cultural identity and trajectory of rabindra sangeet artists। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাবীন্দ্রিকতার সাজপোশাক

রবীন্দ্রনাথ তাঁর আবাল্য ব্রাহ্মসমাজ-সংস্কারের অভ্যাসে শোভনের সঙ্গে জুড়ে দেন ‘মঙ্গল’ শব্দটি। সাজের কোনও স্খলনে রয়ে যেতে পারে যে অমঙ্গল-সম্ভাবনা– এই ইশারাটুকু বুনে দেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর সাজভাবনায়। এই বিশ্লেষণে প্রবেশ করার গভীর আড়ালে রয়েছে সাত-আটের দশকে বাঙালির সমাজে ‘রাবীন্দ্রিক’ সাজ বা সংস্কৃতির যে একটা নাগরিক নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল– তার সুলুকসন্ধান। এই ধরনের বিশিষ্ট সাজপোশাক আর এসরাজ, তানপুরা, মন্দিরা জাতীয় বাদ্যযন্ত্র অনুষঙ্গ হিসেবে যুক্ত হল এক বিশেষ ধরনের গায়নভঙ্গির সঙ্গে, যার নাম ক্রমে হয়ে উঠল ‘রাবীন্দ্রিক’ গায়কি।

শেষ আপডেট: আগস্ট ১৮, ২০২৬, ০৪:৪৪   
Facebook WhatsApp Messenger

১.

শান্তিনিকেতন আশ্রমের নিত্যদিনের চলায় রবীন্দ্রনাথের আগ্রহে ও তাকে ঘিরে একটি নান্দনিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। তাই আশ্রমের সকল অনুষ্ঠানের মতোই গানের পরিবেশনেও যুক্ত হয়েছিল এক ‘শোভনমঙ্গল সাজ’।

আচার্য নন্দলাল ও প্রতিমা দেবীর উদ্যোগে সাজসজ্জায় বসে, আসরসজ্জায় আশ্রমে তৈরি বাটিকের ব্যবহার শুরু হল। সেই বাটিকের নকশায় এল শান্তিনিকেতনের আলপনার এক নিজস্ব ধারা– যে নকশা ও মোটিফগুলি বাংলার ব্রতপার্বণের ও পূজা-আচারের মোটিফগুলির থেকে আলাদা। এর মধ্যে বিশাল প্রাচীন ভারতের স্থাপত্য এবং বৌদ্ধ শিল্প ও চিত্রকলার আভা এবং এই বাটিকের শাড়ি, উত্তরীয় হয়ে উঠল ‘শান্তিনিকেতনী’ সাজের পরিচয়-চিহ্ন।

zoom
শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ

দক্ষিণী মেয়েদের, মূলত সাবিত্রী দেবীর সাজ দেখে কবি উৎসাহ দিলেন মেয়েদের চুলে ফুল বা মালা লাগানোর, সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি, বাটিকের উত্তরীয়, সাদা খোলের তাঁতের শাড়ি বা নৃত্যনাট্যে বাটিকের বসন, এইসব মিলে এক প্রাতিষ্ঠানিক সজ্জার জন্ম হল শান্তিনিকেতনে। উত্তরকালে, বিশেষত রবীন্দ্রশতবর্ষের পর থেকে ‘রাবীন্দ্রিক সাজ’ বলে যে শব্দবন্ধটি নগরে-গ্রামে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়াতে লাগল তার পিছনে রইল রবীন্দ্রনাথের সেই শোভনমঙ্গল সাজের ধারণাটি। এই ‘শোভনমঙ্গল’ শব্দে ‘শোভন’ শব্দটির একটি ধারণা এই সাজের ছবিগুলি থেকে পাই আমরা। কৌতূহল জাগিয়ে তোলে শোভনের সঙ্গে ‘মঙ্গল’ শব্দটি জুড়ে দেওয়ার রবীন্দ্র-অভিপ্রায়। যে রবীন্দ্রনাথ ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে শাড়ির আঁচল নেওয়ার ভঙ্গি ও জ্যাকেটের গড়নের ভিত্তিতে ‘সিসি-লিসি’ ও লাবণ্যের মধ্যে একটি প্রায় চারিত্রিক বিরোধ রচনা করেন: ‘এদিকে ওদের দুই বোন, যাদের ডাকনাম সিসি এবং লিসি। যেন নতুন বাজারের অত্যন্ত হালের আমদানি ফ্যাশনের আপদমস্তক যত্নে মোড়ক করা পয়লা নম্বরের প্যাকেট বিশেষ। উচু খুরওয়ালা জুতো, বুককাটা জ্যাকেটের ফাঁকে প্রবাল আর আম্বারের মালা, শাড়িটা গায়ে তীর্যকভঙ্গীতে আঁটি করে ল্যাপটানো…’। (শেষের কবিতা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

ঠিক একটু পরেই নায়িকা লাবণ্যকে দেখাবেন তিনি। কীরকম? লিখছেন: ‘যেন সমুদ্র থেকে এইমাত্র উঠে এলেন লক্ষ্মী… আর লাবণ্যের সাজ।’

zoom
ইথারতরঙ্গে রবীন্দ্রনাথ

সেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর আবাল্য ব্রাহ্মসমাজ-সংস্কারের অভ্যাসে শোভনের সঙ্গে জুড়ে দেন ‘মঙ্গল’ শব্দটি। সাজের কোনও স্খলনে রয়ে যেতে পারে যে অমঙ্গল-সম্ভাবনা– এই ইশারাটুকু বুনে দেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর সাজভাবনায়। এই বিশ্লেষণে প্রবেশ করার গভীর আড়ালে রয়েছে সাত-আটের দশকে বাঙালির সমাজে ‘রাবীন্দ্রিক’ সাজ বা সংস্কৃতির যে একটা নাগরিক নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল– তার সুলুকসন্ধান। এই ধরনের বিশিষ্ট সাজপোশাক আর এসরাজ, তানপুরা, মন্দিরা জাতীয় বাদ্যযন্ত্র অনুষঙ্গ হিসেবে যুক্ত হল এক বিশেষ ধরনের গায়নভঙ্গির সঙ্গে, যার নাম ক্রমে হয়ে উঠল ‘রাবীন্দ্রিক’ গায়কি। বলাই বাহুল্য, রবীন্দ্রশতবর্ষকে কেন্দ্র করে এই ‘রাবীন্দ্রিক’ গায়কির অনুকরণ যেমন ছড়িয়ে পড়ল মফস্‌সলের গানের ইশকুলের অনুষ্ঠানে, তেমনই পাশাপাশি মূলধারার চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রগানের ব্যবহার থেকে মূলত পঙ্কজকুমার মল্লিক, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুমিত্রা সেন, আরতি মুখোপাধ্যায়দের কণ্ঠ বেয়ে আরেক ধরনের গায়নভঙ্গি জনপ্রিয় হল রবীন্দ্রগানের পরিসরে। সেই ভঙ্গিটিকে অনেকেই ঠিক ‘রাবীন্দ্রিক’ গায়কি বলে মনে করেননি। এই ‘অনেকে’র শ্রবণ-অভিজ্ঞতায় স্থায়ী আসন পেয়ে গিয়েছিল একটু আগে বিবৃত ‘রাবীন্দ্রিক’ নির্মাণের ধারণাগুলি, তাই তাঁরা অনেকেই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, এমনকী সুমিত্রা সেনের রবীন্দ্রগানকেও ঠিক যেন ‘রাবীন্দ্রিক’ পরিসরে পাঙ্‌ক্তেয় করতে চাননি। এই দুই পরিসরের মাঝখানে যেন থেকেছেন দেবব্রত বিশ্বাস।

zoom
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়

আজন্ম ব্রাহ্মসমাজের পরিবেশে বড় হওয়া ‘জর্জ’, উত্তরকালে বামপন্থা ও গণনাট্য আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক ছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ, গ্রামেগঞ্জে রবীন্দ্রসংগীত শোনায় অনভ্যস্ত এবং তথাকথিত ‘রাবীন্দ্রিক’ সংস্কৃতিতে অদীক্ষিত জনতার সামনে রবীন্দ্রগান পরিবেশন করতে করতে হয়তো-বা গানের ‘কমিউনিকেশন’ নিয়ে তাঁর ভাবনা অন্যতর মাত্রায় পৌঁছে গিয়েছে। তাঁর অল্প বয়সের রেকর্ড করা ‘তুমি রবে নীরবে’ গানে ব্রাহ্মসমাজের গায়কির যে সুস্পষ্ট ছাপটি রয়েছে, উত্তরকালের রেকর্ডে সেই আত্মগত (subjective) ভঙ্গিটি অনেকটাই অপসৃত। দেবব্রত গান গাইছেন অনেকটাই শব্দের অর্থের ব্যাখ্যানের ভঙ্গিতে, জোর দিচ্ছেন কণ্ঠের মডিউলেশন, স্বরক্ষেপণের নানা প্রকৌশলের দিকে। গানে আসছে এক ধরনের দৃশ্যমানতা, এক ধরনের বাচিক অভিনয়ধর্মিতা।

zoom
দেবব্রত বিশ্বাস

একবার দেখে নেওয়া যাক, আজন্ম আশ্রমে লালিত কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়েয় চোখে দেবব্রত কেমন ছিলেন? কণিকা লিখেছেন: ‘ব্যক্তিত্ব স্বভাব, প্রকৃতি, কথাবার্তা, চালচলন, বেশভূষা আচরণ সব কেমন যেন একটু আমার অদ্ভুত মনে হত। উনি সকলের থেকে আলাদা।’ শেষবয়সে যখন বিশ্বভারতী সংগীত সমিতির আধিপত্যবাদের সঙ্গে তিনি আপস করছেন না, রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করা ছেড়ে দিয়েছেন, আসরেও গাইছেন কম। তিনি দাড়ি রেখেছেন। কখনও আসরে উপস্থিত হচ্ছেন লুঙ্গি আর ফতুয়া পরে, কণ্ঠে তুলে নিচ্ছেন রবীন্দ্রনাথের গান। যে রবীন্দ্রনাথ আশ্রমজীবনের পরিধানে নাগরিক বাঙালির সাধারণ্যে পরিধেয় ধুতি-পাঞ্জাবির বদলে তুলে নিচ্ছেন সুফি সাধকদের ধরনের জোব্বা, খেলার মাঠে পৌঁছে যাচ্ছেন কালো লুঙ্গি, পাঞ্জাবি আর শাল পরনে, মাথায় লম্বা পারসি ধাঁচের টুপি পরে, নিজেকে ‘ব্রাত্যজন’ অভিহিত করা অন্ত্যজীবনের দেবব্রত বিশ্বাস সাজপোশাকে, চালচলনে সাংস্কৃতিক রাবীন্দ্রিকতার গড়নটি ভেঙে পৌঁছে যাচ্ছেন যেন সেই রবীন্দ্রনাথেরই কাছাকাছি। আর ভেঙে দিচ্ছেন একক স্থাপত্যের মতো ‘রাবীন্দ্রিক’ আচারের উচ্চ দৃঢ় কাঠামোটি।

zoom
চালচলনে সাংস্কৃতিক রাবীন্দ্রিকতার গড়নটি ভেঙে দিয়েছিলেন দেবব্রত বিশ্বাস

‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত’ বইয়ে ‘রাবীন্দ্রিক’ শব্দটির ব্যবহার আছে। সেই ব্যবহারে আছে সকরুণ শ্লেষের আগুন। দেবব্রত লিখেছেন–

“শ্রদ্ধেয় প্রমথনাথ বিশী মশাই তো নিজেই আমার ঘরে এসে একটি ক্যাসেট (cassette) দিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর জন্য কিছু রবীন্দ্র-সংগীত রেকর্ড করে দেবার জন্য। তখন আমি তাঁকে বলেছিলাম, ‘আমি তো অরাবীন্দ্রিক, অনেকেই বলেন– আমার গান আপনি নেবেন কেন?’ তখন উনি বলেছিলেন, ‘ওসব কথা বাদ দিন তো। যদি দিনেন্দ্রনাথ অরাবীন্দ্রিক হন, তাহলে আপনিও অরাবীন্দ্রিক।’ আমি তখন হেসে বলেছিলাম ‘এসব কথা খবরের কাগজে একটু প্রকাশ করে দিন না।’ পরে গান রেকর্ড করে ক্যাসেটটি তাঁর বাড়িতে পৌছে দিয়ে এসেছিলাম।” (ব্রাত্যজনের রূদ্ধসঙ্গীত, দেবব্রত বিশ্বাস, পৃ. ১৬২, করুণা প্রকাশনী, কলকাতা)

zoom
দূরদর্শনে সংগীত-পরিবেশনরত দেবব্রত বিশ্বাস

রবীন্দ্রসংগীত-শিল্পী গীতা ঘটকের পিতৃদেব কানাইলাল গাঙ্গুলি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ও ঠাকুর পরিবারের ঘনিষ্ঠ, অমিয়া ঠাকুর ছিলেন ‘গীতা’র আপন মাসিমা। ‘গীতা’ শান্তিনিকেতন আশ্রম থেকে সংগীতভবনে গান শিখেছেন। সরাসরি গান শিখেছেন ইন্দিরা দেবী ও শৈলজারঞ্জনের কাছে। গীতা ঘটকের গানের শ্রুতিরূপে যে নাটকীয়তা ও কণ্ঠবাদনে ধ্বনি উৎপাদনের (sound production) নানা ওজনের স্বরের ব্যবহার, তা আমাদের শ্রবণ-অভিজ্ঞতার তথাকথিত ‘রাবীন্দ্রিক’ রূপটির সঙ্গে মেলে না। ওঁর সাজে চোখে গাঢ় দীর্ঘ কাজলের রেখা, কপালে নানা রঙের বড় গুঁড়ো টিপ, সোনার গহনা এবং সর্বোপরি গাওয়ার সময় ব্যতিক্রমী মুখভঙ্গি, হাতে নৃত্যমুদ্রার ব্যবহার– সবকিছুই যেন ব্রাহ্মসমাজ বা আশ্রমের ‘শোভনমঙ্গল’ ভঙ্গিটির বিপরীতে।

zoom
গীতা ঘটক

এই সাজ, কণ্ঠের সরু মোটা নানা ধরনের ধ্বনির প্রয়োগ, মুখ ও হাতের ভঙ্গি এবং সব কিছুতেই যে গাঢ় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য শরীরী ভাষায় ‘নির্মাণ’, তা আমাদের আবহমানের ‘রাবীন্দ্রিক’ গায়কীর অবয়বটিকে যেন ভেঙেচুরে দেয়। গীতা ঘটক গাওয়ার সময় যে মুখভঙ্গি করতেন, তা নয়নসুখকর ছিল না। মুখের পেশিকে ভেঙেচুরে ‘মুখশ্রী’র সাধারণ সংজ্ঞা থেকে বেরিয়ে তিনি হয়ে উঠতেন যেন অন্য একটি মুখ। গানের সময় মুখভঙ্গির মনস্তত্ত্ব বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ইন্দিরাদেবীকে লিখেছেন, (সাজাদপুর থেকে সিমলায়, ১০ জুলাই ১৮৯৩ তারিখে)

‘নাবার ঘরে গান তৈরি করবার ভারী কতকগুলি সুবিধা আছে। সবচেয়ে সুবিধা হচ্ছে কোনো দর্শকসম্ভাবনা-মাত্র-না-থাকাতে সমস্ত মন খুলে মুখভঙ্গী করা যায়। মুখভঙ্গী না করলে গান তৈরি করবার পুরো অবস্থা কিছুতেই আসে না। ওটা কিনা ঠিক যুক্তিতর্কের কাজ নয়, নিছক ক্ষিপ্তভাব।’

zoom
সুচিত্রা মিত্র-শান্তিদেব ঘোষ-রমা মণ্ডল

এই যে ‘দর্শকসম্ভাবনার’ কথা ভেবে মুখভঙ্গিকে কেবল স্নানঘরের আড়ালেই রাখছেন রবীন্দ্রনাথ, গীতা তাকে নিয়ে আসছেন সর্বসমক্ষে। নিজের ভিতরকার ক্ষিপ্তভাবকে আড়াল করছেন না। উস্তাদি গানে মুখব্যাদান বা হাতনাড়া আমাদের দৃষ্টির অভ্যাসে মিশে আছে। কিন্তু ‘রবীন্দ্রসংগীতে’ এই আচরণ ব্যতিক্রমী। হয়তো তার আড়ালেও আছে আমাদের ‘রাবীন্দ্রিক’ সাংস্কৃতিক আচরণের ধারণার অবয়বটি। অথচ অল্পবয়সে ছেলেদের মতো চুল ছেটে ফেলেও, কপালে টিপ ‘অলকে কুসুম’ না দিয়েও স্লিভলেজ ব্লাউজ পরিধানে রেখেও, বাংলার তাঁতের শাড়ি, গান গাওয়ার সময় গায়ে-আঁচল স্বল্পাভরণ সুচিত্রা মিত্র যেন অনায়াসেই মিশে যান বাঙালির যূথমানসের সংগীত পরিবেশনের ‘রাবীন্দ্রিক’ চালচিত্রটির মাঝে। হয়তো বা মন্দ্রসপ্তকে তাঁর কণ্ঠের গাঢ় স্থিতি, তাঁর মননশীল ব্যক্তিত্ব, উচ্চারণে এক ধরনের সারস্বত (academic) নিষ্ঠা, স্বরক্ষেপণে মন্ত্রোচ্চারণের মতো ঋজুতা– সব মিলিয়ে তিনি নিজেই হয়ে ওঠেন ‘রাবীন্দ্রিকতার’ এক শীলিত প্রাতিষ্ঠানিক প্রতীক।

zoom
পূর্বা দাম

মূলত বাংলার তাঁতের শাড়ি পরে, গায়ে আঁচলটি টেনে পাকা চুলে ‘সীমন্তে সিন্দুর’ এবং কপালে লাল সিঁদুরের টিপ– শুধুমাত্র এই প্রসাধনকে আশ্রয় করে পূর্বা দামও মিশে যান বাঙালির ‘রাবীন্দ্রিক’ রূপকল্পের পরিসরে। পাশাপাশি আমাদের মনে পড়ে পূর্ব পাকিস্তানে মৌলবাদী অনুশাসনকে উপেক্ষা করে টিপ পরে রবীন্দ্রসংগীত গেয়েছেন সন্‌জীদা খাতুন, পরনে বেশিরভাগ সময়ই থাকত টাঙ্গাইল শাড়ি, যদিও ইদানীং বাংলাদেশের রবীন্দ্রসংগীত গায়িকাদের পরিধানে ঢাকাই জামদানি যেন একটা রাষ্ট্রীয় পরিচিতি-চিহ্নের মতো চোখে ভেসে আসছে।

zoom
টিপ পরে গান গাইছেন সন্‌জীদা খাতুন, মৌলবাদী অনুশাসনকে অমান্য করে

বাম আমলে যে ঊষা উত্থুপকে ‘অপসংস্কৃতির বাহক’ তকমা দিয়ে মহাজাতি সদন কর্তৃপক্ষ ব্যান করেছিল– মামলায় জিতে আসার পর সুভাষ চৌধুরীর পরিচালনায় রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করলেন, আসরে হাজির হলেন তাঁর সিগনেচার বড় টিপ, চুলে মালা এবং চওড়া পাড় শাড়িতে। হাতের ভঙ্গি ও শরীরের মৃদু আন্দোলনে গাইলেন, ‘ওই মালতীলতা দোলে…’, বাঙালিকে অবাক করে আদায় করে নিলেন সুচিত্রা মিত্রের তারিফ। আবার বেশ মজার বিষয় হল, এইচএমভি আশা ভোঁসলের রবীন্দ্রসংগীতের ক্যাসেটের প্রচ্ছদে ব্যবহার করেছিল একটি হিন্দু-বাঙালি গৃহবধূর সাজের ছবি, লালপেড়ে শাড়ি আটপৌরে করে পরা, আঁচলে চাবির গোছা, কপালে সিঁদুর। আবার ব্রাহ্ম ঠাকুরবাড়ির বধূ অমিয়া ঠাকুর পরিণত বয়সে সাদা থান পরে আসরে গান গাইছেন– এ-ছবিও আমাদের চোখে ভাসে।

zoom
সাদা থান পরে আসরে গান গাইছেন ঠাকুরবাড়ির বধূ অমিয়া ঠাকুর

মূলত দেবব্রত বিশ্বাসের গায়নভঙ্গীর বাচিক অভিনয়ধর্মকে আশ্রয় করে, ট্রাউজার্স আর পাঞ্জাবিকে পরিধান হিসাবে ব্যবহার করে, মঞ্চে দাঁড়িয়ে, দুই হাতের প্রসার ও নানা ভঙ্গিকে প্রয়োগ করে পারফরম্যান্সের এক অন্যতম মৌলিক চেহারা উপস্থাপন করলেন নয়ের দশকের পীযূষকান্তি সরকার। অন্যান্য গানের মতোই, রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার সময় দাঁড়িয়ে দু’হাতের ভঙ্গিকে নানা ভাষায় ব্যবহার করে মূলত কথা বলার ভঙ্গির চালটি নিয়ে গান করতে শুরু করলেন লোপামুদ্রা মিত্র।

zoom
লোপামুদ্রা মিত্র

এর বিপরীতে আমাদের চোখে ভাসে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গান গাওয়ার ভঙ্গিটি। পুরু কাচের চশমার আড়ালে প্রায়-নিমীলিত তাঁর দু’চোখ, দৃষ্টি নিবদ্ধ হাতের খাতায়, যে খাতা দিয়ে তিনি আড়ালে রাখতে চান তাঁর মুখ ও স্বভাব-লাজুক সত্তাটিকে। তাঁর একান্ত গায়নভঙ্গি যেন স্বগতোক্তির মতো নিজস্ব উৎসার, গানের বাণীকে সুরের অবগাহনের সঙ্গে ঈষৎ অনুচ্চ রাখা। সব আড়ালের প্রতীক যেন হাতের ওই খাতাখানি।

zoom
শান্তিনিকেতনে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

সব মিলে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গান যেন এক নন-পারফরম্যান্সের ইশারা এনে দেয়। তাঁর এই নিভৃতনির্জন একান্ততা, দর্শক-শ্রোতার থেকে নিজেকে দূরত্বে রাখা ওঁর ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে মিশে যেন এক নিজস্ব গায়নদর্শন তৈরি করে। কণিকার গায়ন এবং পরিবেশনের দর্শনটি জন্ম নিয়েছিল তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতার এবং অনুভবের জগৎ থেকে, কারও নকলনবিশি করে নয়। কণিকা লিখছেন:

‘বাউল ফকিরদের কাছে গান শুনেছি। তা থেকে শিখেছি অনেক। দিনের পর দিন লোধাদের সঙ্গে মিশেছি। মিশেছি সাঁওতালি মানুষের সঙ্গে। তাদের গান, তাদের ধামসা মাদলের ছন্দ ভরিয়ে দিয়েছে আমার প্রাণ। কত কত সুন্দর দিন কেটেছে তাদের সঙ্গে। এমনও হয়েছে সাঁওতালপল্লীতে ঘুরে ঘুরে, গান শুনে, গান গেয়ে দিন কাটছে। পরের দিনই হয়ত কলকাতায় গিয়ে কোনও নামী-দামি মঞ্চে আমার গানের আসর। গান শুরু করছি যখন, তখনও যেন কানে বাজছে ধামসা, মাদলের তাল। সাঁওতালদের নাচ। সেই সুর, তালকে ভেতরে রেখে, গ্রামের সেই নিজস্ব মুক্তির পরিবেশকে ভেতরে রেখেই শুরু করতাম আমার গান। হয়ত সেই কারণেই, সে গান হয়ে উঠত আমার নিজের মত। নিজস্ব।’ (আনন্দধারা, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, আজকাল, কলকাতা, ১৯৯৮, পৃ. ৩১-৩২)

zoom
কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

আশ্চর্য লাগে, ইদানীংকার শান্তিনিকেতনে, মূলত সংগীতভবনের শিক্ষক-পড়ুয়াদের অধিকাংশেরই গাওয়ার সময় হাতে থাকে একটি রঙিন খাতা– গায়নভঙ্গি যেমনই হোক না কেন, খাতাটি থাকা চাই যেন একটি প্রাতিষ্ঠানিক বা সাংস্কৃতিক ‘লোগো’র মতো, যে ‘লোগো’র সঙ্গে কোনও না কোনওভাবে সংলগ্ন থাকে ‘রাবীন্দ্রিক’ নির্মাণটির আভাস, আর এভাবেই ‘রাবীন্দ্রিক’ শব্দটি দূরে সরে যেতে থাকে স্বয়ং এবং সমগ্র রবীন্দ্রনাথের থেকে! যে রবীন্দ্রনাথ সারাজীবন প্রথার অনর্থক খাঁচাগুলি ভাঙতে ভাঙতে চলেছেন, তাসদ্বীপের কৃষ্টিকে বিদ্রুপ করেছেন, মার্কা দেওয়ার সংস্কৃতিকে নস্যাৎ করতে চেয়েছেন– তাঁরই রচিত আশ্রম ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁরই গানের আত্মাকে আড়াল করছে অনুষঙ্গের ভার।

zoom
এইচএমভি-র রবীন্দ্রসংগীতের ক্যাসেটের প্রচ্ছদে হিন্দু-বাঙালি গৃহবধূর সাজে আশা ভোঁসলে

যে আশ্রমে একদিন তিনি আহ্বান করেছিলেন বিশ্বের সংস্কৃতিকে, সেই আশ্রমের সাজে-সজ্জায় মিশেছিল নানা অঞ্চলের নানা পরিসরের আলো, নান্দনিক ভুবনে বৈচিত্র ও সন্ধান ছিল সেই আশ্রমের নিরন্তর সাধনার অংশ। ভারতের নানা আবরণ ও আভরণ এসেছে সেখানে। কিন্তু কেন্দ্রে থেকেছে বাংলার সহজ-স্নিগ্ধ রূপের আদলটি। আজকের শান্তিনিকেতনের গাইয়েদের বাংলার শান্তিপুরি টাঙ্গাইল ধনেখালি প্রভৃতি তাঁতের শাড়ি পরে গান গাইতে প্রায় দেখাই যায় না। হয় ঢাকাই জামদানি পরেন, ওড়িশার মন্দিরপাড় তসর, (কাঁথা বা গুজরাটি কাজের শাড়িও), কপালে মেরুন বা কালো টিপ এবং হাতে রঙিন খাতা। এই সাজ আর অনুষঙ্গ মিলে তৈরি হয়েছে ইদানীংকার শান্তিনিকেতনের রাবীন্দ্রিক ট্রেডমার্ক!

zoom
সংগীতের ভুবনে: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (বামদিকে), দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর (ডানদিকে), মধ্যমণি অতুলপ্রসাদ সেন

আবহমানের সংস্কৃতির ইতিহাসে যেমন চিরকাল নানা ধরনের অনুষঙ্গিকতার আধিপত্য একটি রাজনীতিকে লালন করেছে, এবং তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজার, বিজ্ঞাপন, বিপণন এবং ‘আগমার্কা’ হয়ে ওঠার বিপজ্জনক প্রবণতা। এইভাবে ‘রাবীন্দ্রিক’ নির্মাণটি জন্ম দিয়েছে একধরনের সাংস্কৃতিক পুঁজিতত্ত্বের, ঠিক যেমন সমাজ-রাজনীতির আঙিনায় তৈরি করা হচ্ছে নানা ধরনের বিপণনযোগ্য নির্মাণ– আর আমরা জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে সেই নির্মাণকে বয়ে বেড়াতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি। গানের সুর তার চরণ খুঁজে পাচ্ছে এইসব নিরিখের মাঝেই।

………………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন শৈবাল বসু-র অন্যান্য লেখা

………………………….

asha bhosle Cultural Identity Debabrata Biswas Hemanta Mukhopadhyay HMV Kanika Bandyopadhyay Rabindra Sangeet Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Sanjida Khatun Shantiniketan Suchitra Mitra

Share this article on