


এই ক’দিন আগে, বাংলাদেশে প্রবল রাষ্ট্রবিপ্লবের দিনে আঘাত এল ‘ছায়ানট’ শিক্ষায়তনের শরীরে। ভেঙে ফেলা হল তানপুরা, হারমোনিয়াম, তবলা। পরদিন পথে নেমে এলেন শয়ে শয়ে রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষার্থী ও শিল্পী। পুরোভাগে যশস্বী গাইয়ে লাইসা আহমেদ লিসা। এল হারমোনিয়াম, বাজল তানপুরা, তবলা, মন্দিরা। সমবেত কণ্ঠে গান শুরু হল, ‘মোরে ডাকি লয়ে যাও মুক্তদ্বারে তোমার বিশ্বের সভাতে…’ আমরাও কবে পারব এমন করে গাইতে যাতে বেজে উঠবে উদয়দিগন্তের শঙ্খ?
৯.
১৯৪২-এর ৭ আগস্ট। রবীন্দ্রপ্রয়াণের ঠিক এক বছর পরের কথা। হিটলারের নাৎসি জার্মানি অধিকৃত পোল্যান্ডের ওয়ারশ ঘেটো, যেখান থেকে হাজার হাজার ইহুদিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কনসেন্সট্রেশন ক্যাম্পে, মেরে ফেলা হচ্ছে গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে। শিশু চিকিৎসক জানুজ কর্য্যাক-এর (Janusz Korczak) ছিল এক অনাথালয়, একরাশ ফুটফুটে বাচ্চা। আদেশানুসারে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় ট্রেবলিংকার মৃত্যুশিবিরে। রাজার দোহাই দিয়ে লেখা এতগুলি শিশুর মৃত্যুআদেশ যখন এসে পৌঁছেছিল ডাক্তার কর্য্যাকের কাছে, ডাক্তার কেবল অনুমতি চেয়েছিলেন বাচ্চাদের দিয়ে একটি নাটক অভিনয় করার। সেই নাটক– রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’। ১৯৪২ সালের ১৯ জুলাই একঝাঁক শিশু অভিনয় করল মৃত্যুঞ্জয়ী সেই নাটক, আর ৭ আগস্ট গান গাইতে গাইতে তারা চলল তাদের পালক পিতার সঙ্গে গ্যাস চেম্বারের পথে। সে গান তাদের নাটকে শেখা গান। রবীন্দ্রনাথের গান। নারায়ণ সান্যাল তাঁর ‘মৃতোর্মা অমৃতম’ উপন্যাসটি আশ্রয় করেন ইতিহাসের এই আখ্যানটিকে ঘিরে, সেখানে এই শিশুর দল ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’ গানটি গাইতে গাইতে রওনা দেয় গ্যাস চেম্বারের দিকে।

আমাদের মনে পড়ে সুজয় ঘোষের ‘কাহানি’ (২০১২) ছবিটির কথা, সেখানেও মেট্রোতে, বিষাক্ত গ্যাসের প্রয়োগে নাশকতা, আর সেই ছবিতে এক মেয়ের কঠিন লড়াইয়ের আবহে অমিতাভ বচ্চনের গাঢ় কণ্ঠে ভেসে আসা গান: ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে…’। ক্লিন্টন সেরেজো আর বিশাল শেখরের সংগীত পরিকল্পনায় এই গান একটি নারীবাদী ছবিতে হয়ে ওঠে এক তীব্র রাজনৈতিক গান। ১৯০৫ সালে রচিত এই গান ১০৭ বছর পরে প্রযুক্ত হচ্ছে একটি হিন্দি ছবিতে, একজন নামকরা অভিনেতার কণ্ঠকে আশ্রয় করে। আমরা শুনেছি মহাত্মা গান্ধীর প্রিয় ছিল এই গান। কঠিন সময়ে এই গান তাঁকে জোর দিয়েছে বারবার। ১৯৪৬-এর দাঙ্গাদীর্ণ নোয়াখালি কলকাতা আর বিহারের পথে আহত আর হন্তারকের মাঝখান দিয়ে মানুষের ভিতরকার আলো-অন্ধকারের দিকে তাঁর যে একলা চলা, তাতে ৮০ ছুঁই ছুঁই গান্ধী অপার শক্তি পেতেন এই গান থেকে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার প্রথম উদ্যোগ নিয়েছিলেন যে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং– সেকথা আমাদের মনে করিয়ে দেন অবনীন্দ্রনাথ। ১৯০৫ সালে, বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে ঠাকুরবাড়ির অলিন্দ থেকে যখন খালি পায়ে পথে নেমে আসেন রবীন্দ্রনাথ, হাতে রাখির ডালা, এক মিছিলের পুরোধা তিনি তখন, সেই মুহূর্তে সকলের কণ্ঠে গান ছিল এক অঙ্গীকারের আলো। অবনীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘‘রবিকাকা বললেন, সবাই হেঁটে যাব, গাড়িঘোড়া নয়।… দিনুও ছিল সঙ্গে, গান গাইতে গাইতে রাস্তা দিয়ে মিছিল চলল… ‘বাংলার মাটি বাংলার জল….’ …আসছি, হঠাৎ রবিকাকার খেয়াল হল মসজিদে গিয়ে সবাইকে রাখি পরাবেন… এইবার বেগতিক… আমি ভাবলাম মসজিদের ভেতরে গিয়ে মুসলমানদের রাখি পরালে একটা রক্তারক্তি ব্যাপার না হয়ে যায়…”

অবনীন্দ্রনাথের আশঙ্কা মিথ্যে করে হাসিমুখে রাখি পরেছিলেন সেকালের মৌলানা-মৌলবীরা। বাঙালির ঘরে যত ভাইবোন মুহূর্তের জন্য হলেও কি এক হয়েছিলেন গানের আলিঙ্গনে? যে-গান একেবারেই মিছিলের গান? আর এই মিছিলেরও ১৯ বছর আগে ১৮৮৬ সালের ডিসেম্বরে ২৫ বছর বয়সি রবীন্দ্রনাথকে অনুরোধ করা হয়েছিল একটি ডিনারে গান গেয়ে কংগ্রেসি নেতাদের মনোরঞ্জন করার জন্য। বিলিতি সাজগোজের দস্তুর ছিল সেখানে। অবন ঠাকুর লিখছেন, তাঁরা প্রত্যেকে গেলেন ধুতি-চাদর পরে দিশি সাজে, রবিকাকা মোজা খুলে ফেললেন। আর গান গাইতে হবে বলে রবীন্দ্রনাথ রচনা করে নিয়ে গিয়েছিলেন একটি গান। ডিনারে একে তো এই পোশাক, তার ওপর যুবক কবি গাইলেন,
‘আমায় বোলো না গাহিতে বোলো না/ এ কি শুধু আসি খেলা প্রমোদের মেলা শুধু মিছে কথার ছলনা…’।
পুলিনবিহারী সেনকে সেই অভিজ্ঞতা চিঠিতে লিখছেন পরে, ‘‘সর্বশক্তিমান আমাকে কোনো বিরোধিতার বিরুদ্ধেই রুখে দাঁড়ানোর মত যথেষ্ট শক্তি দেন নি, তা যতই বৈধ হোক না কেন। সেখানে যাওয়ার ঠিক আগে আমি এই গানটি রচনা করেছিলাম…। ‘আমায় গাহিতে বোলো না…’ গানটি গাওয়ার পর পরিস্থিতি মোটেই সুখকর ছিল না।…’’

রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে, রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগেই নির্জন এককের একান্ত গান অনেকান্ত হয়েছে। ‘সুরের রসিক নেয়ে’কে গান গেয়ে ভোলার আহ্লাদটি ভুলেও গান রচিত হয়েছে, গাওয়া হয়েছে রাজনৈতিক লক্ষ্যে, পথে পথে সারে সারে হাঁটার শপথ নিয়ে। অহিংসার পথিক গান্ধীর যেমন কাছের ছিল একলা চলার গান, তেমনই এ গান গভীরভাবে টেনেছিল মার্কসবাদী পথের সৈনিক হেমাঙ্গ বিশ্বাসকেও। তাঁর মনে হয়েছে, ‘যিনি সত্যের পূজারী তাঁকে সত্যের সপক্ষে বহু সময়েই একলা দাঁড়াতে হয়, বহুবারই, তাঁকে পরান খুলে মনের কথা একলাই বলতে হয়।’ সুধীর চক্রবর্তী আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন (‘গান প্রসঙ্গে’) হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সেই উল্লেখ– যেখানে এই গানটি নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে তর্ক হচ্ছে, ‘‘১৯৪২-’৪৩ নাগাদ এই গানটি নিয়েই পার্টি অফিসে বিরাট আলোচনার ঝড় উঠেছিল। একজন নেতৃস্থানীয় পার্টিকর্মী বললেন, ‘আমাদের কর্মপন্থা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। আমরা জনগণকে নিয়েই চলতে চাই। যদি কেউ না আসে এরকম ব্যাপার ঘটলে বুঝতে হবে আমাদের ভুল হচ্ছে এবং ভুলটি হচ্ছে হয় আমাদের নীতিতে নয়তো আমাদের কর্মপন্থাতে।’ তখন বুঝেছিলাম কথাটা সাংঘাতিক…’’। এর থেকে একটা সত্য উঠে আসে যে একটি রবীন্দ্রগানের রাজনৈতিক প্ৰয়োগ নিয়ে একটি পার্টির অভ্যন্তরে যখন বিতর্ক হয়, তখন রাজনীতিকে, রাজনৈতিক গানকে কত সিরিয়াসলি, কত সৎভাবে নিতেন রাজনীতির মানুষরা। ভারতীয় গণনাট্য সংঘ যে তাঁদের রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গানকে মিলিয়ে নিতে পেরেছিলেন, তা সুচিত্রা মিত্র, দেবব্রত বিশ্বাসের মাঠে-ময়দানে-মিছিলে রবীন্দ্র সংগীত গেয়ে বেড়ানোর আখ্যানগুলি থেকে স্পষ্ট। ১৯৪৬-এর দুর্দিনে মাঠে-মিছিলে-ট্রাকে সুচিত্রা গাইছেন ‘সার্থক জনম আমার’, কোনও ছন্দোময় উদ্দীপনার গান নয়। মুক্ত ছন্দের একটি কারুকার্যময় শান্ত দেশপ্রেমের গান হিংসায় জীর্ণ শহরের বিপুল জনতার মাঝে শুশ্রূষা বিছিয়ে দিত। এইভাবে মাঠে-ময়দানে গান গেয়ে কণ্ঠের ক্ষয় হয়েছে সুচিত্রা মিত্রের। তিনি জেনেও পিছপা হননি। অশোক মিত্র লিখছেন: “খুব সম্ভব সেটা ১৯৪৮ সাল, ফেব্রুয়ারি মাস। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া যুব সম্মেলনের শেষ দিনে সন্ধ্যায় ময়দানে শোভাযাত্রার শেষে সভা, সুচিত্রা মিত্র প্রারম্ভসংগীতের জন্য উঠে দাঁড়িয়েছেন, কী কারণে হঠাৎ মাইক্রোফোন বিকল, কিন্তু সুচিত্রা মিত্র বেপরোয়া অনমনীয়া, একা নিরাভরণ কণ্ঠে গেয়ে চলেছেন ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। ইন্দ্রধনুর স্তবকের মত সেই গানের বেশ ময়দানের আকাশকে সৌভাগ্যবতী করে তুলেছে, খোলা আকাশের নিচে অদূরে চৌরঙ্গীর সদ্য জ্বলে ওঠা দীপাবলি, আমরা স্তব্ধ, আমরা মুহ্যমান।” (কবিতা থেকে মিছিলে। অশোক মিত্র)

জওহরলাল নেহেরু কলকাতায় এসেছেন। রাজনৈতিক বিরোধী সুচিত্রা রেডিওতে গাইলেন, ‘কাজের বেলায় উনি কোথা যে ভাগেন, ভাগের বেলায় আসেন আগে।’ রাষ্ট্রের রোষে পড়ে অনেক দিন আকাশবাণীতে ডাক পেলেন না তিনি। গণনাট্য সংঘের হাত ধরে সুচিত্রা-দেবব্রত-জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের কণ্ঠ বেয়ে শান্তিনিকেতন আশ্রম আর শীলিত বাঙালির বৈঠকখানার বাইরে ছড়িয়ে পড়ল রবীন্দ্রনাথের গান। এই সময় জুড়েই একদিকে ‘রবিবাবুর গান’ হয়ে উঠতে থাকল রবীন্দ্রসংগীত, তেমনই মাঠে-ময়দানে রবীন্দ্রনাথের গানকেই সাক্ষী রেখে রচিত হতে থাকল সংস্কৃতির হস্তান্তরের এক অন্য ইতিহাস। লেনিন শতবর্ষে দেবব্রত বিশ্বাস গান ধরলেন ‘গায়ে আমার পুলক লাগে চোখে ঘনায় ঘোর, হৃদয়ে মোর কে বেঁধেছে রাঙারাখীর ডোর।’ যে রবীন্দ্রনাথ রাখিকে আর গানকে ঘরের বাইরে নিয়ে এসেছিলেন দেশের সংকটে পথের দাবিতে, সেই রাখিই ‘রাঙারাখি’ হয়ে রাজনৈতিক ব্যঞ্জনায় উচ্চারিত হল দেবব্রত বিশ্বাসের গান নির্বাচনে। এদিকে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব-পাকিস্থানে কণ্ঠে কণ্ঠে রবীন্দ্রগান হয়ে উঠছে ওপার বাংলার মানুষের জাতিসত্তার চিহ্ন আর লড়াইয়ের অস্ত্র।

১৯৬১ সাল। রবীন্দ্র-জন্মশতবর্ষ। পাকিস্তান সরকার রেডিওতে রবীন্দ্রসংগীত সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে দিলেন। সেই দুঃসময়ে ওয়াহিদুল হক, সনজীদা খাতুন, কলিম শরাফি প্রমুখ শিল্পী পুলিশের ভ্রুকুটি অগ্রাহ্য করে গেয়ে বেড়াতে লাগলেন রবীন্দ্রনাথের গান। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সংসদে দাঁড়িয়ে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন বলেছিলেন ‘রবীন্দ্রসংগীত আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গ নয়’। ঠিক এরপর থেকেই যখন মুক্তিযোদ্ধারা প্রস্তুত হতে থাকেন বাংলাভাষী মানুষের আত্মপরিচয়ের লড়াই এর জন্য, তাঁরা কণ্ঠে তুলে নিলেন রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি। যুদ্ধশেষে রক্তে রাঙা স্বাধীন বাংলাদেশ এই গানটিকেই দেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করলে।
…………………………………..

…………………………………..
এদিকে বরাক উপত্যকায় লালিত শিল্পী ও লেখক শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন: ‘আমাদেরও তো রবীন্দ্রসংগীত চর্চার গায়ে রক্তের চিহ্ন লেগে আছে। ১৯৬১ সালে সারা পৃথিবী যখন কবিগুরুর জন্মশতবর্ষ উদযাপনে উদ্বেল, তখন এই মাটির মানুষ শঙ্কিতচিত্তে ব্যক্ত করছিল নিজের ভাষাসংস্কৃতির অধিকারের কথা।’ তিনি লিখছেন যে বরাকের বাঙালির রবীন্দ্রসংগীত চর্চা ও গায়ন কলকাতার আশীর্বাদমুক্ত, ‘এটা আমাদের বৃহত্তর পরিচিতি নির্মাণের সাথেই সম্পর্কিত এবং সেদিক থেকে আমাদের রবীন্দ্রসংগীত চর্চাও বাংলাদেশের মত এক বৃহত্তর সাংস্কৃতিক সংগ্রামেরই অঙ্গ হয়ে উঠেছে নানা সময়ে।’ (নির্বাসিতের রবীন্দ্রগান, গানের তুমি)।

আটের দশকের ভারত। জরুরি অবস্থা পরবর্তী দেশবাসীর তীব্র অনাস্থায় পরাজিত ইন্দিরা গান্ধী আবার নিজের দল তৈরি করে জনাদেশ নিয়ে সরকার গঠন করেছেন। ১৯৮৪ সালে তাঁকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার ছক তৈরি হচ্ছে, অক্টোবরে তাঁর হননের মাসটিতেই তিনি মগ্ন রয়েছেন একটি রবীন্দ্রগানের ইংরেজি তরজমার কাজে। সেই গানটি ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।’ ১৯৮৪ সালের ২ অক্টোবর গান্ধীজির জন্মদিনে ইন্দিরার হাতে ওঁর অন্যতম ভাষণ-উপদেষ্টা সারদাপ্রসাদ তুলে দিয়েছেন গানটির ইংরেজি অনুবাদ, (অনুবাদ: ক্ষিতীশ রায়), ইন্দিরা খুঁজছেন তাঁর মনের মতো আরও যুতসই কিছু ইংরেজি শব্দ, পেনসিল দিয়ে লিখছেন সেগুলি টাইপ করা সেই টেক্সটটির শরীরে (সূত্র: Sanjiva Prasad, The Frontline, 14.12.2023 )। তার ২৯ দিন পরেই ওঁর শরীর করে দেবে গোপন হিংসার বুলেট।
…………………………………..

…………………………………..
রাজনীতির নানা বিন্যাসে কখনও প্রতিবাদ, কখনও সমর্থন, কখনও অস্তিত্বের সংকটে রবীন্দ্রসংগীতের উচ্চারণে ক্ষমতা, প্রতিক্ষমতা ও শিল্পীর সক্ষমতার ইতিহাসটি রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার ইতিহাসের একটা অন্য ঘরানা তৈরি করেছে রবীন্দ্রযুগ থেকেই। সেই ঘরানা আমাদের চোখে যা ‘রাবীন্দ্রিক’ তার রূপটির চেয়ে আলাদা। মনে পড়ে, বিশ্বভারতীতে একবার উত্তাল ছাত্র রাজনীতির জেরে আঘাত পায় গ্ৰন্থাগার। খবরের কাগজে নিন্দা করে সংবাদ প্রকাশিত হয় এই ঘটনার। তার ক’দিন পরেই মন্দিরে গাইতে আসেন শান্তিদেব ঘোষ। স্থির কণ্ঠে গান ধরেন, ‘তুমি আমাদের পিতা তোমায় পিতা বলে যেন জানি, তোমায় নত হয়ে যেন মানি, তুমি কোরো না কোরো না রোষ…’। গানের প্ৰয়োগ যে কী অব্যর্থ হতে পারে, সেদিনের ধীরে ধীরে শান্ত হওয়া ছাত্রসমাজকে দেখে উপলব্ধি করেছিলাম। অথচ বিপুল দ্বন্দ্ব বিরোধ মাঝে, অসহ অন্যায়ে শান্তিনিকেনের সংগীতশূন্য নীরবতা কষ্ট দেয়। অদূর অতীতে বিশ্বভারতী যখন গৃহহারা করেছিলেন ‘আলাপিনী মহিলা সমিতি’কে, তখন শর্মিলা রায় পোমোর উদ্যোগে একদল প্রাক্তনী অধিকারের গান কণ্ঠে নিয়ে জমায়েত করেছিলেন আশ্রমের এক নম্বর গেটের সামনে। আমরা অভয়া আন্দোলনে সাধারণ মানুষের কণ্ঠে পথে শুনেছি ‘আমরা নই বাঁধা নই দাসের রাজার ত্রাসের দাসত্বে…’।

এই ক’দিন আগে, বাংলাদেশে প্রবল রাষ্ট্রবিপ্লবের দিনে আঘাত এল ‘ছায়ানট’ শিক্ষায়তনের শরীরে। ভেঙে ফেলা হল তানপুরা, হারমোনিয়াম, তবলা। পরদিন পথে নেমে এলেন শয়ে শয়ে রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষার্থী ও শিল্পী। পুরোভাগে যশস্বী গাইয়ে লাইসা আহমেদ লিসা। এল হারমোনিয়াম, বাজল তানপুরা, তবলা, মন্দিরা। সমবেত কণ্ঠে গান শুরু হল, ‘মোরে ডাকি লয়ে যাও মুক্তদ্বারে তোমার বিশ্বের সভাতে…’
আমরাও কবে পারব এমন করে গাইতে যাতে বেজে উঠবে উদয়দিগন্তের শঙ্খ?
………………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন ঠাকুরঘরানা-র অন্যান্য পর্ব
………………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved