


রবীন্দ্রনাথ একদিকে যেমন অলংকারের ভার পছন্দ করতেন না, তেমনই আক্ষেপ করতেন তাঁর গানের উপর স্টিম রোলার চালিয়ে দেওয়ার নিষ্ঠুরতা নিয়ে। তিনি একদিকে লিখছেন, ‘বর্তমান যুগে কলার চেয়ে কার্দানি বড় হয়ে উঠেছে’ (সংগীতচিন্তা), বলছেন, দেহটাকে সাজানোর বদলে দেহটাকে দোকান বানিয়ে তোলার বিরুদ্ধে। কিন্তু তাই বলে গানের শরীরের সাজ নিয়ে তাঁর যে সূক্ষ্ম কল্পনা ছিল, যে সুচারু সূক্ষ্মতা দেখি দিনেন্দ্রনাথ বা অমলা দাশের রিয়াজি কণ্ঠে, সেই জাতের অলংকরণ মুছে গিয়েছে রবীন্দ্রগানের দুনিয়া থেকে।
৮.
যখনই বহু জনতার মাঝে একাকী হয়েছে মন, গেয়েছি প্রতীক্ষার গান। গীতবিতানের ‘প্রকৃতি’র বর্ষা উপপর্যায়ের সেই গান আমার কাছে এমন এক ভালোবাসার গান, যেখানে প্রতীক্ষায় মিশে থাকে পূজা ও প্রণয়। আকৈশোর এ গান ভিতরে বয়ে গিয়েছে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠ বেয়ে, যদিও প্রায় একইরকম টপ্পার অলংকারে গাওয়া সুবিনয় রায় বা সুচিত্রা মিত্রের কণ্ঠেও এ গান মরমে মিশে থেকেছে বারবার।
শান্তিদেব ঘোষের প্রয়াণের পর ‘দেশ’ পত্রিকায় লেখা স্মরণলেখে বুদ্ধদেব গুহ লিখেছিলেন, শান্তিদেবের কণ্ঠে টপ্পা ছিল না, ছিল না তাঁর শিষ্যা সুচিত্রা মিত্রের কণ্ঠেও। বাংলা টপ্পা-গাইয়ে হিসেবে বুদ্ধদেবের প্ৰসিদ্ধি অজানা ছিল না, তাই এ মন্তব্য দেখে চমক লেগেছিল। এর আগেই পড়েছি অবিসংবাদিত সংগীতবিদ ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সেই লেখা, যেখানে সুচিত্রার কণ্ঠে টপ্পার প্রশংসা করছেন লেখক, কানেও বেজে থেকেছে সুচিত্রার কণ্ঠে ‘সার্থক জনম আমার’, ‘মেঘের পরে মেঘ জমেছে’, ‘এরা পরকে আপন করে’ প্রভৃতি গানে টপ্পার জমাট দানাগুলি। ওঁর কণ্ঠে কর্ণাটি কাজের ‘বাসন্তী হে ভুবনমোহিনী’ শুনতে পেয়ে মনে মনে অস্বীকার করেছি এই একমাত্রিক মীমাংসা যে, অলংকারময় গানে সুচিত্রার ততটা সিদ্ধি নেই, যতটা আছে খাড়া সুরের ওজস্বী ভঙ্গির গানে।
রবীন্দ্রগানে টপ্পার কাজ নিয়ে গাইয়ে আর বোদ্ধাদের মধ্যে লড়াই-ঝগড়া কম নেই। কেমন হওয়া উচিত রবীন্দ্রনাথের গানে টপ্পার চরিত্র? ‘মেঘের পরে মেঘ জমেছে’ গানটি নিয়েই যাওয়া যাক বিস্তারে। ১৯০৯ সালের আষাঢ় মাসে সদ্যরচিত এই গানটি রবীন্দ্রনাথ স্বকণ্ঠে গেয়েছেন– এই আখ্যান আমরা পাই সীতা দেবীর ‘পুণ্যস্মৃতি’তে। পকেট থেকে একটি ছোট খাতা বের করে এ গান গেয়ে উঠছেন রবীন্দ্রনাথ, আর ঘরের ভিতর থেকে তাঁর কণ্ঠের উদার স্বর ছড়িয়ে পড়ছে বাইরে, ভিড় জমছে গলিতে সেই কণ্ঠ শুনে।
সীতা দেবীর স্মৃতিকথায় এ গানের কোনও অলংকারিক অনুপুঙ্খ পাই না আমরা। সে অলংকারের চরিত্র কেমন ছিল তার আভাস পেতে হলে আমাদের যেতে হয় দিনেন্দ্রনাথের কাছে। তাঁর কণ্ঠে এ গান যখন প্রথম আমায় বাজিয়ে শুনিয়েছিল বিক্রম সিং, আমার চমক লেগেছিল। এখন ইউটিউবের কল্যাণে সহজশ্রাব্য দিনেন্দ্রনাথের এই গান। এ গানের দু’টি স্বরলিপির মধ্যে একটি দিনেন্দ্রনাথের করা, কিন্তু সেই স্বরলিপিতে বিন্দুমাত্র আভাস নেই দিনেন্দ্র-ঘরানার কারুকাজের। একটি তীব্র ‘কেন’ উচ্চারণের পাশেই দিনেন্দ্রনাথ রাখেন একা দ্বারের ‘পাশে’র ‘মপধপমপ’-র কাজটি। এই ছোট সরগমটি তিনি করেন ক্ষিপ্রগতিতে, উত্তরকালের শিল্পীদের মতো শ্লথকোমল চলনে নয়। স্বর থেকে স্বরান্তরে যাবার সময় কণ্ঠকে তিনি গড়িয়ে নিয়ে যান না, যান দ্রুত, সোজা, গতিময় চালে। এবারে অন্তরায় ‘কাজের দিনে নানা কাজে’র ‘নানা’-তেও তিনি ব্যবহার করেন একই চালের কাজ, যার গতিতে আছে ছুটতানের আভাস।

আমরা জানি, অনেক গানের শরীরেই রবীন্দ্রনাথ বুনে দিয়েছেন, আর তার সঙ্গে এ-ও মনে করিয়ে দিয়েছেন– ‘তান জিনিসটা নিয়মহীন উচ্ছৃঙ্খলতা নহে’ এবং তান নিছক কার্দানি নয়, তার একটি নন্দনদর্শন আছে: ‘গায়কের চিত্ত হইতে গানের আনন্দই বিচিত্র তানের মধ্যে প্রসারিত হইতেছে। যেখানে সে আনন্দ দুর্বল শক্তিও সেখানে ক্ষীণ।’ (সংগীতচিন্তা)। ‘তোমারই ঝরনাতলার নির্জনে’ গানটির কথা ভাবা যাক। মাটির কলস যখন সুরের দানে উপচে পড়ে (আমাদের মনে পড়ে যায় ওয়ার্ডসওয়ার্থ কথিত ‘spontaneous overflow of powerful feelings’), কবি সেখানে উচ্ছলতাকে প্রকাশ করেন তানে। কিন্তু সঞ্চারী সাজান তানবিহীন একটি অবরোহী সুরে। সন্জীদা খাতুন আমাদের মনে করিয়ে দেন সেকথা, দেখিয়ে দেন, এ গানের সঞ্চারীর শেষে ‘মেটে বা নাই মেটে তা’-র ‘তা’তে কবি সুরকে কেবল নিরলংকারভাবে গড়িয়ে আনেন ধৈবত থেকে মধ্যমে, মধ্যমেই সুরকে স্থির রাখেন দু’টি মাত্রা জুড়ে। গানের বাকি তানগুলির মাঝখানটিতে এক অলৌকিক সুষমায় রবীন্দ্রনাথ পেতে রাখেন মধ্যমের স্থির আসন। তান ও স্থির স্বরের এই সাম্যকৌশল রবীন্দ্রনাথ প্ৰয়োগ করছেন ‘প্রাণে খুশির তুফান উঠছে’, ‘রাখো রাখো রে’ প্রভৃতি গানগুলিতেও।
ফিরে যাই দিনেন্দ্রনাথের গানটিতে: ‘মেঘের পরে মেঘ জমেছে’ গানে ‘নানা’ শব্দটিতে স্বরলিপিতে কোনও বিশেষ কারুকাজ নেই (র্স-ধ-ন-র্স), টপ্পার ইশারাও (অর্থাৎ দু’টি স্বরের অনুবৃত্তি) নেই। দিনেন্দ্রনাথ কী গাইছেন? ‘নানা কাজে’-র ‘নানা’টি তিনি গাইছেন, ‘নসনধনসনধ’ এই সাতটি স্বরের দ্রুত চলনে। তিনি মুক্তছন্দের যে লয়টি নিয়েছেন এ গানে, তাতে এই সাতটি স্বর তিনি গাইছেন আনুমানিক দু’ মাত্রার পরিসীমায়। কিন্তু এত অবলীলায়, কোনও ধাক্কা ছাড়া এই স্বরমণ্ডলী তিনি প্ৰয়োগ করছেন যে, এই অলংকার হয়ে উঠছে গানের ভাবের সহচর, যেন গানের অন্তরের রূপ প্রকাশিত হচ্ছে এই কারুকাজে।

এবার দেখি, দিনেন্দ্র-পরবর্তী যুগের মান্য আচার্য শৈলজারঞ্জন ঠিক কী বলছেন এই গানটির কারুকাজ নিয়ে? আমরা পড়ে দেখব অধ্যাপক বুলবুল বসুকে দেওয়া ওঁর সাক্ষাৎকার, যেখানে তিনি বলছেন–
“ঐ যে ‘মেঘের পরে মেঘ জমেছে’ আছে না? (গেয়ে) ‘কাজের দিনে নানা কাজে’ (‘নানা কাজে’-টা ফুরফুরে ক্লাসিকালের মতো করে) এরকম নয়। ‘লোকের মাঝে’ দেখবে ওটা (স্বরবিতানে) ‘নি নি নি সা নি ধা নি সা নি’ দানা একেবারে। (গুরুদেবের) গলায় এত সুন্দর দানা ছিল। আমি শান্তিনিকেতনে … তুমি আমায় ক্ষমা করো … এইরকম দানার গলা শান্তিনিকেতনে আর শুনিনি।’
রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠের টপ্পার দানা আমাদের শ্রবণেও গাঁথা হয়ে আছে, ওঁর ‘তবু মনে রেখো’, ‘বঁধু হে ফিরে এসো’, ‘অন্ধজনে দেহো আলো’ ইত্যাদি গানের ছোট কিন্তু নিটোল সুরেলা দানা। রবীন্দ্রসংগীতে টপ্পার দানার গড়ন ও মাপ কী হবে, এই প্রশ্নের অবিসংবাদিত উত্তর হওয়া উচিত রবীন্দ্রনাথের নিজের কণ্ঠের রেকর্ডে যে দানা আছে, সেই মাপ। ‘অন্ধজনে দেহো আলো’ গানে ‘প্রেমসলিলাধারে’-তে আছে আক্ষরিক অর্থে রাবীন্দ্রিক টপ্পার সইসাবুদ। কিন্তু সব কারুকাজই কি টপ্পার কাজ? এই যে দিনেন্দ্রনাথের গলায় ‘মেঘের পরে মেঘ জমেছে’ গানে ‘থাকি নানা লোকের মাঝে’-তে ‘লোকের’ শব্দে যে কাজ শুনতে পাই আমরা (র্সণধপধণর্সণধণ)– তা তো আমাদের কানে ঠিক বাংলা গানের টপ্পার মতো লাগে না। এমনকী উপরে উল্লেখ করা রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠের টপ্পার কাজের মতোও লাগে না। এ সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের অলংকার। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, সুবিনয় রায় প্রমুখ যত দিকপাল গাইয়ে এই গানটি গেয়েছেন, দিনেন্দ্রনাথের রেকর্ডের গানের কারুকাজের চরিত্র থেকে তা সম্পূর্ণ আলাদা। আরও স্পষ্ট ভাষায় বলতে গেলে গায়কিটাই আলাদা। আগ্রহীজন ইউটিউবে শুনে দেখতে পারেন।

এই ধরনের অলংকার আমরা শুনতে পাচ্ছি অমলা দাশের কণ্ঠে। অমলা দাশ গান শিখেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের কাছে, রথীন্দ্রনাথ তাঁর ‘পিতৃস্মৃতি’তে লিখছেন রবীন্দ্রনাথ আর মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে অমলা দাশের সখ্যের কথা, পদ্মার জলিবোটে দিনের শেষে রবীন্দ্রনাথ আর মৃণালিনীর সান্নিধ্যে ‘অমলাদি’র গানের পর গান গেয়ে যাওয়ার কথা। শান্তিদেব ঘোষের লেখা থেকে আমরা জানতে পারছি অমলা দাশের কণ্ঠে হিন্দি গানের সুর ভেঙে রবীন্দ্রনাথ রচনা করছেন ‘কে বসিলে আজি হৃদয়াসনে’। অমলা দাশ গান রেকর্ড করছেন রবীন্দ্রনাথেরই জীবদ্দশায়, কবি শুনেছেন সেই গান। অমলা দাশের কণ্ঠে ‘ধায় যেন মোর সকল ভালোবাসা’, ‘চিরসখা হে ছেড়ো না’, ‘কে বসিলে আজি’ গানগুলির কারুকাজের সঙ্গে দিনেন্দ্রনাথের কণ্ঠের কারুকাজের আন্দাজ মিলে যায়। ‘কে বসিলে আজি’ গানটি অমলা দাশকেই প্রথম শিখিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অমলা দাশের গলায় এ গানের অলংকার সূক্ষ্ম তানের মতো। শৈলজারঞ্জন অনেকটা বয়সে এ গান রেকর্ড করলেও তাঁর গায়নে অমলা দাশের গায়কি খানিকটা উপস্থিত, যদিও কাজ অনেক কম, মন্থর ও খানিকটা গোল দানার। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রেকর্ডে এ গান গোল দানার টপ্পায় ভরা, সকল অলংকারই এক-এক বিশেষ মাপে টপ্পায়িত, যা পরের প্রজন্মের কাছে রবীন্দ্র-টপ্পার অনুকরণীয় মডেল।

‘রাজা’ ও ‘অরূপরতন’ নাটকে রবীন্দ্রনাথ স্বকণ্ঠে গাইতেন রূপ-উত্তীর্ণ অরূপের গান: ‘আমি রূপে তোমায় ভোলাব না।’ ১৯১০ সালে শান্তিনিকেতনে ‘রাজা’ নাটক দেখছেন সাহানা দেবী। গলায় তুলেছেন সেই গান। রেকর্ড করেছেন। এই গানের প্রথম পাঠ অনুযায়ী ‘প্রেমকে আমার মালা করে’ না-বলে গেয়েছেন ‘সোহাগ আমার মালা করে’। সাহানা দেবীর রেকর্ডটি (ইউটিউবে শ্রবণলভ্য) শুনলে এ গান আমাদের অচেনা ঠেকে। টপ্পার কাজ নেই, আছে আকুল মীড়। আমাদের এ গানের শ্রবণস্মৃতি জুড়ে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে কালজয়ী রেকর্ডটি আছে, সাহানা দেবীর রেকর্ডের সুর সেই রেকর্ডের থেকে প্রায় আসমান-জমিন দূরত্বে। অথচ শৈলজারঞ্জন নিজে কবির কণ্ঠে এই গান শুনেছেন উত্তরকালে, ‘অরূপরতন’ নাটকের অভিনয়ে, শিখে নিয়েছেন, আর শিখিয়ে রেকর্ড করিয়েছেন তাঁর প্রিয় ছাত্রী মোহরকে দিয়ে। শৈলজারঞ্জন লিখছেন:
“একবার অরূপরতন নাটক হচ্ছে কলকাতায়। ‘রূপে তোমায় ভোলাব না’ গানটা উনি নিজে গাইছেন।… আমি গানের দল থেকে ছুটি নিয়ে ফস করে চলে গেছি গানটা শুনবার জন্য। কবি ধরে ফেলেছিলেন সেটা। বলছেন,
‘–না– তুমি– গানের দলে তো দেখছি না তোমাকে– কোথায় পালিয়েছিলে?’
–আমি এবার সিংহের মত জবাব দিলাম, ‘আমি ঠিক জায়গায় ছিলাম।’ হিন্টটা ধরলেন। তখন নরম গলায় বললেন, ‘শোনা গিয়েছিল তো? ভালো হয়েছিল?’
আমি সেটার উত্তর না দিয়ে বললাম, ‘এইবার কিন্তু এই গানটা আমায় শিখতে হবে।’ ফিরে গিয়ে এই গানটা শিখলাম আর মোহরকে দিয়ে রেকর্ড করালাম।” [দু’টি বক্তৃতা: রবীন্দ্রসংগীতের উত্তরাধিকার, রবীন্দ্রনাথ, ‘রবীন্দ্রসংগীত ও শৈলজারঞ্জন’, সম্পা. অনুত্তমা ঘোষ ও শমীক ঘোষ]

এমন একটি বিখ্যাত গানের ক্ষেত্রে সাহানা দেবী ও কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গায়নের এতটা সুরের ও অলংকরণের ফারাক আমাদের সংশয়ী করে তোলে। এ সংশয় নিছক একটি বিশেষ গানের সুরভেদ নিয়ে নয়, এ সংশয় ছুঁয়ে যায় রবীন্দ্রনাথের গানের উত্তরাধিকারের আঙিনাটিকেও।
রবীন্দ্রনাথ একদিকে যেমন অলংকারের ভার পছন্দ করতেন না, তেমনই আক্ষেপ করতেন তাঁর গানের উপর স্টিম রোলার চালিয়ে দেওয়ার নিষ্ঠুরতা নিয়ে। তিনি একদিকে লিখছেন, ‘বর্তমান যুগে কলার চেয়ে কার্দানি বড় হয়ে উঠেছে’ (সংগীতচিন্তা), বলছেন, দেহটাকে সাজানোর বদলে দেহটাকে দোকান বানিয়ে তোলার বিরুদ্ধে। কিন্তু তাই বলে গানের শরীরের সাজ নিয়ে তাঁর যে সূক্ষ্ম কল্পনা ছিল, যে সুচারু সূক্ষ্মতা দেখি দিনেন্দ্রনাথ বা অমলা দাশের রিয়াজি কণ্ঠে, সেই জাতের অলংকরণ মুছে গিয়েছে রবীন্দ্রগানের দুনিয়া থেকে। সেই ঘরানাটাই আলাদা। সেখানে গলাটা চলতই অন্য চালে। গভীর ও দীর্ঘকালীন স্বরসাধনা, বিপুল শ্রবণ ও নন্দনবোধ এনে দেয় সেই ঘরানার কারুকাজ। এই কারুকাজে কৃন্তন আছে, মুড়কি আছে, সূক্ষ্ম স্পর্শস্বর আছে, এমনকী তানও আছে (বুলা মহলানবীশ, সেই যে ওঁর আকুলস্বরে বলা, ‘আমার গানে যেন একটু রস থাকে, তান থাকে, দরদ থাকে ও মীড় থাকে…)। কিন্তু কারুকাজের নামে অকারণ টপ্পার ভূষণভারে সাজিয়ে দেওয়া নেই। অমিয়া ঠাকুর প্রসঙ্গে দেবব্রত বিশ্বাস তাঁর ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত’-এ লিখেছিলেন: অমিয়া ঠাকুর বোধহয় ৭০ পেরিয়েছেন। এখনও তাঁর কণ্ঠে যে কাজ খেলা করে তার স্বরলিপি করা তো দূরের কথা, একালের অথরিটিরা তা গেয়ে দেখাতে পারবেন কি না সন্দেহ।

রবীন্দ্রনাথ যখন গান করেন, কারুকাজগুলি গানের এক্সটেনশন না হয়ে এক্সপ্রেশন হয়ে ওঠে। তা আর কখনওই থাকে না প্রদর্শনবিদ্যার স্তরে। আমার বন্ধুবর, রবীন্দ্রগানের কুসুমবনের হারিয়ে যাওয়া পাখি বিক্রম সিং-এর কণ্ঠে ছিল শ্রাবস্তীর কারুকার্য। কিন্তু ওর গায়নে কোনও দেখনদারি ছিল না, অলংকারের রূপে ছিল অরূপের ইশারা। জিজ্ঞেস করেছিলাম ওকে, ‘পিঙ্কু, তুই কেমন করে এত জটিল কারুকাজের শরীরেও পুরে দিস এত দরদ?’ উত্তরে ও গেয়ে উঠেছিল, ‘আমি রূপে তোমায় ভোলাব না…’
ঋণ:
অধ্যাপক মোহন সিং (ওঁর আদেশেই এ জীবনে বারবার দিনেন্দ্রনাথ শোনা)
অধ্যাপক দূর্বা সিংহ রায়চৌধুরী (দিনেন্দ্রনাথের গাওয়া ‘মেঘের পরে মেঘ জমেছে’-র অলংকারের স্বরলিপি করে দিয়েছেন আমায়)
………………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন ঠাকুরঘরানা-র অন্যান্য পর্ব
………………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved