performing tagore songs: a gender perspective | Robbar
Robbar
  • ১ আশ্বিন ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রবীন্দ্রগায়নের লিঙ্গবিচার

রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রে এমন কণ্ঠই পুজোর দিনে বাতাসে ভাসিয়েছে বাঙালি, যেসব কণ্ঠের সঙ্গে মানিয়ে যায় হ্যান্ডসাম মাচো পুরুষ বা ‘মিষ্টি মেয়ে’র রমণীয় ইমেজ। এই কণ্ঠের গায়কিতে উচ্চারণ শান্তিনিকেতনী ঘরানার তথাকথিত ‘রাবীন্দ্রিক’ উচ্চারণের তুলনায় চিকণ ও মিঠে, স্বরক্ষেপণে বাংলা বেসিক বা ফিল্মের গানের প্রকৌশল রবীন্দ্রসংগীতের ‘লক্ষ্মী সরস্বতী’ গোছের ঈষৎ গোল ভঙ্গিটিকে ভেঙে দেয়। তৈরি হয় বাটলার-কথিত বিষমকামী সমাজ সংস্কৃতির ‘মেয়েলি’ আর ‘পুরুষালি’ পারফরম্যান্সের তীব্র বাইনারি।

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬, ২০:০২   
Facebook WhatsApp Messenger

৭.

বিশ্বভারতীর সংগীতভবনে রবীন্দ্রনাথের গান শিখতে এসে শাড়ি পরা ছেড়ে দিয়ে পাঞ্জাবি-পাজামা পরে ক্লাসে যাওয়া শুরু করল এক অল্পবয়সি পড়ুয়া। এমনকী পরীক্ষার দিনও সতীর্থ ছেলেদের মতোই আশ্রমের রীতি মেনে ওই একই পোশাক পরে গানের ভবনে গেল সে। জন্মে-পাওয়া নারীচিহ্নকে অতিক্রম করে সে স্পষ্ট করল তার পুরুষপরিচয়, তার জেন্ডার আইডেন্টিটি। গান গায় সে নিপুণ সুরে, গভীর দরদে। শান্তিনিকেতনের চৌহদ্দি পেরিয়ে তার কণ্ঠ ছড়িয়ে গেল বাংলার এপারে ওইপারে। সোশাল মিডিয়ায় তার একটা ফ্যানবেস তৈরি হল। কলকাতা শহরে, এমনকী বাংলার বাইরেও গান গাওয়ার ডাক পেতে লাগল এই অল্প বয়সে। ঠিক যেমন বাংলাদেশের রূপান্তরী শিল্পী রামিসা চৌধুরীর সনিষ্ঠ রবীন্দ্রগানও সুধীসমাজের আদর পেতে থাকছে সমাজমাধ্যমে।

‘কিন্তু জানো তো শৈবালদা, আজকাল দূরের, এমনকী কাছের মানুষরাও কথা বলতে থাকছেন আমার সাজপোশাক নিয়ে, আমার চলাফেরার ভাবভঙ্গি নিয়ে।’, বলল মেঘ, অভিমানমাখা সরল অথচ গাঢ় স্বরে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘তার মানে তোমার গানের চাইতে তোমার জেন্ডার-অনুষঙ্গেই তাদের বেশি মনোযোগ এখন?’ মেঘ বলল, ‘শুধু তাই নয়, অনেকেই বলছেন আমি না কি গান থেকে দূরে সরে গিয়েছি, নিজের পুরুষ-পরিচয়কে হাইলাইট করতেই আমি বেশি ব্যস্ত… অথচ জানো আত্মপরিচয়ের এই লড়াইতে আমি সবচেয়ে বেশি শক্তি পাই রবীন্দ্রনাথের গান থেকেই…’। 

zoom

যে গানের ভিতর দিয়ে একজন নবীন শিল্পী ভুবনখানিকে দেখতে চাইছে, তার শ্রোতার ভুবন তার গানকে না দেখে দেখতে চাইছে তার লিঙ্গপরিচয়ের চিহ্নগুলিকে– এই করুণ আয়রনি আজ যে সময়ে তৈরি হচ্ছে, তার ঠিক ৩৬ বছর আগে পশ্চিমি দুনিয়ায় লেখা হচ্ছে এক গণ্ডি-ভাঙা বই, জুডিথ বাটলার-এর ‘জেন্ডার ট্রাবল’। সে বইতে জুডিথ প্রশ্ন করছেন কেবল জন্মসূত্রে ‘নারী’ আর ‘পুরুষ’ এই বাইনারিকে, দু’টি মানুষের প্রণয় বা রতিসংযোগের বিষমকামী আধিপত্যকে। কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবীবিদ্যাচর্চার পরিসরে শুরু হচ্ছে জেন্ডারচর্চা। আর বাটলার-এর এই দুনিয়া-কাঁপানো বইটি লেখার ৫৯ বছর আগে, ১৯৩১ সালের ডিসেম্বরে, রবীন্দ্রনাথ চিঠিতে লিখছেন হেমন্তবালা দেবীকে–

‘একটা কথা মনে রেখো, আমরা সকলেই এক হিসাবে অর্ধনারীশ্বর। কারও মধ্যে বা আধাআধি মিশোল, কারও মধ্যে বা ভাগের কমিবেশি আছে। একান্ত নারী বা একান্ত পুরুষে যদি সংসার বিভক্ত হত, তাহলে তারা মিলতেই পারত না।’

৩১ বছর বয়সে লেখা কাব্যনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’য় তিনি নিয়ে আসছেন নারীর ক্রস-ড্রেসিং আর রূপান্তর-কামনার জটিল উদ্ভাস। সামাজিক নির্মাণে যা পুরুষালি, সেই আচরণে অভ্যস্ত রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদা কামদেবকে বলছেন:

‘…পুরুষের বেশে
নিত্য করি রাজকাজ যুবরাজরূপে
ফিরি স্বেচ্ছামতে; নাহি জানি লজ্জা ভয়,
অন্তঃপুরবাস, নাহি জানি হাবভাব বিলাসচাতুরী…’

zoom
‘চিত্রাঙ্গদা’ ছবির একটি দৃশ্যে ঋতুপর্ণ ঘোষ

সমাজে একটি মেয়ের পুরুষালি গড়ন আর চলন অনুসারে নির্ণীত হয় তার সৌন্দর্যের মাপ। তাই রবীন্দ্র-শতবর্ষে এইচএমভি প্রকাশিত ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্যের রেকর্ডের ইন-লে-তে পুরুষবেশী চিত্রাঙ্গদা আর রূপান্তরিত চিত্রাঙ্গদা এই দুই চরিত্র হয়ে পড়ে ‘কুরূপা’ আর ‘সুরূপা’ এবং অদ্যাবধি আশ্রমে সদনে ভবনে নগরে গ্রামে ইনস্টাগ্রামে ‘লাগু’ হয়ে যায় আক্ষরিক অর্থে অরাবীন্দ্রিক এই দুই অভিধা। রেকর্ড কোম্পানি এবং পরিচালক সন্তোষ সেনগুপ্ত সেই ‘কুরূপা’ চরিত্রের গানের জন্য বেছে নেন সেই সুচিত্রা মিত্রকে যাঁকে লব্ধপ্রতিষ্ঠ হয়েও শুনতে হয়েছে ছোট করে চুল ছেঁটেছেন কেন, যাঁর কণ্ঠ ভারী, লাস্যহীন।

আর গায়কি? রবীন্দ্রঘনিষ্ঠ সংগীতবিদ ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় যাঁর গান শুনে লিখছেন: ‘মনে হয় দিনেন্দ্রনাথ ফিরে এলেন।’ এই কথাটি লেখার ঠিক আগেই ধূর্জটিপ্রসাদ লিখছেন সুচিত্রার খোলা গলা, পুরো দমে গাওয়া, স্পষ্ট উচ্চারণ ও গাঢ় ছন্দজ্ঞানের কথা। প্রশ্ন আসে, এই গুণগুলি কি রবীন্দ্রনাথের গায়কিতে ছিল না? ধূর্জটিপ্রসাদ তো নিবিড় সংগীত-সান্নিধ্য পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথের, অস্তমান জীবনে রেকর্ড করা অসামান্য গায়কির গানগুলিও তো তাঁর অশ্রুত নয়। তবে?

zoom
রবীন্দ্রনাথের নিজের রেকর্ড

আসলে রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠের গড়ন ছিল মিহি, দিনেন্দ্রনাথের মতো জলদমন্দ্র ব্যারিটোন বা বেস ছিল না রবিকণ্ঠে। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তে গিয়ে সাজপোশাক, লম্বা চুল ও মিহি গলার জন্য সহপাঠীদের পরিহাসের শিকার হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯৩৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে আহূত হয়ে সেই অপমানের ইতিহাসটি বিবৃত করেন তিনি সশ্লেষে। ‘আকারে প্রকারে সমস্ত ক্লাসের সঙ্গে আমার এমন কিছু ব্যত্যয় ছিল যাতে আমাকে দেখামাত্র পরিহাস উঠল উচ্ছ্বসিত হয়ে। বুঝলুম, মণ্ডলীর বাহির থেকে অসামঞ্জস্য নিয়ে এসেছি।’ (সূত্র: Presidency College Alumni Association, Tagore Centenary No.1961)

ঋতুপর্ণ ঘোষ একটি সাক্ষাৎকারে জানাচ্ছেন, সেই সময় রবীন্দ্রনাথের লম্বা চুল এবং মিহি গলা, এবং অন্য ছন্দের সাজপোশাকের জন্য শুনতে হয়েছিল, ‘বাইজি এল না কি?’ (রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারটি ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামে ইউটিউবে শুনে নিতে পারেন পাঠক) পুরুষালি ‘মণ্ডলী’র বাইরে যে রবীন্দ্রনাথ, তাঁর কণ্ঠস্বর যাঁরা স্বকর্ণে শুনেছেন, তাঁদের বয়ান কীরকম? ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হল যে রবীন্দ্রনাথের গান শুনে চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় কবির কণ্ঠ সম্পর্কে লিখছেন, ‘যেমন মধুর তেমনি তীক্ষ্ণ, স্পষ্ট…’ (রবিরশ্মি)। নবীনচন্দ্র সেন তাঁর আত্মজীবনীতে লিখছেন রবীন্দ্রনাথের ‘মধুর কামিনীলাঞ্ছিত’ কণ্ঠের কথা। অপরদিকে দিনেন্দ্রনাথের গম্ভীর ব্যারিটোন ধরা পড়েছে তাঁর রেকর্ডে, তাঁর শিষ্যশিষ্যারাও লিখছেন তাঁর মেঘমন্দ্র গাঢ় স্বরের কথা। সেই কারণেই সুচিত্রা মিত্রের ভারি গলাটি শুনে ধূর্জটিপ্রসাদের মনে হল, ‘বুঝি দিনেন্দ্রনাথ ফিরে এলেন’, রেকর্ড কোম্পানির মনে হয় পুরুষালি এমনকী ‘কুরূপা’ চিত্রাঙ্গদার জন্য উপযুক্ত কণ্ঠটি সুচিত্রা মিত্রের। আর তাঁদের কাছে ‘সুরূপা’র নীরব ভঙ্গির সংগীতলীলার সকল শর্ত পূরণ করতে পারেন কিন্নরীকণ্ঠী কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। (মনে পড়ে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কণিকার একটি লংপ্লেয়িং রেকর্ডের ইন-লে লিখতে গিয়ে ‘কিন্নরী’ শব্দটি ব্যবহার করেন।)

zoom
সুচিত্রা মিত্র

কণিকার কণ্ঠ কোমল সুরেলা, গায়কিতে একটি পেলব লাস্য আছে। ওঁর কণ্ঠে ‘কার মিলন চাও’ গানটির ‘বিরহী’ শব্দের উচ্চারণেও তিনি ব্যবহার করেন একটি লতার মতো ভঙ্গি। এই ভঙ্গি ওঁর স্বভাবজাত লাজুকতার সঙ্গে মিশে থাকে। যেমন গীতা ঘটকের কণ্ঠবাদনে মিশে থাকে মানুষী যৌনতার উদ্ভাস। তাঁর গানের শরীরে মিলে যায় শরীরের গান। কিন্তু ভাবার বিষয় হল বিপুল খ্যাতি আর জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও সুচিত্রা-কণিকার রেকর্ড খুব একটা বাজতে শুনিনি উৎসবে বা পুজো প্যান্ডেলে। বরং আবাল্য দেখছি পুজোর প্যান্ডেলে রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বেজেছে হেমন্ত, কিশোরকুমার, দেবব্রত, দ্বিজেন, চিন্ময়, শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ দরাজ ‘পুরুষালি’কণ্ঠ, যেসব কণ্ঠের bass বা ব্যারিটোন আছে। আর মহিলা-শিল্পীর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বাজতে দেখেছি আশা ভোঁসলে, অরুন্ধতী হোম চৌধুরী বা ইন্দ্রাণী সেনের রবীন্দ্রসংগীত। রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রে এমন কণ্ঠই পুজোর দিনে বাতাসে ভাসিয়েছে বাঙালি, যেসব কণ্ঠের সঙ্গে মানিয়ে যায় হ্যান্ডসাম মাচো পুরুষ বা ‘মিষ্টি মেয়ে’র রমণীয় ইমেজ। এই কণ্ঠের গায়কিতে উচ্চারণ শান্তিনিকেতনী ঘরানার তথাকথিত ‘রাবীন্দ্রিক’ উচ্চারণের তুলনায় চিকণ ও মিঠে, স্বরক্ষেপণে বাংলা বেসিক বা ফিল্মের গানের প্রকৌশল রবীন্দ্রসংগীতের ‘লক্ষ্মী সরস্বতী’ গোছের ঈষৎ গোল ভঙ্গিটিকে ভেঙে দেয়। তৈরি হয় বাটলার-কথিত বিষমকামী সমাজ সংস্কৃতির ‘মেয়েলি’ আর ‘পুরুষালি’ পারফরম্যান্সের তীব্র বাইনারি।

zoom
‘ফাল্গুনী’ নাটকে অন্ধ বাউলের ভূমিকায় গান গাইছেন রবীন্দ্রনাথ

জাতির মধ্যে পৌরুষ ও ক্ষত্রিয়সুলভ বীর্য জাগিয়ে তুলতে একসময় বিবেকানন্দ মনে করেছিলেন, “এখন কিছুদিনের জন্য মানুষের কেবল কোমল ভাব উদ্দীপক গানবাজনা বন্ধ করতে হবে। খেয়াল টপ্পা প্রভৃতি হালকা সুরের গান কিছুদিনের জন্য থামিয়ে মানুষকে ধ্রুপদ সংগীত শুনতে অভ্যস্ত করতে হবে। ডমরু আর শিঙ নাড়াতে হবে, ঢাক বাজাতে হবে– যাতে গম্ভীর ও বীরত্বব্যঞ্জক সুর এবং মুখে ‘মহাবীর মহাবীর’ ও ‘হর হর ব্যোম ব্যোম’ শব্দে চারিদিক কেঁপে ওঠে।” (ভাববার কথা, স্বামী বিবেকানন্দ)। সংগীতে শাক্ত পৌরুষের দাবি করছেন যে বিবেকানন্দ, তিনিই কাশীতে বসে গেয়েছেন মধুর ভাবের গান ‘মরি লো মরি আমায় বাঁশিতে ডেকেছে কে’, যজ্ঞেশ্বর তেলির বাড়িতে আকুল স্বরে গাওয়া সেই গানটি শুনছেন ক্ষিতিমোহন সেন, সেই তাঁর প্রথম রবীন্দ্রনাথের গান শোনা। ‘মরি লো মরি’ গানটি অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়া আর কোনও পুরুষ-শিল্পী রেকর্ড করেননি। বিশেষত সমাজের কানে যাঁদের ‘পুরুষালি’ গলা, তাঁরা ‘মরি লো মরি’ গাননি। গাইয়ে হিসেবে এই গান গাইতেন শান্তিদেব, আর ইউটিউবের কল্যাণে আমরা কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সুরাসিক্ত গলায় শুনেছি এই গানের এক আকুল উদাত্ত রূপ। সেই গায়ন এ যুগের রাবীন্দ্রিকতার সমস্ত মিথকে ভেঙেচুরে দেয়, আমাদের মেয়েলি গান পুরুষালি গানের সব সংস্কার ফিকে হয়ে যায় সেই গায়নের আন্তরিক উজ্জ্বলতার সামনে।

zoom
শান্তিনিকেতনে গান গাইছেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়

সাধারণত রবীন্দ্রনাথের যেসব গানে উন্মথিত হয়ে উঠছে এক নারীসত্তা, সেসব গান এড়িয়ে গিয়েছেন দেবব্রত হেমন্ত চিন্ময় সাগর সেন শ্রীকান্ত আচার্য। ‘ওলো সই’, ‘বল সখী বল তারি নাম আমায় কানে কানে’, ‘মরি লো মরি’, ‘সখী ভাবনা কাহারে বলে’ প্রভৃতি গানগুলি গাইতেন শান্তিদেব, ওঁর উদাত্ত কণ্ঠটি ছিল টেইনর, গাইতেন রবীন্দ্রনাথের মতোই চড়া পিচে, যেমন গেয়েছেন বিক্রম সিং। বিক্রম সিং-এর তীব্র কণ্ঠে ‘ও যে মানে না মানা’ গানটি সমাজ-নির্মিত পৌরুষ ও নারীত্বের সব বিরোধকে অতিক্রম করে যায়।

শোনা যায় যে, ধূর্জটিপ্রসাদ বলেই ফেলেছিলেন যে, রবীন্দ্রসংগীত গাইয়েদের মধ্যে সুচিত্রাই একমাত্র ‘পুরুষ’, তিনি সংগীতে মেয়েদের কণ্ঠকে কোন চোখে দেখতেন তা ওঁর লেখা নিচের কয়েকটি বাক্য পড়লে আন্দাজ করা যাবে। ধূর্জটিপ্রসাদ লিখছেন:

“কি জানি কেন, কথা জড়ানো সাহিত্য মাখানো, সাহিত্যিক রসে চোবানো সংগীতের প্রসারে আমি একটু ভীত হয়েছি। ওই সাহিত্যের আশীর্বাদেই মেয়েরা ঢুকে পড়েছেন, কেবল আসরে নয়, সংগীতের মধ্যে। ‘ওমা, কি মিষ্টি হয়ে যাচ্ছে সব!’ খুরশেদ আলি বলতেন, ‘ঠুংরি মেয়েদের জন্য নয়’। অর্থাৎ ঠুংরিটাও নয়।” (মনে এল)

zoom
একত্রে গাইছেন কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সুচিত্রা মিত্র

এই অকল্পনীয় পিতৃতান্ত্রিক বয়ানে উচ্চাঙ্গ সংগীতের বিমূর্ততাকে রাখা হয়েছে অনেক উঁচুতে, আর সেই উঁচু পরিসর পুরুষের। আর কাব্যসংগীত যেন ভাবালুতাকে প্রশ্রয় দেবার জন্য, তাই তার স্থান নিচে। তাই এই একই লেখায় রবীন্দ্রসংগীত প্রসঙ্গে ধূর্জটিপ্রসাদ লিখছেন– রবীন্দ্রসংগীতের ‘ওপর ব্যক্তিগত এক্সপ্রেশন চাপালে বিপদ ঘনিয়ে ওঠে। হয়ে পড়ে ন্যাকামি।’ এই ‘ন্যাকামি’ শব্দটিকে ‘পৌরুষ’ শব্দের বিপরীতে রাখেন একালের মনস্বী আলোচক সমীর সেনগুপ্তও। তিনি লেখেন, ‘রবীন্দ্রনাথের গান থেকে পৌরুষের চিহ্নমাত্র বর্জন করতে আমরা উৎসাহী; …আধুনিক প্রজন্ম যে রবীন্দ্রনাথের গান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে তার একটা কারণ গায়কদের এই ভাবালুতার ভান, যাকে ন্যাকামি বললে বেশি বলা হয় না।’ (রবীন্দ্রনাথের গান: দীপের মতো গানের স্রোতে)। এই লেখায় খুব সঙ্গত কারণেই সমীর সেনগুপ্ত অস্থানে-কুস্থানে মীড়ের প্ৰয়োগ, স্বর থেকে স্বরে গড়িয়ে যাওয়া ইত্যাদি অভ্যাসের দিকে তর্জনী তুলেছেন– যা গানকে শিথিল করে, গানের বার্তাকে, গানের ডিজাইনকে আহত করে। কিন্তু গাইয়ের এই নান্দনিক দারিদ্রকে তিনি যুক্ত করেন পৌরুষের অভাবের সঙ্গে, লেখায় অনভিপ্রেতভাবেই জুড়ে দেন জেন্ডার জটিলতা। আমাদের মনে পড়ে যায় ইদানীং-কালের এথনো-মিউজিকোলজির গবেষক নিবেদিতা বায়েনের সেই লেখা, যেখানে তিনি দেখিয়েছেন পুরুষ-নির্ভর সংগীত, বিশেষত উত্তর ভারতের ধ্রুপদ ধামার গাইয়েদের সংগীতপাঠ কীভাবে আবেগকে নস্যাৎ করতে চায়, টপ্পা ঠুংরি প্রভৃতি মরমী গানকে ‘মেয়েলি ভাবের গান’ বলে খাঁটি ক্লাসিকাল গান বলে মনে করে না। (বৈষম্যের বিরোধ জবানি, Gender Discourse, Samay updates, পর্ব ৪৯)

zoom
কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথ নিজেও কখনও কখনও শৌর্য আর সৎসাহসকে ‘পৌরুষ’ বলেন (পৌরুষেরে করেনি শতধা), ভাষার লিঙ্গ রাজনীতির ঠিক-বেঠিক নিয়ে তখনও আসেনি একালের চিন্তার স্রোতগুলি। কিন্তু তাঁর নিজের গায়কি পুরুষালি না মেয়েলি এই দ্বিধানকে ভেঙে দেয়। গুণী গাইয়ের ক্ষেত্রে তিনি গাইয়ের নিজস্ব ব্যাখ্যান (ইন্টারপ্রিটেশান) ও এক্সপ্রেশনকে স্বাগত জানিয়েছেন। রসতীর্থ পথের পথিক রবীন্দ্রনাথ শিল্পে আত্মপ্রকাশের পরিসরে লিঙ্গভেদ করেননি, আনেননি জেন্ডারের নিরিখ। যে কবি তাঁর গানে লিখেছেন, ‘আমি আমার বুকের আঁচল ঘেরিয়া তোমারে পরানু বাস’, সেই কবির গান গাওয়ার সময় সমাজের তৈরি লিঙ্গের খাঁচা আপনিই ভেঙে যায়।

………………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন ঠাকুরঘরানা-র অন্যান্য পর্ব

………………………

Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar The Gender trouble

Share this article on