


অরবিন্দ কিন্তু কখনও-ই জীবন বা সংসার থেকে পালিয়ে যাওয়া কোনও বৈরাগী ছিলেন না। ১৯২০ সালের ৫ জানুয়ারি, জোসেফ ব্যাপটিস্টাকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি স্পষ্ট লিখেছিলেন– ‘রাজনীতিকে আমি হেয় মনে করি না, কিম্বা তার উপরে চলে গেছি তাও মনে করি না। আগে তা জোরের সঙ্গেই করেছি কিন্তু এখন আধ্যাত্মিক জীবনের উপরেই জোর দিচ্ছি, যদিও আমার আধ্যাত্মিকতা সংসারত্যাগী বা সংসার বিমুখ নয়। আমার কাছে মনুষ্য জীবনের সবকিছুই পূর্ণ আধ্যাত্মিক জীবনের অন্তর্ভুক্ত, রাজনীতিও তার মধ্যে।’ তাঁর এই ‘সবকিছুই আধ্যাত্মিক জীবনের অন্তর্ভুক্ত’– এই বিশ্বজনীন দর্শনেরই সবচেয়ে বড় এবং বর্ণময় ক্যানভাস ছিল তাঁর নাটকগুলো।
বাঙালির একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে– আমরা মানুষকে খুব সহজে নির্দিষ্ট ‘ছাঁচ’ বা টাইপকাস্টে ফেলে দিই। আমাদের কাছে রবি ঘোষ বা অনুপ কুমার মানেই কমেডিয়ান, সুমিত গাঙ্গুলি বা বিপ্লব চ্যাটার্জি মানেই ভিলেন, রঞ্জিত মল্লিক মানেই মধ্যবিত্ত বাড়ির আদর্শ বড়ছেলে আর প্রসেনজিৎ মানেই পর্দায় ডুকরে কেঁদে– ‘মা, আমি চুরি করিনি!’ ঠিক একইভাবে, ইতিহাসের পাতা থেকেও আমরা চরিত্রদের নিজেদের সুবিধামতো ছাঁচে ফেলেছি। শ্রীঅরবিন্দ বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে এক চরমপন্থী বিপ্লবী, যিনি কি না আলিপুর বোমা মামলার পর হঠাৎ করে সব ছেড়েছুড়ে পণ্ডিচেরিতে গিয়ে এক রহস্যময় মহাযোগী হয়ে গেলেন।
বছর কয়েক আগে ব্রাত্য বসুর ‘বোমা’ নাটকে আমরা অরবিন্দকে দেখেছি। সেখানে এক অমোঘ প্রশ্ন তোলা হয়েছিল– বোমা মামলায় দলের অন্য সবাই যখন ফাঁসি বা দ্বীপান্তরের সাজা পাচ্ছে, তখন দলনেতা অরবিন্দ কীভাবে বেকসুর খালাস পেয়ে দিব্যজীবনের সন্ধানে চলে গেলেন? সাম্প্রতিক সময়ে অরবিন্দকে নিয়ে এই একটি নাট্যপ্রচেষ্টা ছাড়া, থিয়েটারের দুনিয়ার সঙ্গে তাঁর আর কোনও যোগাযোগ আমাদের মনে পড়ে না। কিন্তু আমরা ক’জন জানি যে, যে মানুষটিকে নিয়ে আজ নাটক লেখা হচ্ছে, তিনি নিজেই ছিলেন এক দুর্ধর্ষ নাট্যকার? তাঁর ঝুলিতে রয়েছে একাধিক সম্পূর্ণ এবং অসম্পূর্ণ নাটক। আমরা তাঁকে শুধুই ‘বিপ্লবী’ বা ‘যোগী’র ছাঁচে আটকে রেখে তাঁর এই বিস্ময়কর নাট্যকার সত্তাটিকে একেবারেই ভুলে বসে আছি।

অরবিন্দ কিন্তু কখনওই জীবন বা সংসার থেকে পালিয়ে যাওয়া কোনও বৈরাগী ছিলেন না। ১৯২০ সালের ৫ জানুয়ারি জোসেফ ব্যাপটিস্টাকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি স্পষ্ট লিখেছিলেন– ‘রাজনীতিকে আমি হেয় মনে করি না, কিম্বা তার উপরে চলে গেছি তাও মনে করি না। আগে তা জোরের সঙ্গেই করেছি কিন্তু এখন আধ্যাত্মিক জীবনের উপরেই জোর দিচ্ছি, যদিও আমার আধ্যাত্মিকতা সংসারত্যাগী বা সংসার বিমুখ নয়। আমার কাছে মনুষ্য জীবনের সবকিছুই পূর্ণ আধ্যাত্মিক জীবনের অন্তর্ভুক্ত, রাজনীতিও তার মধ্যে।’
তাঁর এই ‘সবকিছুই আধ্যাত্মিক জীবনের অন্তর্ভুক্ত’– এই বিশ্বজনীন দর্শনেরই সবচেয়ে বড় এবং বর্ণময় ক্যানভাস হল তাঁর নাটকগুলো। একবার কল্পনা করুন– একটিমাত্র রঙ্গমঞ্চ, আর তার ওপর দিয়ে দম্ভভরে হেঁটে যাচ্ছে গ্রিক মিথলজির দেব-দানব, আরব্য রজনীর রহস্যময় চরিত্র, সিরিয়ার রক্তলোলুপ সম্রাট আর স্ক্যান্ডিনেভিয়ার বরফে মোড়া পাহাড়ের ভাইকিং যোদ্ধারা। মনে হচ্ছে না, যেন গোটা পৃথিবীর ইতিহাস ও পুরাণকে একটা ফ্রেমে বন্দি করা হয়েছে? ১৮৯১ থেকে ১৯১৫– এই সময়পর্বে রচিত তাঁর নাটকগুলোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, তিনি কোনও নির্দিষ্ট দেশ বা কালের গণ্ডিতে আটকে থাকেননি। কিন্তু কেন একজন ভারতীয় যোগী তাঁর নাটকের রসদ খুঁজতে সুদূর নরওয়ে বা প্রাচীন সিরিয়ার দ্বারস্থ হলেন? নিছকই কি বৈচিত্রের খোঁজ? না কি দেশ-কালের ভৌগোলিক সীমানা চূর্ণ করে, বিজাতীয় গল্পের মোড়কে তিনি বিশ্ববাসীকে দিয়ে গিয়েছেন এমন এক চরম ভারতীয় আত্মিক বার্তা, যা উপলব্ধি করলে আজও তাজ্জব হতে হয়? আসুন, তাঁর পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ নাটকের পাতা উল্টে আজ এক অজানা অরবিন্দের মনোজগতে ডুব দেওয়া যাক।

প্রথমেই ধরা যাক ‘Perseus the Deliverer’ (পার্সিউস দ্য ডেলিভারার) নাটকের কথা। এটি গ্রিক মিথলজির পার্সিউস ও অ্যান্ড্রোমিডার গল্প নিয়ে লেখা। কিন্তু অরবিন্দ এখানে শুধু একটা প্রেমের গল্প শোনাননি। তিনি গ্রিক মিথলজির খোলসে পুরে দিয়েছেন পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক রূপক। পার্সিউস যেমন সিরিয়াকে নিষ্ঠুর দেবতা পসেইডনের হাত থেকে বাঁচায়, অরবিন্দ যেন সেই পার্সিউসের মধ্যেই ভারতের এক উদ্ধারকর্তাকে কল্পনা করেছেন, যে ব্রিটিশদের হাত থেকে দেশমাতৃকাকে রক্ষা করবে। শুধু তাই নয়, পসেইডনের অন্ধ হিংসার বদলে অ্যাথেনার জ্ঞানের আলো দিয়ে তিনি মানুষের আধ্যাত্মিক বিবর্তনের কথাও বলেছেন।
গ্রিক গল্পের মোড়কে তিনি এভাবেই ভারতীয় দর্শনের ‘অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তরণ’-এর বার্তা দিয়েছেন। নাটকে যখন অ্যান্ড্রোমিডা বিপন্ন মানুষের প্রতি করুণায় তাদের মুক্ত করে, তখন সে আসলে সেই ভারতীয় দর্শনেরই প্রতিনিধিত্ব করে, যা সব জীবের প্রতি দয়ার কথা বলে। অ্যান্ড্রোমিডা বলে ওঠে:
‘Because I would not have their human hearts mercilessly uprooted for the bloody Monster you worship as a god! Because I am capable of pain and so can feel the pain of others!’
এই যে অপরের ব্যথায় ব্যথিত হওয়া, এটাই তো ভারতীয় দর্শনের মূল কথা। আর পার্সিউস যখন তাকে উদ্ধার করে, তখন সে কোনও রক্তপাত বা হিংসার মাধ্যমে নয়, বরং অ্যাথেনার (জ্ঞানের দেবী) দেওয়া বর্ম ও তরবারির সাহায্যে। অর্থাৎ, অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করতে হবে জ্ঞানের আলো দিয়ে। অরবিন্দ নিজেই বলেছেন, ‘For through the shocks of difficulty and death/ Man shall attain his godhead.’ এই বিবর্তনের বার্তাই তিনি গ্রিক মিথলজির মাধ্যমে দিয়েছেন।

এরপর আসি ‘The Viziers of Bassora’ (দ্য উজিরস অফ বাসোরা) নাটকে। আরব্য রজনীর ‘দ্য টেল অফ দ্য বিউটিফুল সুইট ফ্রেন্ড’-এর গল্প নিয়ে লেখা এই রোমান্টিক কমেডি। এখানেও সেই একই ব্যাপার– গল্প আরবের, কিন্তু আত্মা ভারতীয়। নুরুদ্দিন ও আনিসের প্রেমের মধ্যে দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন যে, প্রেম কীভাবে মানুষকে কলুষমুক্ত করে।
ইবন সাওয়ি, যিনি একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ, তাঁর চরিত্রের মধ্যে দিয়ে তিনি ‘কর্মে অধিকার, কিন্তু ফলে নয়’– গীতার এই দর্শনেরই যেন প্রতিধ্বনি ঘটিয়েছেন। তিনি বুঝিয়েছেন, জীবনে যাই ঘটুক না কেন, ঈশ্বরের ইচ্ছার ওপর অবিচল আস্থা রাখাই আসল ধর্ম। যখন নুরুদ্দিনের ফাঁসির আদেশ হয়, তখন ইবন সাওয়ি বলেন:
‘Bow to the will of God, my son; if thou Must perish on a false and hateful charge, A crime in thee impossible, believe It is His justice still.’
এই যে ঈশ্বরের প্রতি সম্পূর্ণ সমর্পণ, এটি আরব্য গল্পের প্রেক্ষাপটে হলেও এর অন্তর্নিহিত সুরটি সম্পূর্ণ ভারতীয়। নুরুদ্দিন নিজেও যখন বিপদে পড়ে, তখন সে মানুষের অন্তর্নিহিত মঙ্গলের ওপর বিশ্বাস হারায় না:
“Man Is not ignoble, but has angel soarings, Howe’er the nether devil plucks him down.”
এই বিশ্বাসই তাকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা করে।

এবার চলুন, সিরিয়ার ইতিহাসে ঢুঁ মারি। ‘Rodogune’ (রডোগুন) নাটকে অরবিন্দ সিরিয়ার সিংহাসন নিয়ে দুই ভাই, অ্যান্টিওকাস ও টিমোকেলসের দ্বন্দ্বের কথা বলেছেন। এই নাটকের নায়িকা রডোগুন একজন পার্থিয়ান রাজকন্যা। এখানেও অরবিন্দ সেই প্রেমের জয়গান গেয়েছেন।
রডোগুনের নিঃস্বার্থ প্রেম অ্যান্টিওকাসের ভেতরের অহংকারকে শান্ত করে। অ্যান্টিওকাস যখন রডোগুনের প্রেমের কাছে আত্মসমর্পণ করে, তখন সে সিংহাসনের লোভও ত্যাগ করতে পারে। এই যে পার্থিব ক্ষমতার চেয়ে প্রেমের শক্তিকে বড় করে দেখা, এটাই তো ভারতীয় দর্শনের মূল কথা। অ্যান্টিওকাস যখন রডোগুনকে বলে:
‘The passion of oneness two hearts are this moment Denies the steps of death for ever.’
তখন আমরা বুঝতে পারি যে, এই প্রেম শুধু শারীরিক নয়, এটি আত্মার মিলন। এই নাটকটি ট্র্যাজেডি হলেও, এর শেষে কোনও নিরাশা নেই। অ্যান্টিওকাস যখন মৃত্যুর মুখোমুখি হয়, তখন সে বলে:
‘What were Death then but wider life than earth Can give us in her clayey limits bound? Darkness perhaps! There must be light behind.’
মৃত্যুর পরেও যে আলো আছে, এই ভারতীয় দর্শনই সিরিয়ার ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ফুটে উঠেছে।

‘Eric’ (এরিক) নাটকে আমরা চলে যাই স্ক্যান্ডিনেভিয়ায়। নরওয়ের রাজা এরিকের গল্প এটি। এরিক তলোয়ারের জোরে নরওয়ে জয় করলেও, সে বুঝতে পারে যে, কেবল প্রেমই পারে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে।
প্রতিশোধ নিতে আসা আস্লগ যখন এরিকের প্রেমে পড়ে, তখন সেও ভুলে যায় তার প্রতিশোধস্পৃহা। এরিক যখন আস্লগকে বলে:
‘Love is the hoop of the gods’ hearts to combine. Iron is broken, the sword Sleeps in the grave of its lord; Love is divine.’
এই একটা লাইনের মধ্যেই অরবিন্দ তাঁর পুরো দর্শন বুঝিয়ে দিয়েছেন। শক্তি নয়, প্রেমই হল আসল জয়। এরিক বুঝতে পারে যে শুধু তলোয়ার দিয়ে নয়, মানুষের হৃদয় জয় করেই প্রকৃত ঐক্য আনা সম্ভব। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান গল্পের খোলসে তিনি এই প্রেমের বার্তাই দিয়েছেন যা আসলে ভারতীয় দর্শনের মূল সুর।
সবশেষে, একেবারে খাঁটি ভারতীয় গল্প– ‘Vasavadutta’ (বাসবদত্তা)। ‘কথাসরিৎসাগর’ থেকে নেওয়া উদয়ন ও বাসবদত্তার এই প্রেমের গল্পে অরবিন্দ দেখিয়েছেন হৃদয় বনাম মস্তিষ্কের দ্বন্দ্ব।

অবন্তীরাজ চণ্ড মহাসেন চেয়েছিলেন তাঁর মেয়ে বাসবদত্তাকে দিয়ে উদয়নকে বশ করতে। কিন্তু বাসবদত্তার হৃদয় যখন উদয়নের প্রেমে সাড়া দেয়, তখন পিতার সব কূটনীতি ব্যর্থ হয়। এখানেও অরবিন্দ প্রমাণ করেছেন যে, বুদ্ধির চেয়ে প্রেমের স্বজ্ঞাত (Intuitive) শক্তি অনেক বেশি শক্তিশালী। উদয়ন যখন বাসবদত্তাকে বলে:
‘The deepest things are those thought seizes not; Our spirits live their hidden meaning out.’
তখন আমরা বুঝতে পারি যে প্রেম কোনও যৌক্তিক হিসেব-নিকেশ নয়, এটি আত্মার ডাক। এই নাটকে ভারতীয় প্রেক্ষাপটেই ভারতীয় দর্শন ফুটে উঠেছে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে।
বন্ধুরা, এই পাঁচটি নাটক বিশ্লেষণ করলে একটা জিনিস স্পষ্ট হয়– অরবিন্দ গল্প যেখান থেকেই নিন না কেন, তাঁর লক্ষ্য ছিল মানুষের আত্মার জাগরণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ শুধু এই পার্থিব জীবনেই সীমাবদ্ধ নয়, তার একটি বৃহত্তর আধ্যাত্মিক সত্তা রয়েছে। প্রেম, ভক্তি ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে মানুষ সেই আধ্যাত্মিক সত্তার সন্ধান পেতে পারে। তাঁর প্রতিটি নাটকেই কোনও না কোনও চরিত্র এই উত্তরণের মধ্য দিয়ে গিয়েছে।

গ্রিক, আরব, সিরিয়া বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান– যে রূপরেখাই তিনি ব্যবহার করুন না কেন, তাঁর নাটকের অন্তর্নিহিত সুরটি সম্পূর্ণ ভারতীয়। গীতার কর্মযোগ, উপনিষদের আত্মতত্ত্ব, আর সর্বোপরি প্রেমের মাধ্যমে পরম করুণাময়ের সান্নিধ্য লাভের যে আকাঙ্ক্ষা– তা তাঁর প্রতিটি নাটকের ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে আছে। উদাহরণস্বরূপ, গীতার ‘নিষ্কাম কর্ম’ বা কর্মযোগের আদর্শ আমরা দেখতে পাই ‘দ্য উজিরস অফ বাসোরা’ নাটকের ইবন সাওয়ি চরিত্রের মধ্যে। পুরাণে যেমন রাজা হরিশ্চন্দ্র বা প্রহ্লাদ চরম বিপদেও ঈশ্বরের প্রতি অবিচল আস্থা রেখেছেন, ঠিক তেমনই নিজের নির্দোষ ছেলে নুরুদ্দিনের ফাঁসির আদেশের মুখেও ইবন সাওয়ি স্থিরভাবে বলেন, ‘Bow to the will of God, my son; if thou/ Must perish on a false and hateful charge,/ … believe/ It is His justice still.’ এই যে ফলের আশা না করে ঈশ্বরের ইচ্ছায় সম্পূর্ণ সমর্পণ, এটাই গীতার কর্মযোগ। অন্যদিকে, উপনিষদের সেই শাশ্বত মন্ত্র ‘তমসো মা জ্যোতির্গময়’ (অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে যাও)– এই আত্মতত্ত্বের অসাধারণ প্রকাশ ঘটেছে ‘পার্সিউস দ্য ডেলিভারার’ নাটকে। পুরাণে যেমন দেবাসুরের সংগ্রামে অসুরদের অন্ধকারের শক্তির বিরুদ্ধে দেবতাদের আলোর জয় হয়, ঠিক তেমনই এই নাটকে সমুদ্রদেবতা পসেইডনের অন্ধ ও নিষ্ঠুর পূজা থেকে জ্ঞানের দেবী অ্যাথেনার আলোকময় আরাধনায় উত্তরণ– আসলে মানুষের আত্মারই অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তরণ। পার্সিউস যখন বলে, ‘Since little by little earth must open to heaven/ Till her dim soul awakes into the Light’ তখন তা যেন উপনিষদেরই জাগরণের গান। আর প্রেমের মাধ্যমে ঈশ্বরলাভের কথা যদি বলতে হয়, তবে ‘এরিক’ বা ‘বাসবদত্তা’ নাটকের কথা আসবেই। হিন্দু পুরাণে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির সুরে যেমন গোপীরা আত্মহারা হয়ে ঈশ্বরের প্রেমে সমর্পিত হতেন, ‘বাসবদত্তা’ নাটকে রাজা উদয়নের বাঁশির সুর ও প্রেমের কাছে বাসবদত্তার অহংকার ঠিক সেভাবেই গলে যায়। উদয়ন তাই বলেন, ‘Song is divine, but more divine is love’। একইভাবে ‘এরিক’ নাটকে আস্লগের প্রতিহিংসাপরায়ণ হৃদয় যখন এরিকের প্রেমের কাছে পরাস্ত হয়, তা যেন পরমাত্মার কাছে জীবাত্মারই সমর্পণ। এরিক গেয়ে ওঠে, ‘Love is the hoop of the gods/ Hearts to combine’। তিনি বিদেশি গল্পের কাঠামোর মধ্যে ভারতীয় দর্শনের আত্মাকে এমনভাবে গেঁথে দিয়েছেন যে, তা এক সার্বজনীন আবেদন লাভ করেছে।
তাই বলা যায়, অরবিন্দ তাঁর নাটকের মাধ্যমে ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে এক চিরন্তন সত্যের সন্ধান দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, দেশ-কাল-পাত্র ভেদে মানুষের মনের মূল আকাঙ্ক্ষাগুলো একই থাকে। আর সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের পথ হল প্রেম, ভক্তি ও আত্মত্যাগ– যা ভারতীয় দর্শনের চিরন্তন শিক্ষা।
…………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন নীলাঞ্জন হালদার-এর অন্যান্য লেখা
…………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved