memoirs of joy goswami about observing people | Robbar
Robbar
  • ৬ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২৪ আগস্ট ২০২৬

সদ্যবৈধব্য চিনতে আমার কখনও ভুল হয়নি

এই সেদিন খবরের কাগজে প্রিয়াঙ্কা সরকারের মুখটা দেখলাম। এই মুখ আমার চেনা। আমার আট বছর বয়সে মায়ের এই মুখ দেখেছি। তারপর থেকে সদ্যবৈধব্য চিনতে আমার কখনও ভুল হয়নি। বহু বছর আগে একবার লালগোলা প্যাসেঞ্জারে যাচ্ছি। আমার ঠিক উল্টোদিকে একজন মহিলা, মাঝবয়সি। মুখটা দেখে মনে হচ্ছে, কী যেন একটা বয়ে গিয়েছে ওঁর ওপর দিয়ে। কী যেন হয়েছে… খানিক বাদে নৈহাটি স্টেশন আসার ঠিক আগে একটি ছেলে, পরনে কাছা, ওঁর কাছে এসে কী যেন একটা বলল। আমি বুঝলাম, মা আর পুত্র। ওই মুখ। আমার মায়ের দেখেছি, আট বছর বয়সে।

Published by: Robbar Digital

Posted:April 20, 2026 6:08 pm | Updated:April 22, 2026 2:22 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

কথা হয়। কথা যেখানে বিরাম চায়, সেখানে গান। সুরের সূত্রে আবার আসে কথা। কথা তো নয়, কথকতা যেন। সেই কথকতায় কখনও আসে কোনও অভিনয় দেখার স্মৃতি, কখনও লোকাল ট্রেনে হকারের ডাক। রাজা অয়দিপাওস রানির চুলের কাঁটা নিজের দু’চোখে বিঁধিয়ে দিলেন। মঞ্চের অন্ধকারের মধ্যে আলো কেন্দ্রীভূত হয়। কতটা গাঢ় হয় শম্ভু মিত্রের স্বর? এর ফাঁকে লোকাল ট্রেনের ভিখিরি মাঝসপ্তকের একটা সুরে বলে যেতে থাকেন, ‘অন্ধকে দেবেন। আলো কই, আলো? এই ঘরে কি কোনও দিন আলো জ্বলবে না?’ বহুরূপীর প্রযোজনায় সুদর্শনা তৃপ্তি মিত্র। শাঁওলি সুরঙ্গমা। ‘আলো কই?’ অন্ধকার মঞ্চে বেজে ওঠে তৃপ্তি মিত্রের তীব্র ঝনৎকার। রানাঘাট লোকালে বাড়ি ফেরা। ভিড়ের নানা স্বর। তার মধ্যে, শৈবাল, আবার ওই ভিখিরি, হাতে লাঠি, সঙ্গে সামান্য কাপড়, সিঁথিতে সিঁদুর পরা স্ত্রী, আর ওই আখরের মতো বেজে ওঠা, ‘অন্ধকে দেবেন…।’ রানাঘাট লোকাল চলতে থাকে। লোকাল ট্রেনের ভিড় মুছে যায়। একটি পুরনো মঞ্চ। অনেক অভিনয়ের স্মৃতি বুকে বিছিয়ে রেখেছে তার প্রাচীন পাটাতন। ঝুল মাখা উইংসের মাথায়, এক্কেরে ওই উঁচুতে গোপনে পায়রা ঘুময়। সেই মঞ্চে মাটির সিংহাসন। কথা কয় দু’জন।

১.

জয়দা, আপনার ভিতরে, আপনার সমস্ত প্রকাশের অন্দরে এক ‘নাটুয়া’র বাস। সে আপনার কবিতা বলা হোক, দূরের বা নিকটকথা বর্ণনা হোক, বা নানা গাইয়ের গান বলার ভঙ্গি বিষয়ে তুমুল আগ্রহ হোক, ‘নাটুয়া’ তো আছে একজন ভিতরে। তাই তো? যদি ভুল না-বলে থাকি, তবে কী করে জন্ম নিল এই নাটুয়া?

আমার ভিতরে নাটুয়া আছে? আমি তো সেটা খেয়াল করিনি!

তবে শৈবাল, আপনি তো জানেন আমি দু’বার ফেল করেছি ইশকুলে। একবার তো পরীক্ষা দিতে পারিনি, আর একবার পরীক্ষা দিই, কিন্তু ফেল করি। আর ম্যাট্রিকও পাশ করতে পারিনি আমি। আমার যেদিন জ্বরটর থাকত না, আমি ঘুরে বেড়াতাম। আর লোককে লক্ষ করতাম। একেকজন লোকের তো একেকটা ধরন থাকে, সেটা লক্ষ করতাম।

জ্বর থাকত মাঝেমাঝে?

হ্যাঁ। আমার তো ১২ বছর বয়সে টিবি হয়। ১৯৬৬ সাল সেটা, আমি তখন ক্লাস এইট। একটা বছর আমি অসুখে গৃহবন্দি ছিলাম…

তার মানে, ওই উঠোনে, পিসিমা যেখানে জাঁতা দিয়ে ডাল ভাঙেন, সেখানে যাওয়াও কোবরেজের বারণ?

হ্যাঁ। একেবারেই গৃহবন্দি। আমার একমাত্র সঙ্গী ছিল বই আর রেডিও। সেই রেডিওতে এক নির্জন দুপুরে আমি ‘ডাকঘর’ নাটকটা শুনি। পরে জেনেছি, ওটা ‘বহুরূপী’র প্রযোজনা, আর ‘অমল’ করেছিলেন শাঁওলি মিত্র।

zoom
ডাকঘর নাটকের অভিনয়ে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, আশামুকুল এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৯১৭

তারপর?

একটু সেরে উঠলাম। ঘুরে বেড়াতাম। আমাদের সেই রানাঘাট। মফস্‌সল শহর। পশ্চিমে চূর্ণী নদীর ওপারে কৃষকদের গ্রাম। কেষ্টপুর, চককেষ্টপুর, সন্ন্যাসীবাগান, কামগাছি, তারপর বেড়ে কামগাছি। একটু বর্ধিত, তাই বেড়ে কামগাছি। খিসমে, ‘আড়’ খিসমে। মানে খিসমে গ্রামের একটু আড়ে আর একটি গ্রাম। ১২ পয়সার চানাচুর কিনতাম আর ১২ পয়সায় চা।

১২ পয়সা মানে দু’ আনা?

হ্যাঁ, দু’ আনা।

আপনার তখন কত বয়স?

এই ১২… না, ১২-তে তো আমি… ১৩। ধরুন ১৩ থেকে শুরু, তারপর একটানা ৩৭ বছর বয়স পর্যন্ত।

আমি ঘুরে বেড়াতাম। আর কী করতাম? ‘লোক’ দেখতাম। তাদের কথা বলার ভঙ্গি, তাদের চলা, মুখের ভাব, তাকানো… আমি মনে মনে তাদের একেকটা নাম দিতাম। যেমন কারও নাম দিলাম ‘পতৌদি’, কারও নাম ‘কাল্টু সোনা’, কারও ‘ভোম্বল সর্দার’।

এই যে আমি নাম দিচ্ছি, একেকটা চরিত্র আমার ভিতরে তৈরি হচ্ছে। তাদের সেই গড়ে ওঠা একটা নেশার মতো পেয়ে বসেছে আমাকে। কিন্তু লেখার কথা তো ভাবিনি। একরকম খেলা… নিজের সঙ্গে নিজের।

একজন ঔপন্যাসিক বা নাট্যকার কী করেন? এইভাবে একটা মানুষের ধরন সম্পর্কে একটা আবছা ধারণা থেকে গোটা চরিত্র সৃষ্টি করেন। তাই তো? সেই প্রক্রিয়া কিন্তু তখনই শুরু হয়ে গিয়েছে আমার অজান্তে…

এবং আপনি দেখছেন আর নোট করছেন ভিতরে ভিতরে, তাই তো?

অনেক পরে আমি পড়ব একজন খ্যাতনামা অভিনেতার কথা। অবশ্য নাসিরউদ্দিন শাহ তাঁকে অভিনেতা মনে করেন না। সে অভিনেতা, বলেছিলেন– একজন পেশাদার অভিনেতার কাজ হল, শুধু নিজের অভিনয়ের সময়টা বাদ দিয়ে সর্বক্ষণ নোট নেওয়া। কোন মানুষ কীভাবে বিহেভ করছে, সেটা লক্ষ করতে থাকা। অমিতাভ বচ্চন। বলছেন এ-কথা। একজন অভিনেতার কাছে পুরো দুনিয়াটাই একটা ফুলটাইম ওয়ার্কশপ। এর সঙ্গে আপনি দস্তয়েভস্কির মিল পাবেন। দস্তয়েভস্কি যেমন বলেছেন, একজন লেখকের কাজ পর্যবেক্ষণ করা আর নোট নেওয়া…

zoom
সুজিত সরকার পরিচালিত ‘গুলাবো সিতাবো’-তে অমিতাভ বচ্চন

আমিও দেখতাম। একেকটা মানুষের কথা বলার ভঙ্গি আমায় আকৃষ্ট করত। আমি শুনতাম। দেখতাম। নীরব থাকতাম। কিছু বলতাম না। আমি বরাবর নীরব থাকতাম। এই যে আপনার সঙ্গে আমার বছর তিনেক আগে শিলিগুড়িতে যখন দেখা হল, তখন আমি ‘বলি’। তার আগে ‘বলতাম না’…

[নেপথ্য থেকে ভেসে আসে বিজয়লক্ষ্মী বর্মণের গাঢ় কণ্ঠ: ‘সে বড় নিকটকথা, যা বর্ণনা করি…’]

আপনি বৈধব্য দেখেছেন কখনও, শৈবাল? এই সেদিন খবরের কাগজে প্রিয়াঙ্কা সরকারের মুখটা দেখলাম। এই মুখ আমার চেনা। আমার আট বছর বয়সে মায়ের এই মুখ দেখেছি। তারপর থেকে সদ্যবৈধব্য চিনতে আমার কখনও ভুল হয়নি। বহু বছর আগে একবার লালগোলা প্যাসেঞ্জারে যাচ্ছি। আমার ঠিক উল্টোদিকে একজন মহিলা, মাঝবয়সি। মুখটা দেখে মনে হচ্ছে, কী যেন একটা বয়ে গিয়েছে ওঁর ওপর দিয়ে। কী যেন হয়েছে… খানিক বাদে নৈহাটি স্টেশন আসার ঠিক আগে একটি ছেলে, পরনে কাছা, ওঁর কাছে এসে কী যেন একটা বলল। আমি বুঝলাম, মা আর পুত্র। ওই মুখ। আমার মায়ের দেখেছি, আট বছর বয়সে। আজ প্রিয়াঙ্কাকে দেখলাম। এই সময়ের মেয়ে। এমন নয় যে, এয়োতি চিহ্ন ধারণ করে থাকেন। মুছতে হয়েছে। তবু সেই এক মুখ… মনে পড়ে, ইউরিপিডিসের ‘দ্য ট্রোজান উইমেন’-এর কথা, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধশেষের শত শত সদ্যবিধবার মুখের ছায়া যেন মিশে থাকে সেই মুখে…

[চুপ করে থাকেন জয়।]

[সাউন্ড ট্র্যাক বেজে ওঠে ট্রেনের তীব্র আওতায়। একটি ধারের বার্থ। জানালায় বাইরের দিকে সর্বজয়ার সেই মুখ। কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে কিশোর অপু। কাছা পরা।]

আমার একটা গল্প আছে, জানেন? অমূল্য মুখুজ্জের গল্প। অমূল্য মুখুজ্জে একজন ব্যর্থ অভিনেতা। কিন্তু বুকের মধ্যে অভিনয়কে বহন করে চলেছেন তিনি।

অমূল্য কল্পনা করেন, তিনি হেমিংওয়ের ‘ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’-র কাহিনিটি অভিনয় করছেন মঞ্চে। বৃদ্ধ সান্তিয়াগোর চরিত্রে তিনি অভিনয় করবেন– এই পরিকল্পনায় তো ভিতরে ভিতরে তাঁর তীব্র উদ্দীপনার মুহূর্ত তখন। কিন্তু সমুদ্র? তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, মঞ্চে আপনি সমুদ্র কীভাবে দেখাবেন?

অমূল্য মুখুজ্জে হাসলেন।

‘তা-কা-ব। শু-দ-দু তাকাব। বুয়েছেন না? তাকিয়ে সব বলব। নো ডায়ালগ। দেখবেন?’

Amitabh Bachchan Apu trilogy dakghar Ernest Hemingway Joy Goswami Naseeruddin Shah Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar the old man and the sea ডাকঘর

Share this article on