সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়ে ওঠার উদ্দেশ্যে নয়, সংঘাতের ক্ষত বহন করে চলা মানুষের কথা বলতেই লেখা এই বই। আদতে গোটা পৃথিবীটাই যেন মণিপুর, কিংবা রক্তস্নাত বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ধাঁধা, স্বার্থপর রাজনৈতিক অঙ্কের বলি মণিপুরই যেন এই নীল রঙের গ্রহের রেপ্লিকা– ‘গণতন্ত্রের ব্লাইন্ড স্পট’।
এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না
এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ না
এই বিস্তীর্ণ শ্মশান আমার দেশ না
এই রক্তস্নাত কসাইখানা আমার দেশ না
মণিপুর নিয়ে এই কবিতা লেখেননি নবারুণ ভট্টাচার্য। কারণ ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালের ১ এপ্রিল। উত্তর-পূর্বের রাজ্যটি নতুন করে জ্বলছে ২০২৩ সালের মার্চ থেকে। আরও স্পষ্ট করে বললে ২৭ মার্চ। ওইদিন মেইতেই জনজাতি মামলার রায় দেয় হাইকোর্ট। রাজ্য সরকারকে মেইতেইদের জনজাতি মর্যাদার বিষয়ে বিবেচনা করতে বলে আদালত। তবু, মণিপুর নিয়েই যেন লিখেছিলেন নবারুণ! আশ্চর্য কাণ্ড ঘটে কবিতার পরবর্তী দুই পঙ্ক্তিতে– ‘সমস্ত শরীর ঘিরে জোনাকি না পাহাড়ে পাহাড়ে জুম্/ অগণিত হৃদয় শস্য, রূপকথা ফুল নারী নদী।’ আমাদের মতো ‘মেন ল্যান্ড’-এর মানুষের মনে হতেই পারে, এ তো পাহাড়-সমতলের ভারসাম্যে আঁকা সবুজ প্রকৃতি ঘেরা ভারতের প্রান্তিক রাজ্য মণিপুরের কথাই বলা হচ্ছে। ‘সমস্ত শরীর ঘিরে জোনাকি না পাহাড়ে পাহাড়ে জুম্’– এই পঙ্ক্তিতে একাত্ম হতে পারেন উত্তর-পূর্বের রাজ্যটির পাহাড়ে বসবাস করা ‘কুকি-জো’ সম্প্রদায়ের মানুষও। ২০১৪ সালে প্রয়াত হন ‘রাতের সার্কাস’-এর কবি নবারুণ ভট্টাচার্য। তবুও থামেনি পৃথিবীজোড়া ‘রাতের সার্কাস’। দেশে-বিদেশে চলা খুচরো ‘যুদ্ধ-বিদ্রোহের’ পাশাপাশি তিনটি বড়সড় যুদ্ধ, যথাক্রমে ইজরায়েল-হামাস, ইউক্রেন-রাশিয়া এবং ইজরায়েল-আমেরিকা বনাম ইরান যুদ্ধে মানুষের মৃত্যুমিছিল অব্যাহত। আদতে গোটা পৃথিবীটাই যেন মণিপুর, কিংবা রক্তস্নাত বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ধাঁধা, স্বার্থপর রাজনৈতিক অঙ্কের বলি মণিপুরই যেন এই নীল রঙের গ্রহের রেপ্লিকা– ‘গণতন্ত্রের ব্লাইন্ড স্পট’।

সোহেল ইসলাম লিখিত ‘মণিপুর গণতন্ত্রের ব্লাইন্ড স্পট’ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। প্রায় সাড়ে ৪০০ পাতার বইটি একদিকে যেমন বন্দুক-বারুদ, হিংসা-মৃত্যু-শরণার্থী, মানবপাচার-মাদকের মতো ‘বুকভাঙা কান্নার’ ধারাবিবরণী, অন্যদিকে ‘এক হৃদয় ভালোবাসার সম্ভাবনা’কেও ছুঁয়ে যায়। সেই সম্ভাবনা কিন্তু মণিপুরের সবুজ প্রকৃতি, স্থানীয় মানুষের ইতিহাস, লোককথার মধ্যেই নিহিত রয়েছে। পরিশ্রমসাধ্য দীর্ঘ গবেষণায় লিখিত হওয়া সত্ত্বেও পাঠক টের পান আলোচ্য গ্রন্থের প্রতিটি অক্ষর হৃদয়বান কলমে, অশ্রু-কালিতে লিখিত। গ্রন্থের শুরুতেই ‘নেপথ্য’ কথনে লেখক সোহেল জানিয়ে দেন, ‘এই বই নিরপেক্ষতা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে লেখা হয়নি কিংবা শুধুই সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়ে ওঠার উদ্দেশ্যেও নয়। সচেতনভাবেও লেখাগুলোকে আবেগহীন করা যায়নি। এখানে ক্ষোভ রয়েছে, প্রশ্ন ও অভিযোগও রয়েছে। এখানে নীরবতা কখনো কৌশল, কখনো ভয়, আবার কখনো এমন এক ক্লান্তি, দীর্ঘ সংঘাতের ফলে যারা শিখে নিতে বাধ্য হয়েছে। নীরবতার বিরুদ্ধে এই বই এক প্রতিবাদ।’ কাদের জন্য এই গ্রন্থ লিখিত?

লেখক স্পষ্ট করেন– ‘এই বই সংঘাতের ক্ষত বহন করে চলা মানুষের, যারা কোনো কূটনৈতিক আলোচনায় থাকে না, কোনো নিরাপত্তা নীতির খসড়া লেখে না, কিন্তু নীতির ফলাফল শরীর ও জীবনে বয়ে নিয়ে বেড়াবে সারাজীবন।’ এই নিরন্তর সংঘাত, অন্যদিকে সভ্যতার পুনর্গঠনের সম্ভাবনা এবং মণিপুরের উজ্জ্বল অতীত ঐতিহ্যকে এই গ্রন্থে আটটি অধ্যায়ে গেঁথেছেন সোহেল ইসলাম। ‘ফিরে দেখা মণিপুর’ অংশে ধারণা হয়, খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকেই মণিপুরে মানুষ বসবাস করত। লেখকের উচ্চারণে– ‘মণিপুরের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো ক্ষমতা, বিশ্বাস এবং প্রতিরোধের ধারাবাহিক কাহিনির সংমিশ্রণ।’ প্রাথমিক ধর্ম বিশ্বাসের সঙ্গে গভীর যোগ ছিল প্রকৃতির, বন-পাহাড়-নদী-খেতের ফসলের। পরবর্তীকালে বৈষ্ণব ধর্মের আগমনে নতুন ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। বলা বাহুল্য, বিখ্যাত মণিপুরি নৃত্যের জন্মই হত না এ রাজ্যে বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার ও প্রসার না ঘটলে। কিন্তু সংস্কৃতি তো কখনও বিরোধ তৈরি করে না, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে যখন রাজনৈতিক হাতিয়ার করা হয়, চাপিয়ে দেওয়া হয় তুলনায় দুর্বল অন্যদের ওপরে, তখনই শুরু হয় সংঘাত।

আধুনিক সময়ে মণিপুরে অস্থিরতার সূত্রপাত বার্মিজ আক্রমণে। ‘ফিরে দেখা মণিপুর’ অধ্যায়ে ১৮ শতকের বার্মিজ আক্রমণ মণিপুরের ইতিহাসে যে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল, সেকথা মনে করিয়ে দেন সোহেল– ‘একের পর এক আক্রমণ, গণহত্যা এবং উৎখাত মানুষের ভেতরে রাষ্ট্র ভাঙার ভয় ঢুকিয়ে দেয়।’ একদিকে সংকীর্ণ জাতি সংঘাত, অন্যদিকে তীব্র দারিদ্র এবং ভৌগলিক অবস্থান ধর্ম-জাতি নির্বেশেষে মণিপুরবাসীকে দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সেই দুঃখের পরিসংখ্যানে গা কেঁপে ওঠে। ‘২০০০ সালের পর থেকে মণিপুর-মায়ানমার হাইওয়ে-৩৯ মানব পাচারের স্থায়ী করিডোরে পরিণত হয়েছে। সরকারি এবং বেসরকারি তথ্য মিলিয়ে এই রুট দিয়ে প্রতিবছর প্রায় ১৫০০-২০০০ নারী ও শিশু নিখোঁজ হয়ে যায়।’ বাস্তব চিত্র না কি আরও ভয়াবহ।

১৯৬৭ সালে ভারত-মায়ানমার সীমান্তে ফ্রি মুভমেন্ট রেজিম চালু হয়। এই নিয়ম অনুসারে উভয় দেশের জনগণ একে-অপরের ভূখণ্ডের ১৬ কিলোমিটার ভিতর অবধি যাতায়াত করতে পারতেন। মূল্য উদ্দেশ্য ছিল সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীগুলির মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখা। ‘কিন্তু রাষ্ট্র নীতির সঙ্গে সমানুপাতিক নজরদারি, উন্নয়ন ও বিকল্প অর্থনৈতিক ভিত গড়ে তুলতে সমর্থ হয়নি। ফলে খোলা সীমান্ত মাদক, অস্ত্র ও মানব পাচারের সহজ করিডোর হয়ে ওঠে।’ এইসঙ্গে ‘তামু-মোরে রুট এবং চূড়াচাঁদপুর-ইম্ফল করিডোর আজ আন্তর্জাতিক ড্রাগ সিন্ডিকেটের পরীক্ষিত সাপ্লাই লাইন, যে দিক দিয়ে হেরোইন, ইয়াবা ও সিনথেটিক ড্রাগ নিয়মিত চলাচল করে।’ সোহেল মনে করিয়ে দেন, শখ করে কেউ অপরাধের অন্ধকারে পা বাড়ায় না। “মায়ানমারের গৃহযুদ্ধ, মণিপুরের জাতিগত সংঘাত এবং সীমান্ত রাজনীতির অস্থিরতা মিলে গড়ে উঠেছে এক ‘ড্রাগ-ফুয়েলড ইকোনমি’, যেখানে খিদে, অস্ত্র ও নেশা একই চক্রে ঘুরপাক খায়।” ধারালো ব্লেডের মতো প্রশ্ন তোলেন সোহেল– ‘এর দায় নেবে কে?’ যদিও অনুপ্রবেশ, মাদক ও মানবপাচারের অভিযোগ এবং মণিপুরের হিংসার কারণে ভারত-মায়ানমার সীমান্তে ফ্রি মুভমেন্ট রেজিম ২০২৪ সালে বন্ধ করেছে কেন্দ্র। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে!
সেই দেরি হিসাব দিয়েছে ‘ন্যাশনাল ক্রাইম ব্যুরো’র তথ্য। ‘পরিসংখ্যান বলছে, শুধু ২০১৬ সালেই একটি ছোট শহরের সমান জনসংখ্যা অর্থাৎ ১.১১ লক্ষ মানুষ নিখোঁজ হয়েছে, যার অর্ধেক অর্থাৎ ৫৫,৬২৫ জনের আজও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।’ রাষ্ট্রের এই উদাসীনতা ও বিলম্বে পাহাড় ও উপত্যকার মধ্যে গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য সীমান্ত। কুকিদের কাছে ইম্ফল নিষিদ্ধ, মেইতেইদের কাছে পাহাড়। একটা মণিপুরের মধ্যে যেন ঢুকে পড়েছে অসংখ্য গাজা, তেহরান কিংবা ইউক্রেন! গোটা ভারত যখন উৎসবে মেতে, দীপাবলির আতসবাজিতে আলোকিত, মণিপুর তখন পরিণত হয়েছে অসহায় শরণার্থীদের অন্ধকার রাজ্যে! চলমান হিংসায় সেখানে লক্ষাধিক মানুষ ঘরছাড়া। ‘সংঘাত শুরুর পর থেকে ৫৫৪টি শিশু ক্যাম্পে (শরণার্থী শিবিরে) জন্ম নিয়েছে।’ রাষ্ট্রসংঘ ও ইউনিসেফের রিপোর্ট বলছে, ‘মণিপুরের শিশুরাও যুদ্ধবিধ্বস্ত বিশ্বের সেই তালিকায় ঢুকে পড়েছে, যেখানে শৈশব মানেই আতঙ্ক, শিক্ষা মানেই বিলাসিতা।’ অথচ, এমনটাই কি হওয়ার কথা ছিল?

ঐতিহাসিকরা কিন্তু অন্য কথা বলছেন। মেইতেই ঐতিহ্যবাহী সাহিত্য ‘পুয়া’ অনুযায়ী, ‘কুকি আহংবা’ এবং ‘কুকি আচৌবা’ নামে দুই প্রধানের সঙ্গে ৩৩ খ্রিস্টাব্দে মেইতেইদের প্রথম রাজা নংদা লাইরেন পাখাংবার মিত্রতার সম্পর্ক ছিল। ১৭৫৫ সালে শুরু হওয়া ধারাবাহিক বার্মিজ আক্রমণ থেকে বাঁচতে মেইতেই রাজা খোংসাই এক কুকির বাড়িতেই আশ্রয় নেন। এছাড়াও মেইতেইদের ‘লাইহারাওবার’ লোকসংগীতে উঠে আসে যৌথ খামারের প্রত্যয়ী দর্শন– ‘চিংদা তবা মাহাইগে, তমদা তবা মাহাইগে, ওয়াকন তনোই নয়’ যার বঙ্গানুবাদ করলে দাঁড়ায়– আমাদের বাসস্থান আলাদা হতে পারে, কিন্তু উৎস একই মাটিতে, রক্তের স্মৃতিও এক, আমাদের ইতিহাস পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।’ কাদের ষড়যন্ত্রে এই সম্পর্কের সেতু ভেঙে গেল?
সেই উত্তরের সন্ধানেই রচিত হয়েছে ‘মণিপুর গণতন্ত্রের BLIND SPOT’। এই জরুরি গ্রন্থের শেষাংশে রয়েছে রক্তের দাগে ভরা ছবি ও তথ্যপঞ্জি, মণিপুর নিয়ে বিশিষ্টজনের মন্তব্য। যা অবলোকন করে মণিপুরকে নবারুণ ভট্টাচার্য কথিত ‘মৃত্যু উপত্যকাই’ বোধ হয় পাঠকের। সব শেষে প্রশ্ন ওঠে, সবটাই কি রাষ্ট্রের দায়? না কি দুঃস্বপ্নের মণিপুর নিয়ে সহনাগরিক আমাদের বরফশীতল নীরবতাও সমপরিমাণ কিংবা তারও অধিক নিষ্ঠুরতা ও পাপ! কেন মেনে নেব না, বলব না– এই মৃত্যু উপত্যকাও আমার দেশ।
মণিপুর: গণতন্ত্রের BLIND SPOT
সোহেল ইসলাম
শহরতলি
৮০০্
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved