


মাইক্রোফোন কবির কণ্ঠের ক্রুনিং করতে পারেনি। দিনেন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রগানের প্রথম অ্যামেচার মহিলা শিল্পী অমলা দাশ এমনকী প্লে-ব্যাক জগতের নক্ষত্র কাননদেবীর স্বরপ্রক্ষেপও ছিল দরাজ, তাঁরা এখনকার শব্দগ্রহণ স্টুডিওর এবং শ্রোতাদের কানের নিরিখে গান গাইতেন ‘মাজা গলা চাঁছা’ সুরেই, আর আসরে বা রেকর্ডে শ্রোতারাও তা শুনেছেন আহ্লাদে ভরপুর হয়েই।
৩.
সময়ের সঙ্গে কথা বলার ভঙ্গি বদলায়– একথা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন শম্ভু মিত্র। রবীন্দ্রনাথ যে ভঙ্গিতে তাঁর কবিতা আবৃত্তি করেছেন, আমাদের এই সময়ের কানে তা হয়তো অতিরিক্ত সুরেলা লাগে, খানিকটা উচ্চকিতও হয়তো। ঠিক যে কারণে প্রথমদিকের বাংলা ছায়াছবির সংলাপ ও গানের ভঙ্গি আমাদের অলীক মনে হয়, মনে হয় দূরবর্তী। কণ্ঠস্বর সানুনাসিক অনেক ক্ষেত্রেই, কথা বলায় একটা বাড়তি সুর যেন অভিনেতা আর দর্শকের মাঝে একটা আড়াল তৈরি করে, আমরা কথা বলার সেই ভঙ্গিটিকে দূরে সরিয়ে রাখি। কথা বলার মতো ‘গান বলা’ও বদলে যায়। ‘গান বলা’ বাংলা গানের পরিসরে একসময়ে খুব ব্যবহৃত একটা শব্দবন্ধ, এই ‘গান বলা’ কথাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাংলা কাব্যসংগীতে বাণীটা সুরে প্রকাশ করার একটা দায় আছে গাইয়ের। কীর্তন বা কথকতার গান, কবিগান, নানা পদ ও পয়ার– সেগুলি সবই পরিবেশন করা হয় টেক্সটকে শ্রোতার মর্মে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। সুর সেখানে গৌণ নয়, ভাবপ্রকাশ আর রূপসৃষ্টির এক অমোঘ অস্ত্র। কথা বলার ভঙ্গি বদলালেও গানের ভাবটি প্রকাশ করার দায় এতটুকুও কমে যায় না গাইয়ের। এই ভাব কিন্তু কথার টেক্সট আর সুরের টেক্সট– দু’টি আধারেই ভাগাভাগি করে ধরা আছে। সব মিলেই যে তাঁর সংগীত, একথা নানা ভাষায় ধরা আছে রবীন্দ্রনাথের সংগীতচিন্তায়। আবার প্রত্যেক ব্যক্তি মানুষের কথা বলার নিজস্ব একটা ভঙ্গি থাকে। আবার প্রতিটি ‘গান’ একটি শিল্পমাধ্যম হিসেবে একটি ভাবকে ধারণ করে। গাইয়ের কী কাজ? নিজের স্বভাব, স্বর, বাচনভঙ্গি, প্রকাশ-আচরণ সব কিছু দিয়ে গানটিকে প্রকাশ করা। সেই প্রকাশ যেন তাঁরই একান্ত হয়, কারও ভঙ্গির নকলনবিশি নয়। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় কথা বলতেন অনুচ্চস্বরে, তাঁর স্বভাবে একটি আড়াল ছিল, গান গাইবার সময়ও নিজেকে রাখতেন গানের আড়ালে, কিন্তু তাঁর স্বরের এক্সপ্রেশন ছিল তীব্র। সুর তো ব্যক্তিনিরপেক্ষ, সে তো বহু সাধনার ধন। সময়ের সঙ্গে সমাজে বাচনভঙ্গি বদলায়, সুর লাগাবার মাপকাঠি একই থাকে। সুরই তো কথাকে সংগীত করে তোলে। আমরা দেখলাম, কণিকার অনুচ্চ গায়নভঙ্গি, কমনীয় আলতো উচ্চারণ নকল করতে শুরু করলেন অনেকে। তাঁরা তখন কিন্তু একটি ভঙ্গিকেই উপস্থাপন করতে লাগলেন। গানের ভিতর দিয়ে ভুবনখানি দেখা এবং দেখাবার কাজটি থেকে সরে গেলেন অনেকটা দূরে। তাঁরা হয়তো ভাবলেন, তাঁরা একটি প্রাতিষ্ঠানিক ‘গায়কি’কে গৌরবের সঙ্গে রক্ষা করছেন। কিন্তু আসলে তাঁরা গায়কির নামে একটি সাংস্কৃতিক নির্মাণকেই (cultural construct) বহন করতে থাকলেন শুধু। ‘ভাব’-এর থেকে ‘ভঙ্গি’ বড় হয়ে উঠল। আমরা মনে রাখব, কবি গানে যা লিখেছেন– তার চেয়ে বড় সত্য তাঁর কাছে আর কিছু নেই। তাই মানুষ যে সততা আর বিশ্বাস নিয়ে সত্য কথাটি বলে, সেই বলার ভঙ্গিটিই তার ভাব প্রকাশের সর্বোত্তম পথ। রবীন্দ্রনাথের স্বকণ্ঠের গান শুনে সেই কথাটিই মনে আসে বারবার।

ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী (আশ্রমের ‘বিবিদি’) রবীন্দ্রনাথের গানের প্রথম যুগের অন্যতম মুখ্য শিক্ষক। ইন্দিরা দেবী, সরলা দেবী প্রমুখ জন্মসূত্রেই রবীন্দ্রনাথের গানকে পেয়েছেন, মুনশিয়ানার সঙ্গে গেয়েছেন, কিন্তু রেকর্ড করেননি কোনও অজানা কারণে। ব্রিটিশ লাইব্রেরির সাউন্ড আর্কাইডে আর্নল্ড বাকের রেকর্ড করা ইন্দিরা দেবীর ৮২ বছর বয়সের কণ্ঠে ‘কতবার ভেবেছিনু’ গানটি রয়েছে (সংযোজন সংখ্যা C52/NEP/71C1)। ওই বয়সেও ওঁর ঋজু স্বর, খাড়া সুর লাগানোর দাপট শুনে চমক লাগে। ‘তোমার চরণে’র চড়ার সা-টি তিনি লাগান একেবারে সোজাসুজি, খোলা গলায়। ওঁর দীর্ঘ জীবনের উপান্তে ক্ষিতীশ রায়কে দেওয়া ওঁর বেতার সাক্ষাৎকারে উপরোধে গাইলেন সেই গান। তখন কণ্ঠের সেই আলো অস্তমিত, তবুও গায়কিতে ওই স্পষ্ট খাড়া স্বর লাগানোর ঋজুভঙ্গি। (এই সাক্ষাৎকারটি ইউটিউবে শ্রবণলভ্য)। সরলা দেবী ছিলেন তাঁর রবিমামার গানের জনপ্রিয় পারফর্মার। গান রেকর্ড করেননি, কিন্তু সেই যুগের নানা সভায় তাঁর গানের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। বাড়ির বাইরে গান গাইতে তাঁকে নিয়ে যান প্রথম রবীন্দ্রনাথই। বন্দেমাতরম গানে রবীন্দ্রনাথের যে সুরটি কংগ্রেস ও অন্যান্য সভায় ছড়িয়ে পড়েছিল বিপুল তরঙ্গে, সে গানের স্তবকের ‘ত্রিংশ কোটি’ পঙ্ক্তি থেকে সুর সরলাই দিয়েছিলেন তাঁর রবিমামার আদেশে। রবীন্দ্রনাথের গানে হারমোনাইজ করে পিয়ানোতে বাজিয়ে কবির তারিফ পেয়েছিলেন। পিয়ানোতে হারমোনাইজ করে ‘সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে’, ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে’ গাইতেন সরলা। সরলা লিখছেন, ঠাকুরবাড়িতে পিয়ানো এবং এসরাজ– দু’টিই ছিল অত্যন্ত পছন্দের যন্ত্র। ইন্দিরা দেবীও ছিলেন পিয়ানোতে দক্ষ। যেহেতু ওঁরা প্রায় সকলেই বিলিতি গানে সিদ্ধকণ্ঠ ছিলেন, কাজেই বিলিতি সুরের ধাঁচে তৈরি রবীন্দ্রসংগীত তাঁদের কণ্ঠে পেত এক শিক্ষিত সুরের রণন। সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘চারুলতা’ ছবিতে ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে’ গানে এই ঘরানাটি আমাদের শ্রুতিপরিসরে যেন নথিবদ্ধ করে রাখলেন। শান্তিনিকেতন আশ্রমে এই পিয়ানো বাদন ও নিরীক্ষাগুলি অপসৃত হয়েছিল, এসরাজ সাহচর্যে গান গাওয়ার চল ক্রমে ক্রমে প্রাধান্য পেল। দিনেন্দ্রনাথ শ্রুতিময় যন্ত্র এসরাজ বাজিয়ে গান শেখাতেন, কিন্তু যেহেতু তাঁর কণ্ঠের বাজ এবং উপস্থিতি (presence) ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল, তাই তাঁর সাক্ষাৎ শিষ্যদের গানে লক্ষ করি তাঁর কণ্ঠবাদনের আভা, সে গায়নে মীড়ের জায়গায় নিটোল মীড় এবং খাড়া স্বরের জায়গায় খাড়া স্বর লেগেছে অকুণ্ঠ স্পষ্টতায়। আরেকটু পিছিয়ে গিয়ে আমরা যদি রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে ‘আমার পরান লয়ে’ গানটি শুনি, দেখব কবির স্বরক্ষেপ যেন ব্যাটের মাঝখানে বল লাগার মতো, পাশাপাশি প্রয়োজনীয় মীড়টি যেন হয়ে উঠছে সুরের তরী, যেন নদীতটের দীর্ঘ ঋজু গাছের গায়ে এসে লাগছে গভীর ঢেউ, গান হয়ে উঠছে ছবি।

রবীন্দ্রনাথ, দিনেন্দ্রনাথ, অমলা দাশ, সাহানা দেবী প্রমুখ যখন গাইছেন, তখন গানের জগতে মাইক্রোফোন এসে গেলেও পুরো গলা না ছেড়ে ‘ছোট গলায়’ মিষ্টি করে গাইবার চল, যাকে বিলিতি ভাষায় বলে ‘ক্রুনিং’ (crooning), তা আরম্ভ হয়নি। যে রবীন্দ্রনাথ ‘তাসের দেশ’-এ চরিত্রের মুখে বলিয়ে নেন, ‘কৃষ্টি শব্দটা শুনতে মিষ্টিও নয় স্পষ্টও নয়’, তিনি মিষ্টি করে গান গাইবার খুব একটা পক্ষপাতী ছিলেন না। লিখছেন–
“যাহারা গানের সমজদার এইজন্যই তাহারা অত্যন্ত উপেক্ষা প্রকাশ করিয়া বলে ‘অমুক লোক মিষ্ট গান করে’। ভাবটা এই যে মিষ্টগায়ক গানকে আমাদের ইন্দ্রিয়সভায় আনিয়া নিতান্ত সুলভ প্রশংসার দ্বারা অপমানিত করে, মার্জিত রুচি ও শিক্ষিত মনের দরবারে সে প্রবেশ করে না।… যাহা সহজেই মিষ্ট তাহাতে অতি শীঘ্রই মনের আলস্য আনে, বেশিক্ষণ মনোযোগ থাকে না। অবিলম্বে তাহার সীমায় উত্তীর্ণ হইয়া মন বলে, ‘আর কেন,ঢের হইয়াছে।’…”
মাইক্রোফোন কবির কণ্ঠের ক্রুনিং করতে পারেনি। দিনেন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রগানের প্রথম অ্যামেচার মহিলা শিল্পী অমলা দাশ এমনকী প্লে-ব্যাক জগতের নক্ষত্র কাননদেবীর স্বরপ্রক্ষেপও ছিল দরাজ, তাঁরা এখনকার শব্দগ্রহণ স্টুডিওর এবং শ্রোতাদের কানের নিরিখে গান গাইতেন ‘মাজা গলা চাঁছা’ সুরেই, আর আসরে বা রেকর্ডে শ্রোতারাও তা শুনেছেন আহ্লাদে ভরপুর হয়েই। দেবব্রত বিশ্বাস ও তাঁর গান নিয়ে সত্যজিৎ রায়ের একটি সাক্ষাৎকারের ভিডিও ইউটিউবে পাওয়া যায়। সেখানে সত্যজিৎ বলছেন, ‘তখন থেকেই মাইকের ব্যবহার আসরে গাওয়াতে চলে এসেছিল, ফলে অধিকাংশ যাঁরা গান করতেন… সেরকম দরাজ গলা কারও শুনেছি বলে মনে পড়ছে না, সকলে মাইকটার ব্যবহার করে গলাটা অনেকটা মিনমিনে করে নিয়েছিল, যাকে ক্রুনিং বলে। কিন্তু জর্জদা সেটা কখনও করেননি। সেটা আমাদের কাছে সবচেয়ে ভালো লাগার ব্যাপার ছিল, কেন না খোলা গলায় দরাজ গলায় জর্জদা গান করতেন, সে ধরনের রবীন্দ্রসংগীত কলকাতা থেকে ক্রমে ক্রমে গুটিয়ে আসছিল।’

তাঁর বুচিমাসি এবং উত্তরকালে বউদি কনক দাশ (বিশ্বাস)-এর কণ্ঠবাদন সম্পর্কে দেবব্রত বিশ্বাস লিখছেন, “মনে পড়ে বহু বৎসর আগের সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের কোনো একটি উৎসবের দিনে বুচিমাসির সঙ্গে ‘হে মোর দেবতা’ গানটি দ্বৈতভাবে গাইতে হয়েছিল। তখনকার দিনে ব্রাহ্মসমাজের মন্দিরে মাইক্রোফোন ব্যবহারের প্রচলন হয় নি। দুজনে তো গানটি শুরু করলাম। গানটির অন্তরার ভাগে যখন চড়ার দিকে বুচিমাসির গলার আওয়াজ জোয়ারি শুনে আমার গায়ে কাঁটা দিতে লাগল। আমার গান বন্ধ হয়ে গেল, চোখ বুজে শুনছিলাম বুচিমাসির গান– হঠাৎ তাঁর কনুইয়ের ধাক্কায় চমকে উঠলাম…” (‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত’)। এ প্রসঙ্গে আমাদের মনে পড়ে সত্যজিৎ রায়ের ভাগনি রবীন্দ্রনাথের আশিসধন্য সতীদেবীর কন্যা রুমা গুহঠাকুরতা তাঁর কণ্ঠকে কোনওভাবেই ক্রুনিং করেননি, যে কোনও গানে তাঁর উদাত্ত পূর্ণ কণ্ঠ আজও আমাদের কানে বাজে।
ফিরে যাই রবীন্দ্রনাথের গান গাইবার বর্ণনায়। ১৮৯৪ সালের একটি দিনে রানাঘাটে কবি নবীনচন্দ্র সেনের বাসভবনে তাঁর সদ্যরচিত ‘এসো এসো ফিরে এসো’ গানটি গাইছেন রবীন্দ্রনাথ। শ্রোতা নবীনচন্দ্র লিখছেন:
‘আমার বোধ হইতে লাগিল, কণ্ঠ একেবারে গৃহ পূর্ণ করিয়া, গৃহের ছাদ ভিন্ন করিয়া, আকাশ মুখরিত করিতেছে।… গানের ভাবের সঙ্গে সঙ্গে যেন মুখ ও চক্ষু অভিনয় করিতেছে।’ (আমার জীবন, তৃতীয় খণ্ড) এই শেষ বাক্যটিতে আমরা গায়ক রবীন্দ্রনাথের পারফরম্যান্সটা যেন দেখতে পাচ্ছি। নিজের গানকে কণ্ঠে প্রকাশ করবার সময় তাঁর চোখমুখ অভিব্যক্তিময় হয়ে উঠছে। এক্সপ্রেশনিজমের যে শর্ত ইংরেজি রোমান্টিক কাব্যে সমগ্র ভাবকে অকুণ্ঠিতভাবে প্রকাশ করতে নির্দেশ দেয়, বা ভারতীয় কলাবিদ্যায় রসসৃষ্টির যে নির্দেশে কীর্তন বা কথকতার শিল্পী, (কথক নাচের ‘ভাও’ জিনিসটিও এসেছে এই কথা বলার ভঙ্গিটি থেকেই) চোখেমুখে, শরীরে ভাবের পূর্ণ প্রকাশকে অবারিত রাখেন, রবীন্দ্রনাথের গান গাইবার এই বর্ণনা আমাদের সেই কথাটি মনে করিয়ে দেয়। ‘এসো এসো ফিরে এসো’ গানটি যখন রবীন্দ্রনাথ রেকর্ড করেন, তখন তাঁর কণ্ঠের সেই জৌলুশ অস্তমিত, কিন্তু রেকর্ডে সেই বয়সেও পূর্ণ স্বরে কীর্তন বা কথকতার ভঙ্গিতে গাইলেন সেই গান। অথচ এই গানই যখন আমরা রবীন্দ্রসংগীতের অগ্রগণ্য শিল্পী ও এইচএমভি কোম্পানির মান্য রবীন্দ্রসংগীত প্রশিক্ষক সন্তোষ সেনগুপ্তর কণ্ঠে শুনি, দেখি রবীন্দ্রনাথের এই গানের গায়নটির তুলনায় তা অনেক স্তিমিত, যন্ত্রভারাক্রান্ত এবং রবীন্দ্রগায়নের কথা বলার নিটোল ভঙ্গিটি সেখানে অনুপস্থিত।

মাইক্রোফোন গাইয়েদের কণ্ঠের স্বাস্থ্যের পক্ষে একটি জরুরি যন্ত্র। এর মূল কাজ অনেকের কাছে গাইয়ের স্বরকে পৌঁছে দেওয়া, এতে গলায় অনাবশ্যক চাপ পড়ে না। আমরা জানি বহুজনের সভায় সজোরে গান গাইতে বাধ্য হয়ে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং তাঁর কণ্ঠের উজ্জ্বলতা হারিয়েছিলেন। কিন্তু মাইক্রোফোন যখন কণ্ঠের ঔদার্যকে ক্ষুণ্ণ করে, তখন গান কতটা পূর্ণ প্রাণে গাইছেন শিল্পী, আর কতটাই বা তাঁর লক্ষ্য কণ্ঠের শ্রুতিমধুর ধ্বনির উৎপাদন– তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
আর একটা কথা। সরাসরি তাঁর কাছে তালিম পেয়েছেন এমন শিষ্যশিষ্যাদের বয়ান অনুসারে আচার্য শৈলজারঞ্জন গান শেখাতেন গানের প্রতিটি পদ (phrase) ধরে ধরে, সুর, শ্রুতি, মীড়, টপ্পার কাজ, স্পর্শস্বর– এইসব খুঁটিনাটির দিকে ওঁর নজর ছিল তীব্র। দিনেন্দ্রনাথের মতো বা সমকালীন শান্তিদেবের মতো তিনি ঠিক রবীন্দ্রগানের পারফর্মার ছিলেন না, গানের সালংকার সুরকে নিখুঁতভাবে কণ্ঠে তুলে দেওয়ার কঠিন দায় তিনি নিয়েছিলেন। হাতের এসরাজ বাজত নিখুঁত সুরে, বয়সের ভারে যখন কণ্ঠ শ্রান্ত, এসরাজে নিপুণভাবে স্বর ও শ্রুতিকে প্রকাশ করতেন। তিনি উঁচু পর্দার (high pitch) এসরাজ বাজাতেন, অশেষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের খাড়া করে হাতে ধরা তন্ত্রকারী শৈলী থেকে এই বাজ অনেকটা আলাদা। হাই-পিচ এসরাজের তীক্ষ্ণ সুর এবং মীড়প্রধান বাজ সুরশিশিক্ষু কানে বেশি করে বাজত। আমরা কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপম সুরেলা কণ্ঠটিকে জানি, সেই কণ্ঠের ধ্বনিগুণ যেন এসরাজের সঙ্গে মিলে যায়, বিশেষ করে হাই পিচ এসরাজের চিকন স্রোতের মতো আওয়াজ ও নিটোল মীড় যেন কণ্ঠে ধারণ করেন কণিকা। স্বভাবলাজুক ও অন্তর্মুখী চরিত্রের কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গায়নে আসে এক রমণীয় কোমলতা। নৃত্যনাট্যের গানের বাইরে ওঁর গানের ভঙ্গিটি স্বগতকথনের মতো, ওঁর সামনে যেন কেউ নেই, তিনি নিভৃতে রাখবেন তাঁর একান্ত নিবেদন।

তাঁর এই নন্দন-অবস্থানের পাশাপাশি আমরা শুনি শৈলজারঞ্জনের আর এক প্রায় সমকালীন শিষ্যা নীলিমা সেনের গায়ন, ওঁরও অনুচ্চকিত গায়ন, কণ্ঠস্বরে এক অপূর্ব বিষাদ, গাইতে গাইতে গলাটা যেন একটু ধরে যাওয়া, আকবরি মোহরের (অবনীন্দ্রনাথ কণিকাকে এই নাম দিয়েছিলেন) কণ্ঠের এসরাজি উজ্জ্বলতার পাশে এই কণ্ঠ যেন মাটির বাঁশি। দু’জনের সাজের ধরনেও সেই একই ফারাক, আগ্রহীজন সেটা লক্ষ করে থাকবেন। নীলিমা সেন গাইবার সময় নিজেকে গানের আড়ালে রাখতেন। এই ধরনের গায়ন যেন এক ধরনের ইম্প্রেশনিস্ট ছবির মতো। সোজাসুজি কমিউনিকেট করার দায় থেকে দূরবর্তী এর অবস্থান। এই দুই গাইয়ে কাউকে নকল করেননি, গান তাঁদের স্বভাবের সহজ উৎসারের মতো। এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছে যাওয়ার কোনও কারণ নেই যে, এঁদের গায়নভঙ্গি অবিকল শৈলজারঞ্জনের মতোই। শৈলজারঞ্জনের অন্যতম মুখ্য ছাত্রী চিত্রলেখা চৌধুরীর গায়নশৈলী অন্তর্মুখী নয় মোটেও। রাইফেল শুটিং-এ খেতাব পাওয়া আজীবন কোমরে আঁচল গুঁজে শাড়ি পরনে গান গাওয়া চিত্রলেখার গায়ন ও কণ্ঠপ্রক্ষেপ কিন্তু উন্মুক্ত ও অপেলব। কিন্তু অন্তত দু’টি প্রজন্ম ধরে দলে দলে গাইয়ে (বনানী ঘোষ, রেজওয়ানা বন্যা, স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় প্রমুখ গুটিকয়েক স্বকীয়তায় উজ্জ্বল গাইয়েকে বাদ দিয়ে) অন্ধভাবে দাগা বুলিয়েছেন মূলত কণিকা ও নীলিমার সুরঋদ্ধ মৌলিক কণ্ঠবাদনের ওপর দিয়ে, ফল হয়েছে মারাত্মক। এই নকলনবিশি এক ধরনের কৃত্রিম, অনেকাংশে গলা চেপে গাওয়ার এক ধরনের দলীয় অভ্যাস তৈরি করেছে আর সেই অভ্যাসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ‘রাবীন্দ্রিক’ তকমাটি।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved