Robbar

আমার সহজ পাঠ, আমার স্কুল জীবন

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 13, 2026 12:19 pm
  • Updated:May 13, 2026 2:08 pm  

‘শূন্য থেকে শুরু’। স্বপনসাধন বোসের (টুটু বোস) ৭৫ বছরের জন্মদিনে প্রকাশিত হয়েছিল এই বই। কীরকম ছিল তাঁর বড় হয়ে ওঠা? তাঁর বাল্যকাল? শিক্ষাজীবন? লিখেছিলেন এই বইয়ের ‘সহজপাঠ’ অংশে। তাঁর প্রয়াণ-আবহে রইল সে লেখার টুকরো পুনর্মুদ্রণ।

স্বপনসাধন বোস

হাওড়ার রামকৃষ্ণপুর লেনের ঐতিহ্যবাহী বোস পরিবারে আমার জন্ম। জন্ম– ২৩ জানুয়ারি, ১৯৪৭। সেন্ট টমাস স্কুলে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ে ভর্তি হই খুরুট রোডের হাওড়া বিবেকানন্দ স্কুলে। বাংলা মাধ্যম স্কুল হলে কী হবে, নামডাক ছিল ভালোই। ম্যাট্রিকের র‍্যাঙ্কিংয়ে হাওড়া জেলা স্কুলের সঙ্গে তখন রীতিমতো কম্পিটিশন চলত। সমস্যা একটাই। খুরুট রোডের স্কুলবাড়িটি ছিল ভাড়ার। স্থান সংকুলানের অভাবে সেখানে ক্লাস ফাইভ থেকে সেভেন অবধি পড়ানো হত। পরের উচ্চতর ক্লাসগুলি– এইট থেকে টুয়েল্ভ– পড়ানো হত স্কুলেরই অন্য বিল্ডিংয়ে– হাওড়ার কাসুন্দিয়ায়।

ছোটবেলা

সেখানকার ক্যাম্পাস দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। বিরাট, আর ছড়ানো। খেলার মাঠটিও ছিল অনেক বড়। এখানেই প্র্যাকটিস করতেন মোহনবাগানের বিখ্যাত ফুটবলার স্বর্গীয় অশোক চট্টোপাধ্যায় (চ্যাটার্জি)। বলা বাহুল্য, তিনি এই স্কুলেরই ছাত্র ছিলেন। ক্লাস শুরু হওয়ার আগে আমরা প্রার্থনা সংগীত গাইতাম লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে। এই প্রার্থনা সংগীত বিষয়টির প্রতি আমার দুর্বলতা আছে। মনে হয়, স্কুল যে-ডিসিপ্লিনের শিক্ষা দেয়, এখান থেকেই তার শুরু। প্রার্থনা সংগীত মনকে আত্মপ্রস্তুতির সুযোগ দেয়।

অন্নপ্রাশনের দিন। মায়ের কোলে। সঙ্গে ‘দাদুভাই’

স্কুলের আরও একটি নিয়ম আমার ভারি মনে ধরেছিল। সেটা হচ্ছে, দু’টি পিরিয়ডের মাঝে যেটুকু সময় মিলত, তখন ‘সেল্ফ গভর্নমেন্ট’-এর প্রতিনিধিরা বাকি ক্লাসের নিয়মশৃঙ্খলার দিকে নজর রাখত। ‘সেল্ফ গভর্নর’-এর প্রতিনিধিরা নিযুক্ত হত প্রতিটি ক্লাস থেকে। এখন যখন ভাবি, মনে হয়, এটিই বুঝি ছিল আত্মশাসন এবং আত্ম-নিয়ন্ত্রণের প্রথম পাঠ।

আমাদের সময়ে বিবেকানন্দ স্কুলের হেডমাস্টারমশাই ছিলেন সুধাংশুশেখর ভট্টাচার্য। পণ্ডিত ও যশস্বী মানুষ। রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেয়েছিলেন। শিক্ষকতার ব্রতকে তিনি কেবল পেশা হিসেবে দেখেননি। পেশার অতিরিক্ত জীবনধর্ম বলে ভেবেছিলেন।

স্কুল-জীবন যেহেতু আমাদের শৈশবের সবচেয়ে রঙিন অধ্যায়, তাই তার প্রতি ভালোবাসা যেন ফুরতেই চায় না। সুযোগ পেলেই আমাদের মন বারবার ঝালিয়ে নেয় স্কুলের দিনগুলির কথা। আর, আমি তো এ-ব্যাপারে স্মৃতি-খ্যাপা। এতদিন পরেও চোখের পলক ফেলা মাত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে স্কুলের পরিবেশ, পিছন দিকের পুকুর, পাড়ের ছোট্ট আশ্রম। সেখানে থাকতেন বাদলবাবু। অবিবাহিত ছিলেন।

মায়ের সঙ্গে। টুটু বসু ও তাঁর ছোটমামা অলোক দত্ত

সুধাংশুশেখর ভট্টাচার্য ছিলেন অত্যন্ত কড়া প্রকৃতির শিক্ষক। স্কুলে আসতে সামান্য দেরি হলেই শাস্তি দিতেন। ঝাড়া দু’টি পিরিয়ড দাঁড় করিয়ে রাখতেন সর্বসমক্ষে। কপাল ভালো হলে কখনও-বা এক পিরিয়ডের পরে অব্যাহতি মিলত। তাঁর ভাই ছিলেন হিমাংশুবাবু। তিনিও রাগী। ফলে তাঁকেও আমরা প্রবল ভয় পেতাম। এঁরা কেউ বিয়ে করেননি। পিছুটান ছিল না। ফলে, স্কুল ও ছাত্ররাই ছিল জীবনের ধ্যান-জ্ঞান। কঠোর স্বভাবের জন্য ওঁদের দু’জনের থেকে দূরত্ব রাখতাম। তুলনায় আমাদের কাছে মাটির মানুষ ছিলেন অকৃতদার বাদলবাবু। পড়ার বইয়ের বাইরের পড়া পড়েই তো আমাদের জীবন আসলে সমৃদ্ধ হয়। ছুটির পরে বাদলবাবুর কাছে আমি পাঠ্যক্রমের বাইরে আরও অনেক কিছু জানতে পারতাম। বিশেষত, স্বামী বিবেকানন্দ সম্বন্ধে তাঁর পাণ্ডিত্য ও জ্ঞান ছিল অসামান্য।

এখানে না-বললে নয়, আমার অভিন্নহৃদয় বন্ধু অঞ্জন মিত্রর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল এই বিবেকানন্দ স্কুলে, ক্লাস সিক্সে। সেখান থেকে ধাপে ধাপে আমরা একসঙ্গে পড়েছি। স্কুল পেরিয়ে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ, এমনকী, চার্টার্ড অ্যাকাউনটেন্সি। ইন্টার্ন পাশ করার পরে আমার শাখা ভিন্ন হল। গেলাম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল’ কলেজে। আর, অঞ্জন চার্টার্ড অ্যাকাউনটেন্সি-ই পড়ল। আমিও সিএ কমপ্লিট করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অঞ্জন বলল, কী দরকার! ভবিষ্যতে তোর সব ব্যবসার অ্যাকাউন্টস আমিই দেখব তো। তুই বরং ল’ পড়। কাজে দেবে।

ফেলে আসা ছেলেবেলা, ছুটির মেজাজ

অঞ্জনের সঙ্গে সাইকেল চেপে হাওড়ার অলিগলিতে চক্কর কেটেছি। কী আনন্দময় যে ছিল সেই দিনগুলি। অঞ্জন আমাকে বলত– তুই আমার সঙ্গে মিশে তোর দেখার চশমাটি বদলে নে। যত দিন গিয়েছে, আস্তে আস্তে বুঝেছি ওর কথার মানে। আমরা দু’জন তো দু’-ধরনের আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রতিনিধি ছিলাম। অঞ্জনের ইনফ্লুয়েন্সে পরে আমি যেটা করি– নিজের কমফর্ট জোনের বাইরে বেরিয়ে আসি। জীবনের যে-যে দিক আমি চিনি না, দেখিনি কখনও, সেদিকে তাকাতে শুরু করি। সন্দেহ নেই, তাতে আমার উপকারই হয়েছে। বিবেকানন্দ স্কুলের প্রসঙ্গে আর-একজন শিক্ষকের কথা মনে পড়ে। তিনি হলেন ব্রজমোহন মজুমদার। আমাদের ‘ব্রজবাবু’। আদ্যন্ত সৎ মানুষ। তেমনই অমায়িক স্বভাবের। তাঁর সঙ্গে আমার গভীর সখ্য গড়ে উঠেছিল। স্কুলে প্রতি বছর প্রাক্তনীদের নিয়ে একটা পুনর্মিলন সম্মেলন বা ‘রিইউনিয়ন’ অনুষ্ঠিত হয়। ব্যবসার সূত্রে বহু বছর বিদেশে থাকার জন্য ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আমি এতে অংশ নিতে পারিনি। যদি কখনও পারি, তাহলে আনন্দিত হব। কিন্তু ব্রজবাবুর সঙ্গে কি আর দেখা হবে? চিরকালের কংগ্রেসি ব্রজবাবু একসময় তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। বিধায়ক-ও হন। তবে পৃথিবীতে কেন যে তাঁর প্রয়োজন এত চট করে ফুরিয়ে গেল, জানি না। এই বইয়ের কাজ যখন করছি, একদিন হঠাৎ খবর পেলাম– তিনি আর ইহলোকে নেই। ব্রজবাবুর অন্তর্ধানের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো বরাবরের জন্য মুছে গেল আমার স্কুল-জীবনের মধুর বর্ণমালার একাংশ।

অঞ্জন মিত্রর বিয়ের অনুষ্ঠানে টুটু বোস

…………………………
সাতসকালে ক্লাসে হাজির হওয়ার জন্য আমাকে ভোর ৫টার বাস ধরতে হত। এখন ভেবেই আঁতকে উঠি। পারতাম কী করে! কিন্তু তখন কিছুই মনে হত না। যৌবনের জোশে এমন কত অসম্ভব কিছু যে অনায়াসে করে ফেলে মানুষ! স্কুলের চেয়ে কলেজের কড়াকড়ি কম হবে। জীবন সেখানে অনেক রংদার, উষ্ণ, অ্যাডভেঞ্চারে ভরা।

…………………………

স্কুল থেকে বেরিয়ে ভর্তি হই সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। বি.কম অনার্স। সেখানে ছিল মর্নিং ক্লাস। সকাল ৬টা থেকে। ১৬ নম্বর বাসে চেপে হাওড়া থেকে এসে নামতাম পার্ক স্ট্রিটের মোড়ে। বাকিটুকু হেঁটে চলে যেতাম।

সাতসকালে ক্লাসে হাজির হওয়ার জন্য আমাকে ভোর ৫টার বাস ধরতে হত। এখন ভেবেই আঁতকে উঠি। পারতাম কী করে! কিন্তু তখন কিছুই মনে হত না। যৌবনের জোশে এমন কত অসম্ভব কিছু যে অনায়াসে করে ফেলে মানুষ! স্কুলের চেয়ে কলেজের কড়াকড়ি কম হবে। জীবন সেখানে অনেক রংদার, উষ্ণ, অ্যাডভেঞ্চারে ভরা। এমনটা শুনে বড় হলে কী হবে, বাস্তব সবসময় নিজের টার্মে চলে। সে কারও পরোয়া করে না। স্কুলে দেরি হলে শাস্তিস্বরূপ দাঁড় করিয়ে রাখতেন হেডস্যর। এখানে সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন কলেজের প্রিন্সিপাল ফাদার জরিস। ছোটখাটো মানুষ। তবে প্রবল ব্যক্তিত্ব। পান থেকে চুন খসলে শাস্তি দিতেন। বড় ধরনের কিছু হয়তো নয়। কিন্তু শাস্তি পেয়ে আমাদের মধ্যে লজ্জা, অপরাধবোধ এবং অনুশোচনা– তিনটেই সক্রিয় হয়ে উঠত। এখন সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে হামেশাই জানতে পারি যে, স্কুলে মাস্টারমশাইরা শাস্তি দিলে বাড়ি থেকে অভিভাবকরা উল্টে শিক্ষকদের নামে কমপ্লেন ঠুকে দেন। আমাদের সময়টা ছিল এর সম্পূর্ণ বিপরীত। মাস্টারমশাই শাস্তি দিয়েছেন– এই কথাটি আমরা বাড়িতে বলতেই পারতাম না ভয়ে। পাছে বাড়িতে আর-একপ্রস্থ হেনস্তা হতে হয়। আর, শাস্তি দেওয়ার জন্য আমাদের অভিভাবকরা গিয়ে মাস্টারমশাইকে ভর্ৎসনা করবেন– এমনটা হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। ধরেই নেওয়া হত, মাস্টারমশাই শাস্তি দিয়েছেন মানে নিশ্চয় ছাত্রছাত্রীরা কিছু-না-কিছু বেয়াদবি করেছে।

এই প্রসঙ্গে আমার একটি গল্পের কথা মনে পড়ছে। ‘বনফুল’, মানে সাহিত্যিক বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের লেখা। স্মৃতি থেকে বলছি। হে সহৃদয় পাঠক, সামান্য এদিকওদিক হলে মাপ করে দেবেন দয়া করে।

এক গ্রামের স্কুলে প্রধানশিক্ষক ছিলেন খুব রাশভারী মানুষ। নিজের হাতে প্রতিষ্ঠা করা স্কুলে গ্রামের ছেলেমেয়েদের পড়াতেন। তাঁর পড়ানোর পদ্ধতিটি ছিল সাবেকি কিন্তু এফেক্টিভ। পড়ায় ভুলচুক হলেই বেজায় পেটাতেন। এমন মারতেন যে, কলমির ডাল ভেঙে যেত। প্রচুর মেধাবী ছাত্র তৈরি করেছেন। তাঁর ছাত্ররা ক্রমে জীবনের নানা শাখায় সফল হয়েছে। কিছুদিন হল, প্রধানশিক্ষক যেন অনুমান করছেন তাঁর আড়ালে তাঁকে নিয়ে ফিসফাস চলছে। অনুমান সত্য সাব্যস্ত হল– যেদিন তিনি দেখলেন, শহর থেকে তাঁর নামে অভিযোগপত্র এসেছে।

কী অভিযোগ? না, তিনি বড় মারধর করেন ছাত্রদের। দরদ দিয়ে পড়ান না। আরও কত কী! এই অভিযোগের ভিত্তিতে স্কুল পরিদর্শককে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কী পরিস্থিতি তা সরজমিনে খতিয়ে দেখার জন্য। এই শিক্ষক যেটায় সবচেয়ে অবাক হলেন, তা হল, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগনামায় যারা অভিভাবক হিসেবে সই করেছে, প্রত্যেকেই তাঁর ছাত্র। এদের তিনি পড়িয়েছেন একদা।

এখন, তাদেরই ছেলেপুলেদের পড়ান। প্রত্যেকটি সই তাঁর চেনা। এটাই তাঁকে আহত করল সবচেয়ে বেশি। এতদিন ধরে তিনি পড়ানোর স্টাইলে কিছুমাত্র বদল আনেননি। যে-ছাত্র অকৃতকার্য হয়েছে তাকে কঠোর সাজা দিয়েছেন। কেননা তিনি বিশ্বাস করেন, ডিসিপ্লিন-ই আসল। আর, ডিসিপ্লিন বজায় রাখতে হলে শাসন করা দরকার। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এইভাবেই পড়িয়ে এসেছেন। এবার তাঁর সেই চিরাচরিত পড়ানোর স্টাইল বড় অগ্নিপরীক্ষার মুখে পড়ল।

নির্দিষ্ট দিনে স্কুল পরীক্ষক এলেন। কিন্তু আমরা যখন ভাবতে শুরু করি, জীবনে অপ্রত্যাশিত বলে কিছু আর ঘটবে না, তখনই অপ্রত্যাশিত আসলে ঘটে। দেখা গেল, এই স্কুল পরিদর্শক আর কেউ নন, অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকেরই প্রাক্তন ছাত্র। মানে, ছাত্র এবার বিচার করবে গুরুর। গুরু কতখানি ভুল, কতখানি ঠিক। ‘বনফুল’ এখানে এসে গুরুকেই জিতিয়ে দিলেন। স্কুল পরিদর্শক ওরফে প্রাক্তন ছাত্র বলল, মাস্টারমশাই আমার কিছু করার নেই। আপনার বিরুদ্ধে রীতিমতো লিখিত অভিযোগ আছে। খোঁজখবর যা নিয়েছি, তাতে আপনার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ভিত্তিহীন নয়। ফলে, আমাকে একটা কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে।

কিন্তু একটা অনুরোধ আছে।

প্রধান শিক্ষক বিমর্ষ মুখে জানতে চান সেটা কী! স্কুল পরিদর্শক ওরফে প্রাক্তন ছাত্র বলে, মাস্টারমশাই এই স্কুল তো আপনাকে ছাড়তে হবে। একটা কাজ করুন– আমার বাড়িতে চলুন। আমাকে টুরে টুরে ঘুরে বেড়াতে হয়। দু’টি সন্তানের পড়াশোনার খেয়াল রাখতে পারি না সেভাবে। আপনি তাদের দায়িত্ব নিন। আমি আপনাকে মাথায় করে রাখব। আপনি আমার সন্তানদের পড়ালে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আর দুশ্চিন্তা থাকবে না।

প্রধান শিক্ষক সম্মত হন। যে-ছাত্র তাঁর বিচার করতে এসেছিল, বিচারের শেষে, তিনি তাঁরই অতিথি হয়ে গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। চিরদিনের জন্য। এই অসামান্য গল্পটি বললাম– ডিসিপ্লিনের তাৎপর্য বোঝাতে। আমাদের সেন্ট জেভিয়ার্সে ফাদার জরিসকে দেখে ছাত্ররা পালাত। কেননা, কলেজে ক্লাস করতে অনিচ্ছুক ও পলায়নোদ্যত ছাত্রদের তিনি সাইকেল নিয়ে ধাওয়া করতেন। তারপর পাকড়াও করতে পারলে, তাদের অনেকক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখতেন। শুনলে হাস্যকর মনে হতে পারে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, এই ধরনের তৎপরতা ছিল বলেই আমাদের যেটুকু পড়াশোনা হওয়ার তা হয়েছে। অনুশাসন থাকা দরকার। সুধাংশুশেখর ভট্টাচার্য বা ফাদার জরিসের মতো শিক্ষক আমাদের অনুশাসনের পাঠ দিয়েছিলেন। অল্প বয়সে হয়তো এর সবটুকু গুরুত্ব বুঝতে পারিনি। এখন পারি। শিক্ষকদের প্রভাব যদি ছাত্রছাত্রীদের জীবনে স্থায়ী হয়, তাহলে তাদের বিপথে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে। মেরুদণ্ড সোজা রেখে ও মাথা উঁচু করে বাঁচতে শেখে তারা।

………………………
প্রতি বছর যখন ঘুরতে যেতাম, মা আমাকে একটি খাতা দিয়ে বলতেন, ভ্রমণের শুরু থেকে শেষ অবধি সব অভিজ্ঞতা ইংরেজিতে খাতায় লিখে রাখতে। মা অতদিন আগেও কেমন করে যেন অনুমান করতে পেরেছিলেন, ইংরেজি শেখার ‘বিকল্প’ হয় না। তখন তো ‘বিশ্বায়ন’ বা ‘গ্লোবালাইজেশন’ শব্দটি থেকে আমরা অনেক আলোকবর্ষ দূরে অবস্থান করছি। কিন্তু পেশাদার জগতে ইংরেজি যে অবিসংবাদী আসন গ্রহণ করতে চলেছে, এ-নিয়ে সম্ভবত আমার মায়ের মনে দ্বিধা ছিল না।

………………………

কলেজ পাস করে ভর্তি হই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল’ কলেজে। এখানেও ছিল মর্নিং সেশন। কলেজ পাস করার পর ভিআইপি রোড সংলগ্ন ইস্টার্ন পেপার মিলে অডিটের কাজ করতে যেতাম। সেখানকার বস ছিলেন আমার সিএ ফার্মের জি. বসু। আর ফার্মের নাম ছিল ‘বসু দে কাপুর’। প্রতি শনিবার তাঁর অফিসে যেতে হত রিপোর্ট দিতে। সেটা ছিল জ্যোতি সিনেমার পিছনে। ফার্স্ট ফ্লোরে। আর, নিচেই ছিল বিখ্যাত দেশি মদের ঠেক ‘বারদুয়ারি’। দেখতাম, সেখানে কত লোকের আনাগোনা! ছাপোষা মানুষের পাশাপাশি বিখ্যাত মানুষদেরও সেখানে আসতে দেখেছি। এই শ্রেণিবৈষম্যের কথা বললাম একটাই কারণে। মদের ঠেকের মতো ‘লেভেলার’ আর হয় না। যে-ই আসুক না কেন, যে-শ্রেণির থেকেই আসুক না কেন, পানের ঠেকে সবাই সমান। উচ্চ-নীচ ভেদাভেদ নেই সেখানে। লক্ষ করতাম, সুরারসিকরা ঘাড় সোজা করে ঢুকছেন। কিন্তু বেরনোর সময় সকলেরই পা কেমন যেন টলমল করত!

এককালের জ্যোতি সিনেমা হল

শিক্ষাজীবনের প্রতিটি পর্বে আমি কম-বেশি শিখতে শিখতে গিয়েছি। আজও কত কিছু শিখে চলেছি। বইয়ের পড়া যেমন একটা ভিত রচনা করে দেয়, তেমনই সিলেবাসের বাইরের জগৎ থেকেও আমাদের শেখার শেষ থাকে না। আমার মা একটি কথা বলতেন, এখনও সেটা ভুলিনি। প্রতি বছর যখন ঘুরতে যেতাম, মা আমাকে একটি খাতা দিয়ে বলতেন, ভ্রমণের শুরু থেকে শেষ অবধি সব অভিজ্ঞতা ইংরেজিতে খাতায় লিখে রাখতে। মা অতদিন আগেও কেমন করে যেন অনুমান করতে পেরেছিলেন, ইংরেজি শেখার ‘বিকল্প’ হয় না। তখন তো ‘বিশ্বায়ন’ বা ‘গ্লোবালাইজেশন’ শব্দটি থেকে আমরা অনেক আলোকবর্ষ দূরে অবস্থান করছি। কিন্তু পেশাদার জগতে ইংরেজি যে অবিসংবাদী আসন গ্রহণ করতে চলেছে, এ-নিয়ে সম্ভবত আমার মায়ের মনে দ্বিধা ছিল না।

এখানে একটি বড় মাপের বিতর্কের অবকাশ আছে। কেন ইংরেজি? কেন বাংলা নয়? কেন নয় কন্নড়, মালয়ালম বা মারাঠি? ভারত বহুভাষী দেশ। অনেক ভাষাই ‘রাষ্ট্রভাষা’-র মর্যাদা পেয়েছে আমাদের দেশে। ইংরেজি এর মধ্যে ‘অফিশিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ’। হিন্দিও তাই। এখন হিন্দিকে একমাত্র ‘রাষ্ট্রভাষা’ বলে প্রচার করার চেষ্টা চলছে। আমি এর অর্থ ঠিক বুঝি না। দেশের অন্যান্য ভাষাও যদি ‘রাষ্ট্রভাষা’ বলে গণ্য হয়, তাহলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কেন হিন্দিকে একমেবাদ্বিতীয়ম রাষ্ট্রভাষা বলে প্রচার করা হবে? যে হিন্দি শিখতে চায়, শিখুক না! কিন্তু জোর করে কেন হিন্দি গেলানো হবে সবাইকে?

তবে এ-ও অনস্বীকার্য যে, ইংরেজি আন্তর্জাতিক পরিসরে অত্যন্ত কার্যকর একটি ভাষা। পেশার প্রয়োজনে, সংযোগের প্রয়োজনে ইংরেজি অপরিহার্য। ফলে মা-র উপদেশ পরবর্তী জীবনে কতটা কাজে লেগেছে বলে বোঝাতে পারব না।

কিন্তু ইংরেজির উপর দখল আনতে গিয়ে আমি বাংলা ভুলে যাইনি। বা, বাংলা ভাষার প্রতি আমার ভালোবাসায় খামতি আসেনি। এক সময় পশ্চিমবঙ্গের বাম শাসকরা প্রাথমিক স্তরে ইংরেজি তুলে দেওয়ার সপক্ষে সওয়াল করেছিলেন। আমি এর পক্ষে আগেও ছিলাম না, এখন তো নই-ই। এখনকার গ্লোবালাইড পৃথিবীতে যোগাযোগ করতে হলে ইংরেজির বিকল্প নেই। কিন্তু কেউ যদি চায়, সে ইংরেজি শিখবে অথচ নিজের মাতৃভাষাটাকে বিসর্জন দেবে না, তাহলে কার সাধ্য তাকে মাতৃভাষার আঙিনা থেকে বাইরে ছুড়ে দেয়?

ড. নিমাইসাধন বসু– বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং বিশ্বভারতীর উপাচার্য সম্পর্কে ছিলেন আমার কাকা। তাঁর প্রভাব আমার জীবনে অপরিসীম। ‘ফ্রেন্ড, ফিলোজফার অ্যান্ড গাইড’ বলে তাঁকেই মানি।

একান্ত আলাপচারিতায় কাকা নিমাইসাধন বসুর সঙ্গে

পাঠকদের অবগতির জন্য জানাই, নিমাইকাকা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অত্যন্ত স্নেহভাজন ছিলেন। একদিন নিমাইকাকার সঙ্গে গল্প করছি। হঠাৎ একটি ফোন এল। উনি ফোন রিসিভ করলেন। তারপর কী সব কথাবার্তা সেরে ফিরে এলেন। ওঁর চোখ-মুখ উদ্ভাসিত। কী হয়েছে গো? তখন জানতে পারলাম– ফোনের ওপারে ছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। তিনি চেয়েছিলেন, নিমাইকাকা হাওড়া থেকে লোকসভা নির্বাচনে দাঁড়ান। তাঁকে দেশের শিক্ষামন্ত্রী করার বাসনা ছিল ইন্দিরাজির। কিন্তু নিমাইকাকা সক্রিয় রাজনীতিতে যেতে চাননি। স্পষ্টভাষায় ‘না’ বলে দেন। এর বদলে চেয়েছিলেন যেটা– তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কোনওভাবে সংযুক্ত হতে।

সে ইচ্ছে পূর্ণ হয়েছিল। বিশ্বভারতীর অন্যতম বিবেচক ও বিতর্কহীন উপাচার্য বলে তিনি এখনও বন্দিত।

নিমাইসাধন বসু

…………………………

ইংরেজি শেখার দরকার আছে। কিন্তু তার জন্য মাতৃভাষা জলাঞ্জলি দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। ইংরেজি না-শেখার জন্য এই রাজ্যের একাধিক প্রজন্ম যেমন ভাষা-কানা হয়ে থেকেছে, তেমনই এখনকার প্রজন্ম ইংরেজি শিখতে গিয়ে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি অযত্নবান হচ্ছে। বাংলা তারা শিখতে চায় না। কখনও কখনও এমনও দেখেছি, বাংলা বলতে এখনকার ছেলে-মেয়েরা লজ্জা বোধ করে।

…………………………

তা, নিমাইকাকা বলতেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার যে প্রাথমিকে ইংরেজি তুলে দিল, এটি একটি আত্মঘাতী পদক্ষেপ। বোকামির পরিচয়, দূরদর্শিতার অভাব। একাধিক প্রজন্ম এই সিদ্ধান্তের দরুন ইংরেজি করায়ত্ত করতে খাবি খেয়েছে। আর, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, ইংরেজি না-জানলে কতটা পিছিয়ে পড়তে হয়। আমি বহু বছর দুবাইয়ের বাসিন্দা। ‘এনআরআই’ বাঙালি। দুবাইয়ে কিন্তু কেরালাইটদের খুব কদর। কারণ, তারা ইংরেজিতে সড়গড়। আমাদের বঙ্গভাষীরা তুলনায় অনেক পিছিয়ে। দুবাইয়ের সুদক্ষ শ্রমিকের অন্তত ৭৩ শতাংশ কেরলের অধিবাসী। ফলে কাজের জগতে তাদেরই একচেটিয়া প্রাধান্য।

ইংরেজি শেখার দরকার আছে। কিন্তু তার জন্য মাতৃভাষা জলাঞ্জলি দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। ইংরেজি না-শেখার জন্য এই রাজ্যের একাধিক প্রজন্ম যেমন ভাষা-কানা হয়ে থেকেছে, তেমনই এখনকার প্রজন্ম ইংরেজি শিখতে গিয়ে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি অযত্নবান হচ্ছে। বাংলা তারা শিখতে চায় না। কখনও কখনও এমনও দেখেছি, বাংলা বলতে এখনকার ছেলে-মেয়েরা লজ্জা বোধ করে। অনেক বাড়ির অভিভাবক মনে করে, ইংরেজি শিখলেই সচ্ছল চাকরি পাওয়া যাবে। ইংরেজিকে ঠান্ডা মাথায় তুলে দেওয়া যদি ভ্রান্ত শিক্ষানীতির পরিচয় হয়, তাহলে এখন শুধুই ইংরেজি শিখব, বাংলায় কথা বলব না, বা বাংলা লিখতে জানব না– এটাও ভুল।

(সংক্ষেপিত)