Robbar

কোথায় এমন ধূম্র পাহাড়?

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 3, 2026 5:29 pm
  • Updated:May 4, 2026 5:02 pm  

হেডস্যর উদাত্ত কণ্ঠে গাইছেন– ধনধান্য পুষ্প ভরা। ওই যে ‘কোথায় এমন ধূম্র পাহাড়’। সেই ‘কোথায়’ বলাটা একদম দিলীপকুমার রায়ের মতো। কোনও তালবাদ্য নেই, শুধু একটা হারমোনিয়াম নিয়ে উনি গাইছেন। ‘এমন দেশ টি কো-থাও খুঁজে…’– ‘কোথাও’ এর ‘কো’-টা এক জায়গায় থাকছে, ‘থাও’টা চলে যাচ্ছে অনেক দূরে। থাও-এর সুরটা একটা ঢেউয়ের মতো উঠে নেমে যেন ভেসে যাচ্ছে। খুব ভিড়। আমি তো দেখতে পাচ্ছি না, বাবাকে বলছি আমায় কোলে নাও, আমায় কোলে নাও…

জয় গোস্বামী

শৈবাল বসু

৩.

জয়দা, আপনি তো ছয়ের দশকের শেষদিকে কলকাতা শহরে নিয়মিত থিয়েটার দেখতে শুরু করছেন। বিখ্যাত দল ও বিখ্যাত অভিনেতাদের কাজ দেখছেন। ওই সময়ে রানাঘাট বা তার আশপাশে গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের কোনও প্রভাব পড়তে দেখছেন?

শৈবাল, গ্রুপ থিয়েটার, নবনাট্য– এসব বিষয়ে তখন কিন্তু আমার কোনও ধারণা নেই। এগুলি আমি অনেক পরে একটু-একটু করে জানব। আমার চোখে কী ধরা পড়ছে তখন, সেটা বলি। আমি যে খুব আলাদাভাবে থিয়েটার দেখছি, তা নয়। আমি বলি আপনাকে, ওখানে বিভিন্ন ক্লাব ছিল– যেমন তরুণ সংঘ, মিলন সংঘ, সুহৃদ সংঘ। একটি নাটকের দল ছিল, তার নাম ‘রূপকার’। গোপাল মল্লিক নামে এক দীর্ঘকায় অকৃতদার ব্যক্তি, তাঁর কাঁধ পর্যন্ত লম্বা লম্বা বাবরি চুল, হাতের আঙুলগুলি লম্বা লম্বা। কথা বলার সময় হাতের আঙুলগুলো আশ্চর্যভাবে ব্যাঁকাতেন। তাঁকে রানাঘাটের নাটকের ‘আদি গুরু’ বলা যায়। একটি বাড়ির তিনতলায় একা থাকতেন। তাঁর নেশা ছিল নাটক। আমার মা, রানাঘাটের সকলের বড়দি, আমার বই পড়ার, নাটক দেখার আগ্রহকে সমর্থন করত।… গোপাল মল্লিকের আগেও একটা জায়গা আছে। আমাদের ওখানে অনেকগুলি মন্দির ছিল। যেমন রাধাবল্লভের মন্দির, নিস্তারিণী মন্দির, সিদ্ধেশ্বরী মন্দির। এইসব মন্দিরের চাতালে কথকতা হত।

‘নাটমন্দির’ বলা যাবে জয়দা?

হ্যাঁ। বলতেই পারেন। সেইখানে কথকতা যাঁরা করতেন, তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন বোতল পণ্ডিত, আরেকজন ছিলেন ঠুকরে পণ্ডিত।

বোতল পণ্ডিত?

হ্যাঁ। বোতল পণ্ডিত আর ঠুকরে পণ্ডিত। ‘বোতল পণ্ডিত’ যিনি, তাঁর চেহারা ছিল সুন্দর। আমাদের উপনয়নে তিনি আচার্য ছিলেন। তিনি ইশকুলে পড়াতেন। মুখে ছিল একটা প্রসন্নতা। সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরতেন। গায়ের রং ছিল পীতাভ। তাঁর গৃহে ছিল প্রবল অশান্তি। দিনরাত অন্দর থেকে অভিসম্পাত ভেসে আসত। তিনি বাড়িতে ছেলেদের পড়াতেন। ভেতর থেকে ভেসে আসা চিৎকার অসহ্য হলে, ছেলেদের নিয়ে চলে যেতেন কাছাকাছি কোনও রোয়াকে। আমারও, বড়দির ছেলে বলে সেখানে প্রবেশে কোনও বাধা ছিল না। তিনি যখন কথকতা করতেন, অপূর্ব এক কোমল স্বরে বলতেন…

–‘তারপর? তারপর রাধা আর কৃষ্ণকে খুঁজে পেলেন না। কোথা কৃষ্ণ কোথা কৃষ্ণ…’

বলতে বলতে গান গেয়ে উঠলেন বোতল পণ্ডিত। একটু গেয়ে, যেন স্বগত স্বরে বললেন, এইটা ভীষ্মদেব হয়ে গেল… রামকেলি রামকেলি… ভীষ্মদেব এইভাবে চলেন… আরও খানিকটা গেয়ে উঠলেন। রামকেলি হয়ে গেল… বুঝতে পারছেন, শৈবাল? আমি ওই নামগুলো শুনছি তখন– রামকেলি, ভীষ্মদেব…যে নাম রেডিওতেও শুনেছি। এই নামটুকু বলেই আবার তিনি ফিরে যেতেন কথকতায়…

আর ছিলেন ঠুকরে পণ্ডিত। এই ঠুকরে পণ্ডিতকে আমি আজকাল কলকাতার কোনও জ্ঞানী সংস্কৃতজ্ঞ লেখকের মধ্যে দেখতে পাই। আমি রানাঘাটে যা দেখে এসেছি কলকাতায় তার রেপ্লিকা আরেকটু বড় চেহারায় দেখেছি। ঠুকরে পণ্ডিত স্থানীয় ক্ষমতাবান লোকজনদের সঙ্গে সংযোগ রাখতেন, এই যেমন এমএলএ প্রমুখ জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে…

বোতল পণ্ডিত ডাক পেতেন কম। তিনি যখন কথকতা করতেন, বলতে বলতে থামতেন, ওঁর সেই কোমল সুরেলা স্বরক্ষেপণ। বলছেন– ‘কোথায় রাধা?’, তার মধ্যে একটা মগ্ন আকুলতা। ধরুন, মাজমাওয়ালা গোপাল। সে বেশ উচ্চকিত, অনেকটা জনমোহিনী পাবলিক অ্যাড্রেসের ভঙ্গিতে বলবে: ‘এই কোথায়? কোথায়?’ এই ‘কোথায়’টা এমনভাবে ও ছুড়বে যাতে দর্শককে প্রশ্ন করা হল। আর আমাদের বোতল পণ্ডিত, তিনি ‘কোথায়’ বলবেন অনেক মগ্ন স্বরে… যেন নিজেই খুঁজছেন, খুঁজতে খুঁজতে যেন হয়ে উঠবেন চৈতন্য, গেয়ে উঠবেন জ্ঞানদাসের পদ…

জয়দা একটা প্রশ্ন করি?

করুন।

এই যে অভিনয়ের দু’টি ধারা, মাজমাওয়ালা গোপাল আর বোতল পণ্ডিতের। একটি যেন অনেকটা ডেমনস্ট্রেটিভ, অনেকটা অ্যাক্টিং, আমরা নাট্যশাস্ত্রে অভিনয় প্রসঙ্গে স্থায়ীভাব, সঞ্চারী, ব্যভিচারী ভাব ইত্যাদি যে পাই, পণ্ডিতমশাই যেন আত্মগত, ভাবস্থ…

অতটা তো ধরতে পারিনি। এখনও যে পারি, তা নয়। তবে ওই কথাটা আপনি ঠিক বলেছেন যে, ‘ভাবস্থ’।

[আমার মনে পড়ে যায়, যাদবপুরে আটের দশকে সুপ্রিয়াদির হ্যামলেট ক্লাস, ‘হ্যামলেট’-এর স্বগত উক্তি থেকে সুপ্রিয়াদির চলে যাওয়া অ্যাক্টিং আর প্লেয়িংয়ের, মাজমাওয়ালা গোপাল আর কথক বোতল পণ্ডিতের আসর দেখতে পাই যেন…]

এই দু’জনের বলার ধরন দু’রকম হলেও, একটা জিনিস ছিল কমন, সেটা সাসপেন্স। সাসপেন্স তৈরি করা। এই যে বোতল পণ্ডিত গেয়ে গেয়ে বলছেন…

‘পথের ধুলারে কানু ভাবি গোরা, ধূলায় মুরছি পড়ে,

সুধা ঢালো বঁধূ চরণে কেন…’

বোতল পণ্ডিতের ‘সুধা ঢালো বঁধূ’ এবং ‘চরণে কেন’ উচ্চারণের মধ্যে আমি স্পষ্ট দিলীপকুমার রায়ের গায়ন শুনতে পেতাম। ‘বঁধূ’ শব্দে ‘বঁ’টা সংস্কৃতর মতো উচ্চারণ হচ্ছে, বাংলার মতো নয়। পরে এটা আমাকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন সুধীর চক্রবর্তী।

দিলীপকুমার রায়

মনে পড়ে, আমি বাবার সঙ্গে চূর্ণির ধার দিয়ে হাঁটছি, অদূরে আমাদের পালচৌধুরী হাইস্কুল থেকে গান ভেসে আসছে। সেই দরাজ কণ্ঠ হেডমাস্টার মশাই শৈলেন্দ্রনাথ ঘোষাল। বাবা তখনও পর্যন্ত ওঁকে দেখেননি। সেই স্বর শুনে বাবা সেই দিকে দ্রুত হাঁটতে লাগলেন। হেডস্যর উদাত্ত কণ্ঠে গাইছেন– ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’। ওই যে ‘কোথায় এমন ধূম্র পাহাড়’। সেই ‘কোথায়’ বলাটা একদম দিলীপকুমার রায়ের মতো। কোনও তালবাদ্য নেই, শুধু একটা হারমোনিয়াম নিয়ে উনি গাইছেন। ‘এমন দেশটি কো-থাও খুঁজে…’– ‘কোথাও’ এর ‘কো’-টা একজায়গায় থাকছে, ‘থাও’টা চলে যাচ্ছে অনেক দূরে। ‘থাও’-এর সুরটা একটা ঢেউয়ের মতো উঠে, তারপরেই নেমে ভেসে যাচ্ছে। খুব ভিড়। আমি তো দেখতে পাচ্ছি না, বাবাকে বলছি– আমায় কোলে নাও, আমায় কোলে নাও…

বাবা গান শুনতে শুনতে বলছেন, ‘নিচ্ছি, নিচ্ছি।’ কিন্তু বাবার তো আমায় কোলে নেওয়া বারণ। ব্রিটিশ আমলে, জেলে, বাবার পিঠে বরফ চাপিয়ে রাখা হয়েছিল। তারপর বাবার ফুসফুস দুটো নষ্ট হয়ে যায়। সেইজন্য মায়ের নিষেধ থাকত আমায় কোলে না নেওয়ার। কিন্তু আমি বলে চলেছি, ‘আমায় কোলে নাও,আমায় কোলে নাও…’

আর বাবা বলছেন, ‘নিচ্ছি নিচ্ছি।’ কিন্তু নিচ্ছেন না। মানে, নিতে পারছেন না।

আমরা নাটক নিয়ে কথা বলছিলাম। ওই যে ‘কো-থাও’ শব্দের উচ্চারণকে দীর্ঘ করে দেওয়া এবং তার মধ্যে মীড় ঢেলে দেওয়া হয় – এর মধ্যে সমস্ত দেশগুলিকে একটা খুঁজে আসা আছে… সেই জন্যই তো এই দেশই ‘সকল দেশের রাণী’ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাচ্ছে। ওই যে ‘সকল দেশের রাণী’তে ‘সকল’ শব্দের সুরটা যে একটু ওপরের দিকে উঠেই আবার নিচু হয়ে যায় খানিকটা– এই গায়নের মধ্যে একটা নাটক চলাচল করে। আমি বোতল পণ্ডিতের কথকতার সময়ে আপনমনে বলতে বলতে হঠাৎ হঠাৎ থেমে যাওয়া,  মানে ‘পজ’ নেওয়া… যেন নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করা… এসবের মধ্যে ওই নাটকের চলাচল দেখেছি…

আর ওই যে বোতল পণ্ডিতের কথকতার ফাঁকে ভীষ্মদেবের উল্লেখ, বাড়িতে শুনছি ওঁর নাম। কখনও পণ্ডিতমশাইয়ের রাধাভাবের কীর্তনে কৃষ্ণচন্দ্র দে আর দিলীপকুমার রায়ের গায়কির একটু অজান্তেই মেলামেশা। বাড়িতে রেকর্ডে কৃষ্ণচন্দ্র দে-র গান বাজত। আমার কাকামণি বাড়িতে এলে বাবাকে বলত, ‘সেজদা, কানাকেষ্টর গান গাও।’ ওঁর সময়কার বাঙালি শ্রোতা কৃষ্ণচন্দ্রকে এই নামেই ভালোবেসে উল্লেখ করতেন, কিন্তু এইভাবে নাম বলাটা বা উল্লেখ করাটা যে অনুচিত– সেটা মা আমায় একান্তে ডেকে বুঝিয়ে বলেছিলেন।…

কৃষ্ণচন্দ্র দে

একদিন শেষ-বিকেলে লোকাল ট্রেন দাঁড়িয়ে গিয়েছে। মাঝরাস্তায়। দেখলাম, একলাটি নেমে ধানখেতের আলপথ দিয়ে দু’হাতে দুটো ঝোলা নিয়ে খুব ধীরে ধীরে, হাঁটতে হাঁটতে চলেছে গোপাল। আর দিগন্তে মিলিয়ে যাচ্ছেন অস্ত আকাশের সূর্য…

এর পরে গোপালকে আর কখনও দেখিনি।

[গ্লোব থিয়েটারে বসে আছি এক অঘ্রানের অপরাহ্নে। ওই কাঠের পাটাতনে অভিনেতার কণ্ঠে শুনতে পাচ্ছি–
অল দ্য ওয়ার্ল্ড ইস আ স্টেজ
অল… মেয়ার প্লেয়ার্স
দে হ্যাভ দেয়ার এক্সিট অ্যান্ড এনট্রান্সেস…]

………………..জয়ের সঙ্গে একক। অন্যান্য পর্ব………………..

১। সদ্যবৈধব্য চিনতে আমার কখনও ভুল হয়নি

২। জটলার মাঝে করতালি