Kunwar Narayan’s Poetry: Finding Greatness in Little Things। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজা নয়, টুনটুনির গল্প

রবীন্দ্রনাথের পছন্দের ছোট ঘর, শালী বা মধুরার মতো ছোট নদী, নিমগাছের মতো ছোট ফুল, টুনটুনির মতো ছোট পাখি আর এমনই কিছু মানুষের কথা লিখতে চাই, যারা প্রচলিত অর্থে তেমন ‘বড়’ নয়। তবু তাদেরও নিজস্ব ভাব আছে। ভাষা আছে। কথা আছে। সাত মণ তেল না-পুড়লেও আছে উৎসবও। তাদের নিয়েই রামকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘মুখুজ‍্যের লিটফেস্ট’। আজ প্রথম পর্ব

শেষ আপডেট: এপ্রিল ১৪, ২০২৬, ১৯:৩১   
Facebook WhatsApp Messenger

১.

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গিয়েছেন মহারাষ্ট্রে। তিনি এক শিল্পপতির অতিথি। থাকার ব‍্যবস্থা হয়েছে এমন এক বাড়িতে, যেটা আকারে প্রায় প্রাসাদের মতো। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে গিয়েছেন শান্তিনিকেতনের আশ্রমকন‍্যা রানী চন্দ (১৯১২-’৯৭) ও তাঁর স্বামী অনিল চন্দ (১৯০৬-’৭৪)। রানী ছোটবেলাতেই মা ও বাবাকে হারান। ফলে রানীকে রবীন্দ্রনাথ বিশেষ স্নেহ করতেন। বিয়েও দিয়েছিলেন নিজের উদ্যোগে। অনেকে আপত্তি করেছিলেন, কিন্তু তিনি সেসব গ্রাহ্য করেননি।

zoom
রবীন্দ্রনাথ সমীপে। রানী চন্দ ও অনিল চন্দ

রবীন্দ্রনাথ যে-বাড়ির অতিথি, সেখানে তাঁর থাকার জন‍্য বেশ বড়সড় একটা ঘরের ব্যবস্থা হয়েছে। সে তুলনায় রানী ও অনিল চন্দের ঘরটি ছোট। রবীন্দ্রনাথ তাঁদের ডেকে ঘর বদলাবদলি করতে বললেন। স্বাভাবিক কারণেই তাঁরা ‘অরাজি’। রবীন্দ্রনাথের মানসম্মান ও বয়সের তুলনায় তাঁরা অতি সাধারণ। তাছাড়া, তাঁরা রবীন্দ্রনাথের সঙ্গী মাত্র, আমন্ত্রিত অতিথি নন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বড় ঘরটি ছেড়ে ছোটটিতে যাবেনই। শেষে রবীন্দ্রনাথ ঘরবদলের আসল কারণটি বলবেন। বড় ঘরে তিনি নিজেকে হারিয়ে ফেলেন। ফলে রানী ও অনিল চন্দকে ঘরবদল করতেই হল।

এর ছ’-দশক পরের একটি ঘটনা বেশ মনে পড়ে। তরুণ এক লেখক এসেছে বিশেষ একটি কাজে। তার আসার কথা ছিল আগের সপ্তাহে, কিন্তু হঠাৎ বেড়াতে যাওয়ার কারণে আসতে পারেনি। জিজ্ঞেস করি, সে পাহাড় বা সমুদ্র দেখতে গিয়েছিল না কি? উত্তরে তরুণটি বলে, সে এমন এক জায়গায় গিয়েছিল যেখানে একই সঙ্গে পাহাড় ও নদী দেখা যায়। তারপর একটু সময় চুপ থেকে বলে, সে সমুদ্র দেখতে ভালোবাসে না। সমুদ্রের এতই বিস্তার আর গভীরতা যে, সমুদ্রের কাছে গেলে তার নিজেকে খুবই ছোট ও তুচ্ছ বলে মনে হয়। নদীর কাছে গেলে সেটা মনে হয় না। নদী বড় হলেও উল্টোদিকের পাড় চোখে পড়ে। আর ছোট নদী হলে আরও ভালো লাগে। কেমন একটা অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়।

zoom
বর্ষায় নদী পার হচ্ছেন মহারাণা ফতেহ সিং। সাল: ১৮৯৩। শিল্পী: অজ্ঞাত

ওই তরুণের সেদিনের কথা বেশ মন ছুঁয়েছিল। তার কিছুদিন পরে সোনামুখীতে গোঁসাই মনোহর দাসের মেলা দেখতে গিয়েছি। শহরের কেন্দ্র থেকে কিছুটা দূরে বয়ে চলেছে শালী নদী। বড় নদীর সঙ্গে যোগ থাকার কারণে কোনও কোনও বছর বর্ষাকালে বন্যা হয়, তবে সে তেমন কিছু নয়। বছরের বাকি সময় মেদহীন তন্বীর মতো চেহারা। এই ক্ষীণতনু নদীর জল চান ও পান করে। নদীর ঘাটে নানা উৎসবও পালন করে। অল্প দূরেই সোনামুখীর শ্মশান। চিতার জ্বলন্ত কাঠ শরীরকে গ্রাস করার পর শালীর জল আগুনের তেষ্টা মেটায়। মৃতদেহের মতো আগুনও অদৃশ্য হয়। পাশেই শ্মশানকালীর মন্দির। কালীও শালীর জল পান করেন।

zoom
ডলু লেক

এমনই আর এক নদীর দেখা মিলেছিল শিলচরে। কথাকার ঝুমুর পাণ্ডে নিয়ে গিয়েছিল ডলু চা-বাগান দেখাতে। সেই সঙ্গে ডলু লেকও। মনে আছে, শহর ছেড়ে গ্রামের পথ ধরে যাচ্ছিলাম। ঘাড় তুলে লাল মোরগগুলো রাজকীয় ভঙ্গিতে দেখছিল। সন্দেহবাতিকে ভোগা কুকুরের পাল চোখ পাকিয়ে তাকাচ্ছিল। সে যাত্রায় শিলচরের সবুজ চা বাগান দেখেছিলাম, তবে ডিব্রুগড়ের চা বাগানের মতো বিস্তীর্ণ বলে মনে হয়নি। ডলু লেক অবশ্য বেশ অনেকখানি জায়গা জুড়ে। এতই বড় যে, তাকিয়ে পুরোটা ধরা যায়নি। লেক ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য নৌকা ছিল, কিন্তু তেমন ইচ্ছে জাগেনি। তবে লেকের উল্টোদিকে, সামান্য দূরে, একটা সরু চলমান ধারা চোখে পড়েছিল। নাম শুনলাম– মধুরা। মিষ্টি নাম! দুপুরের সূর্যের আলোয় নদীর স্বচ্ছ জলে আলোর ঝিলিক। নদীর গায়ে কোথাও এক টুকরো বালির চর, কোথাও তাও নেই। দু’-দিকেই মাটির পাড়। সে নদীতে একজন একটা ছোট ডিঙা বয়ে চলেছিল। এমনিতে নদী কারও নিজের হয় না। গ্রাম বা শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে গেলেও হয় না। হয়তো ভীষণ রকম লম্বা-চওড়া বলে। তবে ঘরোয়া চেহারা হলে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তখন ‘আমাদের নদী’ বলা যায়। যেমন রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে।’

zoom
কুঁওর নারায়ণ (১৯২৭-২০১৭)

হিন্দি ভাষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন কবি ছিলেন কুঁওর নারায়ণ। কবি হিসেবে যেমন তাঁর সংবেদনশীলতা, তেমনই উচ্চারণের মগ্নতা। জন্ম উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদে আর উচ্চশিক্ষা লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ে। উপনিষদ, সুফি সাহিত্য, বৌদ্ধধর্ম ও বস্তুবাদ ছিল তাঁর চর্চার অন্যতম চারটি ক্ষেত্র। সেই ছাপ রয়েছে তাঁর বিভিন্ন কবিতায়। সংকটের মধ্যেও মানুষের সম্ভাবনা দেখেছেন আর আপাত তুচ্ছের মধ‍্যে ভিন্নতর এক মূল‍্য ও মাত্রা। তিনি ‘নিমফুল’ নামে একটি কবিতা লিখেছিলেন। কবিতার শুরুতে বলছেন, বাড়ির উঠোনে যে বড় নিমগাছটা আছে তাতে ফুল ফুটলে গোটা বাড়ি তিতকুটে-মিষ্টি ঔষধির গন্ধে ভরে যায়। পরের স্তবকে লিখছেন, সাবানের বুদ্বুদের মতো সাদা ছোট ছোট ফুল বাতাসে ভেসে বেড়ায়। মা যখন উঠোনের তুলসী গাছে জল দিয়ে ফেরে, দু’-একটা ফুল মায়ের লম্বা চুলে আটকে যায়। শেষ স্তবকে পৌঁছে শোনান–

‘নিমফুল বললে
একটার বদলে
অনেকগুলো ফুল মনে ভেসে ওঠে ।
আমি কখনও তাদের বিবর্ণ হতে দেখিনি,
যদিও গুলমোহর বা রক্তকাঞ্চনের মতো
তেমন বর্ণময় কোনওদিনই ছিল না।
নিমফুলের ভিন্নতর এক মর্যাদা
কোথাও একটা আছে
বিশেষ করে অনুতাপ ছাড়া
তারা যখন গাছ থেকে
মাটিতে ঝরে পড়ে।’

এবার উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ‘টুনটুনি ও রাজার কথা’ একটু মনে করা যাক। রাজার সিন্দুকের টাকা বাগানে, রোদে ‘শুকুতে’ দিয়েছিল। সন্ধের সময় রাজার লোকেরা একটা টাকা তুলতে ভুলে যায়। বাগানের কোণে টুনটুনি পাখির বাসা ছিল। সে চকচকে টাকাটা দেখে তার বাসায় তুলে নিয়ে গেল। ভাবল, সে কত বড়লোক হয়ে গিয়েছে! সে বলতে লাগল–

‘রাজার ঘরে যে ধন আছে
টুনির ঘরেও সে ধন আছে!’

রাজার কথাটা পছন্দ হল না। হুকুম দিলেন টাকাটা টুনটুনির বাসা থেকে এনে সিন্দুকে ভরতে। সে হুকুম তামিল হতে টুনটুনি বলে–

‘রাজা বড় ধনে কাতর
টুনির ধন নিলে বাড়ির ভিতর!’

সেকথা শুনে রাজা টাকাটা টুনটুনির বাসায় রেখে আসতে বললেন। টাকা বাসায় ফিরে এসেছে দেখে টুনটুনি বলে–

‘রাজা ভারী ভয় পেল
টুনির টাকা ফিরিয়ে দিল।’

বাকি গল্প সবার জানা। রাজা রেগে গিয়ে কখনও টুনটুনিকে মেরে তার মাংস খেতে চাইলেন, কখনও জ‍্যান্ত পাখি জল দিয়ে গিলে খেতে চেষ্টা করলেন। এমনকী, সিপাইকে দিয়ে তরবারির ঘায়ে কেটে ফেলার চেষ্টাও করলেন। কিন্তু কিছুতেই সফল হলেন না। উল্টে তাঁর নিজের নাকটা কাটা গেল। টুনটুনি বলতে লাগল–

‘নাক-কাটা রাজা রে
দেখ তো কেমন সাজা রে!’

তারপর টুনটুনি অন‍্য দেশে উড়ে চলে গেল । রাজা তার আর কিছুই করতে পারল না।

zoom
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ‘টুনটুনি ও রাজার কথা’

রবীন্দ্রনাথের পছন্দের ছোট ঘর, শালী বা মধুরার মতো ছোট নদী, নিমগাছের মতো ছোট ফুল, টুনটুনির মতো ছোট পাখি আর এমনই কিছু মানুষের কথা লিখতে চাই, যারা প্রচলিত অর্থে তেমন ‘বড়’ নয়। তবু তাঁদেরও নিজস্ব ভাব আছে। ভাষা আছে। কথা আছে। সাত মণ তেল না-পুড়লেও আছে উৎসবও।

তাঁদের নিয়েই ‘মুখুজ‍্যের লিটফেস্ট’।

kuar narayan Rabindranath Tagore Rani chanda Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Upendrakishore Ray Chowdhury

Share this article on