍্যে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়কে সভাপতি করে একটি সমিতি তৈরি করা হল। সে সমিতি সিদ্ধান্ত নেয় যে রাজস্থানি একটি স্বতন্ত্র ও স্বনির্ভর ভাষা এবং তার সাহিত‍্যগত গুরুত্ব আছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে রাজস্থানি ভাষা সাহিত্য অকাদেমির পুরস্কার পাওয়া এবং অন্যান্য ভাষার সঙ্গে আদানপ্রদানের অধিকার পেল। সাহিত্য অকাদেমি থেকে রাজস্থানি ভাষায় পুরস্কার দেওয়া শুরু হয় ১৯৭৪ থেকে, আর প্রথম যে বইটি পুরস্কৃত হয়, তা হল বিজয়দান দেথার ‘বাতাঁ রি ফুলওয়ারি’র দশম খণ্ড। এই খণ্ডটিতেই ছিল সেই গল্প, যা অবলম্বনে হাবিব তনভির ‘চরণদাস চোর’ নাটকটি মঞ্চস্থ করেন। শ‍্যাম বেনেগাল একই কাহিনি অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্রও তৈরি করেন। নাটক ও চলচ্চিত্র, দু’টিই বেশ আলোড়ন তোলে দেশে ও বিদেশে।

zoom
‘চরণদাস চোর’-এর পোস্টার

‘চরণদাস চোর’ গল্পটি বিশেষ বড় নয়, হাজার তিনেক শব্দে লেখা। গ্রাম জীবনের গভীর থেকে উঠে আসা একটি গল্প। গ্রামে এক সাধু এসে হাজির হয়েছে একদল ষণ্ডাগুন্ডা চেহারার শিষ্য নিয়ে। গ্রামের মানুষ ধর্ম, আত্মা, পরমাত্মা, মুক্তি ইত্যাদি শব্দ জানে আর বিশ্বাসও করে। তারা দীক্ষা নেবার জন্যে ভিড় করে। সে গ্রামে একজন নামকরা চোর ছিল। সে জানত যে, গেরুয়া পরলেই সব সাধুর মন সাধনায় থাকে না। মন পড়ে থাকে ভোগবিলাসে। চোর ভাবল সাধুকে একটু জব্দ করে এলে মন্দ হয় না। দুপুরে যখন সাধুর কাছে লোকজন প্রায় নেই, সে গিয়ে বলল যে, শিষ‍্য হতে চায়। সাধুটি অত্যন্ত ধূর্ত প্রকৃতির। সে বলল, শিষ্য হতে গেলে সব শিষ‍্যের মতো একটি জিনিস তাকে জীবন থেকে ছাড়তে হবে। চোর বলল যে, একটা নয়, সে চারটে জিনিস ছাড়বে। সে কোনওদিন কোনও রানির বিছানায় শোবে না, সোনার থালায় খাবে না, সোনার হাওদা পরানো হাতিতে চড়বে না, আর শেষ শপথ হল কোনওদিন কোনও দেশের রাজা হবে না। সাধু জানত চোরের পক্ষে এগুলি কোনওদিন হওয়া সম্ভব নয়, আর তাই পঞ্চম একটি শপথ করিয়ে নিল। সেটি হল কোনওদিন মিথ্যে কথা বলবে না। সাধু জানত, চোরের পক্ষে এটা মানা সম্ভব নয়। দু’দিন পরে মিথ্যে বলবে আর শিষ‍্যত্বেরও ইতি ঘটবে।

zoom
‘চরণদাস চোর’-এর শুটিংয়ে শ‍্যাম বেনেগাল, স্মিতা পাতিল ও অন্যান্য

তার পরের ঘটনাক্রম বেশ কৌতুকের। সে দূরের গ্রামে গিয়ে রাতের বেলা এক মন্দিরে গিয়ে হাজির হল। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল দেবতার দিকে। বৃদ্ধ পুরোহিত ছেঁড়া জামাকাপড় পরা মানুষটিকে জিজ্ঞেস করল, সে কে? উত্তর পেল যে, সে চোর। চোর কখনও নিজেকে চোর বলে না, আর তাই বৃদ্ধ পুরোহিত ভাবল স্বয়ং ঈশ্বর মানুষের রূপে এসে তার পরীক্ষা নিচ্ছে। তাই লোকটির ইচ্ছায় তাকে রাতে মন্দিরের ভিতরে শুতে দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। চোর দেবতার সোনার ছাতা থেকে ভক্তদের দেওয়া অমূল‍্য হিরে-মোতি নিয়ে চলে গেল। তারপর নিজের গ্রামে গিয়ে সোনার ছাতা বিক্রি করে নানা গয়না কিনল আর আমির-ওমরাহদের মতো পোশাক বানিয়ে ফেলল। একটা দামি ঘোড়াও কিনল। বাকি ধনরত্ন মাটির তলায় হাঁড়ির ভিতর রাখল। তারপর আবার চুরি করতে বের হল। এবার এক সন্ধেয় এক শেঠের দরজায় হাজির হল। শেঠের প্রশ্নের উত্তরে এবারও সে নিজেকে চোর বলল, কিন্তু ঠাটবাট দেখে শেঠের বিশ্বাস হল না। সে ভাবল লোকটি উজ্জয়িনীর নামবড় জহুরি, তার কাছে দামি জিনিসপত্র কিনতে এসেছে। শেঠ সিন্দুকের হিরে-জহরত দেখিয়ে রাতে খেতে ও শুতে দিল। পরদিন সকালে উঠে দেখল, সব চুরি হয়ে গেছে। অনেক সম্পত্তি করে চোর ধর্মশালা ও জলসত্র খুলে মানুষের কিছু উপকারও করল আর সুনামও পেল আর ধনের এমনই মহিমা যে চুরি-জোচ্চুরির বিষয় চাপা পড়ে গেল।

zoom
‘চরণদাস চোর’ নাটকে হাবিব তনভির

এরপর সে রাজার ধনের সন্ধানে গেল, আর দরজার সেপাইদের নিজেকে চোর বলে পরিচয় দিল। কিন্তু তার পোশাক, শরীরের অলংকার ও দামি ঘোড়া দেখে কারও চোর বলে মনে হল না। খাজাঞ্চি ভাবল যে, নতুন দেওয়ান আসার কথা, সামনের মানুষটি হলেন তিনি। চোরের সম্পদের অভাব নেই বলে ইচ্ছাপূরণ করতে গোপনে পাঁচটি মুক্তো নিয়ে চলে গেল। সে রাজ‍্যে রাজার চেয়ে রানির দাপট বেশি, আর চোর ধরা পড়ল। সাধুও তখন সে রাজ‍্যে হাজির। তার শিষ‍্যের সততা দেখে সাধু খুশি। চোর বন্দি হল, কিন্তু রানি তাকে রাতে নিজের ঘরে ডেকে পাঠাল। চোরের বুদ্ধি ও সততায় সে মুগ্ধ। রানি তাকে সোনার থালায় খেতে বলল, তার বিছানায় শুতে বলল, এও জানাল যে, পরের দিন রাজাকে হত্যা করে তাকে সোনার হাওদা পরানো হাতিতে চড়িয়ে ঘোরানো হবে। দেশের রাজা হবে সে। গুরুকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি মতো চোর কোনওটাতেই রাজি হল না। রানির হুকুমে সত‍্যবাদী চোরকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলা হল। অন‍্যদিকে গুরুর কোনও প্রতিশ্রুতি কাউকে দেওয়া ছিল না বলে, রানির কথায় সোনার পালঙ্কে শুয়ে পড়ল, সোনার থালায় খেল, সোনায় হাওদা দেওয়া হাতিতে চড়ে নগর ঘুরল আর সে দেশের রাজা হয়ে গেল।

zoom
‘দুবিধা ভা অন‍্য কহানিয়া’-র অনুবাদের প্রচ্ছদ

এটি গল্পের সারাংশ মাত্র। এর ভিতরে বিজ্জী মানুষের মনের সাদা, কালো ও ধূসর জায়গাগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে যান। সমাজের কঠোর বাস্তবতাকে তুলে ধরেন। কৌতুকের মধ্যে দিয়ে সংসার থেকে সামাজিক নানা প্রতিষ্ঠানের স্ববিরোধকে চিহ্নিত করেন। ১৪ খণ্ডে রাজস্থানি লোকগল্পে নতুন করে প্রাণপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি প্রকাশ করলেন ‘দুবিধা ভা অন‍্য কহানিয়া’, ‘উলঝন’, ‘সপনপ্রিয়া’, ‘উজালে কে মুসাহিব’, ‘লাজওয়ান্তি’, ‘মহামিলন’, ‘প্রতিশোধ’, ‘প্রিয় মৃণাল’ ইত্যাদি গল্প সংকলন ও উপন্যাস। বিজ্জীর কাহিনি এতটাই জীবন ঘনিষ্ঠ আর এমনই ছবির মতো তার চিত্রময়তা যে, তাঁর গল্প ও উপন্যাসকে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্র, নাটক ও টেলিভিশন সিরিজ তৈরি হয়েছে। শ‍্যাম বেনেগাল ছাড়াও মণি কাউল, প্রকাশ ঝা-র মতো পরিচালকেরা তাঁর কাহিনি নিয়ে ছবি পরিচালনা করেছেন। তাঁকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করে গিয়েছেন বিখ্যাত হিন্দি লেখক উদয় প্রকাশ। এছাড়াও ভারতের নানা ভাষায় তাঁর বই অনুবাদ করা হয়েছে। ২০০০ সালে বিজয়দান দেথার ‘বাতাঁ রি ফুলওয়ারী’ বইটি বাংলা ভাষায় জয়া মিত্র ভাষান্তর করেন।

বিজ্জী আমাকে বেশ ভালোবাসতেন। গল্প করতেন। হয়তো বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা থেকে আমাকে পছন্দ করতেন। আবার সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের রাজ‍্যের মানুষ হওয়ার কারণেও হতে পারে, যিনি রাজস্থানিকে সাহিত্য অকাদেমিতে যুক্ত করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন।

zoom
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়

বিজ্জীর দুই প্রিয় লেখক ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র। তাঁর লেখক জীবনের কথা বলতে গিয়ে কেন রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের লেখা তাঁকে প্রেরণা জুগিয়েছে, সে কথা লিখেছেন। দিল্লিতে সাহিত্য অকাদেমির অনুষ্ঠানে এসে তেমন একটি লেখা আমাকে দিয়েছিলেন। যত্নেই রেখেছিলাম, তবে এখন আর খুঁজে পাচ্ছি না। তবে তাঁর দেওয়া ‘প্রিয় মৃণাল’ বইটি হাতের কাছে আছে। যাতে ছিঁড়ে না যায়, তাই শক্ত কাগজের মলাট দিয়ে নিয়ে এনেছিলেন। বোর্ড বাঁধাই বইটির ভিতরের দিকে সেলো-টেপ দিয়ে আটকে দিয়েছিলেন যাতে মলাট খুলে না বেরিয়ে আসে। মলাটের উপর দেবনাগরী অক্ষরে ‘প্রিয় মৃণাল’ নামটি লিখে দিয়েছিলেন। এমনই গোছানো মানুষ ছিলেন বিজ্জী। সাধারণত ধুতি আর ফুলহাতা শার্ট পরতেন। যেমন পোশাক হেমন্ত বা দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়কে পরতে দেখা যেত। বিজ্জীকে দিল্লি, কলকাতা এবং দেশের আরও দু’-চার জায়গায় দেখেছি। বুকপকেটে সামান্য কিছু কাগজের সঙ্গে খানচারেক কালির কলম থাকত। শখ ছিল কলমের আর প্রাণের টান ছিল লেখার। জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কখন লেখেন?’ উত্তর দিয়েছিলেন, সকালে গরুগুলোকে খড়-খোল মেখে দিয়ে লিখতে বসেন। তারপর খাওয়া-দাওয়ার পর্ব বাদ দিলে লেখালেখির মধ্যেই থাকেন। পুরো সময় লিখবেন বলে কোনও বাঁধা চাকরির চেষ্টাই করেননি। ‘স্ত্রীর পত্র’- এর মৃণালের চিঠির উত্তরে মৃণালকে চিঠি লিখেছেন বিজ্জী। সেই বইটির নামই ‘প্রিয় মৃণাল’।

zoom
মলাটের উপর দেবনাগরী অক্ষরে ‘প্রিয় মৃণাল’ নামটি লিখে দিয়েছিলেন স্বয়ং লেখক

একটি ঘটনার কথা মনে পড়ছে। ২০০৪ সাল। সাহিত্য অকাদেমির সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষ। অকাদেমির সভাপতি তখন বিশিষ্ট সাহিত্য ও ভাষাতাত্ত্বিক গোপীচন্দ নারাং, সহ-সভাপতি ওড়িয়া কবি রমাকান্ত রথ আর সচিব মলয়ালম ভাষার কবি কোয়মপরমপত্র সচ্চিদানন্দন। সাহিত্য অকাদেমির লোগোটি তৈরি করেছিলেন সত‍্যজিৎ রায় আর সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষে সাহিত্য অকাদেমিতে কর্মসূত্রে যুক্ত সবাইকে পাঁচ গ্রাম ওজনের সোনার একটি করে লোগো উপহার দেওয়া হয়েছিল। সে সোনায় সোহাগা যুক্ত হয়েছিল দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে মূল অনুষ্ঠানে। সাহিত্য অকাদেমির সব ফেলোদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। যতদূর মনে পড়ে মোট ২১ জন ফেলোর মধ্যে ১৮ জন দিল্লির অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে অসমিয়া থেকে নীলমণি ফুকন, বাংলা থেকে শঙ্খ ঘোষ, রাজস্থানি থেকে বিজয়দান দেথা এবং অন্যান্য ফেলোরা ছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনোমোহন সিংহ ফেলোদের সম্মানিত করেছিলেন। বিজ্ঞান ভবনে প্রথম ২০-২৫টা আসনের সারি চিহ্নিত করা হয়েছিল প্রবীণ লেখক ও বিশিষ্টজনদের জন‍্য। সাহিত্য অকাদেমির আমরা কয়েকজন বসেছিলাম দ্বিতীয় ব্লকের প্রথম সারিতে, যাতে বিশেষ কোনও অতিথি এলে দেখতে পাই আর সামনের দিকের আসনে নিয়ে গিয়ে বসাতে পারি। অনুষ্ঠান চলাকালীন দেখলাম, একজন মানুষ দরজা খুলে আমাদের সারির এক প্রান্তে এসে চুপচাপ বসে পড়লেন। চিনতে অসুবিধে হল না। ভারতের তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি ও রাজ্যসভার অধ্যক্ষ ভৈরোঁ সিং শেখাওয়াত। তাঁকে গিয়ে সামনের দিকে বসতে বললেও গেলেন না। জিজ্ঞেস করলেন বিজয়দান দেথাকে সম্মান জানানো হয়ে গেছে কি না! হয়নি শুনে খুশি হলেন, আর মঞ্চে সে সময়ে যিনি বক্তৃতা দিচ্ছিলেন– তাঁর কথা শেষ হতে আমাদের অনুরোধে সামনের দিকে একটি আসনে গিয়ে বসলেন। বেশ কয়েক বছর ধরে আমাদের রাজ‍্যে মন্ত্রী থেকে এমএলএ-রা পর্যন্ত শিক্ষক, সরকারি আধিকারিক ও অন্যান্যদের চেয়ারে বসে পড়ছেন দেখে কথাটা মনে পড়ে গেল। অনুষ্ঠানের শেষে ভৈরোঁ সিং শেখাওয়াত এগিয়ে গিয়ে বিজ্জীর সঙ্গে দেখা করলেন। একেই বলে সৌজন্য। রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজি, শরৎচন্দ্র ও দেশবন্ধুর সম্পর্কের বিষয়ে লেখাপত্র মনে পড়ে যায়।

zoom
সাহিত্য অকাদেমির সুবর্ণজয়ন্তী স্মারক

বিজ্জীর শতবর্ষে এটুকুই আমার শ্রদ্ধা নিবেদন। লেখাটি শেষ করি তাঁর আত্মকথার কয়েকটি বাক্য দিয়ে– ‘ছাত্র জীবনে ছোট-বড় বেশ কিছু অপরাধ করেছি কিন্তু এর জন্যে কোনও সামাজিক দণ্ড সহ্য করতে হয়নি। এটাই আমার জন‍্য সবচেয়ে বড় শাস্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ভিতরে ভিতরে এটা আমাকে এতটাই দণ্ডিত করেছিল যে চোর, লুটেরা বা খুনি হয়ে উঠিনি। পরিষ্কার করে বললে, রঙ্গা-বিড়লা না হয়ে লেখক হয়ে গেলাম আর নিজের জীবনের প্রতি নিরন্তর অত্যাচার করে গেলাম। তবে এটুকু বলতে পারি যে অক্ষরের মর্যাদা, শব্দের মহিমা, কলমের প্রতিষ্ঠা আর অধ‍্যয়নের পবিত্রতাকে জেনে বা অজান্তে কখনও দূষিত করিনি।’ (অনুবাদ: সোমা বন্দ্যোপাধ্যায়)।

প্রিয় বিজ্জী, কথা দিচ্ছি আপনার কাছ থেকে উপহার পাওয়া ‘প্রিয় মৃণাল’ বইটির বাংলা অনুবাদ আপনার জন্মের শতবর্ষে প্রকাশিত হবে আর তা মৃণালের শহর থেকেই।

……………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন মুখুজ্জের লিটফেস্ট-এর অন্যান্য লেখা

……………………….

Habib Tanvir Mani Kaul Prakash Jha Rabindranath Tagore rajasthan Rajasthan literature Sahitya Akademi Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Sharat Chandra Chattopadhyay Shyam Benegal Suniti Kumar Chatterji Vijaydan Detha

Share this article on