Robbar

ধুলামলিন লাইব্রেরি

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 2, 2026 5:08 pm
  • Updated:May 2, 2026 6:26 pm  

প্রাচীন শহরের ধুলামলিন সেই লাইব্রেরিটা মনে পড়ে, দিনের পর দিন বইপত্রের আকর্ষণে সেখানে পড়ে রয়েছিলাম। একতলা বাড়ি একটা, রাজারাজড়ার আমলে তৈরি, ছয়-সাতটা ছোট ছোট ঘর সম্পূর্ণ বই আর বইতে ঠাসা, তেমন ভালো করে ক্লাসিফাই করা নয় বইগুলো। প্রায়শই মলাটছেঁড়া, ধুলোর গন্ধমাখা, হলুদ হয়ে যাওয়া সারি সারি সব জনপরিত্যক্ত অপঠিত বই।

সন্মাত্রানন্দ

৩.

নেই কোনও তেমন তেমন বই। অনেক দূরের ঘুমন্ত গ্রাম সে। বনভূমি; তার মধ্যে ছোট একখানি ঘর। চিরকাল উঞ্ছবৃত্তি করে এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়িয়েছি। ‘বাসা-পাকড়ানো’ আর হল কই আমার? স্থায়ী ঘরদোর না-থাকলে, কোথায় থাকবে বইয়ের র‍্যাক? পয়সাকড়ি নেই বই কেনার মতো। তারই মধ্যে এর-ওর কাছ থেকে চেয়েচিন্তে যেসব বইপত্তর জোগাড় করেছিলাম, সে-সবই ব্যক্তিগত কাজের জিনিস– বেশিরভাগই হয় সংস্কৃত, অথবা পুরনো বাংলায় লেখা। মোট কথা, এমন বই তখন আমার সংগ্রহে ছিল না, যা দিয়ে মধ্যনিশীথের সেই বিচিত্র অভিজ্ঞতার সার্থক মীমাংসা করতে পারি।

যখনকার কথা হচ্ছে, তখনও ইন্‌টারনেট আসেনি। স্মার্টফোন আসেনি। ওসব সরঞ্জাম হাতে থাকলে কয়েক লহমায় এ মামলা সামলানো যেত। আর সত্যিকারের কোনও ভালো লাইব্রেরি তখন আমার কাছে দূরের দ্রাঘিমা। তবু খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল, সেখান থেকে ৩০-৪০ কিলোমিটার দূরে আছে এক প্রাচীন শহর; সেখানে পুরনো এক লাইব্রেরির দেখা মিলতে পারে। সমস্যাটা আমার মাথায় এমনই চেপে বসেছিল তখন যে, মরিয়া হয়েই যেন সেই শহরের দিকে যাত্রা করলাম।

আমার তখন বদ্ধমূল ধারণা, ছোটবেলায় বইতে পড়া এমন কোনও ঘটনা বা তথ্যের খণ্ডাংশ আমার মস্তিষ্কের কোষে লুকিয়ে আছে, কিংবা আমার অবচেতনের গভীরে আত্মগোপন করে আছে, যারই ফলে মাঝরাতে ওরকম কিছু একটা দেখে ফেলেছি। যা দেখেছি, তা হয়তো নিছক কল্পনা, বনের ভিতর অন্ধকারে কুয়াশায় মানুষ এমন কত কিছু দ্যাখে। অথবা, শুধুই স্বপ্ন। সে যাই হোক, মৃতদেহ বহন করে অন্ধকারে অস্ত্র হাতে যে-লোকটি বনপথে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তাঁকে আমি চিনেছি– ছোটবেলায় পড়া বিক্রমাদিত্য আর বেতালের উপকথা। কিন্তু গামারের কর্তিত কাণ্ডের সামনে দাঁড়িয়ে ইউরোপীয় পোশাকপরা যে-মানুষটি চুরুট টানতে টানতে বলেছিল, ‘লাশটা গাছের কাটা গুঁড়ির উপর নামান, কেটেকুটে দেখি, গ্যালেন ঠিক বলছেন নাকি আমি, মানুষের শরীরের গঠনতন্ত্র কি গবাদি পশুর মতন নাকি আলাদা’, সেই লোকটাকে হাজার চেষ্টা করেও চিনতে পারছিলাম না।

প্রাচীন শহরের ধুলামলিন সেই লাইব্রেরিটা মনে পড়ে, দিনের পর দিন বইপত্রের আকর্ষণে সেখানে পড়ে রয়েছিলাম। একতলা বাড়ি একটা, রাজারাজড়ার আমলে তৈরি, ছয়-সাতটা ছোট ছোট ঘর সম্পূর্ণ বই আর বইতে ঠাসা, তেমন ভালো করে ক্লাসিফাই করা নয় বইগুলো। প্রায়শই মলাটছেঁড়া, ধুলোর গন্ধমাখা, হলুদ হয়ে যাওয়া সারি সারি সব জনপরিত্যক্ত অপঠিত বই। সারা দিনে চার-পাঁচজন বুড়ো মানুষ ছাড়া অন্য কোনও পাঠক বা পাঠিকার দেখা মেলে না সেখানে। যাঁরা আসেন, তাঁরাও খবরকাগজ পড়তে আর গল্পগুজব করতেই আসেন। দুপুর হয়ে গেলে লাইব্রেরিঘর একেবারে শূন্য হয়ে যায়। জনৈক বয়স্ক লাইব্রেরিয়ান ঘরের একপাশে কাঠের টেবিলের উপর কনুইতে ভর দিয়ে ঢুলতে থাকেন। আমি কখনও বইয়ের র‍্যাকের আড়ালে, কখনও পড়ার টেবিলে, কখনও ঘরের কোনার দিকের জানালার নীচে, এঘরে-ওঘরে সে-ঘরে প্রয়োজনমতো ঘুরে ঘুরে বেড়াই। অনেক দূরের কোনও বাড়ির অজানা আলিশা থেকে দ্বিপ্রহরজীবী ঘুঘুপাখি অলস বিষণ্ণ সুরে টেনে টেনে ডেকে চলে… ঘুম্‌-ঘুম্‌, ঘুম্‌-ঘুম্‌…

.

এমনই একদিন দুপুরে র‍্যাক থেকে নামিয়ে বিবর্ণ পাতা ওল্টাচ্ছিলাম ধুলোমাখা মোটা একটা বইয়ের। বইটির নাম– ‘আধুনিক শল্যচিকিৎসার ইতিহাস’। খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ বইটার মাঝবরাবর একটা নামের মধ্যে চোখ আটকে গেল। গ্যালেন। আর তার একটু পরেই আরও একজনের নাম। আন্দ্রে ভেসালিয়াস।

কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে পুরো অধ্যায়টা মন দিয়ে পড়তে লাগলাম। যা পেলাম, তা বড়ই অদ্ভুত, বড়ই বিস্ময়কর!

যা বুঝলাম, সংক্ষেপে বলি। ভুলচুক কিছু হলে বিদিততথ্য ব্যক্তিরা আমাকে মাফ করে দেবেন। ষোড়শ শতকে ইউরোপে মানুষের শরীরের গঠনতন্ত্র বা অ্যানাটমি-বিষয়ক জ্ঞানের জগতে একটা যুগান্তকারী প্লাবন আসে। এর আগে অবধি প্রায় ১৪০০ বছর ধরে অ্যানাটমি-বিদ্যায় যিনি রাজ করে এসেছেন, তাঁর নাম ছিল গ্যালেন অব পারগামম্‌। গ্যালেন জন্মেছিলেন তুরস্কে সেই সুদূরকালে ১২৯ খ্রিস্টাব্দে, শিক্ষালাভ করেছিলেন আলেকজান্দ্রিয়ায়, নামযশ উপার্জন করেছিলেন রোমে। গ্যালেনের লেখাপত্তর থেকে এতদিন ধরে জানা গিয়েছিল যে, মানুষের শারীরসংস্থান অনেকটা গবাদি পশুরই মতো। এই সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর জন্য গ্যালেন নির্ভর করেছিলেন ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, পশুশরীরের ব্যবচ্ছেদ এবং তজ্জাত অনুমানের উপরেই। মানুষের মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করা গ্যালেনের সময়ে নিষিদ্ধ ছিল আর গ্যালেনও সে-চেষ্টা করেননি।

গ্যালেন অব পারগামম্‌

এই প্রথাগত চিন্তার দুর্গে ফাটল ধরল ষোড়শ শতকে। আবির্ভূত হলেন আন্দ্রে ভেসালিয়াস। ভেসালিয়াসের মনে হল, মানুষের শারীরতন্ত্র বিষয়ে জ্ঞান আহরণ করতে হলে অপ্রত্যক্ষ অনুমান মোটেই যথেষ্ট নয়। দরকার হচ্ছে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার। সেই অভিজ্ঞতা লাভ করা যেতে পারে সরাসরি মৃত মানুষের শবদেহ ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমেই। তা তো হল, কিন্তু টাটকা মৃতদেহ পাওয়া যাবে কোথা থেকে?

ভেসালিয়াস তখন পড়াশোনা করছেন প্যারিসে। তিনি এবং তাঁর সমমনস্ক বন্ধুরা রাতের অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে চলে যেতেন গোরস্থানে। গ্রেভ ইয়ার্ডের রক্ষক দন্তুর কুকুরের পালকে কোনওমতে প্রতিহত করে সদ্য গোর দেওয়া হয়েছে এমন মৃতদেহ মাটি খুঁড়ে তাঁরা তুলে আনতেন কবর থেকে। অথবা ফাঁসিকাঠে ঝোলানো হয়েছে এমন সদ্যোমৃত মানুষের দেহ নামিয়ে আনতেন রাত্রিকালে সকলের অলক্ষেতে। তারপর রাতের পর রাত সেই শব ব্যবচ্ছেদ করে ভেসালিয়াস ও তাঁর সঙ্গীরা গভীর অভিনিবেশে জানতেন, মানুষের শারীরসংস্থান ঠিক কেমন। অবশ্য পরবর্তীকালে ভেসালিয়াস যখন পাডুয়া ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছেন, তখন স্থানীয় বিচারকদের সঙ্গে বন্ধুত্বের কারণে চরমদণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মৃতদেহ তাঁর গবেষণার কাজে ব্যবহার করার অনুমতি  পেয়েছিলেন। কিন্তু শুরুর দিকে তাঁকে ওই অবৈধ উপায়েই মৃতদেহ সংগ্রহ করতে হয়েছে।

ডি হিউম্যানি করপোরিস ফেব্রিকা

ভেসালিয়াসের গবেষণার ফল তাঁর প্রবাদপ্রতিম গ্রন্থ– ডি হিউম্যানি করপোরিস ফেব্রিকা। কিংবা, সংক্ষেপে ডি-ফেব্রিকা। এই বইয়ের ছত্রে ছত্রে ভেসালিয়াস দেখালেন, ১৪০০ বছর ধরে অ্যানাটমি-বিদ্যায় রাজ করে আসা গ্যালেনের অনুমানগুলি কী পরিমাণে ভুল। গ্যালেন দাবি করেছিলেন, মানুষের চোয়াল ম্যান্ডিবল দুটো হাড়ের সমবায়ে তৈরি। ভেসালিয়াস দেখলেন, ওটা একটাই হাড়। গ্যালেন কল্পনা করেছিলেন, মানুষের বক্ষাস্থি বা উরঃফলকের সাতটি অংশ। ভেসালিয়াস দেখলেন, মাত্র তিনটি অংশ। গ্যালেন বিশ্বাস করতেন, মানুষের যকৃতে পাঁচটা লোব আছে, ভেসালিয়াস প্রমাণ করলেন, মানুষের যকৃতে লোবের সংখ্যা ঠিক দু’টি। এরকমভাবে মানুষের হৃৎপিণ্ডের গঠন, অস্থি-র আকার প্রভৃতি নানা বিষয়ে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ঠিকঠাক সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন ভেসালিয়াস পূর্ববর্তী গ্যালেনের চেয়ে।

লাইব্রেরিতে ব্যাপারটা নিয়ে পড়তে পড়তে আমি আমার সেই অদ্ভুত নৈশ দর্শনের একটা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা খাড়া করতে পারলাম। আমাদের ছোটবেলায় দুর্গাপুজোর ছুটি পড়ার ঠিক আগে, সবে যখন বাতাসে হিমের স্পর্শ লাগতে শুরু করত, বিভিন্ন পূজাবার্ষিকী এসে পৌঁছত আমাদের হাতে, সেসব পূজাবার্ষিকীতে গল্প-উপন্যাসের পাশাপাশি বহু পণ্ডিত মানুষ ছোটদের মতো করে ছোটদের ভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা পরিবেশন করতেন। কল্পবিজ্ঞান নয় সেগুলো, সেগুলো ছিল বিজ্ঞান-সাহিত্য। আমাদের ছোটবেলায় অধিকাংশ শিশুসাহিত্য আজকের মতো এত খেলো হয়ে যায়নি। আমার ধারণা হল, ওরকমই কোনও পূজাবার্ষিকীতে আমি পড়েছিলাম সেই শিশুবয়সে গ্যালেন আর ভেসালিয়াসের কথা। এতদিন ধরে সেই নামদুটো, সেই ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো আমার মস্তিষ্কের আয়নার ওধারে লুকিয়ে ছিল। যার থেকেই আজ এই পরিণত বয়সে বনভূমির কুয়াশামাখা অন্ধকারে অথবা আমার নিশীথস্বপ্নে অমন অদ্ভুত দৃশ্যাবলি, বিচিত্র সংলাপ উদ্ভূত হয়েছে।

ফ্রয়েডের ‘দ্য ইন্টারপ্রিটেশন অব ড্রিমস’ মনে পড়ল, মনে পড়ল আচার্য শঙ্করের ‘পঞ্চীকরণম্‌’ গ্রন্থের সেই তাৎপর্যময় বাক্যটি– ‘করণেষূপসংহৃতেষু জাগরিতসংস্কারজঃ প্রত্যয়ঃ সবিষয়ঃ স্বপ্ন ইত্যুচ্যতে’। যার অর্থ, যখন চক্ষু প্রভৃতি জ্ঞানেন্দ্রিয়সমূহ কাজ করা বন্ধ করে দেয় অর্থাৎ তারা প্রত্যাহৃত হয়, তখন পূর্ব পূর্ব জাগরিত-অবস্থায় মানুষ যেসব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, যা যা সব সে কল্পনা করেছে– সেই সবকিছুরই ছাপ বা ইম্প্রেশন মানুষের মনে স্বপ্নের আকার ধরে দেখা দেয়। মোটের উপর, স্বপ্নের অভিজ্ঞতা জাগরিত-অবস্থার অভিজ্ঞতারই অন্যরকম ফসল।

এই সব ভেবেটেবে আমার সমস্যার একটা মোটামুটি নিষ্পত্তি করা গিয়েছে, এমন স্থির করে শহর থেকে ফিরে এলাম। ফিরে এলাম সেই ঘুমন্ত গ্রামে। বনভূমিতে। আমার বিন্দুবৎ ক্ষুদ্র কুটিরে। দেখলাম, সেই ঘর আগের মতোই আছে। দাওয়ায় জমেছে শুধু ধুলো। আর কোথা থেকে বাতাস বেয়ে ভেসে এসে অজস্র অমলতাস ফুলের চূর্ণ চূর্ণ সোনালি পাপড়ি যোগ দিয়েছে সেই ধুলট-উৎসবে।

শরীর ভালো যাচ্ছিল না, রাতে ভালো ঘুম হয় না, বারবার ভেঙে যায়। হজমেরও বহুবিধ সমস্যা। শুনলাম, পাশের গ্রাম ফুলতলিতে একজন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক আছেন। একদিন সকাল সকাল ফুলতলি গেলাম তাঁকে দেখাতে।

ভদ্রলোকের নাম নারায়ণ চক্রবর্তী। একমাথা পাকা চুল, ইয়াব্বড়ো পাকা গোঁফ, বেঁটেখাটো মানুষ, ধুতি আর ফতুয়াপরা বছর সত্তরের এক বৃদ্ধ। কিন্তু তিনি যখন হাসেন, এমন নির্মল সেই হাসি যে, মনে হয়, আট-দশ বছরের বালক একটি হাসছে। ফুলতলিতে তাঁর মাটির ঘরের বাইরের দিকে ডিসপেনসারি। দেওয়ালের গায়ে খোপওয়ালা কাঠের র‍্যাকে অগুনতি কাচের বয়াম। সেই সব বয়ামে হলুদ, মেটে, কালো, পাটকিলে রঙের গুঁড়ো গুঁড়ো ওষুধ। কোনও কোনও বয়ামের গায়ে লেবেল সাঁটা– হৃদয়ার্ণব। কোনওটার গায়ে আবার লেখা– যকৃৎ। আবার হয়তো কোথাও কোথাও লেখা– চন্দ্রপ্রভা, মধুনাশিনী, সুপাচিকা… আরও যে কত কী অদ্ভুত অদ্ভুত নাম!

দেওয়ালে মা দুর্গার একটি রঙিন ছবি; ক্যালেন্ডার থেকে কেটে নিয়ে কাচ আর কাঠ দিয়ে বাঁধানো। ছবিতে টাটকা কাঠচাঁপাফুলের মালা পরানো। অর্থাৎ, নারায়ণ কবিরাজ নিত্যই পুজো করেন।

অনেকক্ষণ আমার হাতের মণিবন্ধটি ধরে চোখ বুজে গম্ভীর মুখে নাড়ি পরীক্ষা করতে লাগলেন। তারপর হাতটা ছেড়ে দিয়ে চোখ খুলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে গম্ভীর মুখে বললেন, ‘বায়ু কুপিত হয়েছে। রাতে কি বারবার ঘুম ভেঙে যায়?’

আমি মাথা নেড়ে বললাম, ‘তা যায়। একটানা ঘুমই হয় না আমার কোনও দিন। ছোটবেলা থেকেই এমন।’

‘ছোটবেলার কথা হচ্ছে না। ইদানীং কি ঘুম ভেঙে যাচ্ছে বেশি বেশি?’

‘হ্যাঁ।’

‘বিয়ে-থা করেননি কেন?’

‘তা জানি না।’

‘হুম্‌,’ একটু তেরচা চোখে আমার দিকে চেয়ে প্রশ্ন করলেন নারায়ণ কবিরাজ, ‘থাকা হয় কোথায়?’

‘আমতলি।’

‘না, না, আমতলি তো বুঝলাম। আমতলির কোথায়?’

জায়গাটা যথাসাধ্য বুঝিয়ে বললাম। নারায়ণ কবিরাজের চোখ কপালে উঠল। বলে উঠলেন, ‘বলেন কী? আপনি মুকুরটিলার ধারে বনের মধ্যে থাকেন?’

‘মুকুরটিলা? ওই জায়গাটার নাম মুকুরটিলা নাকি?’ এবার আমার অবাক হওয়ার পালা।

নারায়ণ চক্রবর্তী বললেন, ‘হ্যাঁ তো! মুকুরটিলাই ওর নাম। যেখানে গামারগাছের জঙ্গল। আমরা পুরনো লোকেরা ওই নামই জানি। এখন আবার নামটাম পাল্টে গিয়েছে কি না, জানি না। আজকাল তো এমন হয়েছে, পারলে লোকে নিজের বাপের নাম পোজ্জন্তো পাল্টে ফেলছে, তায় আবার টিলার নাম, হুঃ!’

তারপরেই বেশ গম্ভীরভাব ধারণ করে বললেন, ‘যাকগে যাক। ওষুধ দিয়ে দিচ্ছি। নিয়ম করে খাবেন। ঘুম হবে। হজমের গোলমালও সেরে যাবে। তবে পারতপক্ষে ওই মুকুরটিলার জঙ্গলের দিকে যাবেন না।’

‘কেন বলুন তো?’

‘টিলাটার একটা বদনাম আছে। আমি অবশ্য কিছু দেখিনি-টেখিনি। আমাকে বলেছিল সতী!’

‘সতী কে?’

‘সতী আমাদের গাঁয়ের মেয়ে। অল্পবয়সে ভৈরবী হয়ে যায়। বেশ অনেকগুলো বছর কামাখ্যাতে ছিল। ও-ই কী সব দেখেছে মুকুরটিলায়, বলছিল।’

‘কী দেখেছেন তিনি?’

এবার গম্ভীর ভাব সরিয়ে যেন রোদ উঠল। তাঁর সেই বিখ্যাত হাসিটি হেসে নারায়ণ কবিরাজ বললেন, ‘সতী বলছিল, ওই টিলাতে নাকি অনেক অশৈলী ব্যাপার আছে। আপনি হয়তো ওখানে গিয়ে কোনও দিন দেখলেন, আপনার ঠাকুর্দার বাবা আপনার নাতির ছেলের সঙ্গে হেসে হেসে গল্প করছেন। হা হা হা! এসব কত কী উৎপটাং জিনিস যে ভৈরবী মায়েরা দ্যাখে! আপনারা শিক্ষিত মানুষ, ওসব কথা কোনও কাজের নয়। টিলাটা জঙ্গলে ভরা, সাপখোপ মশামর্কট বাদুড়বেল্লিক কত কী আছে! কী দরকার আপনার ওদিকে যাওয়ার?’

ওষুধ নিয়ে ফুলতলি থেকে কুঠিয়ায় ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম নারায়ণ চক্কোত্তির কথাগুলো। কী যেন একটা দেখতে পাচ্ছি ওঁর উচ্চারণের মধ্যে, অথচ ব্যাপারটা কিছুতেই আমার কাছে স্পষ্ট হচ্ছে না!

……………………………….আয়নার ওধারের অন্যান্য পর্ব ………………………………………..

১। ওধারে এক আগন্তুক

২। অন্ধকারে, মৃতদেহ কাঁধে