Robbar

কাশ্মীরের প্রকৃতিকে পোশাকে রূপান্তর

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 20, 2026 6:58 pm
  • Updated:May 20, 2026 6:59 pm  

তাঁর সব থেকে বড় কৃতিত্ব ভারতীয় পুরুষের পোশাকে টাটকা বাতাস বয়ে আনা। ধুতি-পাঞ্জাবি, প্যান্ট-শার্ট, ডেনিম জিন্স আর খুব বেশি করে জহরকোট-মার্কা বন্ধগলার বাইরে পুরুষের পোশাকে রোহিত প্রাকৃতিক মোটিফ এনেছিলেন। সাদা-কালোর একহারা রঙের ভুবন থেকে বেরিয়ে বিভিন্ন উজ্জ্বল রঙের নিরীক্ষা তিনি পুরুষের পোশাকে শুরু করেন। অথচ সেই নিরীক্ষায় অতিরিক্ত মাত্রা ছিল না। এমনকী পুরুষের পোশাককে ডিজাইনিংয়ের ছলে অকারণ মেয়েদের পোশাক করে তুলতেন না রোহিত।

ভাস্কর মজুমদার

‘বুমরো বুমরো শামরঙ্গ বুমরো
আয়ে হো কিস বগিয়া সে, ও-ও-তুম
মেহেন্দি কি ছাঁও মে গীত সুনায়ে বুমরো
ঝুমে নাচে সাঁজ গায়ে জশন মনায়ে বুমরো…’

তিনি যদি চিত্রকর হতেন, তাহলে তাঁর শিল্পে ভরে থাকত ঝকঝকে নীল আকাশ আর পাহাড়ের গা থেকে নেমে-আসা দুরন্ত ঝরনা। কাশ্মীরকে তিনি হৃদয়ে এমনই ধারণ করেছিলেন যে, চিত্রকর না-হয়ে যখন ফ্যাশন ডিজাইনার হয়ে উঠলেন তখন তাঁর প্রকরণে স্থান পেল উপত্যকার পাখি, গাছ, গোলাপ। ভারতীয় ফ্যাশনে তখনও প্রায় ব্রাত্য ভেলভেটকে তিনি একার হাতে জাতে তুলেছিলেন। কিন্তু ফ্যাশনই যে তাঁর জীবনপথ হবে– কাশ্মীর থেকে উৎপাটিত, পরবর্তীকালে দিল্লিতে থিতু হওয়া রোহিত বাল আগে ভাবেননি কোনওদিন।

রোহিত বাল

দিল্লির সেন্ট স্টিফেন্স কলেজে ইতিহাস নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন রোহিত। নয়ের দশকের গোড়ায় ভারতে অর্থনৈতিক উদারীকরণ সামাজিক নানা কিছুর সঙ্গে সঙ্গে ফ্যাশন ব্যাপারটায় একটা বিপ্লব সাধন করেছিল। বাজার খুলে যাওয়ায় পুঁজিবাদ আসতে আসতে মানুষের হাতে টাকা নিয়ে আসছিল। এর প্রকোষ্ঠেই একটা ভোগবাদী জীবন ও চর্যার বিশেষ রূপরেখা তৈরি হল। তখন ফ্যাশন বলতে ধনী পরিবারের মেয়েদের সাজগোজ কিংবা খাদি-সংস্কৃতি বোঝার যে-চল, সেটা প্রশ্নের মুখে পড়ল। ১৯৮৬ নাগাদ ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ফ্যাশন টেকনোলজি’ তৈরি হয়েছে। ঋতু বেরি, রিনা ঢাকা, জে.জে ভাল্লা, আশিস সোনি, তরুণ তাহলানি, মনীশ অরোরা-সহ একগুচ্ছ ফ্যাশনের ছাত্রছাত্রীরা ভারতীয় ফ্যাশনকে একেবারে নবরূপে প্রকাশ করতে শুরু করে দিয়েছে। এই আবহেই ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব রোহিত বালের।

বাড়ির টেক্সটাইল ব্যবসাকে নতুন দিশা দেখাতে গিয়ে ভারতের ফ্যাশন সংজ্ঞাই তিনি বদলে ফেলেছিলেন এক সময়। তাঁর সব থেকে বড় কৃতিত্ব ভারতীয় পুরুষের পোশাকে টাটকা বাতাস বয়ে আনা। ধুতি-পাঞ্জাবি, প্যান্ট-শার্ট, ডেনিম জিন্স আর খুব বেশি করে জহরকোট-মার্কা বন্ধগলার বাইরে পুরুষের পোশাকে রোহিত প্রাকৃতিক মোটিফ এনেছিলেন। সাদা-কালোর একহারা রঙের ভুবন থেকে বেরিয়ে বিভিন্ন উজ্জ্বল রঙের নিরীক্ষা তিনি পুরুষের পোশাকে শুরু করেন। অথচ সেই নিরীক্ষায় অতিরিক্ত মাত্রা ছিল না। এমনকী পুরুষের পোশাককে ডিজাইনিংয়ের ছলে অকারণ মেয়েদের পোশাক করে তুলতেন না রোহিত। তাঁর পোশাকে লিঙ্গ-রাজনীতি ছিল না ঠিকই, কিন্তু পুরুষ ও নারীর পোশাকের সূক্ষ্ম ও সুন্দর বিভেদ ছিল শৈল্পিক মাত্রা বজায় রেখে।

সিদ্ধার্থ মালহোত্রা-ডায়না পেন্টির সঙ্গে রোহিত বাল

রোহিত বালের ডিজাইনের আরেকটি দিক খুব গুরুত্বপূর্ণ যে, তাতে কোনওরকম তথাকথিত বলিউডের ছাপ বা ছায়া ছিল না। ফ্যাশনকে তিনি উচ্চকোটির চর্চা হিসেবে বুঝতেন এবং জনগণের জন্য ফ্যাশন নয়– এটাই বারবার বলতেন। এই শিল্প-বিশ্বাস বোধ করি তাঁকে কখনও সিনেমার সঙ্গে যুক্ত হতে দেয়নি। তিনি পরবর্তীকালে ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’ অনুষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছেন, কিংবা ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের পোশাক ডিজাইন করেছেন, কিন্তু এর বাইরে তাঁর বিচরণ ছিল কেবলমাত্র র‌্যাম্প এবং রিটেলে। ভারতীয় ফ্যাশন উইকগুলির প্রিয় পাত্র তো তিনি ছিলেনই, এমনকী প্যারিস-মিলানের মতো ফ্যাশনের নানা মক্কায় তাঁর শো ছিল বাঁধাধরা।

ফিল্মের সঙ্গে তাঁর গাটছড়া তেমনভাবে কোনওদিন গড়ে ওঠেনি। এমনকী সারা বিশ্বের তাবড় ডিজাইনাররা যখন ফ্যাশন-ভিডিও তৈরি করছেন, রোহিত তখনও বলেছেন, ভিডিও কখনও ফ্যাশনের প্রতি ন্যায় করতে পারে না। দু’টি মাধ্যম তেল আর জলের মতো আলাদা। মেশাতে গেলে রসভঙ্গের সম্ভাবনা বেড়ে যায়! তাঁর র‌্যাম্পে শো-স্টপার হিসেবে তাই কোনও নামী বলিউড সেলিব্রিটির দেখা পাওয়া ছিল বিরল। বিদেশি সেলিব্রিটিরাও ছিল তাঁর কাছে কেবল ‘ক্লায়েন্ট’। কারও জনপ্রিয়তা ব্যবহার করে, নিজের ফ্যাশন ভাবনার অভিমুখ কখনও বন্ধ করতে চাননি রোহিত বাল।

সদ্য চলে গেল রোহিত বালের জন্মদিন (৮ মে)। ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর দীর্ঘ রোগভোগের পর মাত্র ৬৩ বছর বয়সে রোহিত পরপারে চলে গিয়েছিলেন। মৃত্যুর আগের ১০-১২টা বছর তাঁর শরীর ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছিল। বহুদিন কাজ থেকে সরে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। হার্টের অসুখ নয়ের দশকের দামাল ‘গুড্ডা’-কে (ফ্যাশন দুনিয়া এই নামে তাঁকে চিনত) কাবু করে ফেলেছিল প্রায়।

ভারতীয় ফ্যাশনে যুগান্তকারী পরিবর্তন ছাড়া রোহিত বালকে আরও একটি বিষয়ের দিকপাল হিসেবে দেখা যেতে পারে। ভারতবাসী বহুকাল সমকামী-রূপান্তরকামী বলতে কেবল হিজড়ে পেশা ও সম্প্রদায়ের মানুষদের বুঝত। কুইয়র মানুষদের মধ্যে যে কত ভিন্নতা থাকতে পারে, তা কেউ চিন্তা করত না। রোহিত বাল সমকামী ছিলেন, শুধু তাই নয়, তাঁর সুপুরুষ চেহারা, তাঁর খোলামেলা জীবনযাপন এ-দেশে সমকামী মানুষদের দৃশ্যমানতা, বিশেষত, সমকামী ও বিসমকামী মানুষদের মধ্যে যে-আসলে তেমন পার্থক্য কিছু নেই, সমকামী মানুষরা হাস্যকর বস্তু কিছু নয়, বরং সমাজের সম্মাননীয় সম্প্রদায়– তা উপলব্ধি করতে অনেকখানি সাহায্য করেছিল।

ফ্যাশন আন্দোলনের পাশাপাশি দেশের কুইয়র আন্দোলনেও রোহিত বালের একটা প্রভাব ছিল। মৃত্যুর ঠিক এক সপ্তাহ আগে ‘ল্যাকমে ফ্যাশন উইক’-এ নিজের নতুন ডিজাইন নিয়ে হাজির হয়েছিলেন রোহিত। জয়জয়কার হয়েছিল তাঁর নতুন সৃষ্টির। শো-এর শেষে র‌্যাম্পে হেঁটে আসতেও যেন তাঁর শারীরিক কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু নিজের অপ্রতিরোধ্য স্পিরিটের জোরে তিনি এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁর এই শেষতম শোয়ের নাম ছিল ‘কায়নাত: আ ব্লুম ইন দ্য ইউনিভার্স’। আবার সেই ভেলভেটের ওপর ব্রোকেড ও সুতোর কাজ। তাতে পাখি, গাছ, গোলাপ। কাশ্মীর উপত্যকার স্মৃতি। ওই স্মৃতিতেই, রংবেরঙে আজও অমলিন গুড্ডা– রোহিত বাল।

………………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন ভাস্কর মজুমদার-এর অন্যান্য লেখা

………………………