Robbar

লোকশিল্প: আজ-কাল-পরশু

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 6, 2026 6:03 pm
  • Updated:May 6, 2026 6:12 pm  

তথাগত চক্রবর্তী তাঁর ‘লোকশিল্পে রাজনীতির প্রভাব’ বইয়ের ‘কথামুখ’-এ লোকসংস্কৃতির এই প্রথাগত অনড়তার ধারণাটা ভাঙতে চেয়েছেন। লিখেছেন, “প্রতিটি সভ্যতা সংস্কারের মধ্য দিয়ে আর একটি পর্যায়ে উপনীত হয়।… আমাদের মনে হয় লোকসংস্কৃতিও এক জায়গায় থেমে থাকে না।” বইটি ছ’টি প্রবন্ধের সংকলন। বক্তব্যের অভিনবত্বে, বিন্যাসে, বিশেষত উপস্থাপনায় পাণ্ডিত্য জাহিরের বদলে সহজ বৈঠকি ভঙ্গিটি পাঠকের আদর পাবে বলেই আমার বিশ্বাস।

সত্রাজিৎ গোস্বামী

প্রায় তিন দশক আগেও এ-রাজ্যের প্রতি জেলায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় ফি-বছর লোকসংস্কৃতি উৎসব হত। সেই সময় লোকসংস্কৃতি-গবেষণার এক প্রথিতযশা অধ্যাপক উৎসবমঞ্চে আলকাপের মঞ্চ-উপস্থাপনা দেখে মন্তব্য করেছিলেন– ‘এ খাঁটি আলকাপ নয়! এ স্রেফ ভাঁড়ামো!’ প্রশ্ন করেছিলাম, লোকজীবন তো যুগের সঙ্গে তাল রেখে বদলাচ্ছে! ‘খাঁটি’ এখন অবান্তর! তিনি উত্তর দেননি।

লোকসংস্কৃতির প্রথাগত আদিকল্পের ধারণাটা এখনও বিশেষ বদলেছে বলে মনে হয় না! বাউলগান সম্পর্কেও অনেকে বলেন, এখন মঞ্চে, রিয়ালিটি শো-তে, মেলা-উৎসবে যে-সব বাউলগান চলছে, সেগুলো ‘খাঁটি’ বাউলগান নয়! তথাগত চক্রবর্তী তাঁর ‘লোকশিল্পে রাজনীতির প্রভাব’ বইয়ের ‘কথামুখ’-এ লোকসংস্কৃতির এই প্রথাগত অনড়তার ধারণাটা ভাঙতে চেয়েছেন। লিখেছেন, “…সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার ক’রে… প্রতিটি সভ্যতা সংস্কারের মধ্য দিয়ে আর একটি পর্যায়ে উপনীত হয়।… আমাদের মনে হয় লোকসংস্কৃতিও এক জায়গায় থেমে থাকে না।”

বইটি ছ’টি প্রবন্ধের সংকলন। বক্তব্যের অভিনবত্বে, বিন্যাসে, বিশেষত উপস্থাপনায় পাণ্ডিত্য জাহিরের বদলে সহজ বৈঠকি ভঙ্গিটি পাঠকের আদর বলেই আমার বিশ্বাস।

শিরোনাম অনুযায়ী, প্রাবন্ধিক তাঁর লোকশিল্পকে একটা বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, আমাদের সমাজ-সভ্যতার বিকাশের মতো সংস্কৃতিও একটি নিরবচ্ছিন্ন ক্রমাভিব্যক্তির পথে সদা চলমান। লোকজীবন ও লোকসংস্কৃতিও এই গতিময়তার সূত্রে গাঁথা। এই নিয়ত পরিবর্তনের মধ্যেই লগ্ন হয়ে আছে সমকালীন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একটা অন্তহীন চেষ্টা। ফলে লোকশিল্প বা লোকসংস্কৃতির মধ্যেও যখন সেই উত্তরণের আর্তি ধ্বনিত হয়, তখন তাকে বৃহদর্থে ‘রাজনীতি’ বলাই যায়! তবে মনে রাখা দরকার, উচ্চসংস্কৃতিতে উত্তরণকামী ‘রাজনৈতিক’ বার্তা থাকলেও সেখানে আত্মগোপনের সচেতন চাতুর্য কিংবা ক্ষমতার সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে চলার যে সচেতন সুবিধাবাদ থাকে, লোকসংস্কৃতিতে সেই চাতুর্য বা সুবিধাবাদ বিরলপ্রায়!

‘শিকড়ের গান’ প্রবন্ধে বাংলা লোকগানের দু’টি ধারার উল্লেখ করেছেন প্রাবন্ধিক– ‘মাধুকরী নির্ভর বাউল বোষ্টমীর গান আর অন্যদিকে উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত বিপুল শ্রম সংগীতের ভাঁড়ার।’ কিন্তু ‘কথামুখ’-এ যে প্রতিশ্রুতির ইশারা রেখেছিলেন প্রাবন্ধিক, প্রবন্ধের সূচনাতেই সেই প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করে একুশ শতকে দ্রুত নগরায়নের ফলে কৌমভিত্তি ভেঙে যাওয়ায় লোকগানের ‘খাঁটি মধু’ পাওয়া অসম্ভব বলে আক্ষেপ করছেন তিনি! বাউলের যাপন, তার গুহ্যতত্ত্ব আর প্রহেলিকাময় প্রকাশরীতি ছাড়া ‘বাউলগান’ হয় না– বাউল-বিশেষজ্ঞ অধ্যাপকের এই উপদেশও তিনি শিরোধার্য করেই নিয়েছেন!

প্রবন্ধের মূল প্রসঙ্গটা অবশ্য রাজনীতির। ১৯৮০-তে মহানন্দা পেরিয়ে ফেরিঘাটের এক চা-দোকানে মাঝবয়সি এক নির্বিবাদী মানুষের মুখে শোনা: ‘‘বোড় বোড় কালোবাজারি এই দেশেতে,/ ভালো ভালো লোকগুলোকে ‘মিসা’য় দিয়েছে,/ তেলে জলে ভেজালেতে ওরা মেরেছে,/ বাহাত্তরে চেম্বার ধরে ভোট লিয়েছে…” গানটিকে রাজনীতি-সচেতন লোকগান বলে শনাক্ত করেছেন প্রাবন্ধিক। শোনা গিয়েছে, সাতের দশকের মাঝামাঝি অকারণে মানুষটার ‘মিশা’-য় জেল হয়েছিল। সেই থেকেই মানুষটা এমন গান বাঁধে, আপনমনে গায়, কিন্তু কেউ আগ্রহ দেখালেই সতর্কভাবে সরে যায়!

এরপরে আন্তরিক আগ্রহ নিয়ে লোকগান সংগ্রহ, ‘শিকড়ের সন্ধান’ নামক সংস্থা গঠন, লোকগানের কর্মশালার আয়োজনের বৃত্তান্তের পর আবার আক্ষেপ! বাঁশ, হাড়, লাউ, নারকেলমালা ইত্যাদি প্রাকৃতিক উপকরণে তৈরি বাদ্য বা তন্ত্রীর পুরনো বাদ্যযন্ত্রের বদলে এখন আধুনিক যন্ত্রানুষঙ্গ, নাগরিক রুচি ও মূল গানের শব্দ-পরিবর্তনে ‘লোকগানের শিকড়’ হারিয়ে যাচ্ছে বলে তাঁর আক্ষেপ! তাহলে, ‘কথামুখ’-এর উচ্চারিত সমাজ-সভ্যতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে লোকগান বা লোকশিল্পের অনিবার্য পরিবর্তন-সূত্রটাকে তিনি নিজেই খণ্ডন ক’রে বসলেন না তো?

‘শিবের গীতে রাজনীতি’ প্রবন্ধে গম্ভীরার ধর্মীয় রীতিপদ্ধতির প্রসঙ্গ সেরেই এসেছে গ্রামেগঞ্জে গম্ভীরা গানের দলের ক্রমহ্রাসমানতার কথা। পৃথিবী জুড়েই ভুবনগ্রাম-নির্মাণের ঢক্কানিনাদে যাবতীয় লোকসংস্কৃতিই এখন খাদের কিনারে! ১৯৮০-পরবর্তী মালদায় একদল কিশোরের মুখে প্রাবন্ধিক শুনেছিলেন, “আমরা নতুন সালে নৌকো মোদের ভাসাইনু ভাই।/ লাল রঙের পাল তুল্যাছি, দেখবি যদি আয়।/ ও কাণ্ডারি, হও সাবধান,/ ন’টি রাজ্যে উঠছে তুফান।” প্রথম দু’টি পঙক্তিতে ’৭৭-এ পশ্চিমবঙ্গের পালাবদল, আর পরের দুটিতে ’৮০-তে প্রধানমন্ত্রিত্বে ইন্দিরার প্রত্যাবর্তন ও ন’টি রাজ্যে বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার রাজনৈতিক ইশারা স্পষ্ট। গণিখান সাহেবের মালদায় বসে গম্ভীরা গানে খাদ্যসমস্যা, জন্মনিয়ন্ত্রণ বিধি, রেশনব্যবস্থা, বেকারত্ব, সেচনীতি, সারের মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি প্রসঙ্গ শুনে এবং দর্শকের নির্বিবাদ উপভোগ গম্ভীরার গানে বেশ ‘আনকোরা’ বলে প্রাবন্ধিকের মনে হয়েছে। কিন্তু যদি মুঘল আমলের ভূমিনীতির সমালোচনা মধ্যযুগপর্বের ‘অভয়ামঙ্গল’ কিংবা ‘শিবায়ণ’ কাব্যে পাই, অথবা গম্ভীরা গানের পরম্পরাও খুঁজি, তাহলে বোঝা যাবে, লোকসাহিত্যে বা লোকগানে এই সটান-সপাট রাজনৈতিক উচ্চারণ ‘আনকোরা’ ব্যাপার কখনওই নয়!

‘আমি মানব যেই’ প্রবন্ধে এসেছে লোকসাহিত্যে মানুষের আত্মনির্মাণ বা মানবাধিকার-চেতনার প্রসঙ্গ। ১৯৪৮-এ রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার সংক্রান্ত ঘোষণার বহু আগেই পরিবারে, সমাজে, ধর্মীয় পরিসরে, রাষ্ট্রীয় মদতে নানাভাবে মানবিক অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে যে লোকসাহিত্য প্রতিবাদে মুখর হয়েছে, লোকমানুষের ‘আত্মনির্মাণ’-চৈতন্যের অনেকগুলো উদাহরণ রূপকথা, ব্রতকথা, প্রবাদ-প্রবচন, ভাদু, ঝুমুর, সঙ, বাউল ইত্যাদি থেকে দিয়েছেন প্রাবন্ধিক। প্রসঙ্গত মনে পড়ে, ইউরোপীয় নবজাগৃতির বহু আগে চণ্ডীদাসে এই মানব-প্রাধান্য ঘোষিত হয়েছিল, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’

প্রাচীন গ্রিস ও ভারতবর্ষে রাজ-আনুকুল্যে নাগরিক মঞ্চে লোকনাট্যকে লালন করার প্রসঙ্গ পাচ্ছি ‘প্রসেনিয়াম থিয়েটারে লোকনাট্যের প্রয়োগ’ প্রবন্ধে। প্রাবন্ধিকের বক্তব্য, জনকল্যাণকামী সেই রাষ্ট্রীয় চেহারাটা স্বাধীনতা-উত্তর ভারত তথা বাংলায় এক বিশেষ প্রশাসনিক ‘নকশা’-য় গুম করা হয়েছে! লেখকের এই অনুসিদ্ধান্তটি অবশ্য বেশ বিতর্কিত! তবু এর পরেই প্রাবন্ধিকের যথার্থ বক্তব্য, ‘এককেন্দ্রিক রাজনীতির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠাকালে সংস্কৃতির পরিকাঠামোটিকেও ভারত সরকার চেষ্টা করেছিলেন রাজনৈতিক পরিকাঠামোর অনুগামী করে তুলতে।’ সেই প্রকল্প অনুযায়ী আঞ্চলিক ভাষা-রীতি-ধর্মাচারে বৈচিত্রময় লোকসংস্কৃতিকে অখণ্ড ভারত-সংস্কৃতির অঙ্গ করতে গিয়ে তার কৌম-পরিচয়টিকেই ধ্বংস করেছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় অনুদানের পূর্বকালে লোক-আঙ্গিকের আশ্রয়ে যে রাজনৈতিক প্রতিবাদী স্বরের সূচনা হয়েছিল, অনুদান-উত্তরকালে স্বভাবতই সেই স্বর শাসকের অনুগামী বা অন্তত প্রতিবাদহীন কলাচর্চায় পর্যবসিত হয়েছে, প্রাবন্ধিকের এই বক্তব্য ৯৯ শতাংশ সঠিক!

‘রাষ্ট্রপুষ্ট চিত্রকলা’ মধুবনি চিত্রশৈলীর ইতিহাস, রীতি-প্রকরণ, উপকরণ, বিশেষত্ব ও বিশ্বপরিচিতি নিয়ে এক দীর্ঘ প্রবন্ধ। দ্বারভাঙা জেলার মিথিলার লোক-চিত্রীদের একটা বিরাট অংশ বহুকাল থেকেই এই বিশেষ শৈলীর হিন্দু-পুরাণনির্ভর দেওয়ালচিত্র এঁকে চলেছেন। এই মৈথিল লোকচিত্রীরা একসময় রাজ-পোষকতাও পেয়েছেন। ফিরোজ শাহ্‌ তুঘলক থেকে আকবর শাহ্‌ পর্যন্ত ইসলামি রাষ্ট্রের অনুগ্রহে প্রাপ্ত ব্রাহ্মণ্য জায়গিরেই দ্বারভাঙার মৈথিল সংস্কৃতি ও মৈথিল চিত্রকলার বিস্তার। তারপর ঔপনিবেশিককালে শিল্পরসজ্ঞ প্রশাসনিক কর্তা উইলিয়াম গ্রেস আর্চার এই চিত্রকলাকে বিশ্বের কলারসিকের সামনে নিয়ে আসেন বিশ শতকের চতুর্থ দশকে।

১৯৬৬-’৬৭-র পর প্রশাসনিক উদ্যোগে মিথিলার আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের সূত্রে এই লোকচিত্র পরিচিতি পায় ‘মধুবনি চিত্র’ নামে। কিন্তু রাজানুগ্রহ কিংবা ব্রিটিশ প্রশাসনিক সহায়তার দিকটা বিস্তৃতভাবে এলেও, তার বিপরীতে রাষ্ট্রীয় পীড়ন অথবা অনুগ্রহের নামে লোকশিল্পের কণ্ঠরোধ বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অনুবর্তী করে তোলার অপচেষ্টাটি একেবারেই উপেক্ষিত রয়ে গিয়েছে। বইয়ের শিরোনাম অনুযায়ী, এই প্রবন্ধকে তাই অসম্পূর্ণ মনে হয়।

‘বাংলার খাঁটি লোকগান– সোনার পাথরবাটি’ প্রবন্ধের শিরোনামটা ‘খাঁটি লোকগানের’ অলীক ধারণার সূত্রটাকেই আপাতভাবে সমর্থন করেছে বলে মনে হয়। কিন্তু আসলে অবিভক্ত বাংলার লোকগানগুলো আদৌ লোকগান কি না, সে বিষয়ে এখানে প্রশ্ন তুলেছেন প্রাবন্ধিক। এই লোকগানগুলো সম্ভবত দরবারি সংস্কৃতির প্রভাবে কোনও-এক সময়ে রাগ-তাল নির্দেশিত ও লিপিবদ্ধ হয়ে নাগরিক সমাজে প্রচলিত হয়ে উঠেছিল বলে তাঁর অনুমান! ফলে এ-পর্যন্ত প্রাপ্ত বাংলা লোকগানগুলো কৌম সমাজের ‘খাঁটি’ লোকগান কি না, এই জিজ্ঞাসা সত্যিই নতুন চিন্তার অবকাশ তৈরি করে দেয়।

লোকশিল্পে রাজনীতির প্রভাব
তথাগত চক্রবর্তী
লালমাটি প্রকাশন
২৫০ টাকা