Jagadish Chandra Bose: The World of Abyakta। Robbar
Robbar
  • ২ আশ্বিন ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অব্যক্ত জগদীশ, বাঙ্ময় জগদীশ

একজন আদ্যোপান্ত বিজ্ঞানীর অধ্যাত্মবোধ বড় সহজ হয় না। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু আনখশির অধ্যাত্মবাদী। কিন্তু তাঁর অধ্যাত্মচেতনা আর বিজ্ঞানচেতনা সমান্তরাল প্রবাহ হয়ে থাকেনি। বরং তারা মিলেমিশে গিয়েছে জীবনের বিভিন্ন মোড়ে। ‘ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে’ প্রবন্ধটিতে ভারতাত্মার পুরাণ আর বিজ্ঞান মিশে যায়। ভারতীয় দর্শনের যে মূলত দু’টি উদ্ভাস– অধ্যাত্মবাদ ও বিজ্ঞান, তা তিনি সারা জীবনব্যাপী যাপন করতে চেয়েছেন। অব্যক্ত তার প্রমাণ।

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬, ২০:৪৭   
Facebook WhatsApp Messenger

১৪৩৩ সালের আশ্বিন মাস এল। আর সেই সঙ্গে এল আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর ‘অব্যক্ত’ বইটির জন্মমাস। ১৩২৮ থেকে এই ১০৫ বছরের বেশিরভাগ পথটুকুই বাঙ্ময় হয়ে থাকলেও এখন সে যেন নির্বাক! আমরাও আটকে গিয়েছি শারীরস্থানে, যাকে বলে ‘ল্যাটেন্ট পিরিয়ড’, যার বাংলা তরজমা করেছিলেন আচার্য, তাঁর অব্যক্ততে ‘অনুভূতি-সময়’-এর মধ্যে; বইটির হারিয়ে যাওয়ার আঘাত আমরা পেয়েছি কিন্তু সাড়া দিইনি এখনও।

zoom
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু

তাঁর জীবনের যা কিছু এই পর্যন্ত সময়ে অব্যক্ত ঠেকেছে, তা নিয়েই এই বই– প্রথম বই। সেখানে তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ আছে, আছে গাছেদের কথা, আছে তাঁর বিজ্ঞানে নিবেদিত জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, আছে তাঁর শান্ত-সমাহিত ঈশ্বরবিশ্বাস আর দৃঢ় কৃতজ্ঞতাবোধ। যা কিছু অব্যক্ত তার প্রতি বৈজ্ঞানিকের দায়বদ্ধতা নিয়ে তিনি তাঁর যন্ত্র গড়েছেন, গবেষণাগার সাজিয়েছেন, পথ বানিয়েছেন। তাঁর আবিষ্কারের প্রতি স্নেহপাশে তিনি বলছেন, ‘দৃশ্য আলোকের বাহিরে যে অদৃশ্য আলোক আছে, তাহাকে খুঁজিয়া বাহির করিলে আমাদের দৃষ্টি যেমন অনন্তের মধ্যে প্রসারিত হয়, তেমনি চেতন রাজ্যের বাহিরে যে বাক্যহীন বেদনা আছে তাহাকে বোধগম্য করিলে আমাদের অনুভূতি আপনার ক্ষেত্রকে বিস্তৃত করিয়া দেখিতে পায়’।

একজন আদ্যোপান্ত বিজ্ঞানীর অধ্যাত্মবোধ বড় সহজ হয় না। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু আনখশির অধ্যাত্মবাদী। কিন্তু তাঁর অধ্যাত্মচেতনা আর বিজ্ঞানচেতনা সমান্তরাল প্রবাহ হয়ে থাকেনি। বরং তারা মিলেমিশে গিয়েছে জীবনের বিভিন্ন মোড়ে। ‘ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে’ প্রবন্ধটিতে ভারতাত্মার পুরাণ আর বিজ্ঞান মিশে যায়। ভারতীয় দর্শনের যে মূলত দু’টি উদ্ভাস– অধ্যাত্মবাদ ও বিজ্ঞান, তা তিনি সারা জীবনব্যাপী যাপন করতে চেয়েছেন। অব্যক্ত তার প্রমাণ। ড. বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তাঁর ‘বঙ্গসাহিত্যে বিজ্ঞান’ বইটিতে ‘অব্যক্ত’ প্রসঙ্গে লিখছেন– “এই গ্রন্থের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক রচনায় অনুরণিত হয়েছে ঐক্যের সুর। এই ঐক্যের সাধনা প্রাচীন ভারতীয় ঋষিরা একদিন করেছিলেন। গ্রন্থটিতে সংযোজিত বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ আলোচনা করলে দেখা যায়, আচার্য জগদীশচন্দ্র অণু-পরমাণু থেকে শুরু ক’রে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সর্বত্র একই মহাশক্তির বিকাশ অনুভব করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে তাই বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে প্রকৃত কোনো বিভেদ নেই।”

zoom

বিশ্বের একাধিক খ্যাতনামা পদার্থবিদ দর্শনতত্ত্বে তাঁদের অবদান রেখে গিয়েছেন। আমাদের বাংলার পদার্থবিদরাও সে-দলে পড়েন। তাও ‘অব্যক্ত’ পড়লে আচার্য বসুর দার্শনিক চেতনা আমাদের নতুন করে মুগ্ধ করে। সেখানে ছত্রে ছত্রে মনুষ্যজীবনের তুচ্ছতা, সীমাবদ্ধতার কথা লেখা। তিনি দেখছেন চারদিকে ‘জীবনের স্রোত বহিতেছে’ আর তার মধ্যে ‘দুই-একখানা ভগ্ন দিক্‌দর্শনশলাকা লইয়া আমরা মহাসমুদ্রে যাত্রা করিয়াছি’। তাঁর কাছে ‘অসহ্য এই মানুষের অপূর্ণতা’। আবার মানুষ তাঁকে বিস্ময়াবিষ্ট করছে; ‘সমুদ্রতীরস্থ বালুকাকণার গণনা মনুষ্যের পক্ষে সম্ভব, কিন্তু এই অসীম বিক্ষিপ্ত অগণ্য জগতের গণনা কল্পনারও অতীত।… মানুষের মন অসীমের ভার বহিতে পারে না। ধূলিকণা হইয়া কিরূপে অসীম ব্রহ্মাণ্ডের কল্পনা মনে ধারণা করিব?… অধিক বিস্ময়কর কাহাকে বলিব? বিশ্বের অসীমতা, কিংবা এই সসীম ক্ষুদ্র বিন্দুতে অসীম ধারণা করিবার প্রয়াস – কোন্‌টা অধিক বিস্ময়কর?’

মানুষের পাশাপাশি উঠোনের লজ্জাবতী বা অবহেলার বন-চাঁড়াল তাঁকে চমকে দেয়। ফিরে ফিরে ডাক দিয়ে যাচ্ছে তাঁর লেখায় ‘গাছের জীবন মানুষের জীবনের ছায়ামাত্র’। এমন গভীর চেতনাকে তিনি অব্যক্তের শিশুপাঠ্যেও অপরিহার্য ভেবেছেন।

তাঁর বাবার শিক্ষায় মাটির কাছাকাছি থেকে তিনি শ্রমের সম্মান করে গিয়েছেন আজীবন। সে-শিক্ষার প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ থেকেছেন নিরবিচ্ছিন্নভাবে। তিনি শেখাতে চেয়েছিলেন যে, কেন্দ্রকে বলশালী করে প্রান্তীয় শক্তি। তাই তাকে উপেক্ষা সুসভ্যতার লক্ষণ হতে পারে না। তাঁর পৃথিবীতে ‘অমরত্বের বীজ চিন্তায়, বিত্তে নহে’। অবাক হতে হয়, মানুষের মনের গতিবিধি পর্যালোচনায় তাঁর দক্ষতায় যখন তিনি লেখেন– ‘সমবেদনা সতত উর্দ্ধমুখী, কখনও কখনও সমতলগামী, ক্বচিৎ নিম্নগামী’। তাঁর মতে, এ বৈষম্য যত দ্রুত মিটবে, ততই দ্রুত হবে সমাজকল্যাণে পৌঁছনো। বিজ্ঞানেরই হাতে মানবকল্যাণের নিয়ন্ত্রণ। আর ছিল তাঁর কর্মযোগ। গোটা বই-জুড়ে শব্দে লেখা তাঁর বানানো যন্ত্রের ছবি; যন্ত্র যাতে আকাশোর্মি উৎপন্ন হয়, যন্ত্র যাতে অদৃশ্য আলোতে আণবিক পরিবর্তন দেখানো যায়, যন্ত্র যাতে গাছের সাড়া পড়া যায় ইত্যাদি। এসব তো নিশ্চিত সাধনার ফসল কিন্তু অব্যক্ত লিপিবদ্ধ করেছে তাঁর সাধনা বিষয়ে আরেক অমূল্য ভাবনা; ‘সহযোগিতা কি আমাদের সাধনা নয়?’ সাহায্যকে সাধনার স্তরে উন্নীত করে তিনি তাঁর কর্মযোগে নতুন মাত্রা এনেছেন। মানববন্ধনের আশা যেন দৃঢ়তর হয়েছে এতে। আর চিরকালের আশাবাদী তিনি নিজের জীবন দিয়ে বুঝিয়েছেন, যত বড় কর্মকাণ্ডই হোক, ফলের আশা করা যাবে না।

zoom

প্রকৃত কাজে মগ্ন থাকলে হতাশার দিন, মাস, বছর নিমেষমাত্র ঠেকে। তাঁর সাধনা আর খ্যাতির মধ্যে সময়ের ব্যবধান তাঁকে ঋজু করে তুলেছিল। তিনি নিজের ওপর আস্থা থেকে চ্যুত হননি; ‘আমার জীবনে যদি কোনো সফলতা দেখিয়া থাকেন তবে জানিবেন, তাহা সর্বদা নিজেকে আঘাত করিয়া জাগ্রত রাখিবার ফলে।… যদি বাঁচিতে চাও তবে কশাঘাত করিয়া নিজেকে জাগ্রত রাখ’। জনজাতিকে তিনি শেখান ‘যে মুমূর্ষু সে-ই মৃত বস্তু লইয়া আগলাইয়া থাকে’। এরপর ‘অব্যক্ত’তে লিপিবদ্ধ হয় তাঁর বিখ্যাত পর্যবেক্ষণ– ‘শুষ্ক তৃণ জল-স্রোতে ভাসিয়া যায়’। তারপরেও কি ‘শুষ্ক তৃণ’ হওয়ার আতঙ্ক তৈরি না হয়ে পারে?

প্রকাশের অন্তরঙ্গতায় ‘অব্যক্ত’ সুখপাঠ্য। ২০০৭ সালে অব্যক্তের প্রসঙ্গ-কথায় শ্যামল চক্রবর্তী লিখেছেন, “জগদীশ্চন্দ্রের বেলায় আমরা তাঁর বিজ্ঞান গবেষণা ও সাহিত্যভাবনার উন্মেষ একই সময়ে দেখতে পাই। ১৮৯৪ সালে ‘দাসী’ পত্রিকায় ‘ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে’ প্রকাশিত হয়েছে। ১৮৯৫ সালে তাঁর প্রথম বিজ্ঞান গবেষণাপত্র রয়েল সোসাইটিতে প্রকাশিত হয়। পরে ১৯২১ সালে ‘ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে’ অব্যক্ত বইটির মধ্যে প্রকাশ পায়। ‘বঙ্গসাহিত্যে বিজ্ঞান’ বইটিতে আমরা পাই– ‘বস্তুতঃ, সাহিত্যিক ঔজ্জ্বল্যই অব্যক্তের সর্বপ্রধান বৈশিষ্ট্য। বৈজ্ঞানিক জগদীশচন্দ্র এখানে সাহিত্যিক হয়ে উঠেছেন। আলোচ্য গ্রন্থে স্ব-আবিষ্কৃত বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলো বর্ণনা করার সময় তিনি বৈজ্ঞানিকের সাংকেতিকতা পরিহার ক’রে সাহিত্যিকোচিত সরল ও মনোরম ভাষার আশ্রয় নিয়েছেন।”

zoom

শব্দের প্রমিত রূপ ব্যবহার তাঁর সমসাময়িক হলেও তাঁর ‘আকাশোর্মি’ বা ‘তরুলিপি’ জাতীয় শব্দগুলো আজও শ্রুতিমধুর। আর আছে তাঁর কমিক রিলিফ। বিজ্ঞানের একটু ভারী কথা এসে গেলেই পিছু-পিছু এসেছে তাঁর রসিকতা। যার ফলে লেখার ভার অনায়াসেই লাঘব হয়েছে। ‘কুন্তলীন পুরস্কার’ মাথায় রেখে তিনি কল্পবিজ্ঞানের গল্পও লিখেছিলেন; ‘পলাতক তুফান’। বলা বাহুল্য, পুরস্কারটি তিনিই পান। আর আমরা পাই এক শিশুপাঠ্য কল্পবিজ্ঞান।

zoom

কাজের সঙ্গে তাঁর জাতীয়তাবাদের ভাবনা নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত ছিল; ‘অবসাদ ঘুচাও। দুর্বলতা পরিত্যাগ কর! মনে কর, আমরা যে অবস্থাতেই পড়ি না কেন সে-ই আমাদের প্রকৃষ্ট অবস্থা। ভারতই আমাদের কর্মভূমি, এখানেই আমাদের কর্তব্য সমাধা করিতে হইবে।’ দেশের বাইরে তাঁর নিজের গবেষণার কথা ছড়িয়ে তিনি দেশেরই হয়ে কথা বলেছেন। দেশ ছাড়েননি। শুধু তাই নয়, তিনি বিজ্ঞানে ব্যবহৃত ল্যাটিন পরিভাষার একটি করে সংস্কৃত প্রতিশব্দ চেয়ে নিজের বানানো যন্ত্রের নাম তৎসম শব্দে রেখেছিলেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক স্তরে সে উচ্চারণে অসুবিধা তৈরি হয়। তাঁকে ফিরতে হয় ইংরেজি ও ল্যাটিনে। অবশ্য শুরুতে বঙ্গদেশও তাঁকে উপেক্ষা করেছিল! তাই গবেষণাপত্রে বিদেশি ভাষা বেছে নিতে তিনি একপ্রকার বাধ্যই হন।

২০২৬ সালের প্রগলভতার মধ্যে ‘অব্যক্ত’ নির্বাক হলেও নির্বিকার নয়। বইখানা হাতে নিলেই পাঠক, লেখকের আন্তরিকতার, উষ্ণতার অংশীদার হয়ে ওঠেন। দর্শন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কল্পবিজ্ঞান, অধ্যাত্মচিন্তা, কর্মযোগ, সমাজচিন্তা, মানবকল্যাণ, জাতীয়তাবোধ, সাহিত্যচেতনা, শৈশব, ইতিহাসচারণ, যেখানেই ছাদ চুঁইয়ে জল পড়েছে ‘অব্যক্ত’ সেখানেই ছাতা ধরেছে। আমাদের সাড়া দিতে আর কত দেরি?

…………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন সীমন্তিনী ভট্টাচার্য-র অন্যান্য লেখা

…………………..

Abyakta bengali literature Indian Scientists Jagadish Chandra Bose Nature and Science Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar scientists World Science অব্যক্ত

Share this article on