Robbar

চিনের সঙ্গে শিল্পসেতু

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 19, 2026 7:32 pm
  • Updated:July 21, 2026 8:38 pm  
Susobhan Adhikary on cultural bonding between kalabhavana and china | Robbar

সম্প্রতি বিনোদবিহারীর দীর্ঘ স্ক্রোল ছবির প্রদর্শনীর কথা অনেকেরই মনে আছে। নন্দলাল এই চিত্রপট নির্মাণের বিশেষ পদ্ধতি জেনে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে চিন সফরে এসে কলাভবনের অধ্যক্ষ নন্দলাল যেন মনে মনে তাঁর কাজের একখানা ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করে নিয়েছেন। পাশাপাশি স্বীকার করতে হবে, নন্দলালের ভাবনা আর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ কলাভবনের পক্ষে অত্যন্ত কার্যকরী হয়ে উঠেছিল।

সুশোভন অধিকারী

১২.

রবীন্দ্রনাথ বেশ কিছুদিন ধরে ভাবছিলেন– দেশের বাইরে শিল্পের যে স্রোত বয়ে চলেছে, নন্দলালের মতো সম্ভবনাময় শিল্পীদের তার অভিজ্ঞতা অর্জন করা জরুরি। কলাভবন প্রতিষ্ঠার আগে যখন তিনি জাপান গিয়েছিলেন, সেই সময় গগন-অবনের মধ্যে কেউ তাঁর সফরসঙ্গী হবেন, চেয়েছিলেন এমনটাই। কিন্তু শিল্পী ভাইপোরা কেউ দক্ষিণের বারান্দা ছেড়ে সহজে নড়বেন না। তাঁদের দৌড় বড় জোর পুরী, দার্জিলিং কিংবা পতিসর, কি মেরেকেটে শাজাদপুর পর্যন্ত।

এদিকে বিশ্বখ্যাত খুড়োমশাই তো বিশ্বপথিক। নোবেল পুরস্কারের পর আরও তার বিস্তৃতি। ১৯১৬ সালের জাপানযাত্রা সেই নতুন অধ্যায়ের প্রথম বিদেশ সফর। সময়কাল হিসেবে তা রবীন্দ্রজীবনের পাশাপাশি দেশের প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ।

আদি কলাভবন। শিল্পী: বিশ্বরূপ বসু

ইতিমধ্যে জোড়াসাঁকোতে শিল্প-সাহিত্যের সম্মিলনে ‘বিচিত্রা সভা’র সভার সূচনা হয়েছে। তার নেপথ্যে রয়েছে এক আকর্ষণীয় গল্প। নন্দলাল-সহ অবন ঠাকুরের অন্যান্য শিষ্যরা তখন আর্টস্কুল থেকে বেরিয়ে এসেছেন। এবারে কাজকর্মের খোঁজ, জীবিকার সন্ধান চলছে। এই ব্যাপারে নন্দলালের হাতিবাগানের বাড়ির ছাদে শিল্পীবন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত চলছে পরামর্শ, ভাবনাচিন্তা। বন্ধুদের দলে আছেন ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার, অসিত হালদার, শৈলেন দে প্রমুখ শিল্পী। বিস্তর আলোচনার শেষে ঠিক হয়েছে, কলকাতায় তাঁদের একটা ডেরা বানাতে হবে। সেখানেই একত্রে থাকা, ছবি আঁকা, খাওয়াদাওয়া ইত্যাদি চলবে। ছবি আঁকা, তা বিক্রির ব্যবস্থা ছাড়াও বইয়ের প্রচ্ছদ, ইলাস্ট্রেশন ইত্যাদি সবই হবে সেখান থেকে। এ যেন এক শিল্পের সমবায় তৈরির প্রচেষ্টা, আজকের ভাষায় কো-অপারেটিভ সোসাইটি। অতঃপর শিষ্যদের এহেন পরিকল্পনার কথা জেনে অবনীন্দ্রনাথ বললেন– ‘তোমাদের এর জন্যে আর ঘর করতে হবে না। আমারই ঘরে আসর পাতো তোমরা’। ফলে শুরুতে অবনীন্দ্রনাথের ঘরে নন্দলালদের আসর পাতা হল। পরে সেকথা রবীন্দ্রনাথের কানে যেতে তিনি বললেন, অবন কেন, তিনি নিজেই এ জন্য জায়গা দেবেন। এবারে নন্দলাল-সহ একঝাঁক তরুণ শিল্পী– অসিত হালদার, মুকুল দে, সুরেন কর, কাশীনাথ দেবল সবাই মিলে জোড়াসাঁকোর লালবাড়িতে গড়ে তুললেন শিল্পের এক নতুন আখড়া। রবীন্দ্রনাথ তার নাম দিলেন ‘বিচিত্রা’।

কলাভবনের বীজ তখনও রোপণ করা হয়নি, রবীন্দ্রনাথ চাইছিলেন অন্ততপক্ষে নন্দলাল তাঁর জাপানযাত্রার সফরসঙ্গী হিসেবে সঙ্গে চলুক– ‘বিচিত্রা’কে যথাযথভাবে গড়ে তুলতেও তাঁর যাওয়া দরকার। কিন্তু অবন ঠাকুর তাঁর প্রিয়তম শিষ্যটিকে ছাড়বেন না, ফলে সে যাত্রায় কবির সঙ্গে রইলেন মুকুল দে। 

আদি কলাভবন। শিল্পী: বিশ্বরূপ বসু

বছর আটেক বাদে ১৯২৪ সালে নন্দলালকে সহযাত্রী হিসেবে পেলেন রবীন্দ্রনাথ। সেবারে তাঁর চিনদেশ থেকে নিমন্ত্রণ। জানতে পেরে যুগলকিশোর বিড়লা এই যাত্রার ব্যয়ভার বহন করতে প্রস্তুত। চিনের পক্ষ রবীন্দ্রনাথকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, কবির দায়িত্ব তাঁদের। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেশের কয়েকজন কৃতী মানুষকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার অর্থ দিলেন যুগলকিশোর বিড়লা। বিশ্বভারতীর পক্ষে সেই দলে আছেন ক্ষিতিমোহন সেন আর নন্দলাল বসু। নন্দলাল তখন কলাভবনের অধ্যক্ষ, পাকাপাকিভাবে শান্তিনিকেতনের বাসিন্দা। অন্যদিকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রইলেন কালিদাস নাগ, আর কবির সচিব হিসেবে চললেন এলমহার্স্ট। আর ছিলেন সেই সময়ে শ্রীনিকেতনের মহিলা-কর্মী মিস গ্রিন। দীর্ঘ চারমাসের সফর, অনেক টাকাপয়সার প্রয়োজন। অবনীন্দ্রনাথের প্রিয় শিষ্য নন্দলাল এই প্রথম দেশের বাইরে চলেছে তাঁর ‘রবিকা’-র সঙ্গে। চিন্তিত অবন ঠাকুর নন্দলালকে নিয়ে গেলেন স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কাছে। যদি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনও ফান্ড বা স্কলারশিপ জোগাড় করা যায়– এই আশায়। এর আগে নন্দলালের সঙ্গে স্যর আশুতোষের প্রত্যক্ষ পরিচয় ছিল না। অবনীন্দ্রনাথ আলাপ করিয়ে বললেন, ‘ইনি স্বনামধন্য শিল্পী’। তারপর কথাপ্রসঙ্গে স্কলারশিপের বিষয় উঠতে আশুতোষ বললেন, আগে জানালে হত, হরেক নিয়মকানুন পেরিয়ে এই অল্প সময়ে তা এখন সম্ভব হবে না। তিনি বরং অবনীন্দ্রনাথের কোর্টেই বল ছুঁড়ে দিয়ে বললেন– ‘তোমরা আছ, তোমরা দাও না’। ব্যাপারটা অবনীন্দ্রনাথের ভালো লাগল না। শিষ্যের কানে কানে গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘চল হে, সুবিধে হবে না’। এরপর নিজেই নন্দলালকে দিলেন কয়েকটা জরুরি জিনিস। একটা হাতঘড়ি, কোডাক ক্যামেরা আর দেড় হাজার টাকা।

চিনের বন্ধু ও সহ-ভ্রামণিকদের সঙ্গে: শ্যু চিমো, এলমহার্স্ট, মিস গ্রিন, নন্দলাল (উপরে বাঁদিক থেকে), কালিদাস নাগ, ক্ষিতিমোহন সেন (মাঝে), মিস লিং ও রবীন্দ্রনাথ

নন্দলাল জানিয়েছেন, চিন সফরের জন্যে রবীন্দ্রনাথও তাঁকে কিছু টাকা দিয়েছিলেন। সদ্যপ্রতিষ্ঠিত কলাভবন অধ্যক্ষের যাতে কোনও অসুবিধে না হয়, চিনদেশ থেকে কিছু শিল্পসামগ্রী সংগ্রহ করতে পারেন– হয়তো এমনটা ভেবেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আর নন্দলাল সে টাকার বেশিরভাগ খরচ করলেন, চাইনিজ রাবিং কিনে। রিপাবলিক চিন থেকে কোনও জিনিস দেশের বাইরে যাওয়ার নিয়ম নেই। বিশেষ করে শিল্প-সংক্রান্ত জিনিস হলে তো কথাই নেই। কিন্তু কলাভবনের জন্যে নন্দলাল কিছু সংগ্রহ করেছেন– দেশে তা আনতেই হবে। কিন্তু কী করা যায়? হঠাৎ তাঁর মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। চিনে রাবিংগুলো বালিশের খোলের মধ্যে পুরে নন্দলাল তা দিয়ে বালিশ বানিয়ে নিলেন। আর এইভাবেই সেগুলো কলাভবনে এসে পৌঁছল।

মিস লিং, রবীন্দ্রনাথ ও শ্যু চিমো

রাবিং ছাড়াও চিনের শিল্পকাজ দু’চোখ ভরে দেখার পাশাপাশি নন্দলাল কী সংগ্রহ করছিলেন সে খবর তাঁর চিঠিতে ধরা আছে। চিন থেকে রথী ঠাকুরকে সেই চিঠিতে লিখেছেন– ‘জিনিসপত্র Art-এর জিনিসপত্র বিশেষ করে বাহিরে যাওয়া বন্ধ হয়েছে– এরা নিজের museum স্থানে ২ করছে। এমন-কি Touristদের নিকট হতেও জানতে পারলে, জিনিস উদ্ধার করে সংগ্রহ করছে’। নন্দলাল আরও লিখেছেন, চিনের এমন নতুন ভাবনার পিছনে আমেরিকার ছাঁচ কাজ করছে। ফলে কঠোর বিধিনিষেধের আড়ালে ‘বাছবিচার’ না করেই পুরনোকে তারা সরিয়ে দিতে চাইছে, এমনকী ‘বাড়ির চেহারা পর্যন্ত বদলে যাচ্ছে’। যদিও এর মধ্যেও আছে কিছু পুরনোপন্থী মানুষজন। বিশেষ করে শিল্পীরা একত্রিত হয়ে কলকাতার সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্টের মতো একটা শিল্পসংস্থা তৈরি করে কাজ করছে। নন্দলাল তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টায় আছেন। চিনে রাবিং-এর পাশাপাশি কলাভবনের জন্যে তিনি অন্য জিনিসও নিতে চাইছেন। লিখেছেন– ‘বহি ইত্যাদি সংগ্রহ করছি। এবং চিত্রকরদের কথাও সংগ্রহ করছি’। রথী ঠাকুরকে তিনি জানিয়েছেন যে– ‘আমার দ্বারা যা সম্ভব চেষ্টা করছি তবে বড় দৌড় হচ্ছে– দৌড়-তে আমি বিশেষ বিশেষ দক্ষ নই আপনি তাও জানেন’। সেই সঙ্গে নন্দলালের ইচ্ছে, চিন থেকে কিছু শিল্পী তথা কারিগর কলাভবনে নিয়ে আসার। যাঁদের কাছ থেকে কলাভবনের শিল্পী এবং ছাত্রেরা হাতেকলমে কিছু জরুরি কাজ শিখে নিতে পারবে। তবে সে বেশ শক্ত ব্যাপার। স্পষ্টই লিখেছেন– ‘এখান হতে কোনো craftsman যাওয়া অসম্ভব। এরা আমাদের মতই ঘরকুনো বিশেষ করে চাষীরা ও গরীবরা, এমন-কি বাপ-মা, আত্মীয়স্বজন মরিলে ঘরের পাশে বাগানেই গোর দেয়। তবে বড় Artistদের মধ্যে কেহ কখনো যেতে পারে আশা করা যায়। চোখ কান বুঁজে ইহাদের সকলকেই আমাদের কুঁড়েতে নিমন্ত্রণ ত করে চলেছি। তুলি তৈয়ার করা ও কাকিমন তৈয়ার করা এখানেও বেশ আছে তবে এখনো সুযোগ পাই নাই দেখবার’।

চিন দেশের বড় আর্টিস্ট আসবার যে আশা করেছিলেন, পরবর্তীকালে তা সফল হয়েছে। তিনের দশকের শেষে শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন প্রখ্যাত চিনে শিল্পী জু পেঁও। উপরের চিঠিতে ‘কাকিমন’ বলতে নন্দলাল চিনে-জাপানি স্ক্রোল পেন্টিং-এর কথা বোঝাতে চেয়েছেন। একদা স্ক্রোলপেন্টিং আঁকা কলাভবনে একটা জরুরি অঙ্গ হয়ে উঠেছিল। সম্প্রতি বিনোদবিহারীর দীর্ঘ স্ক্রোল ছবির প্রদর্শনীর কথা অনেকেরই মনে আছে। নন্দলাল এই চিত্রপট নির্মাণের বিশেষ পদ্ধতি জেনে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁর চিঠি থেকে এখানে পরিষ্কার, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে চিন সফরে এসে কলাভবনের অধ্যক্ষ নন্দলাল যেন মনে মনে তাঁর কাজের একখানা ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করে নিয়েছেন। পাশাপাশি স্বীকার করতে হবে, নন্দলালের ভাবনা আর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ কলাভবনের পক্ষে অত্যন্ত কার্যকরী হয়ে উঠেছিল।

শ্যু পেইহোং-এর আঁকা রবীন্দ্র-প্রতিকৃতি

নন্দলাল তাঁর গুরুর দেওয়া কোডাক ক্যামেরাতে অনেক ছবি তুলেছেন। সে দেশে অভ্যর্থনা অভিনন্দন গ্রহণের সঙ্গে চিনের শিল্পকলাও নন্দলাল দু’চোখ ভরে দেখে নিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথকে উপহার দেওয়া চিনের বিখ্যাত আর্টিস্টদের ছবি একাধিক সঙ্গে করে এনেছেন– যা কলাভবনের মিউজিয়মে রাখা আছে। পিকিং-এর (আজকের বেইজিং) প্রখ্যাত শিল্পী লিং আর তাঁর কন্যা মিস লিং একবার কেবল নন্দলালকে চায়ের নিমন্ত্রণ করেছেন। মিস লিং নিজেও চিত্রশিল্পী। সেদিনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে নন্দলাল লিখেছেন– ‘চা-এ অভ্যর্থনা করার পরে আমাকে তিনি (মিস লীং) অনেকরকম রং দেখালেন। রং-এর কেক স্টোন-কালারের। দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে গেলুম আমি। বললুম, কিনতে পাবো না? উত্তরে হাসলেন তিনি’। আসলে মিস্টার লিং ছিলেন রাজসভার শিল্পী, চিনের সম্রাট এইসব রং বিশেষভাবে তৈরি করিয়েছেন মিস্টার লিং-এর জন্য। অবশ্য সেখান থেকে নন্দলালকে উপহার দিলেন সঙ্গে দামি চিনে কাগজ আর রং। সেই কাগজে বীরভূমের তালগাছ আর কোপাই নদী এঁকে নন্দলাল উপহার দিলে মিস লিং তো বেজায় খুশি। কেবল তাই নয়, তিনি নন্দলালকে রঙের বাজারে নিয়ে গিয়ে সে দেশের সেরা চিনে রং আর উৎকৃষ্ট কাগজ উপহার দিয়েছেন।

এইভাবে কলাভবনের সঙ্গে চিন দেশের শিল্পসেতু গড়ে উঠল– যার ভিত আজকেও পাকা হয়ে আছে।

………………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন গল্পকলা-র অন্যান্য পর্ব

………………………