life and paintings of chandana hore | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চন্দনা হোরের নিজস্ব ব্যথার পূজা

সেই মেয়ে তার শান্তিনিকেতন আশ্রমবাসের কিশোরীবেলায় দেখেছে রেললাইনের ধারে ফেলে দেওয়া সাঁওতাল মেয়েদের ধর্ষিত দেহ, তারপর সে যুগের পর যুগ ধরে, মেয়েদের রক্তাক্ত অথবা ঝলসে যাওয়া শরীর দেখেছে। যে বালিকার হাঁটুর রক্ত-উৎসার কাজে লেগেছিল বাবার ক্ষত সিরিজের প্ৰবাহে, সেই মেয়ে আজ অবধি জীবনের ষাটটি বছর পার করে কম দেখল না তো মেয়েদের উড়িয়ে-দেওয়া পুড়িয়ে-দেওয়া গুঁড়িয়ে-দেওয়া দেশকে, বিশ্বকে, চারিপাশকে। 

প্রচ্ছদের ছবি: চন্দনা হোর

শেষ আপডেট: এপ্রিল ৫, ২০২৬, ২১:১৪   
Facebook WhatsApp Messenger

সত্তর দশকের রক্তঝরা দিন। এক বালিকা সাইকেল চালানো শিখছে। পড়ে যাচ্ছে বারবার। ছড়ে যাওয়া হাঁটুতে ফুটে উঠছে রক্ত। তার শিল্পী-বাবা সেই রক্ত ছুঁইয়ে দিচ্ছেন দুধের সরের রঙের পেপার পাল্পের শরীরে। তারও অনেক পরে, সেই মেয়েটির বাবার কাজ যখন বিশ্বজুড়ে উদ্‌যাপিত, সেই ক্ষত সিরিজের কাজের সামনে দাঁড়ালে হাঁটু ব্যথা করত মেয়ের। যে সময়কাল হিংস্রতার, সেই সময়কালের সঙ্গে আক্ষরিক অর্থেই রক্তের সম্পর্ক তৈরি হয় মেয়েটির।

zoom
ক্ষত, সোমনাথ হোর

সেই মেয়েটির রংতুলির আর মোমব্রোঞ্জের কাজ দেখতে দেখতে মনে হল, আচ্ছা, এই পৃথিবীর সকল জন্ম, বলাৎকার আর হননের সঙ্গে মেয়েদের সম্পর্কটা কি রক্তের সম্পর্ক নয়? 

zoom
শিল্পী: চন্দনা হোর

মেয়েটির বাবা যখন ব্রোঞ্জ পাতিনায় ‘দ্রৌপদী’ গড়েন, ভাস্কর্যশরীরের কোমর থেকে নীচ পর্যন্ত পুড়িয়ে দেন তিনি। ‘কেন পোড়ালে বাবা?’ বাবা বলেন, ‘মেয়েরা কীভাবে পোড়ে, কীভাবে তাদের পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে সমাজ তুমি পরে বুঝবে…’

zoom
দ্রৌপদী, সোমনাথ হোর

সেই মেয়ে তার শান্তিনিকেতন আশ্রমবাসের কিশোরীবেলায় দেখেছে রেললাইনের ধারে ফেলে দেওয়া সাঁওতাল মেয়েদের ধর্ষিত দেহ, তারপর সে যুগের পর যুগ ধরে, মেয়েদের রক্তাক্ত অথবা ঝলসে যাওয়া শরীর দেখেছে। যে বালিকার হাঁটুর রক্ত-উৎসার কাজে লেগেছিল বাবার ক্ষত সিরিজের প্ৰবাহে, সেই মেয়ে আজ অবধি জীবনের ষাটটি বছর পার করে কম দেখল না তো মেয়েদের উড়িয়ে-দেওয়া পুড়িয়ে-দেওয়া গুঁড়িয়ে-দেওয়া দেশকে, বিশ্বকে, চারিপাশকে। 

ছবির ভাষা, বিশেষ করে মেয়েদের ভাষা, একাত্মতার।

zoom
চন্দনা হোর

মেয়েরা ঋতুকাল থেকে মায়ের সঙ্গে একাত্ম হয়, গেরস্থ বাড়ির একটি মেয়ের কাছে তার মায়ের পুরনো শাড়ি, তার ঘ্রাণ, তার নিজস্ব রক্তপাত– সব কিছু তাকে জড়িয়ে নেয় চিরকালের মানবীসমাজের সঙ্গে। রক্তভেজা কাপড়, রক্তজবা, ফুলের পাপড়ি, দীর্ঘ কোমল বৃন্ত, রক্তাভ নীল লতাজাল তাই সেই মেয়ের ছবিতে ঋতু, গর্ভ, আহত স্তন, নাড়ি, ধমনীজাল সব কিছুর মেটাফর হয়ে আসে। আমরা দেখতে পাই, প্রণয় পীড়ন প্রত্যাখ্যান মিশে যাচ্ছে ব্যক্তিগত থেকে রাজনৈতিক-এ। আর তার শিল্পী-মা? ‘মায়ের ওই কেজেড সেলফ ওঁর ছবিতে বারেবারে এসেছে। মুখে দাগ, কষ্টের ছাপ।’ মুখে দাগ, অপ্রেমের আঁচড় নিয়ে ভেঙেচুরে তবুও অশ্রুর টলটলে ইশারা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মেয়েটির ব্রোঞ্জে তৈরি মানবী মুখগুলি।

zoom
শিল্পী: চন্দনা হোর

পাঠক, আমি শিল্পীর নাম লিখিনি এখনও। নবনীতা দেবসেন বলেছিলেন আমায়, একটি কবিতাপাঠের সভায় ওঁকে কবিতা পড়তে আহ্বান করার সময় ঘোষক বলেছিলেন, এবার আপনাদের সামনে কবিতা পড়বেন শ্রীমতী কবিতা সিংহ। নবনীতাদি বলছেন, ‘আমি মাইক্রোফোনে গেলাম। বললাম, আমি কবিতা সিংহ নই। আমার নাম মহাশ্বেতা দেবী।’ নবনীতাদি বলতেন, মেয়ে-শিল্পী, তার আবার নাম! বড় ক্ষোভে বলতেন তিনি…

zoom
শিল্পী: চন্দনা হোর

একটি মেয়ে একা, স্থান থেকে স্থানান্তরে যেতে যেতে, বাড়িতে, ফ্ল্যাটে, হাসপাতালে থাকতে থাকতে, বিশ্ববন্দিত শিল্পী-পিতার শিল্প কাজের উত্তরাধিকার (ইদানীং তাঁর একান্ত শিল্পী-মায়ের কাজেরও ব্যাপ্ত সমাদর) বহন করতে করতে হয়তো আজও স্মৃতি হাতড়ে লিখে ফেলেন: ‘ওদের মাঝে খেলছি তো খেলছি কিন্তু আমার কি কোনো সচতেন অস্তিত্ব আছে? এই বোধ আমার ভেতরে ছোটবেলা থেকেই প্রবল এক নিঃসঙ্গতা এবং নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছিল…’ [জীবনবন্ধনে, চন্দনা হোর] 

zoom
শিল্পী: চন্দনা হোর

চন্দনার কাজ আমাদের সময়ের কাজ। আমরা যারা থিতু হতে চেয়েছি, দেশ চেয়েছি, ঘর চেয়েছি, রাষ্ট্রের কাছে সমাজের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছি, পড়শীর কাছে আত্মীয়তা আর মানুষের কাছে শুশ্রুষা চেয়েছি, সেই আমাদের প্রত্যেকের চুরমার-করা যন্ত্রণাগুলি নিয়ে, প্রেম-পীড়ন-প্রতিরোধের আর্তিগুলি নিয়ে চন্দনার কাজ, তাঁর ব্যথার পূজা। সেই কাজের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে নিজেকে সেই প্রতিরোধ আর পূজার শরিক মনে হয়।

Chandana Hore Indian Painter kala bhavan Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Somnath Hore

Share this article on