


পড়তে পড়তে বোঝা যায়, তথ্যচিত্র, চলচ্চিত্র মিলিয়ে সুন্দরবন নিয়ে এযাবৎ কম নয়। সবগুলিকে দু’-মলাটে ধরা সহজ ছিল না। মানতেই হবে, সম্পাদক জ্যোতিরিন্দ্রনারায়ণ লাহিড়ী অসাধারণ কাজ করেছেন। এমনকী, এখনও মুক্তি না-পাওয়া ‘সপ্তডিঙার সন্ধানে’-ও বাদ যায়নি। প্রকৃত প্রস্তাবে, এই সংখ্যা সুন্দরবনপ্রেমী মানুষদের জন্য এক চমৎকার আয়োজন।
সুন্দরবন। আক্ষরিক অর্থেই জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ। এক আশ্চর্য ভৌগোলিক অঞ্চল। আমাদের শিল্পে, সাহিত্যে তাই বারবার সুন্দরবন ভেসে উঠেছে স্বাভাবিক ভাবেই। সাতের দশকে ‘অমানুষ’, সাম্প্রতিক সময়ে ‘আবার প্রলয়’-এর মতো ‘পপুলার’ কাজ হয়েছে। অন্যদিকে ‘হাওয়া’র মতো ছবিও হয়েছে। হয়েছে তথ্যচিত্র। এপার, ওপার মিলিয়ে বঙ্গ লোকায়ত জীবনের এক অন্যতর দলিল ফুটে উঠেছে সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে। জলে, জঙ্গলের কথকতার সেলুলয়েড বুননকে ঘিরেই ‘শুধু সুন্দরবন চর্চা’র সাম্প্রতিক সংখ্যা ‘সিনেমায় সুন্দরবন’। যা পড়তে পড়তে বোঝা যায়, এমন একনিষ্ঠ কাজ লিটল ম্যাগাজিনেই হওয়া সম্ভব।

যে-পরিমাণ সাহিত্য রচিত হয়েছে তার তুলনায় চলচ্চিত্রে যে সুন্দরবনের শৈল্পিক প্রকাশ কমই হয়েছে– সেকথা এই বইয়েরই এক প্রবন্ধে উচ্চারিত হয়েছে। তবে কম হোক বা বেশি, এই ‘ডকুমেন্টেশন’ যে জরুরি ছিল। যা নিয়ে আলোচনার সময় সুন্দরবনের বাস্তব অস্তিত্বই যেন স্পষ্ট ফুটে উঠতে থাকে। বাংলাদেশের বিখ্যাত পরিচালক তানভীর মোকাম্মেল যেমন লিখেছেন, ‘সুন্দরবনে মানুষখেকো বাঘের সামনে পড়ার বিপদটা যতটা কাল্পনিক ততটা বাস্তব নয়। কিন্তু সুন্দরবনে, বিশেষ করে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অঞ্চলে, ডাকাতদের খপ্পরে পড়ার ব্যাপারটা প্রায়ই ঘটে থাকে।’ এ একেবারে রক্তমাংসের এক অভিজ্ঞতা! তাঁর চমৎকার সাক্ষাৎকারটি এই সংখ্যার অন্যতম আকর্ষণ। তিনি সুন্দরবন নিয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। পরিচালক জানিয়েছেন, ‘সুন্দরবনের নানা দিক রয়েছে। এবং নানাভাবেই সুন্দরবনকে চলচ্চিত্রে দেখানো যেতে পারে। এবং দেখানো হয়ও। আমরাও একভাবে দেখিয়েছি। আমার মনে হয় আমাদের বনযাত্রী ছবিটাতে এক জীবন্ত তরুণী নারীর আদলে বনবিবিকে দেখিয়ে তার মাধ্যমে সুন্দরবনের বর্তমান দুরবস্থাকে তুলে ধরা এটা এমন এক প্রচেষ্টা যা সুন্দরবনের উপর অন্য কোনো তথ্যচিত্রে আগে দেখানো হয়নি।’ আলাদা করে নজর কাড়ে সাধন চট্টোপাধ্যায়, ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায় প্রমুখর চোখে দেখা সুন্দরবনের কথাও। সুন্দরবনের পটভূমিতে লেখা তাঁদের কোন কোন কাহিনি নিয়ে সিনেমা তোলা সম্ভব, সেকথাই রচনাগুলির মূল উপজীব্য।

পড়তে ভালো লাগে উত্তমকুমারের ‘অমানুষ’ ছবিটি তৈরি হওয়ার গল্প। শক্তিপদ রাজগুরুর উপন্যাস ‘নয়া বসত’ অবলম্বনে তৈরি হয়েছিল ছবিটি। শক্তি সামন্ত অবশ্য লিখিত কাহিনিটিতে পরিবর্তন করেছিলেন। যদিও খোদ লেখকের সঙ্গে আলোচনা করেই তিনি তা করেছিলেন। তবু গোপী দে সরকার তাঁর প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘ডাক্তার দাদার মৃত্যুর পর মহিম ঘোষাল শোকসন্তপ্ত লেখার একাকিত্বের সুযোগ নিয়ে যখন তাঁর শ্লীলতাহানি করতে আসে সেই সময় মধু সেখানে গর্জে ওঠে। সে মহিমকে বলে, ফের যদি দেখি শুনি এখানে জ্বালাতন করতে এসেছ, মধু চৌধুরী সেদিন তোমাকে গলা টিপে শেষ করে মাঝগাঙে রেখে আসবে। কুমির-কামটের ভোজে লেগে যাবে। চলচ্চিত্রে এই প্রসঙ্গটি নেই। বরং রোগী দেখে ফেরার পথে লঞ্চে এই দৃশ্যটির উপস্থাপনা হয়েছে।’ তাঁর মতে, ‘সমস্ত অশান্তির কারণ হিসেবে মহিমকে দোষী সাব্যস্ত করার জন্য এবং সাধারণ দর্শকের কাছে কাহিনীকে আরো চিত্তাকর্ষক করে তোলার জন্য’– এই ধরনের বদল। বহুল জনপ্রিয় এমন এক ছবি সম্পর্কে এই ধরনের লেখা বেশ উপভোগ্য। আলোচিত হয়েছে ‘দ্য জাপানিজ ওয়াইফ’-ও।

আবার ‘রোর: দ্য টাইগার্স অফ সুন্দরবনস’ ছবিটি নিয়ে যে লেখাটি সেখানে দেখানো হয়েছে, কীভাবে তা আপাতভাবে বিনোদন দিতে পারলেও আদপে ‘সুন্দরবনের চলচ্চিত্র হিসেবে অতীব দুর্বল-কল্পনার আঙ্গিকে’ নির্মিত। এই ছবির ভিলেন এক সাদা বাঘ। প্রবন্ধটির রচয়িতা উদ্দালক দাশের মতে, ‘জঙ্গলের গল্প, বাস্তব বিবরণ যে ধরনের চিত্রনাট্য দাবি করে, তা সুন্দরবন থেকে দূরে থাকা মানুষ দ্বারা নির্মিত হলে যা হতে পারে, রোর তার সেরা উদাহরণ। আবার এও দুঃখের বিষয়, যাঁরা সুন্দরবনকে তুলে ধরতে পারেন, তাঁরা আবার চলচ্চিত্রের ফরম্যাটে বাদা, আবাদের গল্পগুলো বলতে অপারগ।’ এখান থেকে পরিষ্কার হয়ে যায়, দূর থেকে বাঘ-কুমিরে (ডাকাতও) ভরা এক বিপজ্জলক ভূখণ্ডের কথা ভেবে সুন্দরবনকে নিয়ে কাজ করা যায় না। বরং তাতে থাকতে হবে মাটির গন্ধ, রক্তমাংসের উপস্থিতি। এদিকে ‘আবার প্রলয়’ নিয়েও প্রায়ই একই অভিযোগ। ছবিটি নিয়ে লিখতে গিয়ে শুভদীপ অধিকারী লিখেছেন, ‘এই সিরিজে সুন্দরবনের বিপন্নতার টুকরো টুকরো কিছু ছবি রয়েছে। রয়েছে জল-জঙ্গলের চমৎকার দৃশ্যায়ন, অসাধারণ ড্রোন শট। তবুও সামগ্রিকভাবে সুন্দরবন কিছুটা অনুপস্থিত।’
আল মাহমুদের ‘জলবেশ্যা’ বিখ্যাত গল্প। সেই গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছিল ‘টান’। পরিচালক মুকুল রায়চৌধুরী জানিয়েছেন কেন সুন্দরবনে সব দৃশ্যের শুটিং করা যায়নি। ‘সুন্দরবনে শুটিং করার একটা বড় অসুবিধা হচ্ছে এখানে জোয়ার-ভাটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। ভাটায় নৌকা দাঁড়িয়ে যায়, আর ঐ ম্যানগ্রোভের শুলোর ওপর দিয়ে হাঁটা যায় না। শুটিং করা সত্যিই কষ্টকর। এই জঙ্গলের মধ্যে বাঘ বা অন্যান্য প্রাণী কীভাবে যাতায়াত করে আমি ভাবতেই পারি না।… অনেক বেয়ার বডি সিন ছিল যেগুলো সুন্দরবনে করা সম্ভব ছিল না। ওখানে হাজার হাজার লোক জমে যেত ঋতুপর্ণা নামলেই। নৌকা নিয়ে লোক চলে আসত।’ পড়তে পড়তে বোঝা যায়, কাজটা যতটা সহজ মনে হয়, তা একেবারেই নয়। বহু রকমের প্রতিকূলতাকে সামলেই ছবি নির্মাণ করা যায়। তবু একথা অনস্বীকার্য, ‘হাওয়া’র মতো ছবিও বাংলা ভাষাতেই নির্মিত হয়েছে। যদিও সেখানে কেবলই গভীর সমুদ্র। তবু ট্রলার ফিশিংয়ে যাওয়া মানুষদের যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে তা অনবদ্য।

একই ভাবে উঠে আসে রাজেন তরফদারের ‘নাগপাশ’-এর কথাও। কিংবা গৌতম ঘোষের ‘শঙ্খচিল’। বাংলাদেশের সুন্দরবন নিকটবর্তী নীলডুমুর নামের এক জায়গায় শুটিংয়ের গল্প শুনিয়েছেন পরিচালক। এসেছে তাঁর ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র কথাও। এইসব কাজের ভিত্তিতে তাঁর সামগ্রিক উপলব্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘পুরোটা নিয়েই সুন্দরবন। বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের। একে আলাদা করা সম্ভব না। আগামী দিনে সুন্দরবনকে নিয়ে ছবি করলে দেশভাগের বিষয়টা ফিরে ফিরে আসবে। এটাকে আমি বাদ দিতে পারব না।…’ এই কথা আমাদের ভাবায়। সুন্দরবনের অরণ্য জীবনের কথা বলতে গেলে দুই দেশের মধ্যে তার ভাগ হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ আসা অবধারিত।
পড়তে পড়তে বোঝা যায়, তথ্যচিত্র, চলচ্চিত্র মিলিয়ে সুন্দরবন নিয়ে এযাবৎ কম নয়। সবগুলিকে দু’-মলাটে ধরা সহজ ছিল না। মানতেই হবে, সম্পাদক জ্যোতিরিন্দ্রনারায়ণ লাহিড়ী অসাধারণ কাজ করেছেন। এমনকী, এখনও মুক্তি না-পাওয়া ‘সপ্তডিঙার সন্ধানে’-ও বাদ যায়নি। প্রকৃত প্রস্তাবে, এই সংখ্যা সুন্দরবনপ্রেমী মানুষদের জন্য এক চমৎকার আয়োজন। চলচ্চিত্রপ্রেমী মানুষদের জন্যও। চমৎকার ছাপা, সেই অর্থে ছাপার ভুল না-থাকা সামগ্রিক ভাবেই সুসম্পাদনার দিকটিকেই তুলে ধরে। তবু একটা অনুযাগ থেকেই যায়। আলোচনাগুলি আরও একটু দীর্ঘায়িত করা গেল না! ধরা যাক, ‘হাওয়া’ নিয়ে লেখাটির কথাই। মাত্র দু’পাতা বরাদ্দ করা হয়েছে। তাও সেখানে মূল টেক্সটের পরিমাণই খুবই অল্প। বোঝা যায়, এতগুলি ছবি ও নানা বিষয়কে ধরতে চাওয়াতেই এই সমস্যা। তবু সেটা বুঝে ফেলার পরও সামান্য আক্ষেপ থেকে যায় বইকি।
শুধু সুন্দরবন চর্চা
সিনেমায় সুন্দরবন সংখ্যা
সম্পাদক জ্যোতিরিন্দ্রনারায়ণ লাহিড়ী
২৫০্
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved