joy gowami about his childhood memory of a busker | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জটলার মাঝে করতালি

গোপালের দু’ হাতে দুটো লোহার রিং। একটা রিং আরেকটা রিং দিয়ে অন্য রিং-এর গায়ে ঝং করে মারছে, আর দুটো রিং একটা আরেকটার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে, যেন বড় কানের দুল দিয়ে তৈরি দু’টি শিকল তৈরি হচ্ছে। পরক্ষণেই একটা ঝাঁকি দিচ্ছে সেই যুক্ত-হয়ে-যাওয়া রিং-এ, আর তৎক্ষণাৎ রিং দু’টি আলাদা হয়ে চলে আসছে ওর দু’ হাতে। এইটি করার পর সে দু’ হাতে দু’টি রিং দোলাতে দোলাতে গলায় অদ্ভুত একটা মোচড় এনে বলছে– ‘ম্যাজিক আর কিছুই নয়। শুধু দ্যাখবার ভুল, আর দ্যাখাবার কায়দা! কী বললাম বলোহ্‌?’

গ্রাফিক্স: দীপঙ্কর ভৌমিক

শেষ আপডেট: এপ্রিল ২৮, ২০২৬, ১৫:২৫   
Facebook WhatsApp Messenger

দু’জনে মুখোমুখি। কথা বলতে বলতে কবি যেন চলে যান কথকতায়। নানা মানুষের স্বর উঠে আসে তাঁর কণ্ঠে। কতরকম হাতের মুদ্রা। বলতে বলতে উঠে দাঁড়ান। কবির শরীর থেকে জন্ম নেয় পারফর্মার। জীবনের বাকি কলরব মিছে হতে থাকে।

২.

আমি জীবনটার মধ্য দিয়ে চলেছিলাম শৈবাল। যেহেতু আমার মেলামেশার বন্ধুবান্ধব কম ছিল। আমি ঘুরে বেড়াতাম। সেসব খুব বড় ভ্রমণ নয়। নিতান্তই রানাঘাট আর তার আশপাশের জনপদ। তার মধ্যেই আমি অভিনয় দেখেছি। একজন লোক। সে মাদুলি বিক্রি করত। তাকে আমি ’৬৭ সাল থেকে ’৮৯ সাল– ২২ বছর দেখেছি। লোকে তাকে ‘গোপাল’ বলে চিনত। সে ছিল খর্বকায়। মাথায় ছাঁট খোঁচা-খোঁচা কাঁচাপাকা চুল। সে ঘুরে ঘুরে খেলা দেখাত। কখনও মিউনিসিপালিটি অফিসের সামনে, কখনও রানাঘাট স্টেশনের এলাকায়। মায়ের সঙ্গে মায়ের ইশকুলের কাজে বহরমপুর কোর্টে গিয়ে দেখেছি, সেই কোর্টের সামনেও সে তার খেলা দেখাচ্ছে। তাকে প্রথম দেখি যেদিন, সেদিনের কথা আমার বেশ মনে আছে। আমি ভীমদার দোকানে আসছি…

‘ভীমদা’ মানে, রানাঘাট স্টেশনে যার দোকানে বসে বসে আপনি সাপ্তাহিক দেশ, অমৃত, এইসব পত্রপত্রিকা পড়তেন?

হ্যাঁ। ‘দেশহিতৈষী’ও পড়তাম। তখন তো নকশাল আন্দোলনের উন্মেষ হচ্ছে…

তো আমি ভীমদার দোকানে আসছি, দেখি– মিউনিসিপ্যালিটি অফিসের সামনে একটা লোক। তার বাম হস্তের করতলের ওপরে একটা দেশলাই বাক্স শোয়ানো রয়েছে। আর সে, ওই দেশলাই বাক্সটার দিকে তার দক্ষিণ হস্তের অঙ্গুলি দেখিয়ে ওই বাক্সটিকে বলছে, ‘ওঠ! উঠে দাঁড়া!’

তার সামনে দু’টি বালক। আমাদের ওই মিউনিসিপালিটি আপিসের পিছনে সাফাইকর্মীদের বসতি ছিল। লোকে বলত ‘মেথরপট্টি’। সেই পরিবারের দু’টি বাচ্চা, ওই, মুখে আঙুল দিয়ে ওই লোকটির দিকে তাকিয়ে।

–এই ওঠ! উঠে দাঁড়া! দাঁড়া বলছি!

লোকটির গলার আওয়াজটা ভারী। যাওয়ার পথে ওই আওয়াজ শুনে আমি তাকিয়েছি। সামনে দু’টি বাচ্চা। আর জনপ্রাণী নেই। কে না কে, এই ভেবে আমি ভীমদার দোকানে চলে গিয়েছি। 

জয়দা, ডান হাতের কোন আঙুল ব্যবহার করছিল, মনে আছে?

তর্জনী। দক্ষিণ হস্তের তর্জনী।

তার মানে লোকটা নিজের অজান্তেই সূচি হস্তমুদ্রা ব্যবহার করছিল…

তাই বুঝি! এই বিশেষ ভঙ্গিমাটির নাম যে সূচিহস্তমুদ্রা, তা আমি জানতাম না, শৈবাল। একটা নতুন জিনিস জানলাম আজ আপনার কাছে। আপনি তো জানেন, শৈবাল, আমি প্রত্যেকদিন একটি করে নতুন জিনিস জানার জন্য অপেক্ষা করি… 

জানি, জয়দা। তারপর?

যখন ফিরছি, ভীমদার দোকান থেকে– দেখি, ওই লোকটাকে ঘিরে বেশ ভিড় জমে গিয়েছে। লোকটার পরনে একটা মালকোঁচা মারা খাটো ধুতি। আর একটা কলার দেওয়া নীল শার্ট। পায়ে টায়ারের চটি। ১৯৬৭ সাল সেটা। আমার স্পষ্ট মনে আছে। জানুয়ারি মাস। আমার প্রথম ভিতর জাগছে। আমি কবিতা লেখা শুরু করছি। আমি ভীমদার দোকান থেকে কাগজের খেলার পাতাটা পড়ে ফিরছি। আর দেখি…

জটলা।

হ্যাঁ। সেই জটলা থেকে মাঝেমাঝে করতালি ভেসে আসছে। কী ব্যাপার! ভিড় ঠেলে বেশ কষ্ট করে এগিয়ে দেখি ভিড়ের কেন্দ্রে সেই লোকটা। একটা বৃত্ত। মাঝখানে ওই খর্বকায়, খাটো ধুতি, নীল কলার দেওয়া জামা-পরা সেই লোক। গোপাল। আমাদের ‘চাচা’ বলে এক বন্ধু ছিল। গাঁজা খেত। শ্মশানে গিয়ে। আমিও তার সঙ্গে শ্মশানে যেতাম। চাচা একটু গোল গোল নেশা-জড়ানো স্বরে বলত, মাজমাওয়ালা গোপাল। চাচা কেন গোপালকে ‘মাজমাওয়ালা’ বলত, আর ওই কথাটার কী মানে, সে আমি আজও জানি না।

মাজমাওয়ালা…

গোপালের দু’ হাতে দুটো লোহার রিং। একটা রিং আরেকটা রিং দিয়ে অন্য রিংয়ের গায়ে ঝং করে মারছে, আর দুটো রিং একটা আরেকটার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে, যেন বড় কানের দুল দিয়ে তৈরি দু’টি শিকল তৈরি হচ্ছে। পরক্ষণেই একটা ঝাঁকি দিচ্ছে সেই যুক্ত-হয়ে-যাওয়া রিংয়ে, আর তৎক্ষণাৎ রিং দু’টি আলাদা হয়ে চলে আসছে ওর দু’ হাতে। এইটি করার পর সে দু’ হাতে দু’টি রিং দোলাতে দোলাতে গলায় অদ্ভুত একটা মোচড় এনে বলছে– ‘ম্যাজিক আর কিছুই নয়। শুধু দ্যাখবার ভুল, আর দ্যাখাবার কায়দা! কী বললাম বলোহ্‌?’

(সম্ভবত ভিড় থেকে): দ্যাখবার ভুউল!

(লোকটির গর্জন): আআর? আআর? বলোহ্‌!

সমবেত: দ্যা-খা-বা-র-কা-য়-দা!!!

বাঃ, দারুণ বললেন তো, জয়দা! লোকটাকে দেখতে পাচ্ছি যেন…

–‘আমি হ-লা-ম…’

–‘আমি হ-লা-ম কী…?’

ভিড় থেকে সাড়া এল, ‘কী? কী?’

–‘সিবাইত।’

‘সেবায়েত’ নয় কিন্তু। সেবাইত। শোনাচ্ছে যেন ‘সিবাইৎ’। হ্রস্ব-ই-টা ছোট। আর ‘ত’-টি যেন ‘ৎ’। ফলে ওই ‘সেবাইত’ শব্দটা দ্রুত একতালের সমের মতো পড়ল যেন হাটের মাঝে।

–‘মা-টি ফেটে রক্ত উঠছে [সে]! মা কামিখ্যা ঋতুমতী হইয়েসেন [এখানে ‘সেন’ উচ্চারণটা সান-ইয়াৎ-সেন-এর মতো, বুঝলেন?]

–‘সেই রক্তমিত্তিকা মা-দুলির মধ্যে পুরে এই মা-দুলি তৈরি করসেন … কে তৈরি করসেন? আমি?’

(ভিড় থেকে কেউ): হ্যাঁ আ-আপনি…

–ধুর শুয়ারের বাচসা!

(ভিড় থেকে প্রবল হাসির আওয়াজ উঠল)

লোকটা কী করছে? দর্শককে অঙ্গীভূত করে নিচ্ছে নিজের পারফরম্যান্সের মধ্যে…

জয়দা, এ তো পার্টিসিপেশন ড্রামা!

হ্যাঁ। কিন্তু আমি তো তখন পার্টিসিপেশন ড্রামা কী, সেইসব জানিই না, শৈবাল। অনেক পরে আমি যখন বাদল সরকারকে দেখি, আমার গোপালের কথা মনে পড়েছিল।

মাজমাওয়ালা গোপাল!

জয়দা, অভিধানে দেখছি ‘মাজমা’ মানে সমাবেশ। তার মানে যে লোক ভিড় জমিয়ে দিতে জানে, সেই তবে ‘মাজমাওয়ালা’!

অপূর্ব। এই তো! এই তো…

[জয়ের মুখে অপরাহ্নের অস্তায়মান আলো জ্বলজ্বল করে।]

……………… পড়ুন জয়ের সঙ্গে একক কলামের অন্যান্য পর্ব ………………

পর্ব ১ : সদ্যবৈধব্য চিনতে আমার কখনও ভুল হয়নি

Childhood Joy Goswami man watching nostalgia Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on