Rabindranath and the early years of kala bhavana | Robbar
Robbar
  • ৬ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২৪ আগস্ট ২০২৬

কলাভবন শুরুর নেপথ্যে এক দরদি শিক্ষক

শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের আর্থিক টানাটানি প্রথম দিন থেকেই সঙ্গী হয়েছে। সেই প্রেক্ষিতে শিক্ষক নগেন্দ্রনাথ আইচ তাঁর নিজের জমিয়ে রাখা সমস্ত টাকাপয়সা একবার রবীন্দ্রনাথের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। মহান আদর্শ আর গভীর ত্যাগের মন্ত্রে দীক্ষিত নগেন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন বিদ্যালয় থেকে অবসর নিয়েও শিক্ষকতার কাজ চালিয়ে গিয়েছেন। বোলপুরে সেই সময় বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি সেখানেও প্রায় বছর ছয়েক পড়িয়েছেন। 

Published by: Robbar Digital

Posted:April 18, 2026 8:33 pm | Updated:April 19, 2026 1:25 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

১.

কিছু শুরুর আগে তার একটা আবহ তৈরি করতে হয়। সে গান বা গল্প– যা-ই হোক না কেন। আসরে বসে গাইয়ে যেমন গান শুরুর আগে মনে মনে গুনগুন করে এক কলি গেয়ে নেন, তবলিয়া দেখে নেন তাঁর স্কেল ঠিক আছে কি না– তেমনই কথক ঠাকুরও প্রস্তুত করেন নিজেকে। তা যেন গ্রামের যাত্রাপালায় মূল অভিনয় শুরুর আগে, উচ্চকিত লয়ে কনসার্ট বাজিয়ে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের মনকে টেনে রাখা সেই রেওয়াজের মতো। উপস্থিত শ্রোতার মন মঞ্চের দিকে আকর্ষিত করে আনার কাজ এর মাধ্যমে চলতে থাকে। কলাভবনের গল্প এখানে খানিকটা সেই ধারায় শুরু হচ্ছে। শুরুর আগেও যে শুরু থাকে, সলতে পাকানোর তেমনই প্রস্তুতি রইল এবারের পর্বে।

কলাভবন তো আর হঠাৎ করে গড়ে ওঠেনি, ধীর গতিতে এক-পা এক-পা করে এগিয়েছে। আমরা জানি, রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত ‘বিশ্বভারতী’র অন্যতম প্রধান অঙ্গের নাম ‘কলাভবন’। তার পুরো চেহারা গড়ে উঠেছে ধীরে ধীরে। ভেবে দেখলে, তার সূচনা কি ব্রহ্মচর্যাশ্রমের অন্তরে নিহিত ছিল না? সেদিকে একটু ফিরে তাকাতে হবে আমাদের। শুরুতে একবার বুঝে নেওয়ার চেষ্টা, কেমন করে কলাভবনের বীজ জলসিঞ্চিত হয়েছিল তার সূচনা পর্বে, সেকালের শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের মাটিতে।

zoom
কলাভবন, বর্তমানে

শুরু অনেকটা এইরকম। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে পিতার আশ্রমে ব্রহ্মবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেন রবীন্দ্রনাথ। সময় ১৯০১, শান্তিনিকেতনের প্রাঙ্গণ তখন একেবারে শূন্য নির্জন অবস্থায় পড়ে আছে। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজে মহর্ষির কাছ থেকে আগ্রহ ও সম্মতি পেলেও বাধা এসেছিল রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়দের কাছ থেকে। সেখানে বিদ্যালয় গড়ে উঠলে পাছে শান্তিনিকেতনের পরিবর্তন ঘটে– এই আশঙ্কায় বাধা এসেছিল ঠাকুরবাড়ির অন্যদের তরফে। তবে রবীন্দ্রনাথ সেই বাধা কাটিয়ে বিদ্যালয় স্থাপন করলেন। তপোবনের আদর্শে স্থাপিত হল বিদ্যালয়। ক্রমে কবির ইচ্ছে, এখানে কেবল লেখাপড়া নয়, শিশুদের মনে শিল্পের সহজ অনুভূতি আর সংগীতের বোধ গড়ে উঠুক। কিন্তু গোড়াতে যখন বিদ্যালয়ের ছাত্র পাওয়াই দুষ্কর, সেখানে তেমন শিক্ষকের সন্ধান পাওয়া তো দূর অস্ত! তাছাড়া সেই পর্বে আমাদের দেশের শিল্প তেমন বিকশিত হয়ে ওঠেনি। অবনীন্দ্রনাথের পটে তখনও ‘ভারতমাতা’ ফুটে ওঠেনি– যা কি না আমাদের শিল্পকলার এক টার্নিং পয়েন্ট। ‘বঙ্গমাতা’ থেকে ‘ভারতমাতা’য় রূপান্তরিত সেই ছবি আমাদের দেশের শিল্পকে নতুন পথের দিশা দেখিয়েছে। ভগিনী নিবেদিতা এ ছবির প্রিন্টকে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত বিস্তৃত করতে চেয়েছিলেন। অবন ঠাকুরের ‘ভারতমাতা’ প্রসঙ্গে তিনি এমন কথাও বলেছিলেন যে, ছবিটিকে কেবল ধনীর গৃহে নয়, চাষির কুটির পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে চান।

zoom
অবনীন্দ্রনাথের ভারতমাতা

এহেন সময়ে ১৯০৪ নাগাদ শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ে যোগ দিলেন গোপালচন্দ্র কবিকুসুম। তিনি ছাত্রদের ছবি আঁকার ক্লাস নিতে লাগলেন। সে-সব ছবি অবশ্য কেমন ছিল, তা আমাদের জানা নেই। তবে গোপালচন্দ্র বেশিদিন শান্তিনিকেতনে থাকেননি, মাসচারেক বাদে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে তিনি ফিরে যান। ফলে বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগ্রহের ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের ভাবনার অন্ত ছিল না। এরপর ক্রমে ক্রমে এসেছেন নগেন্দ্রনাথ আইচ, সন্তোষ মিত্র, ওঙ্কারানন্দ প্রমুখ শিল্পশিক্ষক। এঁদের অবশ্য ছবি আঁকা শেখানোর বাইরে অন্য ক্লাসও নিতে হত। যেমন, নগেন আইচ ছবি আঁকা শেখানোর পাশাপাশি বাংলা পড়াতেন। অবশ্য এই ব্যতিক্রমী মানুষটির কথা বলে শেষ করা যায় না। এমন দরদী শিক্ষক সহজে মেলে না। শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের আর্থিক টানাটানি তার প্রথম দিন থেকেই সঙ্গী হয়েছে। সেই প্রেক্ষিতে শিক্ষক নগেন্দ্রনাথ তাঁর নিজের জমিয়ে রাখা সমস্ত টাকাপয়সা একবার রবীন্দ্রনাথের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। মহান আদর্শ আর গভীর ত্যাগের মন্ত্রে দীক্ষিত নগেন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন বিদ্যালয় থেকে অবসর নিয়েও শিক্ষকতার কাজ চালিয়ে গিয়েছেন। বোলপুরে সেই সময় বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি সেখানেও প্রায় বছর ছয়েক পড়িয়েছেন। এমনই ছিলেন মানুষটি। তবে এই শিক্ষকদের মধ্যে একমাত্র সন্তোষ মিত্র ছিলেন কলকাতার আর্ট স্কুলে অবনীন্দ্রনাথের ছাত্র। ভালো ছবি আঁকার পাশাপাশি স্বভাবের নম্রতার জন্য তিনি ছিলেন অবন ঠাকুরের প্রিয়পাত্র। ফলে ‘রবিকা’ যখন গুরু অবনের কাছে চিত্রশিক্ষকের খোঁজ করছিলেন, তখন অবনীন্দ্র তাঁর ছাত্র সন্তোষকে দিলেন পাঠিয়ে।

zoom
শান্তিনিকেতনের মুক্ত পরিবেশে পড়াশোনা, হোপ সাহেবের তোলা ছবি

১৯১০ নাগাদ শান্তিনিকেতনে এলে তিনি শিশুবিভাগে বাস করতে লাগলেন, আশ্রমের শিশুদের দায়িত্বও রইল তাঁর ওপরে। আজকের শান্তিনিকেতনে ‘পৌষালী’ নামে যে হোটেল দেখা যায়, এটি আসলে সন্তোষ মিত্রের নিজস্ব বাড়ি। মনে পড়ে, আমাদের ছাত্রজীবনে এই বৃদ্ধ শিল্পীকে তখনও জীর্ণ স্কেচখাতা হাতে ছবি এঁকে বেড়াতে দেখেছি। তার বেশিরভাগই ছিল জীবজন্তু, পশুপাখি, গাছপালার ছবি। আর্টের ভাষায় যাকে বলে ‘নেচার স্টাডি’। আশ্চর্য হয়ে গিয়েছি, যখন দেখেছি সেই বৃদ্ধশিল্পী কী অনায়াসে একের পর এক রবীন্দ্রনাথের কবিতা নাগাড়ে মুখস্থ বলে যেতে পারতেন। অভিনয়েও তাঁর আগ্রহ ছিল। শান্তিনিকেতনের পাশে গোয়ালপাড়া গ্রামে সত্যজিৎ রায় যখন ‘অশনি সংকেত’ ছবির শুটিং করেছিলেন তখন ছবির শুরুর দিকের একটি দৃশ্যে তাঁকে অভিনয় করতেও দেখা গিয়েছে। এইসব মানুষের কথা আজ ভাবতে বসলে কেমন রূপকথার গল্পের মতো মনে হয়। 

zoom
সন্তোষ মিত্র (১৮৯৩ – ১৯৭৯)

তবে ইতিহাসের নিরিখে কলাভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনা হয়েছে আরও কিছু পরে। ইতিমধ্যে ঘটে গিয়েছে রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার পর্ব, যা কেবল আমাদের দেশ নয়, সমগ্র বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এই ঘটনার অব্যবহিত পরে কবির জাপান ও আমেরিকা ভ্রমণ তাঁকে নতুন বাঁকের মুখে দাঁড় করিয়েছে। জাপান এবং আমেরিকা তাঁকে যেন আরও বেশি করে শিল্পকলার অভিমুখী করে তুলেছে। ভেতরে ভেতরে নিজের মনের মতো এক মহাবিদ্যালয় গড়ে তোলার দিকে প্রবলভাবে উদ্দীপিত হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। সেই সময় এমন এক বিদ্যালয়ের কথা তিনি ভাবছিলেন, যেখানে বিশ্বের সঙ্গে ভারতের নিবিড় যোগসূত্র গড়ে উঠবে। যা কি না হয়ে উঠবে ভবিষ্যতের এক বিশ্বজাগতিক মহামিলনের যজ্ঞস্থল। এই ভাবেই বীরভূমের কাঁকুড়ে রুক্ষ প্রান্তরে ঘনিয়ে এসেছে ‘বিশ্বভারতী’র বীজ বপনের সেই অমোঘ মুহূর্ত। আর সে যেমন-তেমন বিদ্যালয় নয়, সেই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম দু’টি প্রধান অঙ্গ হবে সংগীত এবং শিল্পকলা।

zoom
আশ্রমিকদের ক্লাস নিচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ

অবশেষে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৯১৮ সালের পৌষ উৎসবের মধ্যেই অত্যন্ত অনাড়ম্বর ভাবে বৈদিক আচারের সঙ্গে স্থাপিত হল বিশ্বভারতীর ভিত্তিপ্রস্তর। ভিত্তির জন্য যে গর্ত খোঁড়া হয়েছিল, কবি সেখানে আতপতণ্ডুল জল, ফুল, কুশ ইত্যাদি নিক্ষেপ করলেন, তারপরে পৌষ-উৎসব উপলক্ষে আগত বিভিন্ন দেশের পুরুষ ও মহিলা প্রত্যেকেই সেই গর্তে মাটি নিক্ষেপ করলেন। তাঁরা যেন বিশ্বমানবের প্রতিনিধি হয়ে প্রতীকী অর্থে রবীন্দ্রনাথের বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রইলেন। পরের ‘শান্তিনিকেতন’ পত্রিকার বৈশাখ সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথের ভাবনা আরও স্পষ্ট হয়ে দেখা দিল।

zoom
নগেন্দ্রনাথ আইচ (১৮৭৮ – ১৯৫৬)

তিনি জানালেন– 

‘…শিক্ষার প্রকৃত ক্ষেত্র সেইখানেই যেখানে বিদ্যার উদ্ভাবন চলিতেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখ্য কাজ বিদ্যার উৎপাদন, তাহার গৌণ কাজ সেই বিদ্যাকে দান করা। বিদ্যার ক্ষেত্রে সেই-সকল মনীষীদিগকে আহ্বান করিতে হইবে যাঁহারা নিজের শক্তি ও সাধনা-দ্বারা অনুসন্ধান, আবিষ্কার ও সৃষ্টির কার্যে নিবিষ্ট আছেন। তাঁহারা যেখানেই নিজের কাজে মিলিত হইবেন সেইখানেই স্বভাবতই জ্ঞানের উৎস উৎসারিত হইবে, সেই উৎসধারার নির্ঝরিণীতটেই দেশের সত্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা হইবে। বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের নকল করিয়া হইবে না’।

আজ থেকে ১০০ বছরেরও আগে বলা রবীন্দ্রনাথের এই আশ্চর্য কথাগুলো আমাদের কি আর তেমন করে স্পর্শ করতে পারে?

Abanindranath Tagore Indian Art KalaBhavana Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Shantiniketan

Share this article on