শঙ্কু মহারাজের লেখা ভ্রমণকাহিনি বাংলা সাহিত্যে অমূল্য সংযোজন। শঙ্কুদা নিজেও সেটা বুঝতেন বলেই মনে হয়। তাই তিনি যে-রচনায় বেশি মানুষের কাছে পৌঁছতে পারবেন সেই লেখাতেই নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। সাহিত্য তো শেষ পর্যন্ত পাঠকের সঙ্গে লেখকের সম্পর্ক স্থাপন। শঙ্কু মহারাজের বেড়াতে যাওয়া আর সেই অভিজ্ঞতায় পুষ্ট কাহিনিগুলি আজও বাঙালি পাঠকের কাছে উপভোগ্য।
২৭.
প্রয়াগে সদ্য শেষ হল কুম্ভমেলা। ২০২৫ সালের মেলাকে ঘোষণা করা হয়েছিল মহাকুম্ভ বলে। প্রয়াগ, হরিদ্বার, নাসিক এবং উজ্জয়িনীতে ১২ বছর অন্তর পূর্ণকুম্ভমেলা হয়। ১২টি পূর্ণকুম্ভ চক্র সম্পূর্ণ করলে প্রয়াগে মহাকুম্ভমেলার আয়োজন হয়। লক্ষ-কোটি ধর্মপ্রাণ মানুষ কাতারে-কাতারে কুম্ভমেলায় যান। বাঙালিদেরও কুম্ভমেলা নিয়ে আগ্রহ প্রচুর। শুধু তীর্থভ্রমণ ও পবিত্র মুহূর্তে স্নানই নয়, কালকূট (সমরেশ বসু)-এর ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’ উপন্যাসখানি যাঁরা পড়েছেন সেইসব সাহিত্যামোদী মানুষের কাছে আবার কুম্ভমেলার আবেদন অন্যরকম। ‘এই ভারতের মহামানব’-এর এমন মিলনস্থল বোধহয় আর কোথাও দেখা যায় না।
কুম্ভ মানুষের মেলা। সমস্ত প্রতিকূলতাকে তুচ্ছ করে কুম্ভমেলা অমৃতের সন্তানের কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় মিলনমেলা। মহাকুম্ভে অনেকগুলি শাহি স্নানের দিন পড়ে, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয় মৌনী অমাবস্যার স্নান। ১৯৭৭ সালে আমি পূর্ণকুম্ভমেলায় গিয়েছিলাম। আমি গিয়েছিলাম বললে অবশ্য সবটা বলা হয় না। আমার সঙ্গে গিয়েছিলেন নিরঞ্জনকা (নিরঞ্জন দত্ত), রমণীদাদু (রমণীকান্ত দাস), কানাইদা (কানাইলাল জানা) এবং আমার আবাল্য সুহৃদ মনোরঞ্জন (মনোরঞ্জন সার)। সেই মেলা আমাদের কাছে আরও উপভোগ্য হয়েছিল কেননা আমাদের ১৬-১৭ জনের দলে ছিলেন বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের অন্যতম জ্যোতিষ্ক শঙ্কু মহারাজ। তিনিই ছিলেন আমাদের দলের প্রধান।
এমনিতে শঙ্কুদার ছিল পায়ের তলায় সর্ষে। প্রায়ই বেরিয়ে পড়তেন এখানে-ওখানে। দেশে-বিদেশে কত জায়গায় যে গিয়েছেন, তা হিসেব করা অসম্ভব। আর সেই সব জায়গা ঘুরে এসে তার ইতিহাস-পুরাণ-মিথ এবং সমসাময়িক বাস্তবতা নিয়ে তাঁর এক-একখানি বই বাংলার পাঠককে মুগ্ধ করত। আমাদের কুম্ভযাত্রার সময় বিবিধ তথ্যে-ব্যাখ্যায় তিনি কুম্ভমেলার রকমারি দিক নিয়ে সারা রাস্তাই নানা মন্তব্য করেছিলেন। এত তথ্য এবং তত্ত্ব তাঁর মাথায় ছিল যে যাত্রাপথের কষ্টটা দূর হয়ে গিয়েছিল সহজেই। যাত্রাপথের কষ্টের কথা তুললাম, কারণ সেবার আমরা কুম্ভে গিয়েছিলাম বাসে করে। কুণ্ডু ট্রাভেলসের পাঁচটা বাস মৌনী অমাবস্যার স্নান উপলক্ষে ছেড়েছিল কলকাতা থেকে। শঙ্কুদা যেহেতু ঢাকুরিয়ার বাবুবাগানে থাকতেন, তাই ঠিক হয়েছিল আমরা গড়িয়াহাট থেকেই বাসে উঠব। আমাদের দলে আমরা পাঁচজন এবং শঙ্কুদা ছাড়াও ছিলেন শঙ্কুদার বেশ কয়েকজন আত্মীয়-বন্ধু। সকাল ছ’-টায় গড়িয়াহাট থেকে বাস ছাড়ার কথা ছিল। আমরা সবাই সেই মতো পৌঁছে গিয়েছিলাম। তারপর শুরু হল যাওয়া-আসা মিলে ১৬০০ কিলোমিটারের যাত্রা।
শঙ্কুদার সহজ গদ্যে লেখা চমৎকার ভ্রমণকাহিনির আমি এতদিন শুধু প্রকাশক ও পাঠক ছিলাম, কুম্ভমেলায় গিয়ে বুঝলাম কেন তাঁর লেখা এত সাবলীল। যখন যে-বিষয়ে তিনি কথা বলতেন সেটা একেবারে প্রাঞ্জল করে বুঝিয়ে দিতেন এবং তাঁর নিজস্ব ঈশ্বরভাবনা থাকলেও লেখার মূল বিষয় ছিল মানুষ আর মানুষের জীবনের আলো-আঁধারির চিত্রণ। সেবার কুম্ভমেলায় যাওয়ার আগেই আমি তাঁকে বলে রেখেছিলাম ফিরে এসে যেন ভ্রমণকাহিনিটা আমিই পাই। তিনি সে-কথা রেখেছিলেন। ১৯৮০ সালের মে মাসে দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর লেখা ‘কুম্ভমেলায়’।
এই বইয়ের শুরুতেই তিনি লিখেছেন কুম্ভমেলা সূচনার গল্প। অমৃতমন্থনের পরে দেবরাজ ইন্দ্রের পুত্র জয়ন্ত যখন অমৃতকুম্ভ নিয়ে ছুটতে শুরু করেন তখন ‘অসুরগণ লক্ষ্য না করলেও ব্যাপারটা তাঁদের গুরুদেব শুক্রাচার্যের দৃষ্টি এড়ালো না। তিনি চিৎকার করে অসুরদের বললেন– ওরে মূর্খের দল, এত কষ্ট করে সমুদ্রমন্থন করছিস্ আর ঐ দ্যাখ্ জয়ন্ত অমৃতকুম্ভ নিয়ে পালাচ্ছে! ঐ অমৃত সমুদ্রমন্থনের সারবস্তু। শিগগীর ছুটে যা, জয়ন্তর কাছ থেকে অমৃতকুম্ভ কেড়ে নিয়ে আয়!’ শঙ্কুদার বক্তব্য ছিল দেবাসুরের লড়াই প্রকৃতপক্ষে ন্যায়ের জন্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের লড়াই। কুম্ভমেলার সূচনাকথাতেই তিনি লিখেছেন–
‘পালাবার সময় জয়ন্ত যে চার জায়গায় অমৃতকুম্ভ নামিয়ে বিশ্রাম করেছিলেন, সেই জায়গা চারটি হলো– হরিদ্বার, প্রয়াগ, নাসিক ও উজ্জয়িনী। কথিত আছে, অমৃতকুম্ভ নামিয়ে রাখবার সময় হরিদ্বার ও প্রয়াগে কয়েক ফোঁটা করে অমৃত পড়ে যায়। জয়ন্ত তিনদিন ছোটার পরে এক-একটি জায়গায় পৌঁছে ছিলেন এবং বারোদিন বাদে ফিরে এসেছিলেন। দেবতাদের একদিনে মানুষের এক বছর। তাই বারো বছর বাদে এই চার-জায়গার কোনওখানে কুম্ভমেলা হয় পূর্ণকুম্ভ। হরিদ্বার ও প্রয়াগে কয়েক ফোঁটা অমৃত পড়ে গিয়েছিল বলে কেবল এই দু’জায়গাতেই প্রতি তিন বছর [ছ-বছর] বাদে বাদে অর্ধকুম্ভ অনুষ্ঠিত হয়।’
আসলে আমাদের মতোই শঙ্কুদাও নিছক পুণ্য সঞ্চয়ের জন্য কুম্ভে যাননি। লক্ষ-লক্ষ পুণ্যার্থীর স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে ভারতের শাশ্বত আত্মাকে খুঁজে বের করাই তাঁর লক্ষ্য ছিল। তাঁর মুখেই শুনেছি একালের কুম্ভমেলার রূপকার আদি শঙ্করাচার্য। তিনি ভারতের চারপ্রান্তে চারটি মঠ স্থাপন করেন। সেই মঠের প্রধানদেরও শঙ্করাচার্য বলা হয়। আদি শঙ্করাচার্য আবার সন্ন্যাসীদেরও দশটি সম্প্রদায়ে ভাগ করে দিয়েছেন– যাকে বলা হয় দশনামী সম্প্রদায়, যাঁরা সাতটি আখড়ায় বাস করেন। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের এবং নানা আখড়ায় বসবাসকারী সন্ন্যাসীদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতেই আদি শঙ্করাচার্য কুম্ভমেলাকে দশনামী সম্প্রদায়ের মিলনমেলা বলে নির্দিষ্ট করে গিয়েছিলেন। আবার আমাদেরই প্রশ্নের উত্তরে এই মেলার প্রাচীনত্ব নিয়ে বলেছিলেন, এই মেলা না কি রাজা হর্ষবর্ধনেরও আগে চালু হয়েছে। ‘কুম্ভমেলায়’ তিনি লিখেছেন–
‘কবে থেকে এই মেলা? সঠিক উত্তর জানা নেই কারও। কিন্তু রামায়ণ-মহাভারতের কথা বাদ দিলেও বলা যায়– কুম্ভ বিশ্বের প্রাচীনতম ধর্মমেলা। কারণ বিখ্যাত চৈনিক পরিব্রাজক ইউয়ান চোয়াঙের [হিউয়েন সাং] ভ্রমণ-বিবরণকে নিশ্চয়ই আমরা ইতিহাস বলে স্বীকার করব। তিনি তাঁর বিবরণে ৬৪৪ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত প্রয়াগের মেলার একটি চমৎকার বর্ণনা রেখে গিয়েছেন। এটি ভারতীয় মেলার প্রাচীনতম ইতিহাস।
ইউয়ান চোয়াঙ লিখে গিয়েছেন– সেবারের মেলায় নাকি পাঁচলক্ষ মানুষ সমবেত হয়েছিলেন। এই সংখ্যাটি সম্পর্কে অবশ্য সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। কারণ সেকালের জনসংখ্যায় পাঁচলক্ষ পুণ্যার্থী খুবই বেশি। তার ওপর সেই পরিবহনহীন যুগে অত মানুষের প্রয়াগে আসাও সম্ভব নয়। তাহলেও এ সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই যে, কুম্ভমেলায় তখনও অগণিত মানুষের আগমন ঘটত।
সপ্তম শতাব্দীর সেই মেলায় ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত পুণ্যার্থীদের মধ্যে দেশের দরিদ্রতম মানুষ যেমন ছিলেন, তেমনি ছিলেন স্বয়ং হর্ষবর্ধন। ছিলেন সাধারণ মানুষ থেকে রাজসভার সদস্যগণ। ছিলেন যাজক, দার্শনিক পণ্ডিত ও সন্ন্যাসীবৃন্দ। মহারাজা হর্ষবর্ধন প্রয়াগের ত্রিবেদী সঙ্গমে দাঁড়িয়ে রাজকোষের সমস্ত অর্থ দরিদ্র ও সাধুদের দান করে দিতেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ছোটোবোন রাজশ্রীর কাছে থেকে একখানি কাপড় চেয়ে নিয়ে তাঁর রাজপোশাকটি পর্যন্ত বিলিয়ে দিতেন। তবে হর্ষ কেবল কুম্ভমেলা উপলক্ষেই এই দানযজ্ঞ করতেন, তা নয়। প্রায় প্রতি পাঁচবছর অন্তরই নাকি প্রয়াগে তিনি এমন দান করতেন। ৬৪৪ খ্রিস্টাব্দের মেলায় তিনি যে দানযজ্ঞ করেছিলেন সেটি তাঁর রাজত্বকালের ষষ্ঠ অনুষ্ঠান।’
কুণ্ডু ট্রাভেলসের আতিথেয়তায় আর কুম্ভমেলায় পৌঁছে সেখানকার পরিবেশ দেখে মন ভরে গিয়েছিল। সেবার ১৯ জানুয়ারি ছিল মৌনী অমাবস্যা। আমরা উঠেছিলাম নদীর ধারে মেলার মাঠে তৈরি করা সারি-সারি তাঁবুর কয়েকটিতে। জানুয়ারি মাসের কনকনে ঠান্ডায় প্রয়াগের মেলায় যারা তাঁবুতে থাকেনি তাদের সেই অভিজ্ঞতা লিখে বোঝানো মুশকিল। চারিদিকে অসংখ্য লোক, মাইকে ঘোষণা চলছে লাগাতার, এদিকে-ওদিকে অসংখ্য মঠ-আখড়া। আমরা স্নান করেছিলাম বুধবার। তার আগের রাত থেকে আবার শুরু হয়েছিল বৃষ্টি। তাঁবুতে শুয়েও ভিজেছি, ভোরবেলা স্নানেও বেরিয়েছিলাম বৃষ্টি মাথা করে। নাগা সন্ন্যাসী থেকে শুরু করে দশনামী সম্প্রদায়ের শোভাযাত্রা করে স্নান শেষের পর আমরা বিপুল জনতার চাপে এগিয়ে চললাম নদীর দিকে। বৃষ্টির মধ্যেই বরফ ঠান্ডা জলে স্নান সেরে আবারও অগণিত পুণ্যার্থীর ভিড় ঠেলে ফিরে এলাম নিজেদের তাঁবুতে। তীর্থে অন্তত তেরাত্তির বাস করাই বিধি। আমরা তাই তিন দিন ওখানে থেকে তারপর ফেরার বাসে উঠেছিলাম।
মেলায় যে ক’-দিন ছিলাম, একটু রাতের দিকে শঙ্কুদা আমাদের নিয়ে বেরুতেন মেলার মাঠটা ঘোরাবেন বলে। সন্ধের পর ভিড় একটু কমে যেত। সেরকমই একদিন আমরা গিয়েছিলাম আনন্দময়ীর মায়ের কাছে। আমাদের তাঁবু থেকে আনন্দময়ী মায়ের তাঁবু খুব দূরে ছিল না। আমার মনে আছে সেখানে গিয়ে আমি মা-কে প্রণাম করে অনেকক্ষণ বসে তাঁর কথা শুনেছিলাম। আনন্দময়ী মা তাঁর প্রসাদস্বরূপ আমার হাতে একখানি আপেল দিয়েছিলেন। আশ্চর্যের ব্যাপার, কলকাতায় ফিরে সেবছরই এমন একটা সুযোগ পেয়ে গেলাম যে দে’জ পাবলিশিং থেকে গঙ্গেশচন্দ্র চক্রবর্তী-কথিত ‘শ্রীশ্রীআনন্দময়ী মা কথামৃত’ বইটির ১ম খণ্ড প্রকাশ করতে পেরেছিলাম। চার বছর পরে সে-বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। অনেক পরে ২০০১ সালে ‘শ্রীশ্রীআনন্দময়ী মা কথামৃত’র অখণ্ড সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। আনন্দময়ী মা-কে নিয়ে গঙ্গেশচন্দ্র চক্রবর্তীর আরেকটি বই– ‘আনন্দময়ী মা লীলাপ্রসঙ্গে’ও আমরা প্রকাশ করেছি। সেবারের কুম্ভমেলায় গিয়ে আনন্দময়ী মায়ের সাক্ষাৎ পাওয়াটা আমার কাছে বাড়তি পাওনা ছিল। এইসব টুকরো-টুকরো স্মৃতি মনে পড়ায় এখন বুঝতে পারছি, জীবনে বেড়াতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তো কম নেই, কিন্তু শঙ্কুদার সঙ্গে কুম্ভ যাওয়ার স্মৃতি কোনওদিন ভুলব না।
শঙ্কু মহারাজের সঙ্গে আমার আলাপ কিন্তু সাতের দশকের একেবারে গোড়ায়। সেসময় আমি সময় পেলেই বইপাড়ার প্রবীণ প্রকাশকদের কাছে যেতাম তাঁদের নানা অভিজ্ঞতার কথা শুনতে। মিত্র ও ঘোষ-এ গিয়ে আমি গজেন্দ্রকুমার মিত্রের সঙ্গে মাঝে-মাঝে কথা বলতাম। সুমথনাথ ঘোষকেও ওই দোকানে দেখেছি, তবে তাঁর সঙ্গে খুব কমই কথা হয়েছে। গজেনবাবু আমাকে স্নেহ করতেন আর অনেক রকম পরামর্শও দিতেন, তাঁর অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার ছিল বিশাল। এই দুই খ্যাতনামা লেখক এবং বন্ধু একসঙ্গে মিত্র ও ঘোষ-এর মতো একটা প্রকাশনা সংস্থা শুরু করে সেই প্রতিষ্ঠানকে যে-উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন তার তুলনা বাংলা প্রকাশনা জগতে খুঁজে পাওয়া কঠিন। একদিন গজেনবাবুর কাছেই বসেছিলাম এমন সময় মিত্র ও ঘোষ-এ এলেন তখনকার বিখ্যাত ভ্রমণ-লেখক শঙ্কু মহারাজ। ছিপছিপে চেহারা, চোখে বড় ফ্রেমের চশমা, বুদ্ধিদীপ্ত মানুষটিকে আমার প্রথম দর্শনেই আমার খুব ভালো লেগে যায়। যদি খুব ভুল না করি, গজেনবাবুকে শঙ্কুদা কাকাবাবু বলে ডাকতেন। তার অনেক আগেই মিত্র ও ঘোষ থেকে ‘বিগলিত করুণা জাহ্নবী যমুনা’র মতো বই বেরিয়ে গেছে। আবার রবীন্দ্র লাইব্রেরি থেকে ‘মধু-বৃন্দাবনে’ বা ‘চতুরঙ্গীর অঙ্গনে’র মতো বইও প্রকাশিত হয়েছে। এই রবীন্দ্র লাইব্রেরির কর্ণধার ছিলেন রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস। এখন যেখানে ‘বিদ্যাসাগর টাওয়ার’ হয়েছে ঠিক সেই জায়গাটিতে তাঁর দোকান ছিল।
ভ্রমণসাহিত্যের পাঠক বাংলাতে চিরকালই আছেন। আর শঙ্কুদার প্রথম কয়েকটি বই বেরুনোর পরেই উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, প্রবোধকুমার সান্যাল বা ‘রম্যাণি বীক্ষ্য’র লেখক সুবোধকুমার চক্রবর্তীর মতো তাঁকেও বাংলার পাঠক সাদরে বরণ করে নিয়েছিলেন।
আমি প্রকাশনার প্রথম বছর থেকেই চাইছিলাম শঙ্কুদার একটা বই করতে। কিন্তু একেবারে নতুন প্রকাশককে তিনি বই দেবেন কি না এই রকম ভাবছিলাম। শেষ পর্যন্ত তাঁকে একটি বই করার প্রস্তাব দিতে তিনি সহজেই রাজি হয়ে যান এবং ১৯৭০ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরেই ঠিক হয়ে যায় যে পরের বছরের শুরুর দিকেই দে’জ পাবলিশিং থেকে তাঁর আনকোরা নতুন বই প্রকাশিত হবে। সেইমতো ১৯৭১ সালের এপ্রিলে, বাংলা নববর্ষের সময় প্রকাশিত হল– ‘লীলাভূমি লাহুল’। সে বইয়ে প্রকাশকের কথায় লিখেছিলাম–
“বাংলাসাহিত্যে যে কয়জন শক্তিমান লেখকের আবির্ভাব হয়েছে, শঙ্কু মহারাজ তাঁদের অন্যতম। তিনি যেমন বাংলা ভ্রমণ-সাহিত্যের পরিধিকে প্রসারিত করেছেন তেমনি আপন অধ্যবসায় ও প্রতিভাবলে নিজেকে এযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হিমালয়-ভ্রমণ কাহিনীকার রূপে করেছেন স্বপ্রতিষ্ঠিত। ‘লীলাভূমি লাহুল’ তাঁর ত্রয়োদশ গ্রন্থ এবং অষ্টম হিমালয়-ভ্রমণ কাহিনী।
ভারতীয় হিমালয়ের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় উপত্যকা লাহুল। হিমাচল প্রদেশের এই উপত্যকাটির উচ্চতা দশ হাজার ফুটের ওপরে। সে রিক্ত কিন্তু সুন্দর, দুর্গম কিন্তু দুর্লভ, জনবিরল কিন্তু জনপ্রিয়। তার তুষারাবৃত পর্বতমালা, হিমবাহ ও গিরিপথ পর্যটক পর্বতারোহীদের পরমপ্রিয়। তার গুরু-ঘাঁতাল, কারদাং, তাম্বুল ও গেমুর প্রভৃতি গুম্ফা পুরাবিদদের পরম বিস্ময়।
আলোচ্য গ্রন্থে লেখক তাঁর স্বভাবসিদ্ধ সরল ভাষা ও সাবলীল ভঙ্গিতে সেই বিচিত্র-সুন্দর লাহুল উপত্যকার কথা বলেছেন জেসুইট মিশনারীদের (১৬২৪ খ্রীঃ) হিমালয়-যাত্রা থেকে শুরু করে, মহিলা লাহুল পর্বতাভিযান (১৯৭০ খ্রীঃ) পর্যন্ত লাহুল হিমালয়ের প্রায় সমস্ত অভিযানের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়েছেন। বলেছেন লাহুলের নদী-হ্রদ, ফুল ফল, পশু-পাখী আর মানুষের কথা; লাহুলীদের ভাষা, সংস্কৃতি, সমাজ ও ধর্মের কথা; রোতাং, খোকসার, শিগু, গোন্ধলা, তাণ্ডি, থিয়েট, ত্রিলোকনাথ, কেলং, জিসপা, পাতসেও, রড়ালাচা, চন্দ্রাতাল, কুনজুম ও কাজা প্রভৃতি রমণীয় স্থানের কথা। বলেছেন সি. জি. ব্রুস, উইলিয়ম মুরক্রফট, এ. ই গাণথার, জয়েস ডানশীথ, জোসেফাইন স্কার, এইচ. ভি. বহুগুণা এবং সুজয় গুহ ও কমলা সাহার কথা।…”
সাধারণ মানুষের কাছে লাহুল তখন এত পরিচিত জায়গা ছিল না। তবু শঙ্কুদার লেখার গুণে বইটি প্রকাশের সঙ্গে-সঙ্গেই পাঠকের পছন্দের বই হয়ে ওঠে। এই বইয়ের সূত্রেই তাঁর সঙ্গে আমার চিঠিপত্রে যোগাযোগ শুরু হয়। আমার সঞ্চয়ে তাঁর সবচেয়ে পুরোনো চিঠিটি ১৯৭১ সালের ২১ জানুয়ারি লেখা। সেই চিঠিতে তিনি লিখেছেন–
‘সবিনয় নিবেদন,
৩৫ পৃষ্ঠা পাণ্ডুলিপি এবং প্রচ্ছদপটের ফটো পাঠালাম। বাঁদিক থেকে রেখে ডানদিকের খানিকটা বাদ দিতে হবে। ওপরের আকাশ বা নিচের মাটি শিল্পী হাতে এঁকে খানিকটা বাড়িয়ে নিতে পারেন। আমি আগামীকাল বাইরে চলে যাচ্ছি। ৪/৫ দিন পরে ফিরে আসব।
আমার অফিসের ঠিকানা নিচে দিলাম। জায়গাটা এই ভদ্রলোকের কাছ থেকে জেনে নেবেন।
শুভেচ্ছান্তে
বিনীত,
শঙ্কু মহারাজ’
চিঠিটি তিনি কার হাত দিয়ে পাঠিয়েছিলেন, আজ আর মনে পড়ছে না। তবে শঙ্কুদা ব্যক্তিজীবনে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী ছিলেন। তিনি হাইকোর্টের অফিসিয়াল লিকুইডেটরের দপ্তরে কর্মরত ছিলেন। তাঁর অফিস ছিল ওল্ড কোর্ট-হাউস স্ট্রিটে। প্রসঙ্গত বলে রাখি, তাঁর পোশাকি নাম জ্যোতির্ময় ঘোষদস্তিদার, সম্ভবত ডাকনাম শঙ্কুর সঙ্গে মহারাজ যোগ করে তিনি নিজের লেখক-নামটি গড়ে নিয়েছিলেন। ‘লীলাভূমি লাহুল’ বইটির প্রচ্ছদ তাঁর পাঠানো ছবি অবলম্বনে তৈরি করে দিয়েছিলেন শচীন্দ্রনাথ বিশ্বাস। এই শচীন্দ্রনাথ বিশ্বাস ছিলেন রবীন্দ্র লাইব্রেরির রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাসের ভাই। তিনি শঙ্কুদার বেশ কিছু বইয়ের মলাট করেছিলেন। বইটিতে শঙ্কুদার অধিকাংশ বইয়ের মতোই একটি মানচিত্র এবং বেশ কিছু সাদা-কালো ছবিও ছাপা হয়েছিল।
এর পরের বছর ‘বিগলিত করুণা জাহ্নবী যমুনা’ চলচ্চিত্রায়িত করেন পরিচালক হীরেন নাগ। ছবির মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়। ছবিটির শুটিং পর্বে লেখকও অভিনেতা-কলাকুশলীদের সঙ্গী হন। সেই অভিজ্ঞতার ফসল ‘গঙ্গা-যমুনার দেশে’ বইটি। ১৯৭২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি একটি চিঠিতে দেখছি লিখছেন, ‘… আর একটু তাড়াতাড়ি না করলে বোধহয় বৈশাখে বই বের করা সম্ভব হবে না। আমার Proof-এর সঙ্গে আগের কাটা-প্রুফটা পাঠিয়ে দেবেন।…’ এই সময় শঙ্কুদা মাঝে-মধ্যে আমাদের দোকানে আসা শুরু করেন। অনেক সময় তাঁর সঙ্গী হতেন আরেক প্রখ্যাত লেখক ‘নটরাজন’ (হরিশচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়)। নটরাজন ছিলেন কলকাতা পুলিশের ডি এস পি, ভবানীভবনে ছিল তাঁর অফিস। শঙ্কুদা আর নটরাজনের বেশ বন্ধুত্ব ছিল। কয়েক বছর পর থেকে নটরাজনেরও বেশ কিছু বই দে’জ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। নটরাজন ছিলেন মূলত ক্রাইম ফিকশন লেখক। তাঁর বিখ্যাত যে বইগুলি আমি প্রকাশ করেছিলাম তার মধ্যে আছে– ‘স্কটল্যাণ্ড ইয়ার্ড’, ‘পুলিশ সাহেব’, ‘পুলিশেশ্বর’, ‘পুলিশোত্তম’, ‘পুলিশাসুর’, ‘লালবাজার’, ‘ওরা সেই পুলিশ’ ইত্যাদি।
১৯৭৩ সালের অগাস্ট মাসে প্রকাশিত হয় শঙ্কুদার সম্ভবত একমাত্র উপন্যাস ‘ভাঙা দেউলের দেবতা’। সতীন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রচ্ছদে বইটি ছেপেছিলাম বাণীশ্রী প্রেস থেকে। ‘ভাঙা দেউলের দেবতা’ শঙ্কুদা তাঁর সহধর্মিণী ‘শ্রীমতী বাণী ঘোষ দস্তিদার-কে’ উৎসর্গ করেন। এরপর থেকে প্রায় প্রতি বছরই তাঁর বই দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত হতে থাকে। একে-একে ছাপা হতে থাকে ‘রাজভূমি রাজস্থান’, ‘পুণ্যতীর্থ-প্রভাস’, ‘হিমতীর্থ-হিমাচল’, ‘অমরতীর্থ অমরনাথ’, ‘দ্বারকা ও প্রভাসে’। আবার ১৯৮২ সালে রবীন্দ্র লাইব্রেরির বিখ্যাত বই তিন খণ্ডে ‘মধু-বৃন্দাবনে’ তিনি আমাদের দিলেন পুনর্মুদ্রণ করার জন্য। আমি ১৯৮৪ সালে বইগুলিকে এক মলাটে নিয়ে এসে একটি অখণ্ড সংস্করণও প্রকাশ করি। ‘মধু-বৃন্দাবনে’র অখণ্ড সংস্করণটির উৎসর্গপত্রে শঙ্কুদা লিখেছিলেন, ‘যাঁরা আমাকে বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন,/ যাঁরা আমাকে বৃন্দাবনের সঙ্গে পরিচিত করিয়েছেন,/ সেই পরম শ্রদ্ধেয় সুসাহিত্যিকদ্বয়/ শ্রীগজেন্দ্রকুমার মিত্র/ ও/ শ্রীসুমথনাথ ঘোষ-কে’।
১৯৮৬ সালে আমি পুনর্মুদ্রণ করেছিলাম শঙ্কু মহারাজের ‘অমরাবতী আসাম’। নিখিল ভারত বঙ্গসাহিত্য সম্মেলনের জোড়হাট অধিবেশনে যোগ দিতে গিয়ে তিনি জোড়হাট, শিবসাগর, ডিব্রুগড়, গৌহাটি, কামাখ্যা দেখে এসেছিলেন। এই বইয়ে শঙ্কুদা মোটামুটিভাবে অসম সম্পর্কে আমাদের ধারণা অনেকখানি স্পষ্ট করতে পেরেছিলেন। তাতে সহায়ক হয়েছে তাঁর স্বভাবসিদ্ধ প্রাঞ্জলভঙ্গিতে একটি ভূখণ্ডের নিবিড় পরিচয় ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা। অসমের সাংস্কৃতিক জীবন, সাহিত্য, ইতিহাস, ধর্ম, নিসর্গ, অরণ্য, মন্দির, পুরাকীর্তি, লোকসংস্কৃতি, আতিথ্যপরায়ণতা– কোনও প্রসঙ্গই তাঁর দৃষ্টির আড়ালে থাকেনি।
‘অমরাবতী আসাম’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল মণ্ডল বুক হাউস থেকে, সম্ভবত ১৯৭৭ সালে। মণ্ডল বুক হাউস থেকে প্রকাশের পর বইয়ের একটি কপি শঙ্কুদা তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর দপ্তরে পাঠান। প্রধানমন্ত্রী সেই বই পেয়ে ৭ জানুয়ারি ১৯৭৭ সালে যে চিঠি লেখেন সেটিও সেই সংস্করণে সংযোজিত হয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধী লিখেছিলেন–
‘Dear Shri Sancu Maharaj,
I have received your letter and your book “Amarabati-Assam”. What a wonderful country we live in. The variety
Of climate, land-scape and custom and our extraordinary Cultural wealth provided much material for writers and artists. Travelogues also help in national integration.
With good wishes, …’
‘অমরাবতী আসাম’-এর দে’জ সংস্করণ প্রকাশের সাত বছর পর ১৯৯৩ সালের নভেম্বর মাসের ১৮ তারিখে আমার নিজের লেখা একটি চিঠির খসড়া দেখতে পেয়ে মনে পড়ে গেল যে, আমি একসময় শঙ্কুদার ‘অমরাবতী আসাম’ বইটি অসমিয়া ভাষায় অনুবাদ করে বিক্রির ব্যবস্থা করেছিলাম। ‘অমরাবতী আসাম’-এর এই অনুবাদটি দে’জ পাবলিশিং-এর একমাত্র অসমিয়া ভাষার বই। সেসময় গৌহাটির সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে আমার বেশ হৃদ্যতা হয়। তিনি ‘গৌহাটি বুক ডিপো’ নামে একটি দোকান চালাতেন। বাংলা বই কেনার সূত্রে আমাদের দোকানে তাঁর যাতায়াত ছিল। আমার ওই চিঠিটি সেই সুভাষদাকেই লেখা। চিঠিতে লিখেছিলাম–
‘ প্রিয় সুভাষদা,
৴রী বিজয়া দশমী ও দীপাবলীর আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা গ্রহণ করবেন এবং সবাইকে জানাবেন। আশা করি আপনারা সবাই মায়ের কৃপায় কুশলে আছেন। আমরা এবারে পুজোর পর বোম্বে-গোয়া-কোচিন বেড়াতে গিয়েছিলাম। গত পরশু সন্ধ্যায় কলকাতায় পৌঁছেছি। সবাই ভালো আছি। শঙ্কুদার কাছে আপনার সব খবর পেলাম। তিনি এবার প্রায় ২১/২ মাস আসামে ছিলেন এবং বরপেটা, কোকড়াঝাড়, নগাঁও, তেজপুর, জোড়হাট ও গৌহাটি সহ নানা জায়গায় গিয়েছিলেন। তিনি দেখেছেন যে আসামে তাঁর জনপ্রিয়তার প্রধান স্তম্ভ “বিগলিত করুণা জাহ্নবী যমুনা”র অসমীয়া সংস্করণ। দুঃখের কথা “অমরাবতী আসাম” আসামের উপর লেখা হলেও বহু শিক্ষিত অসমীয়া এখনও বইটির নাম পর্যন্ত শোনেননি। এই বইটির অসমীয়া অনুবাদ প্রকাশ করার জন্য ইতিপূর্বে বেশ কিছু ব্যক্তি/সংস্থা শঙ্কুদা এবং আমাদের অনুমতি চেয়েছেন। আমরা সে অনুমতি দিতে পারিনি।
শঙ্কুদার কাছ থেকে এই সব সংবাদ জানার পর আমাদের মনে হচ্ছে যে ভালো কোনো লোককে দিয়ে “অমরাবতী আসামে”র অসমীয়া অনুবাদ করিয়ে আমরাই প্রকাশ করি। কিন্তু আপনার পরামর্শ এবং সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া এই পরিকল্পনা কার্যকরী করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ, আপনি যদি “অমরাবতী আসাম”-এর অসমীয়া সংস্করণ আসামে পরিবেশনের দায়িত্ব নিতে সম্মত থাকেন তাহলে আমরা এ-কাজে অগ্রসর হতে পারি। বলা বাহুল্য, এ পরিকল্পনা কার্যকরী হলে আমরা ধীরে ধীরে আরো কিছু জনপ্রিয় বাংলা বইয়ের অসমীয়া অনুবাদ প্রকাশের বাসনা করছি। তখনও আপনাকে আমাদের পাশে থাকতে হবে। পরিবেশনের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই বিজ্ঞাপন এবং প্রচারের দায়িত্ব আমাদের নিতে হবে। বইটির কত কপি (১১০০/২২০০) ছাপা যাবে, জানাবেন।
আপনার উত্তর পাওয়ার পর আমরা বইটির অনুবাদের কাজ শুরু করবো।…’
পরের মাসে প্রায় একই প্রস্তাব-সহ সুভাষদাকে আরেকটি চিঠিও লিখেছিলাম। আজ আর মনে পড়ছে না বইটি অসমীয়া ভাষায় কবে বেরিয়েছিল বা কে সেই বইটির অনুবাদ করেছিলেন। তবে ১৯৯৫ সালের বইমেলার সময় আবার দে’জ থেকে প্রকাশিত হয় শঙ্কুদার লেখা ‘অলকাপুরী আসাম’। এর পরের বছরই পুনর্মুদ্রণ করেছিলাম ‘মায়াময় মেঘালয়’। অনেক পরে যখন শঙ্কুদার ‘ভ্রমণে ভারত’ গ্রন্থাবলির পরিকল্পনা হল, তখন উত্তরপূর্ব-ভারত নিয়ে লেখা এই তিনটি বই একত্রে ২০০১ সালে প্রকাশিত হয়।
১৯৯৭ সালের এপ্রিল মাসে শঙ্কুদা আসামের কামরূপ জিলা সাহিত্য সভার তরফে বিশেষ সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তাঁর হাত দিয়ে সম্ভবত ‘কামরূপ রত্নমালা’ বইয়ের দু’টি খণ্ড আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়। কিন্তু এই সভায় যেতে পেরে তিনি খুবই খুশি হয়েছিলেন। আমাকে গৌহাটি থেকে ২৮.৪.৯৭ এবং পরদিন কলকাতায় ফিরে এসে দু’টি চিঠি লিখে তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন। এই সভা উপলক্ষে তিনি ছিলেন ‘স্টেট গেস্ট’। ওখানকার পত্রপত্রিকাতেও তাঁকে নিয়ে সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।
‘মায়াময় মেঘালয়’ আগে ছিল নাথ পাবলিশিং-এর বই। তখন এটি দু’-খণ্ডে ছিল। আমি বইটির অখণ্ড সংস্করণ প্রকাশ করেছিলাম। নাথ পাবলিশিং-এর সমীর নাথকে লেখা একটি চিঠির খসড়াও আমার ফাইলে পেলাম। ১৩ মার্চ ১৯৯৫ সালে দে’জের প্যাডে আমাদের দপ্তরে বসে শঙ্কুদা সেই চিঠিতে লিখেছিলেন–
‘প্রিয় সমীর,
এখানে এসে সুধাংশুর কাছ থেকে খবর পেলাম, তুমি নাকি মায়াময় মেঘালয় (খাসি পাহাড়) পর্বের ফর্মা খুঁজে পেয়েছো। সংবাদটা তো আমার আগে জানার কথা। সুতরাং তোমার আচরণে অত্যন্ত বিস্ময় বোধ করছি। সুধাংশুকে তুমি বলেছো, আমার সঙ্গে দেখা করবে। আমি তোমাকে চিঠি লিখে, দোকানে গিয়ে, বইমেলার স্টলে গিয়ে বারবার তোমাকে একবার দেখা করার অনুরোধ জানিয়ে এসেছি। তুমি আমার সে অনুরোধ আজও রক্ষা করো নি, অথচ সুধাংশু মায়াময় মেঘালয় (অখণ্ড) সংস্করণ প্রকাশ করবে শুনে তার কাছে ছুটে এসেছো। আমি তো গত চিঠিতে তোমাকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিয়েছি। আর তুমি যখন বই দু’খানি পৃথক ভাবে প্রকাশ করেছো, তখন অখণ্ড সংস্করণে তোমার আপত্তি করার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে না। অতএব দে’জ ‘মায়াময় মেঘালয়’ (অখণ্ড) সংস্করণ প্রকাশ করবে। তোমাকে পুনরায় অনুরোধ করছি, অবিলম্বে ফোনে দিন এবং সময় ঠিক করে আমার সঙ্গে একবার দেখা ক’রো। না হলে আমি ‘মায়াময় মেঘালয়’ পৃথক পর্বগুলি সম্পর্কেও নতুন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হব। কারণ কোন লেখক তার কোন বইয়ের অকারণ মৃত্যু চাইতে পারে না।…’
শঙ্কুদার ভ্রমণ কাহিনির বিষয়বস্তু কিন্তু কেবলই ভারতের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে তা কিন্তু নয়। ১৯৮৮ সালে আমি প্রকাশ করি তাঁর ফ্রান্স ভ্রমণের কাহিনি– ‘এক ফরাশি নগরে’। আবার, ১৯৯১ এবং ১৯৯২ সালে পরপর প্রকাশিত হয় ‘বেলজিয়াম থেকে বাভেরিয়া’ এবং ‘উর্বশী এথেন্স’।
১৯৯৮-এর বইমেলার সময় দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত হয় শঙ্কুদার ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’। বইটির ভূমিকায় অধ্যাপক অরুণকুমার বসু লেখেন–
‘পর্যটকের পরিক্রমা ভূগোলের মৃদ্লোকে, কথাসাহিত্যিকের পরিক্রমা মানবের হৃদ্লোকে। এই উভয়ের সহাবস্থান একই লেখকের ভিতর, এমন ঘটনা দুর্লভ তবে দুঃসাধ্য নয়। বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের বিশিষ্ট লেখক শঙ্কু মহারাজের শ্রেষ্ঠ গল্পের এই সংকলনটি ভূপর্যটনবৃত্তান্ত-বিশারদের লোকজীবনপরিক্রমার একটি স্বাদু ও সাধু উদাহরণ। শঙ্কু মহারাজ তাঁর সাহিত্যপ্রতিভাকে ভ্রমণঅভিজ্ঞতার পঞ্জীকরণে নিবিষ্ট না করলে আমরা তাঁর হাত থেকে গল্প-উপন্যাসজাতীয় রচনা আরও বেশি পরিমাণে পেতাম– বাংলা কথাসাহিত্য সমৃদ্ধতর হত। শঙ্কু মহারাজের শ্রেষ্ঠ গল্পে সংকলিত লেখকের ভ্রমণ-ব্যতিরিক্ত সাহিত্যসৃষ্টির কয়েকটি নির্বাচিত নিদর্শন সেই বিশ্বাস আরও দৃঢ় করে তোলে। এ গ্রন্থে তাঁর কিছু সাম্প্রতিক কিছু-পুরনো মিলিয়ে গোটা পনেরো গল্প স্থান পেয়েছে, যার অধিকাংশই লেখকের প্রত্যক্ষ ভ্রমণ-অভিজ্ঞতার জগৎ থেকে ঈষৎ স্বতন্ত্র বৃত্তের বাসিন্দা।…’
যদিও আমার বিশ্বাস একজন লেখক যখন গল্প-উপন্যাস লেখার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নিজেকে তা থেকে বিরত রেখে ক্রমাগত অনবদ্য সব ভ্রমণকাহিনি লিখে গেছেন, তখন তাঁর সেই সিদ্ধান্ত ভেবেচিন্তেই নেওয়া। শঙ্কু মহারাজের লেখা ভ্রমণকাহিনি বাংলা সাহিত্যে অমূল্য সংযোজন। শঙ্কুদা নিজেও সেটা বুঝতেন বলেই মনে হয়। তাই তিনি যে-রচনায় বেশি মানুষের কাছে পৌঁছতে পারবেন সেই লেখাতেই নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। সাহিত্য তো শেষ পর্যন্ত পাঠকের সঙ্গে লেখকের সম্পর্ক স্থাপন। শঙ্কু মহারাজের বেড়াতে যাওয়া আর সেই অভিজ্ঞতায় পুষ্ট কাহিনিগুলি আজও বাঙালি পাঠকের কাছে উপভোগ্য।
শঙ্কুদার শেষ যে-বইটা আমি প্রকাশ করেছিলাম সেটি তাঁর প্রয়াণের পর প্রকাশিত হয়– ‘ত্রিপুরা-তীর্থে’। ২০০৪ সালের ১৮ অক্টোবর শঙ্কুদা ‘সুন্দরের অভিসারে যাত্রা’ করার পরের বছর বইমেলায় ‘ত্রিপুরা-তীর্থে’ প্রকাশিত হয়। শঙ্কুদার স্মরণসভার দিনই বউদি এই বইয়ের পাণ্ডুলিপি আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। এই বইয়েরও ভূমিকা লিখেছিলেন অরুণকুমার বসু। ছোট্ট ভূমিকায় অরুণবাবু এমন একটা প্রসঙ্গের অবতারণা করেছিলেন যাতে বোঝা যায় শঙ্কুদার কী বিপুল জনপ্রিয়তা ছিল পাঠক-মহলে। সৈয়দ মুজতবা আলীর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে দু’-দিনের আলোচনাসভায় অরুণবাবু গিয়ে উঠেছিলেন সূর্যমণিনগরের অতিথিশালায়। সেসময় তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসে ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এ. দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্র। উনি সেই ছাত্রের নাম জিজ্ঞাসা করে জানতে পারেন ছেলেটির নাম শঙ্কু মহারাজ আচার্য। এমন আশ্চর্য নামের কারণ জিজ্ঞাসা করলে ছাত্রটি উত্তর দেয় তার জন্মের সময়ই শঙ্কু মহারাজ ত্রিপুরা এসেছিলেন এই বইটির তথ্যসংগ্রহের কাজে। ছাত্রটির সাহিত্যপ্রেমী বাবা প্রিয় লেখকের প্রতি শ্রদ্ধায় নিজের সন্তানের নাম রাখেন শঙ্কু মহারাজ আচার্য। একজন লেখকের কাছে এর থেকে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে!
শঙ্কুদার সঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, তাঁর সঙ্গে শেষবার বেড়াতে যাওয়ার কথা বলেই শেষ করব। ১৯৯৩ সালে সপরিবারে– আমি, টুকু, অপু আর ঋদ্ধি, শঙ্কুদার সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলাম গোয়া। আমাদের সঙ্গে সেবার মনোরঞ্জন-অর্চনা আর তাদের ছেলে বাবু এবং প্রচ্ছদশিল্পী ধীরেন শাসমল ও তাঁর স্ত্রী অঞ্জু, তাঁদের দুই ছেলেমেয়ে– বাবলা আর বাবলিও গিয়েছিল। ঋদ্ধির তখন বছরখানেক বয়স। একেবারে ছোটবেলা থেকেই ঋদ্ধিকে কোলে-পিঠে মানুষ করেছে শরদিন্দু মল্লিক। ঋদ্ধি তাকে ‘বন্ধু’ বলেই ডাকে চিরকাল। সেই শরদিন্দুও সেবার আমাদের সঙ্গে গিয়েছিল।
শঙ্কুদার তখন শরীর খুব একটা ভালো নয়। পেসমেকার বসানোর পর স্বাভাবিকভাবেই তাঁকে শরীরের ব্যাপারে বাড়তি সতর্ক থাকতে হচ্ছিল। তাই সেবারের বেড়াতে যাওয়াটা ট্রেনেই ব্যবস্থা করেছিলাম। আমরা কয়েকদিন আগেই চলে গিয়েছিলাম বোম্বে। সেখানে শঙ্কুদা এসে আমাদের আমাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার পর আমরা গোয়া, কোচিন ঘুরে কলকাতায় ফিরেছিলাম। আগেও বলেছি শঙ্কুদার সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া মানে ইতিহাস-ভূগোল-পুরাণের এনসাইক্লোপিডিয়ার সঙ্গে বেরিয়ে পড়া। গোয়ায় পর্তুগিজদের আসার ইতিহাস থেকে শুরু করে ওখানকার চারটি বিখ্যাত গির্জা– Se Cathedral, Convent and Church of St. Francis of Asisi, St. Cajetan Church, আর Basilica of Bom Jesus আর অসংখ্য মন্দির এবং সব জায়গার অমূল্য সব শিল্পকীর্তি-স্থাপত্যকলা আমাদের খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখিয়েছিলেন শঙ্কুদা। বন্ধুদের সঙ্গে সপরিবারে এমন বেড়াতে যাওয়া আমার জীবনে খুব বেশি হয়নি।
আমি আর মনোরঞ্জন মাঝে-মাঝেই সেবারের গোয়া ভ্রমণের স্মৃতিচারণ করি। গোয়া থেকে ফিরে শঙ্কুদা যে-বইটি লেখেন সেটি ১৯৯৭ সালের অগাস্ট মাসে প্রকাশিত হয়– ‘গজমোতি গোয়া’। আমরা যেবার গোয়া গেলাম অপু সেবার মাধ্যমিক পাশ করেছে। তার তখন নিজস্ব একটা ক্যামেরাও হয়েছে এবং ছবি তোলার প্রবল ঝোঁক। মনোরঞ্জন আর অপুর তোলা ফটোগ্রাফ ব্যবহার করেই ‘গজমোতি গোয়া’র প্রচ্ছদ হয়েছিল। আজ সেই বইটা হাতে নিয়ে দেখছি কয়েকটি প্রাকৃতিক দৃশ্যের সঙ্গে আমার আর টুকুরও একটা ছোট্ট ছবি সেই মলাটে আছে। আর আছে ‘বন্ধু’র কোলে ছোট্ট ঋদ্ধি।
‘গজমোতি’ গোয়ার শুরুতে শঙ্কুদা লিখেছিলেন সাহিত্যিক শৈলজারঞ্জন মুখোপাধ্যায় নাকি তাঁকে জানিয়েছিলেন– ‘চাওয়ার মতো করে কিছু চাইতে পারলে, তা পাওয়া যায়। আমরা পেতে চাই অথচ ঠিকমতো চাইতে পারি না। তুমি যদি কায়মনোবাক্যে কোনো কামনা করতে পারো, তাহলে তা অবশ্যই পেয়ে যাবে।’ শঙ্কুদা আগে একবার গোয়া ঘুরে এসেছিলেন। কিন্তু তাঁর খুব ইচ্ছে ছিল আরেকবার যাওয়ার, বইয়ের শেষে তাই ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়ে শৈলজারঞ্জনের কথাটার পুনরাবৃত্তি করে লিখেছেন চাইবার মতো করে চাইলে সত্যিই পাওয়া যায়, কারণ ‘জীবনদেবতা পরম করুণাময়’। আমারও মনে হয় কথাটা নির্ভেজাল সত্যি। চাইবার মতো করে চাইলে এই জীবনেই সবটা পাওয়া যায়।
লিখন শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়
……………………ইতি কলেজ স্ট্রিট-এর অন্যান্য পর্ব…………………
পর্ব ২৬। বাংলাদেশে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও একুশে বইমেলায় কখনও স্টল পাইনি
পর্ব ২৫। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি মুহূর্তের রক্ত-ঘাম-হাসি-কান্নার এক জীবন্ত দলিলচিত্র ছেপেছিলাম
পর্ব ২৪। রাখাল ছেলে যেমন বাঁশি বাজায়, আমিও তেমন নিজের খুশিতে লিখি, বলেছিলেন যাযাবর
পর্ব ২৩। রয়্যালটি-মুক্ত বইয়ের ওপর প্রকাশকদের ঝোঁক চোখে পড়ছে বইমেলাতেও
পর্ব ২২: শেষমেশ রেগে গিয়ে আমাকে চিঠিই লিখে ফেলেছিলেন শঙ্খ ঘোষ!
পর্ব ২১: ৩০০০ কপি বিক্রির মতো জীবিত বা মৃত লেখক আর হয়তো নেই
পর্ব ২০: কম বয়সে আমাদের রোববারের আড্ডা ছিল ২৮ নম্বর প্রতাপাদিত্য রোড, আশুদার বাড়িতে
পর্ব ১৯: ‘লেখা বড় হচ্ছে’ অভিযোগ আসায় খুদে হাতের লেখায় পাণ্ডুলিপি দিতেন প্রবোধবন্ধু অধিকারী
পর্ব ১৮: দু’বছরের মধ্যে সংস্করণ না ফুরলে অন্য জায়গায় বই ছাপার চুক্তি ছিল শরদিন্দুর চিঠিতে
পর্ব ১৭: পূর্ণেন্দু পত্রীর বাদ পড়া প্রচ্ছদ ও দিনেশ দাসের কবিতার শ্রেষ্ঠ দিনগুলি
পর্ব ১৬: সব প্রকাশনার যাবতীয় বইয়ের হদিশ পাওয়া যেত ‘সম্মিলিত গ্রন্থপঞ্জী’তে
পর্ব ১৫: নিছকই একটা পত্রিকা নয়, ‘কলেজ স্ট্রীট’ আমাদের আবেগ
পর্ব ১৪: খুদে পাঠকদের জন্য মিনিবই তৈরির কথা প্রথম ভেবেছিলেন অভয়দা
পর্ব ১৩: কয়েকটি প্রেসের গল্প
পর্ব ১২: দীর্ঘায়ু বই ও আইয়ুব পরিবার
পর্ব ১১: প্রেমের নয়, অপ্রেমের গল্প সংকলনের সম্পাদনা করেছিলেন সুনীল জানা
পর্ব ১০: ছোট্ট অপুকে দেখেই রঙিন ছবিতে ভরা টানটান গল্পের বই করার ইচ্ছে জেগেছিল
পর্ব ৯: চানঘরে গান-এ সত্যজিৎ রায়ের চিঠি থাকায় ব্যাপারটা গড়িয়েছিল কোর্ট কেস পর্যন্ত
পর্ব ৮: প্রকাশক-লেখকের কেজো সম্পর্কে বুদ্ধদেব গুহর বিশ্বাস ছিল না
পর্ব ৭: পুজো সংখ্যায় না-বেরনো উপন্যাস বই আকারে সুপারহিট
পর্ব ৬: মানবদার বিপুল অনুবাদের কাজ দেখেই শিশির দাশ তাঁর নাম দিয়েছিলেন– ‘অনুবাদেন্দ্র’
পর্ব ৫: সাতবার প্রুফ দেখার পর বুদ্ধদেব বসু রাজি হয়েছিলেন বই ছাপানোয়!
পর্ব ৪: লেখকদের বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছুই লিখতে হয়, প্রফুল্ল রায়কে বলেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র
পর্ব ৩: পয়লা বৈশাখের খাতায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় মজাচ্ছলে লিখেছিলেন, ‘সুধাংশুরা রাজা হোক’
পর্ব ২: বাংলা মাসের সাত তারিখকে বলা হত ‘গ্রন্থতিথি’, বিজ্ঞাপনেও বিখ্যাত ছিল ‘৭-ই’
পর্ব ১: সত্তরের উথাল-পাথাল রাজনৈতিক আবহাওয়ায় আমি প্রকাশনার স্বপ্ন দেখছিলাম