


হেডস্যর উদাত্ত কণ্ঠে গাইছেন– ধনধান্য পুষ্প ভরা। ওই যে ‘কোথায় এমন ধূম্র পাহাড়’। সেই ‘কোথায়’ বলাটা একদম দিলীপকুমার রায়ের মতো। কোনও তালবাদ্য নেই, শুধু একটা হারমোনিয়াম নিয়ে উনি গাইছেন। ‘এমন দেশ টি কো-থাও খুঁজে…’– ‘কোথাও’ এর ‘কো’-টা এক জায়গায় থাকছে, ‘থাও’টা চলে যাচ্ছে অনেক দূরে। থাও-এর সুরটা একটা ঢেউয়ের মতো উঠে নেমে যেন ভেসে যাচ্ছে। খুব ভিড়। আমি তো দেখতে পাচ্ছি না, বাবাকে বলছি আমায় কোলে নাও, আমায় কোলে নাও…
৩.
জয়দা, আপনি তো ছয়ের দশকের শেষদিকে কলকাতা শহরে নিয়মিত থিয়েটার দেখতে শুরু করছেন। বিখ্যাত দল ও বিখ্যাত অভিনেতাদের কাজ দেখছেন। ওই সময়ে রানাঘাট বা তার আশপাশে গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের কোনও প্রভাব পড়তে দেখছেন?
শৈবাল, গ্রুপ থিয়েটার, নবনাট্য– এসব বিষয়ে তখন কিন্তু আমার কোনও ধারণা নেই। এগুলি আমি অনেক পরে একটু-একটু করে জানব। আমার চোখে কী ধরা পড়ছে তখন, সেটা বলি। আমি যে খুব আলাদাভাবে থিয়েটার দেখছি, তা নয়। আমি বলি আপনাকে, ওখানে বিভিন্ন ক্লাব ছিল– যেমন তরুণ মিলন সংঘ, সুহৃদ সংঘ। একটি নাটকের দল ছিল, তার নাম ‘রূপকার’। গোপাল মল্লিক নামে এক দীর্ঘকায় অকৃতদার ব্যক্তি, তাঁর কাঁধ পর্যন্ত লম্বা লম্বা বাবরি চুল, হাতের আঙুলগুলি লম্বা লম্বা। কথা বলার সময় হাতের আঙুলগুলো আশ্চর্যভাবে ব্যাঁকাতেন। তাঁকে রানাঘাটের নাটকের ‘আদি গুরু’ বলা যায়। একটি বাড়ির তিনতলায় একা থাকতেন। তাঁর নেশা ছিল নাটক। আমার মা, রানাঘাটের সকলের বড়দিমণি, আমার বই পড়ার, নাটক দেখার আগ্রহকে সমর্থন করত।… গোপাল মল্লিকের আগেও একটা জায়গা আছে। আমাদের ওখানে অনেকগুলি মন্দির ছিল। যেমন রাধাবল্লভের মন্দির, নিস্তারিণী মন্দির, সিদ্ধেশ্বরী মন্দির। এইসব মন্দিরের চাতালে কথকতা হত।
‘নাটমন্দির’ বলা যাবে জয়দা?
হ্যাঁ। বলতেই পারেন। সেইখানে কথকতা যাঁরা করতেন, তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন বোতল পণ্ডিত, আরেকজন ছিলেন ঠুকরে পণ্ডিত।
বোতল পণ্ডিত?
হ্যাঁ। বোতল পণ্ডিত আর ঠুকরে পণ্ডিত। ‘বোতল পণ্ডিত’ যিনি, তাঁর চেহারা ছিল সুন্দর। আমাদের উপনয়নে তিনি আচার্য ছিলেন। তিনি ইশকুলে পড়াতেন। মুখে ছিল একটা প্রসন্নতা। সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরতেন। গায়ের রং ছিল পীতাভ। তাঁর গৃহে ছিল প্রবল অশান্তি। দিনরাত অন্দর থেকে অভিসম্পাত ভেসে আসত। তিনি বাড়িতে ছেলেদের পড়াতেন। ভেতর থেকে ভেসে আসা চিৎকার অসহ্য হলে, ছেলেদের নিয়ে চলে যেতেন কাছাকাছি কোনও রোয়াকে। আমিও বড়দির ছেলে হিসেবে সেখানে স্বাগত ছিলাম। তিনি যখন কথকতা করতেন, অপূর্ব এক কোমল স্বরে বলতেন…
–‘তারপর? তারপর রাধা আর কৃষ্ণকে খুঁজে পেলেন না। কোথা কৃষ্ণ কোথা কৃষ্ণ…’
বলতে বলতে গান গেয়ে উঠলেন বোতল পণ্ডিত। একটু গেয়ে যেন স্বগত স্বরে বললেন, এটা রামকেলি হয়ে গেল… বা এটা ভীষ্মদেব… বুঝতে পারছেন, শৈবাল? আমি ওই নামগুলো শুনছি তখন– রামকেলি, ভীষ্মদেব… এই নামটুকু বলেই আবার তিনি ফিরে যেতেন কথকতায়…

আর ছিলেন ঠুকরে পণ্ডিত। এই ঠুকরে পণ্ডিতকে আমি আজকাল কলকাতার কোনও জ্ঞানী সংস্কৃতজ্ঞ লেখকের মধ্যে দেখতে পাই। আমি রানাঘাটে যা দেখে এসেছি কলকাতায় তার রেপ্লিকা আরেকটু বড় চেহারায় দেখেছি। ঠুকরে পণ্ডিত স্থানীয় ক্ষমতাবান লোকজনদের সঙ্গে সংযোগ রাখতেন, এই যেমন এমএলএ প্রমুখ জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে…
বোতল পণ্ডিত ডাক পেতেন কম। তিনি যখন কথকতা করতেন, বলতে বলতে থামতেন, ওঁর সেই কোমল সুরেলা স্বরক্ষেপণ। বলছেন– ‘কোথায় রাধা?’, তার মধ্যে একটা মগ্ন আকুলতা। ধরুন, মাজমাওয়ালা গোপাল। সে বেশ উচ্চকিত, অনেকটা জনমোহিনী পাবলিক অ্যাড্রেসের ভঙ্গিতে বলবে: ‘এই কোথায়? কোথায়?’ এই ‘কোথায়’টা এমনভাবে ও ছুড়বে যাতে দর্শককে প্রশ্ন করা হল। আর আমাদের বোতল পণ্ডিত, তিনি ‘কোথায়’ বলবেন অনেক মগ্ন স্বরে… যেন নিজেই খুঁজছেন, খুঁজতে খুঁজতে যেন হয়ে উঠবেন চৈতন্য, গেয়ে উঠবেন জ্ঞানদাসের পদ…
জয়দা একটা প্রশ্ন করি?
করুন।
এই যে অভিনয়ের দু’টি ধারা, মাজমাওয়ালা গোপাল আর বোতল পণ্ডিতের। একটি যেন অনেকতা ডেমনস্ট্রেটিভ, অনেকটা অ্যাক্টিং, আমরা নাট্যশাস্ত্রে অভিনয় প্রসঙ্গে স্থায়ীভাব, সঞ্চারী, ব্যভিচারী ভাব ইত্যাদি যে পাই, পণ্ডিতমশাই যেন আত্মগত, ভাবস্থ…
হ্যাঁ। ঠিক। ভাবস্থ…
[আমার মনে পড়ে যায় যাদবপুরে আটের দশকে সুপ্রিয়াদির হ্যামলেট ক্লাস, ‘হ্যামলেট’-এর স্বগত উক্তি থেকে সুপ্রিয়াদির চলে যাওয়া অ্যাক্টিং আর প্লেয়িংয়ের, মাজমাওয়ালা গোপাল আর কথক বোতল পণ্ডিতের আসর দেখতে পাই যেন…]
এই দু’জনের মধ্যে একটা জিনিস আমি লক্ষ করতাম শৈবাল, যেজন্য আমি বারবার ছুটে ছুটে যেতাম, সেটা হল এঁদের দু’জনের বলার ধরনের মধ্যে ছিল একটা সাসপেন্স। এই যে বোতল পণ্ডিত গেয়ে গেয়ে বলছেন…
‘পথের ধুলারে কানু ভাবি গোরা পথে পড়ে মূর্ছায়ে… তবু হে বন্ধু চরণে কেন…’
বোতল পণ্ডিতের ‘চরণে কেন’ উচ্চারণের মধ্যে আমি স্পষ্ট দিলীপকুমার রায়ের কণ্ঠ শুনতে পেলাম।

মনে পড়ে, আমি বাবার সঙ্গে চূর্ণির ধার দিয়ে হাঁটছি, অদূরে আমাদের পালচৌধুরী হাইস্কুল থেকে গান ভেসে আসছে। সেই দরাজ কণ্ঠ হেডমাস্টার মশাই শৈলেন্দ্রনাথ ঘোষাল। বাবা তখনও পর্যন্ত ওঁকে দেখেননি। সেই স্বর শুনে বাবা সেই দিকে দ্রুত হাঁটতে লাগলেন। হেডস্যর উদাত্ত কণ্ঠে গাইছেন– ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’। ওই যে ‘কোথায় এমন ধূম্র পাহাড়’। সেই ‘কোথায়’ বলাটা একদম দিলীপকুমার রায়ের মতো। কোনও তালবাদ্য নেই, শুধু একটা হারমোনিয়াম নিয়ে উনি গাইছেন। ‘এমন দেশটি কো-থাও খুঁজে…’– ‘কোথাও’ এর ‘কো’-টা একজাগায় থাকছে, ‘থাও’টা চলে যাচ্ছে অনেক দূরে। ‘থাও’-এর সুরটা একটা ঢেউয়ের মতো উঠে নেমে যেন ভেসে যাচ্ছে। খুব ভিড়। আমি তো দেখতে পাচ্ছি না, বাবাকে বলছি– আমায় কোলে নাও, আমায় কোলে নাও…
কিন্তু বাবার তো আমায় কোলে নেওয়া বারণ। ব্রিটিশ আমলে জেলে বাবাকে পিঠে বরফ চাপিয়ে রাখা হয়েছিল। তারপর বাবার দু’বার প্লুরিসি হয়। ওইজন্য মায়ের নিষেধ থাকত আমায় কোলে না নেওয়ার। কিন্তু আমি বলে চলেছি, ‘আমায় কোলে নাও,আমায় কোলে নাও…’
আমরা নাটক নিয়ে কথা বলছিলাম। ওই যে ‘কোথাও’ শব্দের মধ্যে একটা তীব্র খোঁজার আকুলতা… ওই যে ‘সকল দেশের রাণী’তে ‘সকল’ শব্দের সুরটা যে একটু ওপরের দিকে উঠে নিচু হয়ে যায় খানিকটা, এই গায়নের মধ্যে একটা নাটক চলাচল করে। আমি বোতল পণ্ডিতের কথকতার সুরে স্বরক্ষেপে, চকিত যতিতে বিরাম নেওয়ার ভঙ্গিতে ওই নাটকের চলাচল দেখেছি…
আর ওই যে বোতল পণ্ডিতের কথকতার ফাঁকে ভীষ্মদেবের উল্লেখ, আমিও বাড়িতে রেডিওতে শুনছি ওঁর শাস্ত্রীয় গান। কখনও পণ্ডিতমশাইয়ের রাধাভাবের কীর্তনে কৃষ্ণচন্দ্রদের গায়কির আভা। বাড়িতে রেকর্ডে কৃষ্ণচন্দ্র দে-র গান বাজত। আমার কাকামণি বাড়িতে এলে বাবাকে বলত, ‘সেজদা, কানাকেষ্টর গান দে।’ ওঁর সময়কার বাঙালি শ্রোতা কৃষ্ণচন্দ্রকে এই নামেই ভালোবেসে উল্লেখ করতেন, কিন্তু এইভাবে নাম দেওয়াটা বা উল্লেখ করাটা যে অনুচিত– সেটা মা আমায় একান্তে ডেকে বুঝিয়ে বলেছিলেন।…

একদিন দিনান্তবেলায় লোকাল ট্রেনের জানলা দিয়ে দেখলাম, গ্রামের স্টেশনে একলাটি নেমে মাঠের আলপথ দিয়ে সাইকেল হাতে হেঁটে হেঁটে অস্ত আকাশের পটে মিলিয়ে যাচ্ছে মাজমাওয়ালা গোপাল…
[গ্লোব থিয়েটারে বসে আছি এক অঘ্রানের অপরাহ্নে। ওই কাঠের পাটাতনে অভিনেতার কণ্ঠে শুনতে পাচ্ছি–
অল দ্য ওয়ার্ল্ড ইস আ স্টেজ
অল… মেয়ার প্লেয়ার্স
দে হ্যাভ দেয়ার এক্সিট অ্যান্ড এনট্রান্সেস…]
………………..জয়ের সঙ্গে একক। অন্যান্য পর্ব………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved