Evolution of gambling and betting from past to modern era by Samir Mondal | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তাস পাশা সর্বনাশা

জুয়া খেলার এত বিজ্ঞানভিত্তিক ভাবনাচিন্তা, মাথা গুলিয়ে দেওয়া এমন সব ভাবনার বহু আগে থেকেই কিন্তু মানুষ পাশা খেলত। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, স্টুয়ার্ট কুলিনের ১৯০৭ সালের গ্রন্থ, ‘গেমস অফ দ্য নর্থ আমেরিকান ইন্ডিয়ানস’ বইটিতে নেটিভ আমেরিকানদের ব্যবহৃত পাশা, ভাগ্যনির্ভর খেলা আর জুয়ার প্রাগৈতিহাসিক ইতিহাস অনুসন্ধান করা হয়েছে একটা গবেষণায়। তার ফলাফলে দেখা গেছে, গত ১২০০০ বছর ধরে পাশা খেলা ও জুয়া নেটিভ আমেরিকান সংস্কৃতির অংশ ছিল। ওয়াইওমিং, কলোরাডো ও নিউ মেক্সিকোর ফলসম সংস্কৃতিতে পাওয়া প্রাচীন পাশার নিদর্শনগুলো ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার সমজাতীয় প্রাচীনতম নিদর্শনের চেয়েও বহু হাজার বছর পুরোনো।

শেষ আপডেট: জুন ২৯, ২০২৬, ২০:২৬   
Facebook WhatsApp Messenger
Evolution of gambling and betting from past to modern era by Samir Mondal | Robbar

৩৪.

মহাভারতের দ্রৌপদীর প্রশ্নটি আজও ভারতীয় সমাজের সামনে ঝুলে আছে। ‘যিনি নিজেকেই হারিয়েছেন, তিনি আমাকে কীভাবে বাজি রাখেন?’ হাজার হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও এই প্রশ্নের উত্তর আজও অসম্পূর্ণ রয়ে গিয়েছে।

মহাভারতের অন্যতম মর্মান্তিক পর্ব হল যুধিষ্ঠিরের পাশাখেলা। ধর্মরাজ যিনি, সেই যুধিষ্ঠির– একের পর এক নিজের ধনসম্পদ, রাজ্য, ভাইদের, এমনকী শেষ পর্যন্ত দ্রৌপদীকেও বাজি রেখেছিলেন। এই ঘটনা শুধু একটি পৌরাণিক কাহিনি নয়, এটি মানুষের দুর্বলতা, আসক্তি এবং দায়িত্বহীনতার এক চিরন্তন প্রতীক। যুধিষ্ঠিরও তাই করেছিলেন। পাশার ছকে তিনি শুধু দ্রৌপদীকে নয়, সমগ্র পাণ্ডব পরিবারের মর্যাদা ও নিরাপত্তাকে বাজি রেখেছিলেন।

zoom
মহাভারত সিরিজ, গণেশ পাইন

আন্তর্জালে এখনও শিউরে ওঠার মতো সংবাদ মেলে। এই একুশ শতকের ভারতেও। যুগ পালটেছে, মানসিকতা একই রয়ে গিয়েছে। পালটায়নি আদিম প্রবৃত্তি। উত্তরপ্রদেশের লখনউয়ের ঘটনা মনে করিয়ে দিতে পারে মহাভারতের কাহিনি।

‘দ্য ওয়াল’-এর শিরোনাম: স্ত্রীকে বাজি রেখে জুয়া খেলল স্বামী, বন্ধুদের সামনেই চলল শ্লীলতাহানি, ঠিক যেন মহাভারত।

‘এইসময়’: পাশাখেলার পুনরাবৃত্তি! স্ত্রীকে বাজি রেখে হারল স্বামী, পরে ৮ জন মিলে ভয়ংকর অত্যাচার। ঘটনা উত্তরপ্রদেশের। ধর্ষণের অভিযোগ শ্বশুর, ভাসুর, ননদের স্বামীর বিরুদ্ধেও। 

‘এবিপি আনন্দ’: আইপিএল জুয়ায় স্ত্রীকে বাজি। ম্যাচ শেষে বউ হারালেন কানপুর জেলার গোবিন্দনগরের এক ব্যক্তি। 

‘আনন্দবাজার পত্রিকা’: স্থান, কাল, পাত্র আলাদা হলেও কলিযুগেও সেই ঘটনারই পুনরাবৃত্তি। বন্ধুদের সঙ্গে জুয়া খেলায় স্ত্রীকে বাজি ধরেছিলেন এক ব্যক্তি। অভিযোগ, জুয়ায় হেরে যাওয়ায় ওই মহিলাকে ধর্ষণ করে দুই যুবক। 

‘বিবিসি’: ভারতের ওড়িশা রাজ্যের এক বাসিন্দা বন্ধুর সঙ্গে জুয়া খেলতে নেমেছিলেন স্ত্রীকে বাজি রেখে। সেই জুয়া খেলতে গিয়ে হেরে যান তিনি। আর খেলার শর্ত হিসাবে স্ত্রীকে তুলে দেন জয়ী ব্যক্তির হাতে। 

সংবাদমাধ্যমে এমন অনেক খবর। দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ আসলে একজন নারীর অপমানের চেয়েও বড় কিছু। এ সেই মুহূর্ত, যখন একজন মানুষ অন্য একজন মানুষের উপর নিজের মালিকানা দাবি করে। আধুনিক সমাজে সেই মানসিকতা নানা রূপে বেঁচে আছে আজও। যখন স্বামীর ঋণের বোঝা স্ত্রীর জীবনে নেমে আসে, যখন পরিবারের মতামত ছাড়াই সংসারের সমস্ত সঞ্চয় ঝুঁকিতে ফেলা হয়, যখন অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ভার নারীদের কাঁধে এসে পড়ে, তখনই দ্রৌপদীর প্রশ্ন বার বার শোনা যায়– আমাকে কে বাজি রাখল?

সংসারের সঞ্চয় হারালে প্রথম আঘাত আসে পরিবারে। সন্তানের পড়াশোনা থেমে যায়, বৃদ্ধ পিতামাতার চিকিৎসা অনিশ্চিত হয়, স্ত্রীর গয়না বন্ধক পড়ে, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ভেঙে যায়। যে সিদ্ধান্ত একজন নিয়েছেন, তার মূল্য দেন অনেকে।

দ্বাপর যুগের অবসানের পর কলিযুগে এসেছি আমরা। যুগ চলে গিয়েছে, কিন্তু তার রেশ  টেনে তাস-পাশা-জুয়া রয়ে গিয়েছে কলিতে।

সংসারের ভার কার ওপরে সে বোঝার বয়স তখন আমার হয়নি। ছোটবেলায় মায়ের চোখে ধুলো দিয়ে খুব কম বয়সেই আমরা যে জুয়া খেলতে শুরু করেছিলাম, সেটা বুঝতে পারিনি প্রথমে। কাচের গুলি, মারবেল, লাট্টু ইত্যাদি নিয়ে খেলতাম। খেলতে খেলতে গুলি জেতা যখন শুরু হল, তখন সত্যিকারের একটা নেশার আমেজ পেলাম। ভালো খেলতে পারলে পুরো পকেট ভরে যেত। জেতার আনন্দ তো বটেই, গুলিরও যে একটা মূল্য আছে সেটাও বুঝতে পারলাম কিছুদিনের মধ্যে। কিছু কিছু ছেলেরা পকেটে করে পয়সাও আনত। তারা নিঃস্ব হয়ে গেলে, সব গুলি ফুরিয়ে গেলে অন্যদের কাছ থেকে গুলি কিনত। তার বিনিময়ে কিছু পয়সা একজনের পকেট থেকে আরেকজনের পকেটে চালান হয়ে যেতে দেখলাম। শুরুতে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।

আমাদের তরুণ বয়সে ‘নতুন দা’-র মতো কলকাতা থেকে গ্রামে এক বন্ধুর বন্ধু এসেছিল। অপেক্ষাকৃত ধনী বাড়ির শিক্ষিত ছেলে, কিন্তু সে ছেলে যে-সে ছেলে নয়। সে পাড়ায় আমাদের দু’-চারজনকে বিড়ি-সিগারেট খাওয়া আর তাস খেলা শিখিয়েছিল। টোয়েন্টি নাইন। সে খেলা একেবারে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল পাড়ায়। যত তরুণ কিশোর যুবক, তারা তার আগে আমাদের পাড়ায় তাস খেলত না। তাস খেলাটা ছিল অবসর নেওয়া বড়দের রাতের বেলার খেলা। তারা খেলত ‘ব্রিজ’। শুনেছি সেটা না কি মগজের খেলা। পাড়ায় তো তাস খেলা ছড়িয়ে পড়ল এবং কিছুদিন পরে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করল। এরপরেই অন্য কেউ আবার এর মধ্যে দিয়ে তিন পাত্তি খেলা শিখিয়েছে। এছাড়া আরও কিছু কিছু খেলা হয় যেখানে পয়সা লেনদেনের ব্যাপার থাকে। এইটা একটা ভয়াবহ ব্যাপার শুরু হয়ে গেল পাড়ায়।

zoom
দ্য পোকার গেম, উনিশ শতকের ছবি

গ্রামীণ মেলায় ভাগ্য পরীক্ষার নামে অনেকগুলো খেলার আয়োজন ছিল আমাদের ছেলেবেলায়। যেগুলো আসলে জুয়াই। তবে সেসব খেলা ওই মেলার ক’দিন, তারপরে আর আলাদা করে তাদের দেখা যেত না। তাই ওটা খুব একটা ভয়াবহ মনে হয়নি। 

আমরাও দুর্গাপুজোর সময় সাময়িকভাবে ওই সপ্তাহখানেকের জন্য ব্যবসা করার বাণিজ্য করার আনন্দ উপভোগ করতাম। কেউ বেলুন বিক্রি তো কারও ঘুগনি-আলুরদম কিংবা বেগুনি, আলুর চপ আর পাপড়ভাজার  দোকান। এছাড়া শুরু হল লটারির দোকান। পাঁচ পয়সার টিকিটে সেফটিপিন, চুলের কাঁটা, বাঁশি, বেলুন, লজেন্স, বিস্কুট ইত্যাদি হয়ে একেবারে বড় রঙিন প্লাস্টিকের বালতি, এমনকী টেবিল ঘড়ি ও রেডিও পর্যন্ত পাওয়া যেতে পারে। 

পরে একটু বেশি বয়সে যাদের লেখাপড়া হল না তারা ছোটখাটো রোজগারের কাজে লেগে পড়ল। তাদের মধ্যে কাউকে কাউকে দেখেছি সত্যিকারের বড় লটারির টিকিট বিক্রি করতে। মাঝেমাঝেই বেশ কয়েক হাজার টাকা কিংবা লক্ষ টাকা পর্যন্ত লটারিতে পাওয়ার খবর পাওয়া গেল। লটারিতে ভাগ্য ফেরানোর সে এক দৈবযোগ বলে মনে করত সবাই। ভাগ্য প্রসন্ন হলে লাখপতি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। তবে টিকিটের দাম কিন্তু খুব একটা কম নয়। ফলে অনেক গরিব মানুষও নেশাগ্রস্ত হয়ে অনেক টাকা নষ্ট করে ফেলত।

কর্মজীবনে যখন রোজগার করছি, তখন বন্ধুদের সঙ্গে গোয়াতে গিয়ে আধুনিক জুয়া খেলতে প্রথম ক্যাসিনোতে ঢুকেছিলাম এবং সমস্ত পয়সাই হেরে গিয়ে সেদিন খালি হাতে বেরিয়ে এসেছিলাম। শিল্পী-বন্ধুদের সঙ্গে বেশ কয়েকটি বিদেশ ভ্রমণও জুটেছে কপালে। কিছু বন্ধু আছে, যে দেশেই যাক, তারা আর কিছু না হোক ক্যাসিনোতে যাবেই। তবে হ্যাঁ, এই ক্যাসিনোগুলো একেকটা বিশাল উত্তেজনার জায়গা। সেটার কাণ্ডকারখানা দেখতে বেশ লাগে। প্রথম বড় সাইজের ক্যাসিনো দেখেছিলাম অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরে। বিশাল বড় মাপের একটি অত্যাধুনিক শপিং মলের মতো চেহারা। তার সমস্ত ফ্লোরে ফ্লোরে এবং সমস্ত ছোট-বড় রুমে ক্যাসিনোর নানান রকম খেলার আয়োজন। আর তারই ফাঁকে ফাঁকে আছে কিছু কিছু নাচগানের ব্যবস্থা, ভালো ভালো খাবারের দোকান। অল্পবয়সী এবং নারীপুরুষ নির্বিশেষে অবাধ জনসমাগম। খেলার বেশিরভাগ সময়টাই রাতে আর খেলতে খেলতেই রাত কাবার। 

বেশ কিছুদিন একটি নামী ফ্যাশন ম্যাগাজিনের সঙ্গে কাজ করার সুবাদে নুসলি ওয়াড়িয়ার বিখ্যাত পারিবারিক ঘোড়দৌড়, ‘ওয়াড়িয়া কাপ’-এর কাজে যুক্ত হয়েছি। ম্যাগাজিনের বিশেষ সংখ্যায় সেবার রেসের মাঠে ফ্যাশন প্যারেড, মুম্বইয়ের রেসকোর্সে। লিজা রে, ঐশ্বরিয়া রাই-এর মতো সুন্দরী মডেলদের ঘোড়ার সঙ্গে হাঁটা ইত্যাদি; এবং ফটোগ্রাফিক কাজের আয়োজন করতে খুব কাছ থেকে অনেক খুঁটিনাটি জিনিস দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। শুধু গ্যালারিতে বসে ঘোড়ার দৌড় নয়, এখানে খুব ছোট ছোট সাইজের ভীষণ কম ওজনের ঘোড়ার চালক মানে জকিদের সঙ্গে কথাবার্তা, ঘোড়ার গায়ে হাত দিয়ে সমস্ত নেপথ্য কাহিনি কারবারের খুঁটিনাটি দেখার সে এক আলাদা অভিজ্ঞতা। রেসের বাজির বিশাল মাপের আয়োজন, বড় মাপের উত্তেজনায় সামিল হলাম। 

zoom
সি এন ওয়াড়িয়া গোল্ড কাপ

বাজি ধরা, জুয়া খেলা এবং আধুনিক ঝুঁকিপূর্ণ লোভের এখন নানারকম রূপ। ধনীদের নানান মেজাজ মর্জি। এখন হয়তো রাজসভায় পাশা নেই। পাশার ঘুঁটি বদলেছে, খেলার মঞ্চ বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে। মানুষের লোভ ও জুয়ার মনোবৃত্তি একই রয়ে গেছে। এখন আছে শেয়ার বাজার, অনলাইন বেটিং, লটারি, ক্যাসিনো, সাট্টা, ক্রিপ্টোকারেন্সির উন্মাদনা এবং রাতারাতি ধনী হওয়ার অসংখ্য স্বপ্ন। আপাতদৃষ্টিতে এগুলোর সবই জুয়া হয়তো নয়, কিন্তু যখন বুদ্ধি-বিবেচনার জায়গায় লোভ প্রধান হয়ে ওঠে তখন বিনিয়োগ জুয়ায় পরিণত হয়। প্রযুক্তি জুয়ার চরিত্রকে আরও সূক্ষ্ম করেছে। এখন মোবাইল ফোনই হতে পারে পাশার ছক। কয়েকটা স্পর্শেই লক্ষ লক্ষ টাকা হাতবদল হয়। খেলোয়াড় ভাবেন তিনি নিজের ভাগ্য নিয়ে খেলছেন। শকুনির পাশা আজ অ্যালগরিদমে পরিণত হয়েছে।

এখন প্রশ্ন জুয়া কি তবে শুধুই ভাগ্য পরীক্ষা? একেবারেই অনিশ্চিত, অনির্দেশ্য! বিজ্ঞান কী বলছে? এ সম্বন্ধে আগে থেকে কি কিছুই বলা যাবে না? বিজ্ঞান বলছে বলা যাবে। এমন কি এ-ও বলছে যে একেবারে সঠিকভাবেই বলা যায়। তবে তার জন্য এক্ষুনি আমরা কঠিনতম পদ্ধতি অর্থাৎ কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে যাব না। বিজ্ঞানীরা বলছেন যে, জুয়া খেলা মূলত দু’টি জিনিসের উপর ভিত্তি করে হয়, ‘যদৃচ্ছতা’ (Randomness) এবং ‘সম্ভাবনা’ (probability)।

যদৃচ্ছতা বা র‍্যান্ডমনেস হল কোনও ঘটনা বা তথ্যের অনুক্রমে কোনও বিন্যাস, শৃঙ্খলা বা পূর্বাভাসের অভাব। মানে কোনও প্রক্রিয়ার ফলাফল আগে থেকে বলা যায় না। আপনি অতীতের ঘটনার উপর ভিত্তি করে একটি নির্দিষ্ট ফলাফল নির্ধারণ করতে পারবেন না। যদি আপনি একটি নিরপেক্ষ মুদ্রা ন’বার টস করেন এবং প্রতিবারই হেড পড়ে, তবুও দশম বারে হেড বা টেল পড়ার একটি স্বাধীন, অপ্রত্যাশিত সম্ভাবনা থেকে যায়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাস্তবে বিষয়টি পুরোপুরি সত্যি নয়, ফলাফল আগে থেকেই অনুমান করা সম্ভব।

ধরুন, আমরা একটি মুদ্রা টস করলাম, এতে ‘হেড’ পড়ার সম্ভাবনা ফিফটি-ফিফটি। মুদ্রাটি হাত থেকে ছিটকে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে সেটি কোনদিকে মুখ করে ছিল– তা যদি আমরা জানতাম, তবে হয়তো আমরা কিছুটা নিখুঁত পূর্বাভাস দিতে পারতাম। আর যদি আমরা মুদ্রাটির ওজন ও আকার এবং হাত থেকে ছাড়ার সময় তার কোণ, অবস্থান ও গতিবেগ সম্পর্কেও জানতাম এবং পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো– মাধ্যাকর্ষণ, ঘর্ষণ ও বাতাসের বাধা কাজে লাগিয়ে মুদ্রাটির গতিপথের একটি মডেল তৈরি করতাম, তবে ফলাফলটি আগে থেকেই বলে দেওয়া সম্ভব হত। 

এখন রইল সম্ভাব্যতা তত্ত্ব। সেটা হল অনিশ্চয়তাকে সংখ্যার সাহায্যে বোঝার একটি পদ্ধতি। কোনও ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কতখানি, বা ভবিষ্যতে কী ঘটতে পারে– তার আন্দাজ করতে এটি ব্যবহৃত হয়। পরিসংখ্যান, গণিত, বিজ্ঞান, অর্থসংস্থান, জুয়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, কম্পিউটার বিজ্ঞান, গেম থিওরি ও দর্শনের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। জটিল ঘটনা ও ব্যবস্থার মধ্যে লুকিয়ে থাকা নিয়ম ও প্রবণতাও এর সাহায্যে বোঝা সম্ভব।

জুয়া খেলার এত বিজ্ঞানভিত্তিক ভাবনাচিন্তা, মাথা গুলিয়ে দেওয়া এমন সব ভাবনার বহু আগে থেকেই কিন্তু মানুষ পাশা খেলত। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, স্টুয়ার্ট কুলিনের ১৯০৭ সালের গ্রন্থ, ‘গেমস অফ দ্য নর্থ আমেরিকান ইন্ডিয়ানস’ বইটিতে নেটিভ আমেরিকানদের ব্যবহৃত পাশা, ভাগ্যনির্ভর খেলা আর জুয়ার প্রাগৈতিহাসিক ইতিহাস অনুসন্ধান করা হয়েছে একটা গবেষণায়। তার ফলাফলে দেখা গেছে, গত ১২০০০ বছর ধরে পাশা খেলা ও জুয়া নেটিভ আমেরিকান সংস্কৃতির অংশ ছিল। ওয়াইওমিং, কলোরাডো ও নিউ মেক্সিকোর ফলসম সংস্কৃতিতে পাওয়া প্রাচীন পাশার নিদর্শনগুলো ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার সমজাতীয় প্রাচীনতম নিদর্শনের চেয়েও বহু হাজার বছর পুরোনো। গবেষকদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে প্রাচীন নেটিভ আমেরিকানদের মধ্যে দৈবচয়ন, ভাগ্য ও সম্ভাব্যতা সম্পর্কে কার্যকর ধারণা ছিল।

zoom
প্রাচীন ভারতীয় পাশার বোর্ড

গবেষণাটি আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য তুলে ধরে। জুয়া-সংক্রান্ত ১৩১টি নৃতাত্ত্বিক বিবরণের বিশ্লেষণে দেখা যায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কেবল নারীরাই খেলায় অংশ নিয়েছিল। পুরুষদের অংশগ্রহণ ছিল নামমাত্র। গবেষকদের ধারণা, এই প্রবণতা সেই তুষার যুগ থেকেই। তাহলে তো বলা যেতে পারে যে পাশা ও জুয়ার সঙ্গে যুক্ত সামাজিক খেলার ক্ষেত্রে নারীরাই সম্ভবত অগ্রণী জুয়াড়ির ভূমিকা পালন করেছিল।

প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে একেবারেই আজকের টাটকা সময়ের জুয়ার পরিসংখ্যান এবং উত্তেজনার খবরে চলে আসি। এবারের বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই যেন আরেকটি অদৃশ্য বিশ্ব কাঁপানোর বাঁশি বেজে উঠেছে। মাঠে খেলোয়াড়েরা গোলের জন্য লড়বেন, আর মাঠের বাইরে কোটি কোটি মানুষ ব্যস্ত থাকবেন আরেক খেলায়। বাজির খেলা।

আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা ম্যাককোয়ারির হিসাব বলছে, এবারের ফিফা পুরুষদের বিশ্বকাপে সারা পৃথিবীতে বাজির পরিমাণ ৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ, টুর্নামেন্ট চলাকালীন প্রতিটি ম্যাচকে ঘিরে গড়ে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বাজি ধরা হবে। সংখ্যাটা এতটাই বিশাল যে, ২০২২ সালে কাতারে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের সময় মোট ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বাজির রেকর্ডকেও অনেকটা পিছনে ফেলে দেবে।

zoom
সূত্র: ইন্টারনেট

এই বিপুল বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। আগে বিশ্বকাপে অংশ নিত ৩২টি দল, এবার সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪৮। ফলে ম্যাচের সংখ্যাও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। কাতারের বিশ্বকাপে যেখানে ৬৪টি ম্যাচ হয়েছিল, এবার ছয় সপ্তাহের সূচিতে ম্যাচের সংখ্যা একশোরও বেশি। বেশি ম্যাচ মানেই বেশি উত্তেজনা, আর সেই উত্তেজনার সঙ্গেই বাড়ছে বাজির অঙ্ক।

তাই এবারের বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের বিশ্বসেরা দল নির্ধারণের লড়াই নয়; তা অর্থ, প্রযুক্তি, বিনোদন এবং মানুষের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতারও এক বিশাল বৈশ্বিক মঞ্চ। মাঠে গোলের হিসেব যেমন চলবে, তেমনই অদৃশ্য এক খাতায় চলবে কোটি কোটি ডলারের বাজির অঙ্ক কষা।

…পড়ুন অল্পবিজ্ঞান-এর অন্যান্য পর্ব…

পর্ব ৩৩: ফ্লাশ-ব্যাক

পর্ব ৩২: চেনাসোনা, জানাসোনা

পর্ব ৩১: ঠান্ডা আনন্দের ইতিহাস

পর্ব ৩০: সংস্কৃতির গুরুচণ্ডালী

পর্ব ২৯: চুরি হোক শিল্পসম্মত

পর্ব ২৮: মশা নিয়ে মশকরা

পর্ব ২৭: কাণ্ডজ্ঞানগম্যি

পর্ব ২৬: আয় ঘুম যায় ঘুম

পর্ব ২৫: ধুলোবালির পর বালিধুলো

পর্ব ২৪: তালাচাবির বন্ধুত্ব

পর্ব ২৩: বেঁধে থাকা বেঁধে রাখা

পর্ব ২২: এই দুনিয়া ঘোরে বনবন বনবন

পর্ব ২১: শরীরের ক্যানভাসে আঁকা শিল্প

পর্ব ২০: বিজ্ঞান পরিবেশনা ও মিউজিয়ামের অজানা গল্প

পর্ব ১৯: মরণের পরেও, এই পৃথিবীর জন্য আপনি রইলেন

পর্ব ১৮: মন রে কৃষিকাজ জানো না

পর্ব ১৭: গুপ্তধন কিম্বা লুপ্তধন

পর্ব ১৬: ছবির শরীর, শরীরের ছবি

পর্ব ১৫: মাপ করুন, সৃষ্টিশীলভাবে!

পর্ব ১৪: মাপের ভুলভাল, পাগলের মাপজোখ

পর্ব ১৩: শব্দ কল্প দ্রুম

পর্ব ১২: হ্যালো, তুমি শুনতে পাচ্ছ কি?

পর্ব ১১: ‘শব্দ’ শুধুই আওয়াজ নয়

পর্ব ১০: শিল্পকলায় বিষ্ঠা মানে ব‍্যঙ্গ, বিদ্রুপ অথবা প্রতিবাদ

পর্ব ৯: বাস্তব আর ভার্চুয়ালের সীমান্তে দাঁড়িয়ে হাইব্রিড আর্ট প্রশ্ন করতে শেখায়– শিল্প কী?

পর্ব ৮: মগজে না ঢুকলে শিল্পও আবর্জনা

পর্ব ৭: ছবির অসুখ-বিসুখ, ছবির ডাক্তার

পর্ব ৬: বিসর্জনের মতোই একটু একটু করে ফিকে হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর রং ও রূপ

পর্ব ৫: জীবন আসলে ক্যালাইডোস্কোপ, সামান্য ঘোরালেই বদলে যায় একঘেয়ে নকশা

পর্ব ৪: কুকুরেরই জাত ভাই, অথচ শিয়াল সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি?

পর্ব ৩: অন্ধকারে অল্প আলোর মায়া, ফুরয় না কোনওদিন!

পর্ব ২: বজ্রবিদ্যুৎ ভর্তি আকাশে ঘুড়ি উড়িয়ে আমাদের চিরকালের নায়ক হয়ে আছেন বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন

পর্ব ১: বস্তু নাকি ভাবনা, শিল্পকলায় কী খোঁজেন?

casino dice game draupadi Mahabharata probability Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on